হোমার ও ইলিয়াড : চরিত্র অঙ্কনে হোমারের তুল্য শিল্পী বিশ্বসাহিত্যে মেলা ভার—একমাত্র শেক্সপীয়ার ব্যতীত।”


হোমার: বিশ্বসাহিত্যের আদি যাদুকর, যিনি মানুষের ক্রোধকে কাব্যের উপজীব্য করে করুণায় রূপান্তরিত করেছেন।
ভূমিকা
বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী অঙ্গনে উজ্জ্বলতম যে আলোতবর্তিকা সহস্রাব্দ ধরে মানবসভ্যতাকে পথ দেখাচ্ছে, তিনি মহাকবি হোমার। ‘ইলিয়াড’ কেবলই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর বীরত্বের গাথা মনে হলেও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, হোমারের প্রকৃত জাদু লুকিয়ে আছে তার অনন্য চরিত্রায়ন রহস্যে। চরিত্র সৃষ্টিতে তিনি এমন এক শিল্পী, যার সমকক্ষ বিশ্বসাহিত্যে মেলা ভার—একমাত্র শেক্সপীয়ার ব্যতীত।
হোমারের ইলিয়াড কেবল পৌরাণিক দেবতার খেলা নয়, বরং এটি রক্ত-মাংসের মানুষের এক নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ। এখানে অজেয় বীর একিলিস যেমন প্রচণ্ড ক্রোধে অন্ধ হন, তেমনি দেশপ্রেমিক হেক্টরকে আমরা দেখি পরিবারের জন্য স্নেহকাতর এক সাধারণ মানুষ হিসেবে। প্রতিটি চরিত্রই তাদের স্বতন্ত্র আচার-ব্যবহার, হাব-ভাব আর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় সমুজ্জ্বল। এই চরিত্রের দ্বৈরথ কেবল সংঘাত তৈরি করে না, বরং মানুষের ভেতরের অহং (Hybris) আর নিয়তির লড়াইকে জীবন্ত করে তোলে।
তবে হোমারের সার্থকতা কেবল চরিত্রচিত্রণে সীমাবদ্ধ নয়; তার আঙ্গিকগত সার্থকতা ও মহাকাব্যিক সংহতি আজও বিস্ময় জাগায়। দশ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধের মাত্র ৪৭ দিনের ঘটনাকে তিনি যেভাবে একটি সুসংবদ্ধ শিল্পরূপ দিয়েছেন, তা শিল্পের এক চূড়ান্ত নিদর্শন। আজকের আলোচনায় আমরা প্রবেশ করব হোমারের সেই ধ্রুপদী অন্দরমহলে, যেখানে বীরত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে মানুষের দ্বিধা-বিভক্ত আত্মা আর এক কালজয়ী মহাকাব্যের অটুট গঠনশৈলী।
হোমার ও ইলিয়াড
- “হোমারীয় শিল্পকলা: ইলিয়াডের চরিত্রায়ন রহস্য ও মহাকাব্যিক সংহতি”
- “হোমারের ইলিয়াড: রক্ত-মাংসের মানুষ ও এক নিখুঁত মহাকাব্যের ব্যবচ্ছেদ”
- “চরিত্র অঙ্কনে অনন্য হোমার: ইলিয়াডের মনস্তত্ত্ব ও আঙ্গিকগত সার্থকতা”
- “হোমার ও ইলিয়াড: চরিত্রের দ্বৈরথ থেকে শিল্পের চূড়ান্ত সংহতি”
- “হোমারের অমর তুলি: ইলিয়াডের বৈচিত্র্যময় চরিত্র ও ধ্রুপদী গঠনকৌশল”
হোমার ও ইলিয়াড একিলিস চরিত্র বিশ্লেষণ:
চরিত্র অঙ্কনে হোমারের তুল্য শিল্পী বিশ্বসাহিত্যে মেলা ভার-একমাত্র সেক্সপীয়ার ব্যতীত। ‘ইলিয়ড’ এবং ‘ওডিসি’তে প্রায় চল্লিশটি প্রধান চরিত্র আছে। অথচ প্রতিটি চরিত্রই আচার-ব্যবহার, হাব-ভাব, চাল-চলন, কথা-বার্তায় অপর থেকে স্বতন্ত্র। প্রতিটি চরিত্রই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল এবং প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
‘একিলিসের ক্রোধ’ এই গাথা অবলম্বন করেই হোমার ‘ইলিয়ড’ রচনা করেছেন এবং একিলিসের ক্রোধই কাব্যের মূল উপজীব্য। সুতরাং কাব্যের মধ্যে একিলিস প্রধান ভূমিকা লাভ করেছে।
একিলিস বীর। আত্মসম্মানই সব চাইতে বড় কথা। আত্মসম্মানবোধ না থাকলে তাকে ত যথার্থ মানুষ বলা যায় না। একিলিসের মধ্যে এই আত্মসম্মানবোধ পরিপূর্ণ মাত্রায় বিরাজমান এবং তাই তাকে গর্বিত করে তুলেছে।
আগামেমনন তার যুদ্ধ-বন্দিনী ব্রিসিসকে অন্যায়ভাবে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করাতে তার আত্মসম্মানে প্রবল ঘা লাগে। তার চাইতে আগামেমনন অধিকতর শক্তিশালী হ’তে পারে, কিন্তু তাতে কি এসে যায়। কিন্তু দেবী এথেনা তার মধ্যে শুভবুদ্ধির উদ্রেক করাতেই সে নিবৃত্ত হয়।
তবে বীর হয়েও একিলিস বীরধর্মের বিপরীত প্রতিজ্ঞা করে বসে।
গর্বিত একিলিস প্রতিজ্ঞা করে, একিয়ানদের পক্ষে ও ট্রজানদের বিপক্ষে আর অস্ত্র ধারণ করবে না। যেহেতু সে বীর, যুদ্ধই তার আকাঙ্ক্ষিত, তবুও ক্রোধের বশবর্তী হয়ে সে এই প্রতিজ্ঞা করে।
তার বদ্ধমূল ধারণা, সে একিয়ানদের পক্ষে অপরিহার্য। তাই সে এই অসম্ভব প্রতিজ্ঞা করে। দারুণ গর্ব ও দুর্দমনীয় ক্রোধ তাকে অন্ধ করে তুলেছে। তার ধারণা একিয়ানদের তাকে ছাড়া চলবে না। ক্রোধ যে কত বড় রিপু এই সম্পর্কে ফোনিক্স তাকে সাবধান করতে চেয়েছে। কিন্তু এই ক্রোধের পরিণাম যে কত শোচনীয় শোকাবহ হতে পারে, তা তার পক্ষে ধারণাতীত। বীর হয়েও বিরোধী প্রতিজ্ঞা তার চরিত্রে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। এর পরিণতি হয় ট্র্যাজিক।
একিলিস কর্তব্যপরায়ন, কর্তব্যবোধ আছে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে সম্মানবোধ সেই কর্তব্য পালনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তার মতো সম্মানী লোকের পক্ষে আগামেমননের অপমান মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। অথচ যুদ্ধ হতে নিবৃত্ত হওয়া মানেই সহচরদের প্রতি কর্তব্যে এবং বীরধর্ম সম্পাদনে ত্রুটি। একদিকে আত্মসম্মানবোধ অপরদিকে সামাজিক কর্তব্য ও বীরধর্ম সম্পাদন-এই দু’য়ের অন্তর্দ্বন্দ্বে সে কাব্যের প্রথম হতে প্রায় শেষ অবধি জর্জরিত হয়েছে।
এই দ্বন্দ্ব তার মধ্যে দ্বিধা-বিভক্ত আত্মার সৃষ্টি করেছে এবং কাব্যের পরবর্তী অংশে সেই দ্বিধা-বিভক্ত আত্মার আত্মসংগ্রামের মর্মন্তুদ কাহিনি ব্যক্ত হয়েছে।
বীর একিলিসের সম্মান আগামেমনন ধুলায় অবলুন্ঠিত করেছে। মানুষের জীবনে গৌরবই প্রধান কথা। সেই গৌরবের প্রতিভূ ব্রিসিসকে- যা সে বাহুবলে আয়ত্তাধীন করেছে- তার থেকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তার প্রতি চূড়ান্ত অন্যায় করা হয়েছে। ফলে তার পৌরুষ বিক্ষুব্ধ হয়েছে। এবং আত্মাবমাননায় তার পক্ষে অশ্রুসংবরণ করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। সে মাকে অনুরোধ করে দেবরাজ জিউসের কাছে আবেদন জানানোর জন্য যেন উজানদের জয় ও একিয়ানদের পরাজয় ঘটে।
খোলা পাতার সকল কন্টেন্ট ক্লিক করুন
একিয়ানদের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠ তাকে আগামেমনন অসম্মান করার দরুন যেন তাদের এই দুর্ভোগ হয়। বীর একিলিসের এমনি অধঃপতন ঘটেছে। একিয়ানদের পক্ষে যুদ্ধ করতে এসে সে একিয়ানদেরই ধ্বংস কামনা করেছে। বীরের অবনতি ঘটেছে বিশ্বাসঘাতকে-গর্বই তার এমন অধঃপতনের হেতু।
ক্রোধোদ্দীপ্ত একিলিস অন্তরের মধ্যে ক্রোধকে লালন করে রেখেছে। তাই ওডিসাস প্রমুখ আগামেমননের সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এলে, সে তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। আগামেমননের উৎকোচ ও উপঢৌকনে সে প্রলুব্ধ হবার নয়। অর্থের বিনিময়ে তাকে বশীভূত করা সম্ভব নয়। তার মনোভাব অনমনীয় ও সুদৃঢ়।
অত্যধিক মাত্রায় গর্বই তাকে প্রবল অনুভূতিশীল করে তুলেছে। সে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছে তার যোগ্যতা যথাযোগ্য মর্যাদা লাভ করেনি। ফলে সে হয়ে উঠেছে সকল থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ। সে বীর হয়েও বীরধর্মে আস্থা হারাতে বসেছে। যুদ্ধ করার মধ্যে সে কোন অর্থ খুঁজে পায় না, স্বদেশে প্রত্যাগমন করাই যেন তার পক্ষে সংগত।
