বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতায় ভাব বিভোরতা বেশি, আঙ্গিকের ক্ষেত্রে কবির মনোযোগ কম-আলোচনা কর।
অথবা, বিহারীলালের কবিতায় আবেগের প্রবলতা মুখ্য-আলোচনা কর।
অথবা, তিনি যতবড় ভাবুক ছিলেন, ততবড় কবি ছিলেন না-আলোচনা কর।


খোলা পাতা ওয়েবসাইটের সকল কন্টেন্ট দেখতে ক্লিক করুন
ভূমিকা
বাংলা কাব্যধারায় বিহারীলাল চক্রবর্তী এক অনন্য নাম। তাঁকে অনেকেই ‘ভোরের পাখি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন—কারণ তাঁর কবিতায় নবজাগরণের সূচনালগ্নের স্নিগ্ধ আলো, ব্যক্তিমানসের জাগরণ এবং অন্তরাত্মার আবেগময় সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে যখন কাব্য প্রধানত আখ্যাননির্ভর ও অলঙ্কারমুখী, তখন বিহারীলাল চক্রবর্তী কবিতাকে অন্তর্জাগতিক অনুভবের ক্ষেত্র করে তুলেছিলেন। তাঁর কাব্যে প্রকৃতি, প্রেম, বেদনা ও আত্মমগ্নতা এক গভীর আবেগঘন সুরে ধ্বনিত হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এই আবেগের প্রবলতা কি কখনও কখনও আঙ্গিককে আড়াল করে দেয়নি? তিনি কি মূলত ভাবুক, নাকি পূর্ণাঙ্গ শিল্পসচেতন কবি? তাঁর কবিতায় কি রোমান্টিকতা বেশি, না মিস্টিক ধ্যানধারণা? সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, বিহারীলাল যত বড় ভাবুক, তত বড় শিল্পনৈপুণ্যসম্পন্ন কবি নন। আবার অন্য অংশ বলেন, তাঁর ভাবাবেগই তাঁর কবিত্বের প্রাণশক্তি।
এই প্রবন্ধে বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতার ভাব-বিভোরতা, রোমান্টিক ও মিস্টিক প্রবণতা এবং আঙ্গিক-সচেতনতার সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করে তাঁর কাব্যপ্রতিভার স্বরূপ অনুধাবনের চেষ্টা করা হবে।
ভোরের পাখি হিসেবে খ্যাত, বাংলা গীতিকবিতার পথিকৃৎ বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-৯৪) বাংলা কাব্য জগতে এক স্বতন্ত্র ও অবিষ্মরণীয় কবি-প্রতিভার অধিকারী। বিহারীলালের কবিতাতেই প্রথম মনোজগতের আত্মভাবনা প্রকাশ পেয়েছে। তবে কবির কাব্যে আবেগ-উচ্ছ্বাসের প্রবণতা একটু বেশি মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে, ফলে আঙ্গিকের দিকে কবির দৃষ্টি বেশি ছিল না বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।
কবিহৃদয়ের একান্ত অনুভূতি যখন সংগীতের মাধুর্য নিয়ে স্বতঃস্ফুর্তভাবে আবেগকম্পিত সুরে আত্মপ্রকাশ করে , তখন তা হয়ে ওঠে গীতিকবিতা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিহারীলালের কাব্যেই প্রথমবারের মতো বিশুদ্ধ গীতিকবিতার সুর ধ্বনিত হয়েছিল। তাই তিনি গীতিকবিতার পথিকৃৎ। বিহারীলালই প্রথম ব্যক্তি-হৃদয়ের অবরুদ্ধভাব কল্পনাকে প্রকাশ করেন এবং রোমাণ্টিক মনোবেদনার কল্পনাভিসার ও সৌন্দর্য অনুধ্যানকে শিল্পসম্মতভাবে তাঁর কবিতায় পরিবেশন করেছেন।
অন্তরের গভীরে স্বতঃউৎসারিত গভীর আবেগ বিহারীলালের কবিতায় স্থান লাভ করেছে। তাঁর কবিতা জীবনের গভীর উপলব্ধি হতে উৎসারিত। তাই তাঁর কবিতায় বা কাব্যে যথেষ্ট আবেগ ও উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া তাঁর কবি কল্পনার প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো প্রেম-সৌন্দর্যকে উপলব্ধির জন্য ব্যাকুলতা। প্রেম-সৌন্দর্যকে তিনি বাস্তবের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখতে চেয়েছেন। পূর্ববর্তী যুগের গীতিকবিতা জীবনের বহিরঙ্গকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে, আধুনিক গীতিকবিতা জীবনের অন্তরঙ্গের সংবাদকে বাইরে প্রকাশ করে। বিহারীলাল চক্রবর্তীও তাই করেছেন। এজন্য তাঁর কবিতায় ব্যক্তি-হৃদয়ের আবেগ-উচ্ছ্বাস একটু বেশিই প্রকাশ পেয়েছে।
বিহারীলাল চক্রবর্তী – কবিকর্ম
বিহারীলাল চক্রবর্তীর কাব্য সাধনার ফসল কম নয়। তাঁর কাব্যগুলো হলো- ’সঙ্গীত শতক”(১৮৬২), ’নিসর্গ সন্দর্শন,(১৮৭০), বন্ধুবিয়োগ(১৮৭০), ’প্রেমপ্রবাহিনী’(১৮৭০), ’বঙ্গসুন্দরী”(১৮৭০), ’সারদামঙ্গল’(১৮৭৯), ’সাধের আসন’(১৮৮৯) ইত্যাদি।
তাঁর কাব্য-সাধনা সম্পর্কে আজহার ইসলাম বলেছেন-
সূর্যের কিরণ স্পর্শে পুষ্প যেমন ধীরে ধীরে একটার পর একটি পাঁপড়ী মেলিয়া পূর্ণরুপে প্রস্ফুটিত হয়; কবির মানস পদ্মও তেমনি সুর সরস্বতীর স্পর্শে নিভৃতে একটু একটু করিয়া পূর্ণ বিকশিত হইয়াছে।”
এই প্রস্ফুটিত হবার পথ বড় সহজ-সরল। তাঁর কাব্যের ভাষা এত সহজ সরল ও অনবদ্য যে কাব্যপাঠের সময় মনে হয় তিনি যেন কবিতা লিখতে বসেননি। বরং নিজের নিতান্ত ভাবনাগুলোকে আটপৌরে করে প্রকাশ করেছেন।
”নিসর্গ সন্দর্শন ” কাব্যটি বিহারীলাল চক্রবর্তীর প্রকৃতি চেতনার স্বাক্ষর । প্রকৃতির রুপ-রস-মুগ্ধ কবি-হৃদয়ের উচ্ছ্বাসময় স্বরূপ এ কাব্যে প্রায় প্রতিটি কবিতায় ধরা পড়েছে। যেমন-
’প্রণয় করেছি আমি প্রকৃতি রমণী সনে
যাহার লাবণ্যচ্ছটা মোহিত করেছে মনে”
ওয়ার্সওয়ার্থ, শেলী, কীটস প্রমুখ কবিদের মতো প্রকৃতি-মুগ্ধ রোমান্টিক মনের পরিচয় পাওয়া গেলেও বিহারীলালের কবিতায় আবেগের সংহত রুপটি পাওয়া যায় না।
”বঙ্গ সুন্দরী’ কাব্যটি কবির নারী সম্পর্কিত রোমান্টিক মনের পরিচয় বহন করে। কবি নারীকে সীমার মধ্যে আবদ্ধ না রেখে নারীর সৌন্দর্যকে স্বর্গে স্থান দিয়েছেন-
”তুমি বিশ্বের জ্যোতি হৃদপদ্মে সরস্বতী
………………………………
হত মরুময় সব চরাচর না থাকিতে জগতে যদি।”
’বন্ধুবিয়োগ’ কাব্যে ঘনিষ্ট চার বন্ধু পূর্ণচন্দ্র, রামচন্দ্র, কৈলাস ও বিজয়ের এবং প্রিয়তমা পতœীর অকাল মৃত্যু জনিত হৃদয়ের বেদনা গভীর আবেগময় ও সহজ সরল ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে।-
”কেউ যদি কোনখানে পাইত আঘাত
সকলের শিরে যেন হত বজ্রপাত।
তৎক্ষণাৎ উঠিতাম প্রতিকার তরে
পড়িতাম বিপক্ষের ঘাড়ের উপরে।”
‘প্রেম প্রবাহিনী’ কাব্যে শুদ্ধ প্রেমের সন্ধানে ব্যর্থ কবি মনের হাহাকার খুঁেজ পাওয়া যায়। যেমন-
”তিনি কহিলেন , ভাই , জগতের প্রতি
আমার অন্তর চটে গিয়েছে সম্প্রতি।”
সর্বদা হুহু করে মন
বিশ্ব যেন মরুর মতন
চারিদিকে ঝালাপালা
উঃ কি! জ¦লন্ত জ্বালা
অগ্নিকুন্ডে পতঙ্গ মতন।
এসব পংক্তির মধ্যে কবির অন্তরে ছোঁয়া আছে, আবেগ আছে, কিন্তু কবিতাটি শিল্পময় হয়েছে কিনা কবির সেদিকে খেয়াল নেই।
’সারদামঙ্গল’ বিহারীলাল চক্রবর্তীর শ্রেষ্ঠ কাব্য। এখানে সারদা কবির কাব্যলক্ষ্মী, মানসমূর্তি ও সৌন্দর্যের উৎস। কবি তাকে কখনো কবি-প্রতিভার উন্মেষ প্রেরণা, কখনো প্রেয়সী জায়া, কখনো আবার সর্বব্যাপিনী বিচিত্র-রূপিনী প্রাণশক্তিরুপে কল্পনা করেছেন। এ কাব্যে তিনি একাধারে রোমান্টিসিজম ও মিষ্টিসিজমের প্রয়োগ দেখিয়েছেন।
”তবে কি সকলি ভুল?