কিন্তু তার সমস্যা এত সহজ বা সরল নয়। কেননা তার মা থেটিস তাকে নিয়তি-সম্পর্কে সচেতন করে দিয়েছে। সে যুদ্ধে যোগ দিলে মৃত্যুর মাধ্যমে অমর হয়ে থাকবে আর যুদ্ধ না করে দেশে ফিরে গেলে গৌরবহীন দীর্ঘ জীবন লাভ করবে। বীরের পক্ষে গৌরবহীন দীর্ঘ জীবন অপেক্ষা গৌরবময় মৃত্যু শ্রেয়। তাই তার পক্ষে দেশে ফিরে যাওয়া হয়ে ওঠে না। আবার দারুণ ক্রোধের দরুন যুদ্ধে যোগদানেও সমর্থ হয় না। তার জীবনের সমস্যা এমনই জটিল।
হোমার ও ইলিয়াড
প্যাট্রোক্লাস একিলিস-চরিত্রেরই অংশভাগ। একিলিসের চরিত্রে যে মানবতাবোধ নিহিত রয়েছে তাই প্যাট্রোক্লাসের মাধ্যমে রূপায়িত হয়েছে। প্যাট্রোক্লাস একিয়ানদের দুর্গতি দেখে সর্বদা ভাবিত বা চিন্তিত এবং একই কারণে সে একিলিসের কাছে যুদ্ধে যোগ দেবার অনুমতি চায়।
একিলিস প্যাট্রোক্লাসকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দেয়। সুতরাং এ-কথা সুস্পষ্ট যে, সে অন্তরে অনুতপ্ত এবং তার অনমনীয় মনোভাব কিছুটা শিথিল হয়েছে। সে অন্তরের অন্তঃস্থলে একিয়ানদের প্রতি অনুকম্পাপরবশ, কিন্তু প্রবল ক্রোধ ও গর্বের দরুন নতি
স্বীকার করে যুদ্ধে যোগদান করা তার পক্ষে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। এজন্যই সে প্যাট্রোক্লাসকে যুদ্ধে পাঠায়। প্যাট্রোক্লাসের মাধ্যমে তার অন্তরজাত আকাঙ্ক্ষাই রূপায়িত হয়েছে। প্যাট্রোক্লাসের যুদ্ধে অংশগ্রহণ, তার যুদ্ধে যোগদানের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
সে নিশ্চয় আশা করে প্যাট্রোক্লাস যুদ্ধে জয়ী হয়ে যেন নিরাপদে ফিরে আসে। কিন্তু প্যাট্রোক্লাস যদি জয়ী হয় তা হলে এ সুস্পষ্ট হবে যে, একিলিস একিয়ানদের পক্ষে অপরিহার্য নয়। এক অর্থে, সে অবচেতন মনে প্যাট্রোক্লাসের পরাজয় কামনা করে। তার গর্ব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য প্যাট্রোক্লাসের পরাজয় বাঞ্ছনীয়। তার চরিত্র এমনই জটিল এবং আত্মা এমনই দ্বিধা-বিভক্ত।
অথচ প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুতে সে শোকে মুহ্যমান হয়ে ওঠে- বুকফাটা আর্তনাদ করতে থাকে। প্যাট্রোক্লাস তারই আত্মার দোসর, তাকে হারিয়ে বাঁচার কোন অর্থ হয় না। মনে হয়, অন্তরের অপার বেদনায় সে যেন আত্মঘাতী হবে।
প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুতে তার প্রবল শোক হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা তার গর্ব ধুলায় অবলুণ্ঠিত হয়েছে। প্রতিহিংসায় ক্ষিপ্ত হয়ে সে একিয়ানদের দুর্গতি কমনা করছে, তার সেই মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এজন্য তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে- তার অন্তরের দোসর প্যাট্রোক্লাসকে আহুতি দিতে হয়েছে।
এই চরম মূল্য দিয়ে সে উপলব্ধি করতে সমর্থ হয় তার মধ্যে ত্রুটি কোথায়। তার বোঝার ক্ষমতা প্রসারতা লাভ করে। তবু সে ক্রোধের ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হয় না, -ক্রোধ শুধু আগামেমনন থেকে হেক্টরের প্রতি ন্যস্ত হয়। এই ক্রোধ তাকে আপন জন থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে বলে সে নিজেকে ধিক্কার দেয় এবং বহুদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর সে আপন জনের সাথে মিলিত হয়।
একিলিস জানে, সে নিয়তির সন্তান এবং নিয়তি সম্পর্কে তার বার বার সচেতন করে দেয়া হয়েছে। মা তাকে জানায়, হেক্টরের মৃত্যুর পরেই তার মৃত্যু অবধারিত। যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে তারই রথের ঘোড়া জান্থাস নিয়তি সম্পর্কে তাকে সাবধান করে দেয়।
একি জটিল সমস্যার সম্মুখীন সে! ব্যক্তিগত সম্মান রক্ষার্থে তাকে প্রতিশোধ নিতে হবে এবং এজন্য হেক্টর-বধ করতে হবে। অথচ হেক্টর-বধ তাকে করতে হবে নিজ জীবনের বিনিময়ে। নিজের সম্মান ও গৌরব রক্ষার জন্যে মৃত্যু সুনিশ্চিত জেনেও সে হেক্টর-বধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে একিলিসের এক হিংস্র বর্বর ও নিষ্ঠুর রূপ প্রকটিত হয়েছে। প্রতিশোধস্পৃহায় সে অন্ধ উন্মাদ হয়ে যায়। দলে দলে উজানদের হত্যা করতে থাকে। নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে যায়। প্যাট্রোক্লাসের চিতায় বলি দেয়ার জন্যে বারজন উজান তরুণকে বন্দী করে। উন্মত্ত একিলিস মৃত্যুপথযাত্রী হেক্টরের শেষ অনুরোধ- তার দেহ ট্রজানদের ফিরিয়ে দেয়ার-ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। হেক্টরের দেহকে ধুলায় লুণ্ঠিত ও অপবিত্র করে সে এক পৈশাচিক উল্লাস বোধ করে।
হেক্টর বধের পরই তার চরিত্রের মধ্যে পরিবর্তন সূচিত হয়। ধীরে ধীরে মনুষ্যত্বের উদ্বোধন ঘটে এবং চরিত্রে মমতা ও সম্ভ্রম ফিরে আসে। বৃদ্ধ রাজা প্রায়ামের প্রতি তার পরর দয়াপরবশ হয়ে ওঠে। হেক্টরের শব ফেরত দিয়ে তার শেষ অনুরোধ রক্ষা করে এবং যেতক্রিয়াহেতু যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়ে ঔদার্য ও মহানুভবতার পরিচয় দেয়।
একিলিসের আত্মানুসন্ধান এ-ভাবেই পরিপূর্ণতা লাভ করে। বিনয়, সহৃদয়তা, জয়তা, বুদ্ধিমত্তা এই সকল গুণাবলী তার মধ্যে প্রথমাবধিই ছিল, কিন্তু ক্রোধ এগুলোকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ক্রোধের উপশম ঘটাতে তার মধ্যে সত্যিকার বীরত্ব ও মহত্ত্বের উদ্বোধন ঘটে। ফলে সে জ্ঞান লাভ করে এবং নিজেকে নিজে অতিক্রম করে এক উন্নত মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে সমর্থ হয়।
যে ক্রোধমুক্ত হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসে। যদিও সে জানে যে জীবন অতি ক্ষণস্থায়ী, তবু সে জীবনকে পরিপূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। তার মধ্যে নশ্বর জীবনকে উপভোগের আকাঙক্ষা দেখা দেয় এবং মানুষের সাথে মানুষের যে স্বাভাবিক সম্পর্ক তাই স্থাপিত হয়।
একিলিশের ট্র্যাজেডি-তার প্রতিহিংসার মতোই-একান্তভাবে ব্যক্তিগত। তার চরিত্রের মধ্যে রয়েছে অত্যধিক মাত্রায় গর্ব বা hybris, গ্রীকরা একে মস্ত বড় পাপ বলে জানত। সুগভীর দুঃখভোগ ও অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে সে এই গর্বের ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হয়। এরই ফরে আার ঘটে আত্মমুক্তি এবং সে আবার মনুষ্যত্বের মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
হেক্টর চরিত্র বিশ্লেষণ হোমার ও ইলিয়াড
‘ইলিয়ডে’ একিলিসের পরেই হেক্টর প্রধান চরিত্র। বরং তাকে এই কাব্যে প্রতিনায়কের মর্যাদা দেয়া যায়।
হেক্টর এমন চরিত্র যাকে ভালো না বেসে পারা যায় না। তার প্রতি আমাদের সহজেই প্রীতি ও মমত্ববোধ উদ্রিক্ত হয়। সে বীর সৈনিক, কিন্তু এটাই তার মধ্যে মহত্তম গুণ নয়। তার মহত্ত্বের সন্ধান করতে হবে অন্যত্র-তার চরিত্র-নিহিত মানবতাবোধের মধ্যে।
যুদ্ধের মূল হেতু প্যারিসের লালসা ও ব্যভিচার। প্যারিস হেলেনের স্বামী মেনিলাসের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করে গৃহস্বামিনীকে অপহরণ করেছে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে প্যান্ডারাস মেনিলাসকে আঘাত করে যুদ্ধ শর্ত ভঙ্গ করেছে। সে অন্যায় যুদ্ধে যোগ দিয়েছে, এই সম্পর্কে হেক্টর সচেতন। সুতরাং এই অন্যায় যুদ্ধের প্রতি হেক্টরের নৈতিক সহানুভূতি নেই। এবং এই অন্যায় যুদ্ধের ফল কখনও শুভ হতে পারে না, এই ধরনের একটা পূর্ব ধারণা তার আছে।
(আমি যদি কাপুরুষের মতো যুদ্ধ এড়িয়ে পালিয়ে থাকি, তা হলে ট্টজান পুরুষ ও মহিলাদের মুখ দেখাব কেমন করে?)