নাহি কি প্রেমের মূল?
বিচিত্র গগন-ফুল কল্পনা লতার।”
“সাধের আসন” কাব্যটি আসলে ”সারদামঙ্গল” কাব্যের উপসংহার স্বরূপ। ”সারদা মঙ্গল” কাব্যে কবি যোগাসনে বসে- ঢুলুঢুলু নয়নে , বিভোর বিহবল মনে” কাকে ধ্যান করেছেন তার উত্তর দেওয়ার চ্ষ্টো করেছেন। ”সাধের আসন” কাব্যে।
“ধেয়াই কাহারে দেবী নিজে আমি জানিনে
কবিগুরু বাল্মীকির ধ্যান ধনে চিনিনে
কেবল হৃদয়ে দেখি দেখাইতে পারিনে।”
এভাবে কবির রচনা থেকে অনেক দৃষ্টান্ত দেখানো যেতে পারে যেখানে কবির ভাব শিশুর মতো সরল, ভাষাও শিশুর মত আলগা, বিহারীলাল আসলে শুধু কবি নন, তিনি আবেগপ্রবন ধ্যানীও।
বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতার প্রতি পংক্তিতেই কবিত্ব ঢাকা আছে, তবে রচনশৈলীর দুর্বলতা চোখে পড়ে। তার রচনার মধ্যে দক্ষ শিল্পীর সচেতন মনের পরিচয় তেমন পাওয়া যায় না। তাই বলা যায় তিনি কবি, কিন্তু শিল্পী নন।
বিহারীলাল চক্রবর্তী রোমান্টিক কবি। তবে তাঁর মন সময়ে সময়ে মিস্টিক রূপান্তরিত হয়েছে। এই মিস্টিসিজম ভাবতন্ময়তা অনেক সময় কবিকে আবেগ তাড়িত করেছে এবং প্রকৃত কাব্য-সৃষ্টির পক্ষে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিহারীলাল চক্রবর্তী তার স্বতন্ত্র কবিমনের বৈশিষ্ট্যে গতানুগতিক কাব্য ধারায় নতুনত্বের সূচনা করেছেন ঠিকই তবে রচনার প্রাচুর্য ও উৎকর্ষতা দিয়ে শিল্পীমনের সাার্থকতা দেখাতে পারেননি। বাস্পাকুল কবি-মন আবেগের তোড়ে ভেসে গেছে। ভাব অনুযায়ী সচেতনভাবে ভাষা ব্যবহৃত হয়নি। তাই কবি যে ভাবলোকে বিচরণ করেছেন, তাঁর কাব্য পাঠককে সে ভাবলোকে নিয়ে যেতে পারেনা। আবেগের আধিক্যই ভাব ও ভাষার মধ্যে অসংগতি এনে দিয়েছে। অন্তরের ভাবনাকে বাইরে প্রকাশ ক্ষমতার ঘাটতি কবিকে কবি করে তোলেনি। তাই অনেকে বলেছেন-
”তাঁর কবিতা তাঁকে যত বড় কবি বলে নির্দেশ করে, তিনি তা অপেক্ষা বড় কবি ছিলেন।”
আবার কেউ বলেছেন-
”তিনি যতবড় ভাবুক ছিলেন, তত বড় কবি ছিলেন না।”
বিহারীলাল চক্রবর্তীর মধ্যে আবেগ ছিলো, কিন্তু নিজের আত্মর্গত ভাবনাকে অন্যের হৃদয়ে পৌঁছে দেবার যে শিল্পী-মানসের প্রয়োজন ছিলো, তা তার ছিলো না। প্রতিটি কাব্যে বর্ণণার ক্ষেত্রে তিনি আবেগ প্রবণ। তবে কবিচিত্ত সে সুরকে কোথাও একত্রিত করে শিল্প-সংহত রূপ দিতে পারেননি। তাঁর প্রতিটি কাব্যে প্রায়ই বক্তব্যের অপূর্ণতা লক্ষ্যণীয়। তাঁর এই অপূর্ণতার একমাত্র কারণ আবেগ। তিনি যদি আবেগের তোড়ে ভেসে না যেতেন, নিজেকে বিশ্বজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে কাব্যের ভাষা, ছন্দ ও কলা-কৌশলের দিকে নজর দিতেন, তাহলে বিরাট কবিমন নিয়ে হয়তো আরও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো বাংলার সাহিত্যাকাশে আলো ছড়াতেন।