বীরধর্মে তার আস্থা আছে বলেই এন্ড্রোম্যাকির চোখের পানি বা শিশুসন্তানের নামে আবেদন তাকে এক বিন্দু টলাতে পারেনি।
হেক্টরের মাধ্যমে এই বীরধর্মই রূপায়িত হয়েছেঃ জীবন সংক্ষিপ্ত হতে পারে। কিন্তু
অকুতোভয়ে ও নির্ভীক চিত্তে সেই জীবনের সম্মুখীন হতে হবে। কাপুরুষের মতো জীবন-ভয়ে ভীত হলে চলবে না। বীরের মতো জীবনের সকল সমস্যা ও সংকটের সম্মুখীন হলে পরই জীবন হয়ে উঠবে সত্য, সুন্দর ও সার্থক এবং ভাবী কালের মানুষের কাছে আমরা লাভ করব অমর মহিমা।
হেক্টর একদিকে বীর ও বলিষ্ঠ, অপর দিকে কোমল ও ক্লান্ত। তার বীরত্বের অন্তরালে রয়েছে এক স্নেহ-ভালবাসা-কাতর হৃদয়। সে জানে ট্রয়ের ধ্বংস অনিবার্য। তাই স্ত্রীর ভবিষ্যতের ভাবনা তাকে বিচলিত করে তুলেছে।
“আমি ট্রজানদের নিগ্রহ বা হেকুবা, প্রায়াম ও আমার অন্যান্য ভাইদের শত্রুহস্তে নিহত হওয়ার চিন্তায় তেমন কাতর নই, যতটা আমাকে পীড়িত করেছে এ-চিন্তা যে, তোমাকে তারা টেনে নিয়ে গিয়ে ক্রীতদাসীতে পরিণত করবে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি, আর্গসে তুমি অন্য কোন মেয়ের জন্য তাঁতের কাজ করছ বা দূরবর্তী কূপ থেকে নিতান্ত অনিচ্ছায় পানি নিয়ে যাচ্ছ। তোমার চোখে অশ্রু দেখে কেউ বলছেঃ ‘ঐ দেখ হেক্টরের স্ত্রী যাচ্ছে-ইলিয়াম অবরোধের সময়ে যে হেক্টর ছিল উজান’ পক্ষের সেনানায়ক।’ এদের প্রতিটি কথা নতুন করে তোমার বুকে শেলের মত বিধতে থাকবে। তোমার তখন শুধু একজন লোকের কথা মনে পড়তে থাকবে, যে তোমাকে মুক্ত রাখতে পারত। তোমাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময়কার তোমার চিৎকার শুনবার আগে যেনো আমাদের মৃতদেহ গভীর মাটির নীচে প্রোথিত হয়।”
সে স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়েছে এই বলে যে, কোন মানুষই তার নিয়তিকে অতিক্রম করতে পারে না।
সে শুধু স্নেহপ্রবণ স্বামী নয়, সন্তানবৎসল পিতাও। শিশুপুত্র এস্টিয়ানক্সের মাধ্যমে সে অমর হতে চেয়েছে। দেবতাদের সম্বোধন করে সে এই প্রার্থনা করেছে,
“জিউস, দেবতাগণ! এই আশীবাদ কর, যেন আমার ছেলে ট্রয়ে আমারি মত খ্যাতিমান যোদ্ধা ও সাহসী হয়। সে যেন হয় ইলিউমের শক্তিশালী রাজা। সে যুদ্ধ থেকে ফিরে এলে লোকে যেন বলে, ‘পিতার চাইতেও এ বেশি শক্তিশালী।’ সে যেন নিহত শত্রুর রক্তমাখা অস্ত্রাদি নিয়ে ঘরে ফিরে তার মাতাকে সুখী করে।”
হেক্টর অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস করে না। ভবিষ্যদ্রষ্টা পলিডামাস অশুভ লক্ষণ দেখে তাকে শত্রুপক্ষের জাহাজ আক্রমণ হতে বিরত করতে চেয়েছে। প্রত্যুত্তরে সে বলেছে, ‘সব চাইতে ভাল লক্ষণ হল স্বদেশের জন্যে যুদ্ধ করা।’
এন্ড্রোম্যাকির ধারণা, সাহসই তার স্বামীর ধ্বংসের হেতু হবে। এই সাহস হেক্টরকে বাস্তব সম্পর্কে অন্ধ করে তুলেছে-যেমন গর্ব ও ক্রোধ একিলিসকে অন্ধ করে দিয়েছে এবং তার ধ্বংসের হেতু হয়েছে। রণক্ষেত্রে আপাত-জয়ের উল্লাসে হেক্টর উন্মাদপ্রায়। কিন্তু সে জানে না, একিলিসের অবর্তমানেই এই জয় সম্ভব হয়েছে।
স্বচ্ছদৃষ্টিসম্পন্ন পলিডামাস ট্রজানদের হিতোপদেশ দেয় নগর-প্রাচীরের ভিতরে আশ্রয় নেওয়ার জন্যে। কারণ একিলিস যে কোনো মুহূর্তে রণক্ষেত্রে অবতরণ করতে পারে। বাস্তব-অনভিজ্ঞ হেক্টর এই প্রস্তাবে ভ্রুকুটি হানে। এর পরিণাম হয়ে ওঠে ভয়াবহ। পরবর্তীকালীন গ্রীকদের একটি প্রবাদ আছেঃ ‘দেবতারা যাকে ধ্বংস করবেন, তাকে প্রথমে উন্মাদ করে দেন।’ এ কথা হেক্টর সম্পর্কেও প্রযোজ্য। জয়ের নেশায় সে উন্মাদ হয়ে উঠেছে। তাই বৃদ্ধ পিতা-মাতার করুণ কান্না এবং যুদ্ধ হতে নিরাপদ আশ্রয়ে আসার সবিনয় অনুরোধ, কিছুই তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। তার এই উন্মাদনার মূলে রয়েছে কর্তব্য বুদ্ধি ও বীরধর্ম।
কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে একিলিসের সম্মুখীন হয়ে সে নিষ্ঠুর বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করে এবং উপলব্ধি করতে সমর্থ হয় যে, ট্রজানদের ধ্বংসের জন্যে সে-ই দায়ী। একিলিস তার দিকে অগ্রসর হতে থাকলে সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পলায়নে তৎপর হয় এবং নগর-দেওয়াল প্রদক্ষিণ করতে থাকে। কাপুরুষ বলে অভিহিত হবে, এই ভয় থাকা সত্ত্বেও সে পলায়ন করেছে। সাময়িক স্নায়ুদৌর্বল্যই এজন্যে দায়ী এবং একে সম্পূর্ণ মানবীয় বলা যেতে পারে। সে মানুষ, মানুষ বলেই মৃত্যুভয়ে ভীত। জীবনে তার বাঁচার আকাঙ্ক্ষা প্রবল, তাই মৃত্যু তার কাছে ভয়াল রূপে দেখা দেয়।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে সে আবার সাহস ফিরে পায় এবং স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে একিলিসের সম্মুখীন হয়।
“আমাকে মৃত্যুবরণ যখন করতেই হবে, তখন যাতে তা অগৌরবের মৃত্যু না হয় এবং সস্তায় যাতে আমার জীবন বিকিয়ে না যায় সেজন্য এমন যুদ্ধ করব, যে-কাহিনী অনাগত যুগের মানুষেরও কানে পৌঁছবে।”
সে দীর্ঘ ও ভারী তারবারি নিয়ে একিলিসের উপর বিদ্যুৎবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
হেক্টর এক ট্রাজিক চরিত্র। তার ট্র্যাজেডি শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয়-কেননা তাঁর সাথে সমগ্র ট্রয়ের ধ্বংসের কাহিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
একিলিসের মতোই হেক্টরের মধ্যে আছে অত্যধিকমাত্রায় গর্ব-যাকে hybris বলা হয়। এর ফলে তার ভারসাম্য ব্যাহত হয়েছে এবং সে সত্যোপলব্ধি হতে বঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার আত্মজ্ঞানের প্রসারতা ঘটে। সে যে ভুল করেছে এবং এই ভুলের ফলে ট্রয়ের উপর যে ধ্বংস নেমে এসেছে, এর সম্পূর্ণ গুরুদায়িত্ব বহন করার ফলে তার দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়ে এসেছে। ফলে সে সত্যোপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছে।
মহাকবি হেক্টরের চরিত্রকে সুগভীর দরদ, অনুকম্পা ও সহানুভূতি দিয়ে অঙ্কন করেছেন। ফলে চরিত্রটি আধুনিক কল্পনাকেও আকৃষ্ট করেছে। সেক্সপীয়ার তার সম্পর্কে বলেছেন ‘Sweet knight ot Troy.’ মধুসূদনের কল্পনাকে হেক্টর উদ্দীপ্ত করেছে বলেই তিনি ‘হেক্টর-বধ’ রচনায় প্রয়াসী হন। শুধু তাই নয়, হেক্টরের আদর্শে ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ মেঘনাদের চরিত্র অঙ্কন করেছেন।
আগামেমনন চরিত্র হোমার ও ইলিয়াড
ট্রয়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে আগামেমনন একিয়ান-পক্ষ পরিচালনার গুরু দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। সুতরাং একিয়ান পক্ষে সে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য চরিত্র।
এত বড় একটা যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হতে হলে যে যোগ্যতা থাকার প্রয়োজন তা তার অনেকখানি খর্ব হয়েছে কতকগুলো চরিত্রগত ত্রুটি বা ছিদ্রের জন্যে-যেমন একগুয়েমি, ঔদ্ধত্য, হঠকারিতা, লোভ, স্বার্থপরতা ও অসহিষ্ণুতা। এই শেষোক্ত গুণটির জন্যে সে কোন সমালোচনা সহ্য করতে অনিচ্ছুক।