তারাপদ মুখোপাধ্যায় ভাবুক বিহারীলাল চক্রবর্তী সম্পর্কে ’আধুনিক বাংলা কাব্য” গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ’বন্ধু বিয়োগ’ কাব্য সম্পর্কে বলেছেন-
”কবি উচ্ছ্বসিত হইয়াছেন, কিন্তু কল্পনার ভাবানুরঞ্জনের বস্তু-তথ্যকে কাব্য সত্যে পরিণত করিতে পারেন নাই।”
ভাবকে কাব্যে বাণীরূপ দিতে গেলে কিছু বর্জন করতে হয়, কিছু গ্রহণ করতে হয়। ” এইভাবে কল্পনায় বাস্তবে, প্রত্যক্ষে -অপ্রত্যক্ষে, তথ্যে-সত্যে, রূপে-অপরূপের মিলনেই গড়া হয় বাক্সময় কাব্য-প্রতিমা।” বিহারীলালের সে ক্ষমতা ছিল না। কেননা, এ কাব্যে তিনি এমন তুচ্ছ ঘটনারও অবতারণা করেছেন, যা কাব্যের বিষয়বস্তু রূপে গৃহীত হতে পাওে না। পূর্বে উল্লিখিত লাইনগুলি যে কবিতা হয়নি, তার জন্য দায়ী বিষয় ও প্রকাশভঙ্গী।
’ প্রেম প্রবাহিনী’-তে প্রথম প্রেমের অনুরাগ, উচ্ছ্বাস ও প্রেমের মাদকতাহীন পরিণতির চিত্র বিভিন্ন সর্গে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে প্রেম সম্পর্কে কবির ধারণা স্পষ্ট নয়। উচ্ছ্বাসের ধোঁয়ায় কবির সহজ দৃষ্টি ঢাকা পড়ে গেছে। তিনি কখনো বলেছেন-
“হায়রে সাধের প্রেম, কত খেল মানুষে
কোথায় তুলে কোথা নিয়ে ফেল।
আবার কোথাও প্রেমের অলৌকিক মহিমা প্রকাশ করেছেন। ’ভাষা ও প্রকাশ রীতি বন্য ঘোড়ার মতো তাহার নাগালের বাহিরেই রহিয়া গিয়াছে।”
“নিসর্গ -সন্দর্শন” কাব্যেও দেখা যায় কবি বিষয়ের গভীর প্রবেশ করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। সমুদ্রের বাহ্যিক রূপ দেখে কবি বিস্মিত হয়েছেন, কিন্তু সমুদ্র তীরবর্তী অনেক বস্তুমূলক বিষয় তার মনের আকাশে শরতের মেঘের মতো ভেসে গেছে। তবে স্বকীয় প্রকাশভঙ্গীর একটা অস্পষ্টভাব এ কাব্যে ধরা পড়েছে।
”বঙ্গ সুন্দরী”র প্রথম কলি থেকেই ”সারদামঙ্গল’ কাব্যের কবির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। একটা কুসুম লেখনীর পরিচয় এ কাব্যে রয়েছে। এ কাব্যেই দেখা যায়-ভাষায়-উপমায়-প্রকাশভঙ্গীতে কবির পূর্ণ অধিকার জন্মেছে। ”বঙ্গসুন্দরী” বিহারীলালের প্রথম সার্থক সৃষ্টি।” কাব্যের মূল অংশে ভাবের দিক থেকে কোনো মৌলিকত্ব ও চমৎকারিত্ব না থাকলেও এর ”্উপহার” অংশে কবির রোমান্টিক কবি-ভাবনা অতি চমৎকারভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
”সারদা মঙ্গল”কাব্যে সারদার সাথে কবির বিরহ মিলনের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। সারদা কবির মানস প্রিয়া রুপে বিশেষ, আবার বিশ্ব সৌন্দর্যের উৎসরূপে সারদা নির্বিশেষ। প্রথম সর্গটিতে সারদার এই ব্যক্তিক-নৈর্ব্যক্তিক রুপ চমৎকার সংযম ও সাঙ্কেতিকতার সাথে অঙ্কিত হয়েছে। কিন্তু পরের সর্গগুলোতে সারদার সাথে কবির বিরহ মিলনের উচ্ছ^াসবহুল অতিপল্লবিত বর্নণাই প্রধান।