একিলিসের বিপরীত চরিত্ররূপে তাকে অঙ্কিত করা হয়েছে। একিলিসের চরিত্রে যে দৃঢ়তা এবং নৈতিক বল বা বিশ্বাস আছে, তা তার মধ্যে নেই।
দেবতা এপোলোর মন্দিরের পুরোহিত ক্রাইসেস প্রচুর মুক্তিমূল্যের বিনিময়ে কন্যার মুক্তি প্রার্থনা করে। কিন্তু লোভ ও স্বার্থপরতার দরুন আগামেমনন তাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে দেবতা এপোলোর ক্রোধ একিয়ানদের উপর নেমে আসে, তাদের ঘটে দারুণ বিপর্যয়। ভবিষ্যদ্রষ্টা ক্যালচাস পুরোহিতকন্যা ক্রাইসিসকে ফেরত দিতে বলে। আগামেমনন ক্যালচাসের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একগুয়েমি ও ঔদ্ধত্যের দরুন সে বাস্তবকে গ্রহণ ও স্বীকার করতে অসমর্থ।
অথচ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সে শেষ অবধি ক্রাইসিসকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বিনিময়ে সে একিলিসের যুদ্ধ-বন্দিনী ব্রিসিসকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে। একিয়ান-পক্ষের প্রধান সেনাপতির গৌরব এভাবেই সে রক্ষা করেছে।
এই হঠকারিতার দরুন সে একিয়ানদের অন্যতম বীর ও সুহৃদ্ একিলিসের সমর্থন হারিয়েছে। একিলিস প্রতিজ্ঞা করেছে, সে আর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। আগামেমননের ধারণা সে একিলিস ছাড়াই যুদ্ধজয়ে সমর্থ হবে। এই মিথ্যা দম্ভ তার আছে। তাই সে স্বপ্ন দেখেছে দেবতাদের নির্দেশ, ট্রয় অধিকৃত হবেই। তার মিথ্যা দম্ভই তার অবচেতন মনে স্বপ্নের মাধ্যমে রূপলাভ করেছে।
অথচ অন্তরের অন্তঃস্থলে সে জানে, একিলিস ছাড়া সে যুদ্ধজয়ে অসমর্থ। এই সংশয় তার মনে আছে। এজন্যই সে একিয়ান-সৈন্যদের ফিরে যেতে বলেছে-নিছক তাদের আনুগত্য পরীক্ষা করার জন্যে নয়।
তার মধ্যে মানসিক স্থৈর্য ও ধৈর্যের একান্ত অভাব। সে অস্থির, অব্যবস্থিতচিত্ত, অপরিণামদর্শী এবং অস্বচ্ছদৃষ্টিসম্পন্ন। প্রায়ই সে উদ্ধত হয়ে ওঠে এবং শক্তির আস্ফালন করে থাকে। কখনো তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস প্রবলভাবে দেখা যায়, আবার কখনো সে হতাশায় একেবারে মুষড়ে পড়ে।
এ-সকল তার অক্ষমতা ও অস্থিরচিত্ততারই লক্ষণ মাত্র। তার মধ্যে নৈতিক বলের একান্ত অভাব এবং যে-কোন অবস্থাকে সমগ্র দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে সে সম্পূর্ণভাবে অক্ষম। ফলে তার কথা বা কাজের পরিণাম কি হতে পারে, এ-সম্পর্কে সে সচেতন নয়। আত্মপ্রত্যয়, নৈতিক সাহস এবং স্বচ্ছদৃষ্টির অভাবহেতু সে রণক্ষেত্রে শত্রুর সম্মুখীন হয়ে একান্তভাবে বিপন্ন বোধ করে এবং কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া তার পক্ষে সম্ভবপর হয় না।
যুদ্ধে ক্রমাগত বিপর্যয় ঘটতে থাকলে, সে বুঝতে পারে তার ঔদ্ধত্য ও হঠকারিতা কি সর্বনাশ বহন করে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এই সংকটময় মুহূর্তে সে তার গুরুদায়িত্ব বহনে অসমর্থ হয়-যা তার পক্ষে একান্তভাবে স্বাভাবিক। সে যুদ্ধ পরিহার. করে সত্যি দেশে ফিরে যেতে চায়। বীর ডায়োমিডিস তাকে বিদ্রূপ করে বলে, জিউস রাজদণ্ড ও রাজকীয় মহিমা দিয়েছেন বটে, কিন্তু সাহস দেননি।
যুদ্ধে উপর্যুপরি বিপর্যয়ের ফলে সে তার ভুল বুঝতে পারে।
একিয়ানদের সভায় সে মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে যে, একিলিসের প্রতি সে চরম অন্যায় করেছে এবং সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায় একিলিসকে উৎকোচ ও উপঢৌকন দিয়ে। একিলিস উপঢৌকন পেলে শান্ত বা তৃপ্ত হবে, এমন ধারণা করা তার পক্ষেই সম্ভব। ফলত দেখা যায়, একিলিস এই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে।
একিলিসের ক্রোধের উপশম ঘটে বন্ধু প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুতে এবং তখনই একিলিসের সাথে তার একটা সমঝোতায় পৌঁছান সম্ভবপর হয়। সে যে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তার বিচার-বুদ্ধি বিভ্রান্ত হয়েছিল, একথা স্বীকার করে সে ঔদার্যের পরিচয় দেয়।
সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও মেনিলাসের প্রতি মমত্ববোধ তার চরিত্রটিকে সমুন্নত করে তুলেছে। বীর হেক্টর একিয়ানদের দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহবান জানালে, সে কিছুতেই মেনিলাসকে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে দেয়নি। ইতিপূর্বে যুদ্ধ-শর্ত ভঙ্গ করে প্যান্ডারাস মেনিলাসকে আহত করলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
এই চূড়ান্ত অবমাননায় সে আর্তনাদ করে বলে ওঠে
“ভাই তোমার মৃত্যুর জন্যেই কি আমরা চুক্তির শপথ গ্রহণ করলাম? তোমাকে উজানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একাকী পাঠালাম?”
হঠকারী ও ঔদ্ধত্য আগামেমননের চরিত্রটি এখানেই সম্পূর্ণ মানবীয় হয়ে উঠেছে।
প্যারিস চরিত্র বিশ্লেষণ হোমার ও ইলিয়াড
প্যারিস সুপুরুষ, কিন্তু সে অস্থিরচিত্ত ও চঞ্চলমতি যুবক। কোনরূপ দায়-দায়িত্ব বা নীতিবোধ তার নেই। সে শুধু ফুর্তিতেই মশগুল থাকে। ট্রয়ের এতবড় সর্বনাশা যুদ্ধেও-যে যুদ্ধ তারই অপকীর্তির ফল-সে এতটুকু বিচলিত নয়।
সে কামদেবী আফ্রোদিতের বরপুত্র। সুতরাং রিরংসাবৃত্তি ও নারী-সঙ্গলিপ্সা তার মধ্যে প্রবল। প্রবল কামনার বশবর্তী হয়েই সে মেনিলাসের অতিথি হয়েও তার স্ত্রী সুন্দরীশ্রেষ্ঠা হেলেনকে অপহরণ করে নিয়ে আসে এবং আতিথ্যধর্মের অবমাননা করে। তার এই বিশ্বাসঘাতকতাই ট্রয়ের যুদ্ধের হেতু। এজন্যে টয়ে দেখা দিয়েছে ধ্বংসের প্রচণ্ড তাণ্ডবলীলা। বস্তুত সে ট্রয়ের যুদ্ধের জন্য দায়ী হ’লেও, সে এই কাব্যে নায়কের মর্যাদা লাভ করেনি। তার নৈতিক ত্রুটির জন্যই হোমার তাকে উজানপক্ষে প্রাধান্য না দিয়ে হেক্টরকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
কোনরূপ নীতিবোধ তাকে আদৌ পীড়িত করে না। বস্তুত বিবেক বলতে তার মধ্যে কিছু নেই। হেলেনই এই যুদ্ধের সূচনা। এবং হেলেনকে ফিরিয়ে দিলেই এই যুদ্ধের সমাপ্তি হবে। তাই উজানদের এক সভায় এন্টিনর হেলেনকে ফিরিয়ে দেবার প্রস্তাব করে। কিন্তু সে এই প্রস্তাব আদৌ সমর্থন করে না।
যুদ্ধক্ষেত্রে মেনিলাস দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহবান গ্রহণ করেছে দেখে সে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। সে প্রাণভয়ে ফিরে যায় নিজ সৈন্যদলে-“যেমন করে কোন মানুষ অরণ্য-গিরিসঙ্কটে হঠাৎ সাপ দেখে থস্কে গিয়ে যে-দিক থেকে এসেছিল, সে-দিকেই ফিরে যায় বিবর্ণমুখে কাঁপতে কাঁপতে।”
তার কাপুরুষতার জন্যে হেক্টর তাকে ভর্ৎসনা করে।
“নারীলোভী নন্দদুলাল। কেন তুমি জন্মেছিলে? বিয়ের আগেই তোমাকে মেরে ফেলা হয়নি কেন? হাঁ, আমার মতে তা-ই হত ভালো। তোমার মতো আমাদের সকলের পক্ষে লজ্জা ও ঘৃণার পাত্র কেউ থাকার চাইতে না থাকাই অনেক ভাল ছিলো।”
ভীরু প্যারিস মেনিলাসের মোকাবিলা করতে সমর্থ না হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে হেলেনের কাছে এসেছে এবং কাম জর্জর হয়ে তাকে শয্যায় আহবান জানিয়েছে। আকণ্ঠ ঘৃণায় উদ্রিক্ত হয়ে হেলেন তাকে বলেছে,
“যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তুমি চলে এসেছো! আমি আশা করেছিলাম, আমার পূর্বস্বামী-সেই মহান সেনানীর হাতে তোমার পতন হয়েছে।”
হেক্টর তার সম্পর্কে যথার্থ বলেছে, সে একেবারে খেয়ালী। যখন খুশী অহেতুকভাবে যুদ্ধ ছেড়ে চলে আসে। প্রচণ্ড ধ্বংসের আয়োজনের মধ্যে সে আদৌ বিচলিত বা বিড়ম্বিত নয়। যুদ্ধক্ষেত্রেও তার নবাবী চাল-চলন বজায় থাকে। মোট কথা, নিজের ফুর্তি নিয়েই সে মশগুল। তাকে বলা চলে, আত্মসুখসন্ধানী।
প্রায়াম চরিত্র হোমার ও ইলিয়াড
বৃদ্ধ রাজা প্রায়াম ট্রয়ের অধিপতি। ধন-সম্পদ, বিত্ত-বৈভব, স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন, পাত্র-মিত্র-অমাত্য সবই তার আছে। কিন্তু এই ঐশ্বর্যের মধ্যেও তার এক শোচনীয় শোকাবহ মূর্তি উদ্ঘাটিত হয়েছে। সে যথার্থই এক বিষাদ-করুণ চরিত্র।
এতকাল সে সসম্মানে রাজ্যরক্ষা এবং প্রজা ও পরিবার পালন করে এসেছে। কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তির লীলায় আজ তার ট্রয় নগরী শত্রুহস্তে ধ্বংসোন্মুখ। যুদ্ধক্ষেত্রে একের পর এক তার বীর পুত্ররা হত হচ্ছে, তার বীর সেনানীরা মৃত্যুবরণ করছে। ট্রয়ের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠেছে। সেই মহাসর্বনাশের কথা ভেবে সে বিচলিত।
“এই বৃদ্ধবয়সের আমার জন্য পিতা জিউস কত দুঃখ-কষ্ট জমা করে রেখেছেন, সে-কথা একবার চিন্তা কর। মৃত্যুর পূর্বেই আমাকে দেখতে হচ্ছে শত্রুপক্ষ কর্তৃক আমার ছেলেদের নিদারুণ ধ্বংস, মেয়েদের উপর অত্যাচার ও তাদের শয়নকক্ষ লুণ্ঠন, শিশুদের আছড়ে মারা আর একীয় সৈন্য কর্তৃক পুত্রবধূদের টেনে হেঁচড়ে নেওয়া। সর্বশেষে আসবে একীয়দের তরবারিতে বা বর্শায় আমার মৃত্যুবরণের পালা। আমারই রাস্তার মুখে আমার মৃতদেহ হবে কুকুরদের দ্বারা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন।”
নিয়তিকে সে প্রত্যক্ষ করছে, কিন্তু এর গতি রোধ করবার সাধ্য তার নেই। কেননা, সে একান্তভাবে নিরুপায়-বয়সের ভারে ক্লান্ত ও জরাজীর্ণ। তাই এত বড় রাজ্য রক্ষার গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত করেছে বীর পুত্র হেক্টরের প্রতি। হেক্টরই তার সকল আশা-ভরসার নিদান।
কিন্তু রণক্ষেত্রে দুর্ধর্ষ একিলিসকে পুত্র হেক্টরের সম্মুখীন হতে দেখে সে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে এবং তাকে নগর-প্রাচীরের মধ্যে এসে আশ্রয় নিতে বলেছে।
“পুত্র! আমি অনুনয় করে বলছি, ঐ লোকটার সাথে একাকী সহায়হীনভাবে মোকাবেলা করো না। তা হলে তুমি পরাজিত হবে-মৃত্যুবরণ করবে। সে শুধু তোমার চাইতে বেশি শক্তিশালী নয়, সে হিংস্র। দেবতারাও যদি আমার মতো ওর প্রতি নির্দয় হতেন, তা হলে তার লাশ শীঘ্রই কুকুর-শকুনের ভক্ষ্য হতো। তা হলে আমার হৃদয়ের উপর থেকে একখানা পাথর নেমে যেতো। এই লোকটাই আমার বহু ছেলেকে মেরেছে বা দূরবর্তী দ্বীপগুলোতে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছে। তাই তোমাকে বলছি বাছা, দেয়ালের ভেতরে এসে ট্রয় এবং ট্রজানদের রক্ষাকর্তা হও।”
হেক্টরের অবর্তমানে এই নগরীতে যে মহাসর্বনাশ ঘটবে, এ-কথা ভেবে সে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। সে তার ধূসর দাড়ি ও চুল ছিঁড়তে থাকে এবং বিলাপ করতে থাকে।
তার সকল আশা-ভরসার নিদান বীরপুত্র হেক্টর একিলিসের হাতে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়। শুধু তাই নয়, একিলিস মৃতদেহকে অপবিত্র করে। হেক্টরের শব রথের সাথে বেঁধে ধুলি-বালির মধ্য দিয়ে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে চলে।
এই দৃশ্য অবলোকন করে পুত্রশোকাতুর রাজা বেদনার্ত কণ্ঠে গুমরে ওঠে। হেক্টরের শবের কাছে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে ছুটে যায়। বহু কষ্টে যখন তাকে নিবৃত্ত করা হয় তখন সে গোময়-স্তূপে গড়াগড়ি দিতে দিতে বিলাপ করতে থাকেঃ
“বন্ধুগণ, তোমরা আমাকে যেতে দাও। আমার জন্য এত যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাকে একীয় শিবিরে যেতে হবে। আমি ঐ অমানুষ রাক্ষসটার কাছে আবেদন জানাতে চাই। আমার বৃদ্ধবয়স ও হেক্টরের যুবা বয়সের কথা ভেবে তার লজ্জা হতে পারে। যে তাকে এ-পৃথিবীর মুখ দেখিয়েছে, তাকে লালন-পালন করে উজানদের পক্ষে অভিশাপস্বরূপ করে গড়ে তুলেছে, তার সেই পিতা পেল্যুসও তো আমারি সমবয়সী। তার হাতে যে দুঃখকষ্ট ভোগ করেছি, উজানদের মধ্যে কেউ এতটা করেনি।
আমার এতগুলো সন্তান তাদের মধুময় যৌবনে তার হাতে মৃত্যুবরণ করেছে। তবু তাদের জন্য আমার যে দুঃখ, তার চাইতে অনেক বেশি তীব্র দুঃখ পেয়েছি শুধু একজনের জন্যে-এবং সে হচ্ছে এই হেক্টর। আঃ। সে যদি শুধু আমার কোলে মৃত্যুবরণ করতো, তা হলে প্রাণভরেআমরা- আমি এবং তার মা তার জন্যে রোদন করতে পারতাম।
হেক্টরের শব ফিরিয়ে আনতে সে একাকী একিলিসের শিবিরে যেতে উদ্যত হয়েছে। কিন্তু অমঙ্গলের আশঙ্কা করে রাণী হেকুবা বাধা দিয়েছে। তবু সে স্ত্রীর নিষেধ লঙ্ঘন করেই যাত্রার জন্যে তৈরি হয়েছে।
শোক-দুঃখ আঘাত-বেদনায় সে যেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। যাত্রাকালে পথিমধ্যে জনতাকে দেখে অহেতুক তিরস্কার করে, তাদের দণ্ডাঘাত করতে থাকে। তার উগ্রমূর্তি দেখে জনতা পালিয়ে যায়। ছেলেরাও তার তিরস্কারের হাত থেকে রেহাই পায়না।
প্রায়াম পুত্রহন্তা একিলিসের জানু জড়িয়ে ধরে এবং হাত চুম্বন করে- জগতের ইতিহাসে এর কোন তুলনা হয় না। প্রচুর মুক্তিমূল্যের বিনিময়ে হেক্টরের শব ফেরত দেয়ার আবেদন জানায় এবং একিলিসের পায়ের কাছে নতজানু হয়ে রোদন করতে থাকে। ধূসর কেশ ও শুভ্রশ্মশ্রু বৃদ্ধের জন্যে একিলিসের মন করুণায় ভরে ওঠে।
জাগতিক নিয়মে তরুণ পুত্রের হাতেই বৃদ্ধ পিতার শেষকৃত্য সম্পাদিত হয়। কিন্তু প্রায়ামের জীবনে জাগতিক নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে। সে বেঁচে আছে এবং বেঁচে থেকেই তাকে মৃত পুত্র হেক্টরের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।
বৃদ্ধ রাজা প্রায়ামের বেদনাবিধুর মূর্তি আমাদের অশ্রুসজল করে তোলে। সম্ভবত একই কারণে বাঙালি কবি মধুসূধন রাবণ-চরিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে তাকে স্মরণ করেছেন।
হেকুবা চরিত্র : হোমার ও ইলিয়াড
হেকুবা-চরিত্রের মাধ্যমে শাশ্বত মাতৃহৃদয়ের স্বরূপই উদ্ঘাটিত হয়েছে। হেকুবা চিরন্তনী মা। বীরপুত্র হেক্টর যুদ্ধক্ষেত্র হতে ক্লান্ত হয়ে এসেছে। তাই মমতাময়ী মা তাকে সুরা পান করিয়ে সতেজ করে তোলার প্রয়াস পেয়েছে।