“সারদা সংহার মূর্তিতে কবির সন্ত্রাস, অভয়মূর্তিতে কবির শান্তি, সারদার আবির্ভাবে কবির উল্লাস, অন্তর্ধানে বিষন্নতা, এই উল্লাস ও বিষন্নতা, এই পাওয়া ও না-পাওয়ার জোয়ার ভাটায় কাব্যখানি একটি অনির্দিষ্টের ব্যঞ্জনায় শেষ হয়েছে। আদর্শ ও বাস্তবের বির্ধো সব কবির কাব্যে দেখা যায়। তবে বিহারীলাল চক্রবর্তীর কাব্যে এ বিরোধের চেয়ে উচ্ছ্বাস ও চোখের জল বেশি এবং কবি হিসেবে সেখানেই বিহারীলালের অপকর্ষ। বিহারী লাল অনুভুতির রুপ দিতে গিয়ে সংযমের বাঁধ ভেঙ্ েফেলেছেন।”
সারদামঙ্গলে কবি-কল্পনার মৌলিকত্ব থাকলেও ভাব সংযমের অভাবে এর কাব্য সম্ভাবনা পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারেনি। লিরিক কবিতার উপাদান প্রগাঢ় অনুভূতি ও কল্পনার ক্রীড়া-বিলাস, কিন্তু বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতায় পাই অনুভূতির পরিবর্তে আবেগ, কল্পনার পরিবর্তে উচ্ছ্বাস। এই আবেগ ও উচ্ছ্বাস সংযত হলে ‘সারদাম্ঙ্গল’ বাংলা কাব্য-মালার উজ্জ্বল রতœ হয়ে শোভা পেত।
উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, বিহারীলাল চক্রবর্তীই প্রথম আতœভাব প্রকাশের কবি। তবে আত্মভাবনার প্রাচুর্য তাকে শিল্পী-কবি হয়ে উঠতে বাধা দিয়েছে। তাঁর কবিতায় মৌলিকত্ব আছে সুর আছে-আবেগ ও রোমান্টিক চেতনার চিহ্নও রয়েছে প্রতিটি কাব্যে। হৃদয়ের প্রবল আবেগ বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো তাঁর কাব্যে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু ভাবের উপয্ক্তু বাহন হিসেবে ভাষা ও কলাকৌশল ব্যবহৃত হয়নি। শিল্পীসত্ত্বার অভাব পরিলক্ষিত হয়। প্রকাশরীতির দৈন্য তাঁর কাব্যে স্পষ্ট। প্রকাশের সারল্য যেমন কবির কাব্যের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ, তেমনি সে কারণেই তিনি ব্যতিক্রমধর্মী ও নিন্দনীয়ও।
”বিহারীলাল চক্রবর্তী প্রবলভাবে রোমান্টিক এবং সে কারণেই তিনি গভীরভাবে মিস্টিক।” ব্যাখ্যা কর।
ভোরের পাখি বলে খ্যাত বিহারীলাল চক্রবর্তী বাংলা সাহিত্যে নতুন সুরের প্রবর্তক। তিনিই প্রথম বাংলা কবিতায় গীতিকবিতার মূল সুরের প্রবর্তন করেন। বিহারীলাল বাংলা কবিতাকে বস্তুতন্ময়তা নিয়ে আসেন। বিহারীলাল বিশ্বের অপার সৌন্দর্যকে নিজের মতো করে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। তাই তিনি রোমান্টিক, তবে উপলব্ধির গভীরতার কারণে শেষ পর্যন্ত মিস্টিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছেন।
রোমন্টিক কবি বা কবিতার জগত এত বিস্তৃত এবং তার প্রকৃতি এত অস্পষ্ট যে, কোনো একটি মতবাদের দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না। রোমান্টিক-কবি মানুষ ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ও তাদের সৌন্দর্য সম্পর্কে যথেষ্ট চিন্তা, কল্পনা এবং আবেগে আবেগায়িত হন, অর্থাৎ আবেগ-প্রবণতা রোমান্টিক কবির বৈশিষ্ট্য। তারাপদ মুখোপাধ্যায় ’আধুনিক বাংলা কাব্য’ গ্রন্থে বলেছেন-
“রোমান্টিক কবির একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য হইল বর্তমানের কুশ্রী দীনতা হইতে, বাস্তবের প্রত্যক্ষ রুঢ়তা হইতে মুক্তি লইয়া মানস জগতে আত্মনিমজ্জন। যাহা অত্যন্ত কাছের, যাহা অত্যন্ত স্পষ্ট- প্রত্যক্ষ, তাহা রোমান্টিক কবিকে পীড়িত করে। রোমান্টিক কবি তাই বাস্তবকেও কল্পনার ইন্দ্র ধনুরাগে রঞ্জিত করিয়া লন, বাস্তবে দেখেন কল্পনার ভুমিকার ভূমিকায়।”
বিহারীলাল চক্রবর্তীর প্রথম সার্থক সৃষ্টি ’বঙ্গ সুন্দরী’ কাব্য থেকেই রোমান্টিক কবি-ভাবনা অতি চমৎকারভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এ কাব্যের ’উপহার’ অংশে মুক্ত কল্পনাক্রীড়ার চিহ্ন প্রতি পংক্তিতে বিদ্যমান।
এর পর থেকে বিহারীলাল চক্রবর্তীর মধ্যে রোমন্টিক কবির চরম বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে। বিহারীলাল বাহরেরবিশ্বের সৌন্দর্যকে বাইরে রেখে উপভোগে খুশি হতে পারেন নি। তিনি ভাবুক কবি, আত্মভাবে সর্বদা মশগুল থাকতেন। আর এ আত্মভাব মূলত বিশ্বসৃষ্টি সম্বন্ধে একটা গভীর রহস্যবোধ ।
(বিহারীলাল রোমান্টিক না মিস্টিক? শশীভূষন দাশগুপ্ত বাংলা সাহিত্যের নবযুগ)
কবির ধারণা এই রহস্যই বিশ্বসৌন্দর্যের অন্তনিহিত সত্য। একটা মায়াশক্তির মত এই রহস্য সমগ্র সৃষ্টিকে ঘিরে রেখেছে। এই রহসময়ীই সৌন্দর্যময়ী, অন্তরে বাইরে বহু বিচিত্ররুপে প্রতিভাত হয় কান্তিরুপিনী সেই মায়া । কবি এই কান্তিময়ী সহস্যময়ীকে বুদ্ধির প্রখর আলোতে এনে স্পষ্ট করে দেখতে ইবং বুঝতে চান নি কখনো। এখানেই কবির রোমন্টিক স্বভাবের প্রকাশ। ’সাধের আসন’ কাব্যে কবি এই রহস্যময়ীর ধ্যানের সাধনা করেছেন।
বিশ্ব প্রকৃতি জুড়ে কবি এই কান্তিময়ী অনন্ত রহস্যের লীলা দেখেছেন। সে রহস্যের লীলা কবিরর মনপ্রাণকে সবসময় মুগ্ধ করেছে। চোখে এনে দিয়েছে রহস্যের নেশা। তাই কবি মানুষ, পশু, নদ-নদী অর্থাৎ বিশ্ব প্রকৃতির সব কিছুর মধ্যে এই রহস্যের লীলাক্ষেত্র প্রত্যক্ষ করেছেন। অন্তরের রহস্য দিয়ে বিরাট বিশ্বকে আবৃত করে নিজেরে ভিতরেই কবি সবসময় মেতে থাকতেন।
হৃদয় প্রতিমা লয়ে
থাকি থাকি সুখী হয়ে
……………….