বীরপ্রসবিনী হেকুবা। বীরপুত্র হেক্টরের জননী হবার সৌভাগ্যে তার বক্ষ স্ফীত হবে, এই তো স্বাভাবিক।
কিন্তু মাতৃহৃদয় সন্তানের জন্য সর্বদা আশঙ্কাতুর। যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ঠুর একিলিস হেক্টরের দিকে এগিয়ে এলে সে তাকে দেয়ালের ভেতরে এসে নিরাপদ আশ্রয় নিতে অনুরোধ করে। এক হাতে তার বুকের কাপড় সরিয়ে অন্য হাতে একটি স্তন তুলে ধরে অশ্রুপ্লাবিত চোখে হেক্টরকে বলে,
“বাছা হেক্টর, অন্তত এটার একটুখানি সম্মান কর, আমাকে দয়া কর। কতবার এটার দুধ খাইয়ে তোমাকে আমি শান্ত করেছি। সে-সব দিনের কথা স্মরণ কর বাছা। দেয়ালের ভেতরে এসে শত্রুর মোকাবিলা কর। একাকী ওর সাথে যুদ্ধ করো না।”
এই আবেদন মাতৃত্বের।
কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর বিধানে তার সেই বীরপুত্র অকালে শত্রুহস্তে নিহত। তার অন্যান্য সন্তান একিলিসের হাতে বন্দী বা ধৃত হয়েছে, কিন্তু কেউ প্রাণ হারায়নি। একিলিস সুদীর্ঘ বর্শাঘাতে হেক্টরের প্রাণহরণ করে। সেই সন্তানের দেহ তারই চোখের সম্মুখে ধুলায় অবলুন্ঠিত হতে দেখে তার পক্ষে নিজেকে সংবরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
সে নিজের চুল ছিড়তে থাকে এবং মাথার অবগুন্ঠন ফেলে দিয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলেঃ
‘বাছা, কি দুঃখই আমাকে দিয়ে গেলে। তুমি মরেছ যদি, তবে আমি বেঁচে আছি কেন? ট্রয়ে সর্বক্ষণ তুমি ছিলে আমার গর্ব। এখানকার প্রত্যেক পুরুষ ও নারীর কাছে তুমি ছিলে তাদের রক্ষাকর্তা, দেবতার মতো তারা তোমার পূজা করত। বস্তুত জীবিত অবস্থায় তুমি ছিলে তাদের সকলের গর্ব। আর এখন সেই তোমাকেই মৃত্যু এবং ভাগ্য দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে।”
এভাবে রাণী হেকুবা বিলাপ করতে থাকে। হেক্টরের দেহ নিষ্ঠুর একিলিসের হাতে লাঞ্ছিত হবে, এ তার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব।
হেক্টরের শব রাজা প্রায়াম ফিরিয়ে আনলে তার শোক উদ্বেলিত হয়ে ওঠে।
রানী হেকুবার জীবনে একিলিস চরম দুর্ভাগ্য হেনেছে। বীরপুত্র হেক্টরকে সে হত্যা এবং তার মৃতদেহকে অপবিত্র করেছে, অন্যান্য পুত্রদের বন্দী বা ধৃত করেছে। সুতরাং সেই নির্মম একিলিসের প্রতি তার সমস্ত অন্তর ঘৃণায় উদ্বেলিত হয়ে উঠবে, এই তো স্বাভাবিক।
একিলিসের প্রতি সে প্রতিশোধস্পৃহায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে।
“ওঃ! এই রাক্ষসটাকে যদি হাতের কাছে পেতাম, আমি তার কলেজ চিবিয়ে খেতাম। তাহ’লে আমার প্রতিহিংসা কিছুটা মিটত।”
কিন্তু দুর্বল ও অক্ষম নারীর পক্ষে অফালন করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই।
হেক্টরের শব উদ্ধারের জন্যে সেই নরহস্তা রক্তপিপাসু একিলিসের কাছে তার স্বামী যাবে, এ-কথা শোনা মাত্র সে আশঙ্কাতুর হয়ে ওঠে। স্বামীর অমঙ্গল হতে পারে, এই ভাবনা তাকে বিচলিত করে তোলে।
“হায় হায়। তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি কি একেবারে লোপ পেয়েছে? বিশেষ করে সেই লোকটার কাছে, যে তোমার এতগুলো সাহসী পুত্রকে হত্যা করেছে? তুমি কি করে একীয় নৌবহরে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারলে? নিশ্চয় তোমার হৃদয়টা হচ্ছে লোহার মতো কঠিন। দেখামাত্রই তোমাকে একেবারে হাতের মুঠিতে কায়দায় পেয়ে সেই বিশ্বাসঘাতক পশুটা মোটেই ছেড়ে দেবে না-তার নিকট থেকে কোনরূপ দয়াই তুমি পাবে না। না, না। এ হয় না।”
তার এই নিঃসঙ্গ ও বেদনাবিধুর জীবনে স্বামীই একমাত্র আশ্রয় বা অবলম্বন। স্বামী যাতে নিরাপদে ফিরে আসতে পারে, সেজন্য যাত্রার পূর্বে দেবতার উদ্দেশ্যে সুরা তর্পণের জন্য স্বামীকে অনুরোধ করে। শুধু তাই নয়, স্বামী যেন দেবতার কাছে প্রার্থনা করে মঙ্গলবাহী দূত পাঠানোর জন্য- যাতে তার স্বামী নিরাপত্তার বিশ্বাস নিয়ে শত্রুশিবিরে যেতে পারে। স্বামীর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা এবং নিরাপত্তা-ভাবনায় সে সর্বদা আকুল।
মাতৃত্ব ও নারীত্বের এক উজ্জ্বল চিত্র রানী স্বেকুবার মাধ্যমে রূপায়িত হয়ে উঠেছে। তার জীবনের অতল গভীর বেদনা আমাদের অন্তরকে স্পর্শ করে।
এন্ড্রোম্যাকি চরিত্র : হোমার ও ইলিয়াড
এন্ড্রোম্যাকি পতিব্রতা ও সন্তানবৎসলা নারী। পতি ও পুত্র নিয়েই তার সংসার এবং এরাই তার জীবনের সর্বস্ব। ট্রয়ের সর্বনাশা যুদ্ধে সে তার পিতা ও সাত ভাইকে হারিয়েছে। একিলিস তাদের হত্যা করেছে। পিতৃকূলে তার আপন বলতে আর কেউ অবশিষ্ট নেই। সুতরাং স্বামীই তার একমাত্র ভরসা ও আশ্রয়স্থল। হেক্টর শুধু তার স্বামী নয়,-পিতা, মাতা, ভাই সবই।
হেক্টরের সাথে তার ভাগ্য একসূত্রে গ্রথিত। তাই হেক্টরের জন্য সে সর্বদা আতঙ্কিত। সে জানে, হেক্টরের বীরত্বই একদিন তার সমাপ্তি ঘনিয়ে আনবে। ফলে সে হবে বিধবা, তার শিশুপুত্র হবে অনাথ। ভাবী অমঙ্গলের আশঙ্কা করে সে হেক্টরকে দেয়ালের উপরে থাকতে অনুরোধ করে।
“তোমার বীরত্বই তোমার সমাপ্তি ঘনিয়ে আনবে। তোমার শিশুপুত্রের কথা, তোমার যে স্ত্রী শিগগিরই বিধবা হবে, তার কথা তোমার মনে জাগে না। যুদ্ধে একদিন একীয়দের হাতে তোমার মৃত্যু হবে। তোমাকে হারালে আমারও হয়ত মৃত্যু হবে। কারণ তোমার মৃত্যু হ’লে আমার মনে শান্তি থাকবে না- থাকবে অনন্ত দুঃখ।- এখন কৃপা কর আমাকে, থাক এখানে এই দেয়ালের উচু চূড়ায়- তোমার শিশুপুত্রকে অনাথ এবং স্ত্রীকে বিধবা করো না “
এন্ড্রোম্যাকি সেবাপরায়ণা। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে স্বামী স্নান করবে। তাই সে গরম পানির ব্যবস্থা করে। এ তার স্বপ্নেরও অগোচর, ইতিমধ্যেই তার স্বামী একিলিস কর্তৃক নিষ্ঠুর ভাবে হত হয়েছে এবং স্বামীর দেহকে একিলিস অপবিত্র করেছে।
দুর্গপ্রাচীর থেকে বিলাপ-ধ্বনি শুনে তার সর্বাঙ্গ শিউরে ওঠে, হাত থেকে দ্রব্য পড়ে যায়। সে যথার্থই আশঙ্কা করে যে, হয়তো বা ইতিঃপূর্বেই হেক্টরের আকাশচুম্বী গরিমার চির অবসান হয়ে গেছে। সে জানে রণক্ষেত্রে তার স্বামী কখনও পশ্চাদপসরণ করবার মতো পাত্র নয়।
এণ্ডোম্যাকি দুরু দুরু বক্ষে পাগলিনীর মতো ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। দুর্গপ্রাচীরে আরোহণ করে সে দেখতে পায় একটি অশ্ব-শকটে তার স্বামীর মৃতদেহ বেঁধে একীয় নৌবহরের দিকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে-এই দৃশ্য তার পক্ষে সহ্যাতীত। তার চোখে সারা বিশ্ব অন্ধকার হয়ে আসে। সে সংজ্ঞাহারা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
জ্ঞানলাভের পর সে বিলাপ করতে থাকে,
“ও হে হেক্টর! কি হবে আমার এখন? কি কুক্ষণে তোমার আমার জন্ম হয়েছিল।- এখানে প্রায়ামের ঘরে তোমার, আর থীবে ইটনের গৃহে আমার জন্ম হল একই অশুভ নক্ষত্রে। সেখানে এক দুর্ভাগা পিতার দুর্ভাগিনী সন্তান হিসেবে ছোটকাল থেকেই লালিত-পালিত হয়েছিলাম।