জীবন-কুসুমাঞ্জলি পদে করি দান।(সারদা মঙ্গল)
বিহারীলাল চক্রবর্তী এই হৃদয় প্রতিমার সাক্ষাৎ পেয়েছেন বিশ্বভূবনের মধ্যে আকারে ইঙ্গিতে-আভাসে। অন্তরের আলো ছাড়া তাকে অন্য কিছু দিয়ে দেখা যায় না।
কবির অন্তরে রহস্যময়ী মায়া মূর্তিরূপে যে ’হৃদয় প্রতিমা’ ধরা দিয়েছে, তিনিই কবির বহুনন্দিত ’সারদা’ ইনিই কাব্যলক্ষ্মী। সমগ্র কাব্য-সাধনার ভিতর দিয়ে কবি এরই ধ্যান করেছেন, এই সারদা দেবী বহির্বিশ্বে রূপে, রসে, প্রেমে মাধুর্যে ’কায়াহীন বিশ্ববিমোহিনী মায়া’র ন্যায় নিজেকে বহু বৈচিত্র্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন, আবার সৌন্দর্যে , প্রেমে, জ্ঞানে তিনি ’অন্তরব্যাপিনী’ হয়ে যোগমগ্ন কবির বিহাল মনে বিরাজ করেছেন।
ভাব-ভবে মাতোয়ারা
যেন পাগলিনী পারা,
আহলাদে আপনহারা মুগ্ধা মোহিনী,
নিশান্তের শুকতারা,
চাঁদের শুধার ধারা,
মানস-মুরালী মম আনন্দ-রূপিনী।
বিশ্বের সকল সৌন্দর্য পুজারি কবির অন্তরে এই ’মানস-মুরালী’ রুপে আবর্ভূত হন, কবি অন্তরে তার সাক্ষাৎ পেয়ে কাব্যে তারই বন্দনা করেন। বাইরের জগতের এই সৌন্দর্যময়ী , প্রেমময়ী কবির অন্তরে একটা রসপ্লাবনের ভিতর দিয়ে নিজেকে রুপান্তরিত করেন বাণী মূর্তিতে। কবির কাছে তাই সারদা সৌন্দর্যময়ী ও বাণীমূর্তি। এই সারদার ভিতরে লক্ষী, উর্বশী এবং সরস্বতী এক হয়ে গেছেন।
বিহারীলাল চক্রবর্তীর কাব্যে প্রেম ও সৌন্দর্যের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, কারণ দুটোই সারদার মায়াস্পর্শজাত। সারদার সৌন্দর্য-মাধুর্য নারীমূর্তির মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তার প্রতি আকর্ষনই হলো প্রেম। সারদা-মঙ্গল ও ’সাধের আসন’ কাব্যে নারীর প্রেমময়ী মূর্তির মধ্যেই প্রেমময়ী সারদার প্রকাশ।
তুমিই বিশ্বের জ্যোতি,
হৃদপদ্মে সরস্বতী,
প্রেম, স্নেহ ভক্তিভাবে দেখি অনিবার।
আমাদেও ঘরে ঘরে বিরাজমান প্রিয়া, সৌন্দর্যময়ী, প্রেমময়ী এবং রসময়ী নারীর সকলেই সারদার বহিঃপ্রকাশ বলে কবির ধারণা। মহাদেবের উমা, কৃষ্ণের রাধা,ঘরের প্রিয়া, সংসারের যুবতী সতীর ভিতির দিয়েই সারদা মর্ত্যে বিরাজমান, নর-নারীর অনন্ত প্রেম সারদারই লীলা স্পন্দন মাত্র।
প্রিয়ার অনন্ত প্রেমরূপে সারদার প্রেম অনুভব করাতে কবির মনে সন্দেহ- এত প্রেম, এত স্নেহ,দয়া মায়া
তবে কি সকলই ভুল?
নাই কি প্রেমের মুল?
বিচিত্র গগন ফুলে কল্পনা-লতার? (সারদামঙ্গল)
প্রেম ভুল হলেও স্বীকার করতেই হয় যে, এই ভুলের মায়া দিয়েই মানবজীবন , ব্মিবজীবন গড়ে উঠেচে। বিশ্ব নিখিলের মূল রহস্য সৌন্দর্যরুপিনী, প্রেমরুপিনী এবং বাণীরুপে অন্তরে বসবাসকারী এই সারদাই যুগেযুগে কবির অন্তরে দেকা দেন এবং সেই রহস্যময়ীর ধ্যানে মগ্ধ হয়েই কাব্য রচনা করেন।
কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী রোমন্টিক কবি। তাই সারদাকে স্পষ্ট না করে ধরা-ছোঁয়ার ভিতরে আনতে চাননি; বা সারদাও পলকে ঝলকে’ই দেখা দিয়েছে। শুধু দূর হতে আভাসে-ইঙ্গিতে কবির সারদার পরিচয়। এ জন্যই কোনো ভক্ত পাঠিকা প্রশ্ন করেছেন-
হে যোগন্দ্র যেগাসনে
ঢুলু ঢুলু দু’নয়নে
বিভোর বিহবল মনে কাঁহারে ধেয়াও?