এভাবে এন্ড্রোম্যাকি অশ্রুবর্ষণ করতে করতে বিলাপে রত হয়েছে। ট্রয়ের পুরনারীরাও তার দুঃখে কাতর হয়ে তার সঙ্গে বিলাপে যোগ দিয়েছে।
প্রায়াম হেক্টরের শবদেহ শত্রুর কবল থেকে নিয়ে আসে এবং তা দেখে এন্ড্রোম্যাকির নিজেকে সংযত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। দু’হাতে স্বামীর মাথা তুলে ধরে বিলাপ করতে থাকে, “স্বামী। বড় অল্প বয়সে তুমি মৃত্যুবরণ করেছ এবং আমাকে বিধবা করে গেছ। আমরা হতভাগ্য দম্পতি যে শিশুপুত্রকে পৃথিবীতে এনেছি, সে নিতান্তই শিশু। সে যে কোনদিন মানুষ হয়ে উঠতে পারবে, সে-ভরসা আমার নেই।”
এ-সব কথা বলে এন্ড্রোম্যাকি আপন শোক প্রকাশ করে এবং তার বিলাপের সাথে অপর মেয়েরাও যোগ দেয়। এন্ড্রোম্যাকির এই বেদনা শুধুট্রয়ের পুরনারীদের নয়, আমাদের সকলেরই অন্তর স্পর্শ করে। তার বেদনাকে মহাকবি হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছেন।
হেলেন চরিত্র: হোমার ও ইলিয়াড
হেলেন বিশ্বের সুন্দরীশ্রেষ্ঠা। তার সৌন্দর্য দেখে ট্রয়-নগরীর বৃদ্ধরা অভিভূত হয়েছে। সে তো নারীমাত্র নয়, সে অমর দেবীর অবিকল প্রতিমূর্তি। তাকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘকাল ধরে একিয়ান ও ট্টজানদের মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সূচনা ঘটেছে, এতে অবাক হবার কিছু নেই। তার সৌন্দর্যে ট্রয়-নগরীর বৃদ্ধরা অভিভূত হয়েছে বলেছে,
“এমন নারী রত্বের জন্যে ট্রয় ও একিয়ান সৈন্যরা যে এত দীর্ঘকাল ধরে কষ্ট সহ্য করছে, এজন্যে কে তাদের দোষ দিতে পারে।” তাই তাদের কাছে ট্রয়ের যুদ্ধ স্বাভাবিক বলে প্রতিভাত হয়েছে। সৌন্দর্যের এই ধারণায় লেসিং চমৎকৃত হয়ে বলেছেন, ‘What can afford us a more lively idea of beauty than that cold old age should think the war justified which had cost so much blood and so many tears”.- Lacoon
হেলেন কাম, সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যের প্রতীক। এদিক দিয়ে প্যারিসের সাথে তার সাদৃশ্য আছে। আবার একিলিসের মতোই সেও এক রহস্যময় চরিত্র-নিজের কাছেই নিজে রহস্য-সংসক্ত।
তার মধ্যে পাপবোধ প্রবলভাবে দেখা যায়। প্যারিসের সাথে তার ব্যভিচারের ফলে নিরীহ নর-নারীর জীবনে দেখা দিয়েছে নিঃসীম দুঃখভোগ, ট্রয়নগরীতে নেমে এসেছে দারুণ ধ্বংস ও বিপর্যয়। এ সকল দুঃখ ও দুর্ভাগ্যের জন্যে সেই দায়ী। এজন্যে তার অন্তরে রয়েছে গ্লানি ও অনুশোচনা। সে অন্তরে দারুণ জ্বালা অনুভব করে। সে নিজেকে সব সময় অপরাধী বলে বিবেচনা করে এবং এ নিয়ে সর্বদা কুণ্ঠিত। হেক্টরকে সে বলেছে, “আমি সত্যি লজ্জাহীনা, দুষ্টমনা, ঘৃণ্য জীব। কত ভাল হ’ত, যদি জন্মমুহূর্তেই
দুষ্ট ঝড়- দেবতা আমাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে কোনো পাহাড়ের উপরে কিংবা কোনো উত্তাল তরঙ্গসঙ্কল সাগরে ফেলে দিত। আর এ-সব দুর্ঘটনা ঘটবার আগেই তরঙ্গ আমায় চিরতরে গ্রাস করে ফেলত।” তার এই অন্তর্দাহের জন্যে বিবেক বা নীতিবোধই দায়ী।
সে এক দারুণ সমস্যার সম্মুখীন। দুই বিবাদমান পক্ষের মধ্যে এক পক্ষে আছে তার স্বদেশবাসী একিয়ানরা, প্রাক্তন স্বামী মেনিলাস ও আপন জনেরা, অপর পক্ষে তার নতুন দেশ, বর্তমান পরিবার ও স্বামী। যাদের পেছনে ফেলে এসেছে, হৃদয়ের স্মৃতিপট থেকে তাদের একেবারে মুছে ফেলা কখনো সম্ভব নয়।
পূর্বস্বামী, পিতা-মাতা এবং পরিত্যক্ত নগরীর জন্যে তার একটা প্রবল আকুতি আছে। অথচ সে জানে, একিয়ানরা যুদ্ধে জয়ী হলে তার শাস্তি অনিবার্য এবং এই ভয়ে সে ভীত। আবার প্যারিসের জন্যে তার দুর্বলতা আছে এবং তা তার মধ্যে প্রবল মোহের সঞ্চার করেছে। অথচ তার পূর্বস্বামী মেনিলাসের তুলনায় বর্তমান স্বামী প্যারিস দুর্বল ও অব্যবস্থিতচিত্ত।
প্যারিসের ভীরুতা ও কাপুরুষতা তার অন্তরে ঘৃণার উদ্রেক করেছে। তাই একদিন যে ভালোবাসার তাগিদে সে স্বামী-সংসার ফেলে চলে এসেছিল সেই ভালোবাসা স্নান হয়ে গেছে। অথচ প্যারিসের প্রতি ভালবাসা স্তিমিত হয়ে এলেও, প্যারিসকে প্রত্যাখ্যান করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্যারিসে পালিয়ে এলে তার ঘৃণা উদ্রিক্ত হয়েছে এবং প্যারিসকে সে বলেছে, “যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তুমি চলে এসেছো? আমি আশা করেছিলাম, আমার পূর্বস্বামী সেই মহান সেনানীর হাতে তোমার পতন হয়েছে। তুমি আস্ফালন করতে যে, তুমি মেনিলাসের চাইতেও বড় যোদ্ধা। কেন তবে আবার তাকে মোকাবেলা করতে যাচ্ছ না?”
প্যারিসের প্রতি প্রবল ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও সে তার শয্যাসঙ্গিনী হবার আহ্বান উপেক্ষা করতে পারেনি!
সৌন্দর্যময়ী হেলেনের সেই আত্মসংগ্রামের কাহিনি সত্যি বেদনাবহ। প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্বে সে জর্জরিত হয়েছে, অথচ এই নির্বান্ধব পুরীতে কেউ তাকে বোঝবার প্রয়াস পায়নি-একমাত্র হেক্টর ব্যতীত। শুধু হেক্টরের কাছেই সে আপন অন্তরের বেদনাকে প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছে।
তার লজ্জাহীনতা ও প্যারিসের দুর্বুদ্ধির জন্যে ট্রয়ে যে বিপর্যয় ঘটেছে, এর সমস্ত দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছে হেক্টরকে। তাই হেক্টরের কাছে সে লজ্জিত এবং হেক্টরের জন্যে রয়েছে তার অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধ।
অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আত্মগ্লানিতে জর্জরিতা হেলেন জানে যে, ভাবীকালের মানুষ তার কলঙ্ক নিয়ে কাব্যগাথা রচনা করবে। সৌন্দর্যের মধ্যে অভিশাপ আছে এবং সেই অভিশাপ তাকে শুধু জীবনে নয়, যুগ যুগ ধরে বহন করতে হবে।
গঠনকৌশল : হোমার ও ইলিয়াড
‘একিলিসের ক্রোধ’ কাব্যের মূল উপজীব্য। মহাকাব্যের প্রথম থেকেই তা উচ্চারিত হয়েছে। বিষয়টি রূপায়িত হয়েছে তিনভাবে –
-(১) মূল আখ্যান-ঝগড়ার কাহিনি , আগামেমনন ও একিলিসের মধ্যে ঝগড়া দিয়ে। (২) সহযোগী আখ্যান-যুদ্ধের মূল গতিবিধি, অর্থাৎ যুদ্ধ ও যুদ্ধ সংক্রান্ত ঘটনাবলি (৩) অনুষঙ্গী উপাখ্যান-পৌরাণিক এবং নানাবিধ উপখ্যানের অবতারণা।
একিলিসের ক্রোধই কাহিনির মূল সূত্র। সেই সূত্র ধরে টয়ের যুদ্ধের ঘটনাবলি বিন্যস্ত করা হয়েছে এবং ফাঁকে ফাঁকে পৌরাণিক ও নানাবিধ উপাখ্যানের অবতারণা করা হয়েছে।
মাত্র ৪৭ দিনের ঘটনা নিয়ে ‘ইলিয়ড’ রচিত। ট্রয়ের যুদ্ধ দশ বছর ধরে চলে। কিন্তু শেষ বছরের মাত্র এই কয়টি দিন হোমার কাহিনির জন্য নির্বাচন করেছেন কবি।
আগামেমননের প্রতি একিলিসের ক্রোধ নিয়ে কাহিনির সূচনা এবং বন্ধু প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুতে সেই ক্রোধ ন্যস্ত হয় হেক্টরের প্রতি। হেক্টর-বধের পর ক্রোধের উপশম এবং হেক্টরের শবদাহের পরেই কাব্যের পরিসমাপ্তি ঘটে।
‘ইলিয়ড’-এর আখ্যানটি দৃঢ়ভাবে সংবদ্ধ। আখ্যানের আদি, মধ্য ও অন্ত সামঞ্জস্য সূত্রে গ্রথিত বা সংবদ্ধ। আখ্যানের এই দৃঢ় সংহতি ও শিল্পগত ঐক্য এরিস্টটলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, এবং প্রশংসা করেছে। বলা হয়েছে, কাহিনির ঐক্যসূত্র গড়ে তুলেছে একিলিসের ক্রোধ এবং তা প্রথম, নবম, ষোড়শ, উনিশ, বাইশ এই কয়টি সর্গে বর্ণিত হয়েছে।
প্রথম সর্গে আছে ব্রিসিসকে নিয়ে আগামেমননের সাথে একিলিসের ঝগড়া, ফলে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবে না বলে একিলিসের প্রতিজ্ঞা। নবম সর্গে আছে, যুদ্ধে বিপর্যয়ের ফলে আগামেমনন কর্তৃক একিলিসের কাছে সন্ধির প্রস্তাব, কিন্তু একিলিস কর্তৃক তা প্রত্যাখ্যান।
হোমার ও ইলিয়াড
ষোড়শ সর্গে একিলিস বন্ধু প্যাট্রোক্লাসকে যুদ্ধে যেতে দেয়, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে প্যাট্রোক্লাস অশেষ বীরত্ব দেখিয়েও হেক্টরের হাতে মৃত্যুবরণ করে। উনিশ সর্গে আছে, একিলিসের সাথে আগামেমননের সমঝোতা এবং প্যাট্রোক্লাস বধের প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহা।
বাইশ সর্গে একিলিস নিষ্ঠুরভাবে হেক্টরকে হত্যা করে। তেইশ সর্গে আছে প্যাট্রোক্লাসের শবদাহ। চব্বিশ সর্গে দেখা যায়, মুক্তিমূল্য নিয়ে একিলিস প্রায়ামকে হেক্টরের শবদেহ ফেরত দেয় এবং উজানরা খুব যত্নের সাথে হেক্টরের শেষকৃত্য সম্পাদন করে।
সুতরাং একিলিসের ক্রোধ এবং সেই ক্রোধের উপশম, এই নিয়ে কাহিনির মূলসূত্রটি গড়ে উঠেছে। এই মূলসূত্রের উপর ভিত্তি করেই ট্রয়ের যুদ্ধের কাহিনি বিন্যস্ত এবং যুদ্ধের গতিবিধি বর্ণিত হয়েছে। এবং এই কাহিনির মধ্যেই শ্রোতার মনোরঞ্জনার্থে ও বৈচিত্র্য সম্পাদনের জন্যে নানা উপাখ্যানের সন্নিবেশ করা হয়েছে।
অনেকে ইলিয়াডকে হোমারের একক রচনা নয় বলে উল্লেখ করেছেন। অনেক অংশ পরবর্তীতে সংযোজন মনে করা হয়। কিন্তু ‘ইলিয়ড’-এর পরিণত শিল্পকৌশল একক কবির রচনা বলেই সাক্ষ্য দেয়। হোমার কাহিনিবিন্যাস এবং গঠন-কৌশলের দিক দিয়ে অভিনবত্ব ও আশ্চর্য সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। ‘ইলিয়ডে’র গঠন-প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে
জর্জ স্টেইনার বলেছেন, “The work of Homer, as we know it, is of dazzling intricacy. Its design is tight and deliberate. Set it beside the finest of recorded folk poetry, and the difference leaps to eye, We are dealing in the lliad with a commanding vision of man, or randomly carried forward. The entrance into action via the articulate it every detail, not with a tale of adventure automatically oblique theme of Achilles’ anger is art of high sophistication. The entire design, with its inner echoes and alterance of stress and repose, follows on the particular drama of the opening.”
কাহিনি বর্ণনার কৌশলে এবং চরিত্র বিশ্লেষণের পটভূমি তৈরিতে হোমারের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতেই হয়। একিলিসের ক্রোধ নিয়ে কাহিনির সূচনা। অথচ নবম সর্গ পর্যন্ত দক্ষ শিল্পী একিলিসকে আড়ালে রেখেছেন। কাহিনির শুরু নাটকীয়ভাবে,- শ্রোতারা সহসা একিলিসের সাক্ষাৎ পায় না।
হোমার অবলম্বন করেছেন বিলম্বিত রীতি। যেমন দ্বিতীয় সর্গে আগামেমননের স্বপ্ন বৃত্তান্ত কাহিনীর গতিকে বিলম্বিত করেছে। এর ফলে শ্রোতা জানে কি হবে, কিন্তু কখন কি ভাবে হবে তা জানে না। হোমার জানেন, গল্পের সাথে শ্রোতা বহু পূর্বেই পরিচিত। কেননা তা বহুকাল ধরে লোকমুখে প্রচলিত।
সুতরাং শ্রোতার মনোরঞ্জন করতে হলে কাহিনি অভিনব পদ্ধতিতে বিন্যাস করতে হবে। শ্রোতার মনে ঔৎসুক্য জাগাবার জন্যে হোমার সংকটময় মুহূর্তকে বিলম্বিত, কাহিনি দীর্ঘসূত্র, নানা প্রসঙ্গের অবতারণা এবং এই সুযোগে নানা চরিত্র ও ঘটনার তাৎপর্য উদ্ঘাটিত করেছেন।
হোমার কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে মূল কাহিনি থেকে বিচ্ছিন্ন ও অপ্রাসঙ্গিক ঘটনার অবতারণা করেছেন। এর ফলে শ্রোতা পরিচিত কাহিনীর মধ্যেই নতুনত্ব ও অভিনবত্বের আস্বাদ লাভ করে।
হোমার ও ইলিয়াড : , ‘ইলিয়ড’-এর কাহিনি দশ বছরের যুদ্ধের মধ্যে শেষের দিকের মাত্র ৪৭ দিনের ঘটনা নিয়ে লেখা এবং এর মধ্যে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে বিধৃত করা হয়েছে। অতীতে যা ঘটেছে তা হোমার কৌশলে উন্মোচিত করেছেন এবং তা তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে আমরা ‘ইলিয়ড’-এ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একই সাথে পাচ্ছি। এবং মহাকবির কাল সম্পর্কে সচেতনতার ফলেই তা সম্ভব হয়েছে।
‘ইলিয়ড’ শ্রব্যকাব্য হলেও, এতেও মূলত নাটকীয় রীতি প্রাধান্য লাভ করেছে। হোমার জানেন, কতটুকু বর্ণনা করতে হবে আর কতটুকু ঘটনার মাধ্যমে উদ্ঘাটিত করতে হবে। সে সকল ঘটনাবলি যেন আমরা নাটকের মতোই রঙ্গমঞ্চে চোখের সম্মুখে প্রত্যক্ষ করি।
এই নাটকীয় রীতি প্রাধান্য লাভ করার ফলে হোমার নিজের মুখে যথাসম্ভব কম কথা বলেছেন, পাত্র-পাত্রীদের মাধ্যমে কাহিনি রূপায়িত করেছেন। তিনি কয়েকটি কথায় মুখবন্ধ করে পাত্র-পাত্রীদের উপস্থিত করেছেন। কারণ হোমার জানেন কখন বর্ণনা করতে হবে আর কখন পাত্র-পাত্রীদের জবানীতে ব্যক্ত করতে হবে।
চরিত্রগুলোকে হোমার আঁকেন না, চরিত্রগুলো যেন তাদের কথা ও কার্যাবলির মাধ্যমে আপনাদের উদ্ঘাটিত করে। এই নাটকীয় রীতিতে বিন্যস্ত করার ফলে তাঁর সৃষ্ট প্রতিটি চরিত্র বিশিষ্ট ও স্বতন্ত্র।
শুধু তাই নয়, চরিত্র-চিত্রণে হোমারের আশ্চর্য সংগতি লক্ষ করা যায়। একিলিস, আগামেমনন, মেনিলাস, ওডিসাস, নেষ্টর, হেক্টর, প্রায়াম, হেকুবা, এন্ড্রোম্যাকি, থেটিস, এথেনা, হেলেন প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে এই সামঞ্জস্য দেখা যায়। চরিত্র-চিত্রণে এই সংগতি থেকেই প্রমাণিত হয় যে, ‘ইলিয়ড’ কবির অত্যুৎকৃষ্ট শিল্পচাতুর্য ও শিল্প নৈপুণ্যের পরিচয় বহন করে।
হোমার ইলিয়াডে দেখিয়েছেন মানবিক ট্র্যাজেডি কীভাবে মহিমামণ্ডিত হয়। হোমার তাঁর কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ইতিহাসকে সাহিত্য করেছেন। হোমারের হাত ধরেই ক্রোধ হয়ে উঠেছে সাহিত্যের উপজীব্য। বীরত্ব কেবল শক্তির প্রদর্শন নয়, নৈতিক দ্বন্দ্বেরও ভাষা হতে পারে। নিয়তির ক্রীড়ানক হয়েও মানব মহিমাকে হোমারের কাছে বড় হয়ে উঠেছে। হোমার দেখিয়েছেন সংলাপ, উপমা ও বর্ণনা কীভাবে সংগীতময় হয়ে কাহিনির মাঝে প্রবাহিত হয়।
হোমার ভাষার সৌন্দর্যে গঠনকে দীপ্ত করেন। হোমার ট্র্যাজেডিকে নান্দনিকতায় উন্নীত করেন। হোমার সাহিত্যে মানবিকতার মানদণ্ড স্থাপন করেন। হোমার শেষ পর্যন্ত আমাদের বলে যান—মানুষই মহাকাব্যের কেন্দ্র।


হোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াডহোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াডহোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াডহোমার ও ইলিয়াড হোমার ও ইলিয়াড