কবি তাঁর ’সাধের আসন’ কাব্যে তারই জবাব দিয়েছেন-
ধেয়াই কাঁহারে দেবি।
নিজে আমি জানি নে।
কবি-গুরু বাল্মীকির ধ্যান-ধনে চিনিনে।
………………………………..
কেবল হৃদয়ে দেখি, দেখাইতে পারিনে।
বিহারীলাল চক্রবর্তীর সমগ্র কাব্যের মধ্যে একটা বিষাদের সুর, একটা না পাওয়ার বেদনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কবি যেন জন্মাবদি সমগ্র বিশ্বের ভিতর দিয়ে পরিপূর্ণ কোন এক মানস প্রতিমাকে পেতে চেয়েছেন। কিন্তু সে-
চিরদিন মোরে হাসাল কাঁদাল, চিরদিন দিল ফাঁকি,
বিশ্বের বড় বড় রোমান্টিক কবির কাব্যেই এই বিষাদের সুর বর্তমান, রবীন্দ্রনাথের কাব্যের মধ্যেও এই বিষাদের সুর ঝংকৃত হয়ে উঠেছে।
বিহারীলাল চক্রবর্তীর কাব্যে সারদার রহস্যমূর্তিকে ঘিরে যে রোমান্টিকতার জন্ম তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। শীঘ্রই কবি মিস্টিক হয়ে গিয়েছেন। রোমান্টিক ও মিস্টিক কাব্যে পরস্পর বিরোধী নয়। দুটো বিষয়ই কবি মনের একই ধর্ম থেকে সৃষ্টি । তাদের পার্থক্য প্রকারগত নয়,
রোমান্টিক মনই রহস্যের অতলে আরও ডুব দিয়ে মিস্টিক হয়ে ওঠে। আমাদের জ্ঞানের আলো ছাড়াও হৃদযের একটা আলো আছে। এ হৃদয়ের আলো সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট নয়, চন্দ্রের আলোর মতো অস্ফুট, স্নিগ্ধ ও কমনীয়। সেই স্নিগ্ধ হৃদয়ের আলো গায়ে মেখে বাইরের সব কিছুই চেনা যায় না, সমগ্র বিশ্বটাই যেন ধোয়াটে, অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ধোঁয়াতে, অস্পষ্ট, রহস্যময় বিশ্বে যারা বিহার করেন, তার রোমান্টিক থেকে যান। কিন্তু যারা আরও এগিয়ে গিয়ে, হৃদয়ের আলো দিয়ে রহস্যময়তার বিতরে একটা সত্য আবিষ্কার করে সংশয়ে দোদুল্যমান চিত্তকে স্থির করেন, তারা মিস্টিক।
বিহারীলাল চক্রবর্তীর সারদাও এক এবং অদ্বয়; সে কবি-হৃদয়ের গভীর অনুভূতির উপরে প্রতিষ্ঠি একটা দৃঢ় বিশ্বাস। মিস্টিকদের আবি®কৃত অদ্বয় সত্য যুক্তিতর্কের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, হৃদয়ের আলোতে দেখা গভীর বিশ্বাস। কবি সারদাকে দিয়ে শুধু বিশ্বের সৌন্দর্য, মাধুর্য, প্রেম, এবং জ্ঞানেরই ব্যাখ্যা করেন নি, সারদা এখানে বিশ্বসৃষ্টির অন্তর্নিহিতা মায়াশক্তি। সারদা এখানে দার্শনিকদের আখ্যায়িত ’মায়া’। তাই কবি বলেন –
কবিরা দেখেছে তাঁরে নেশার নয়নে।
যোগীরা দেখেছে তাঁরে যোগের সাধনে (সাধের আসন)
’সাধের আসনে’র যোগেন্দ্রবালার বর্ণনার মধ্যেও সর্বত্র সরাদার এ রকম বিশ্বময়ী মূর্তি ফুঠে উঠেছে। বিশ্বপ্রকৃতির সবকিছুর মধ্যে সারদারই আত্ম-প্রকাশের লীলা। শেষ পর্যন্ত কবির হৃদয়ের সত্য পৌষেল কুয়াশাচ্ছন্ন চন্দ্রালোকে স্নাত হয়েছে। সারদা শুধু কবির মানসী নয়, সে আদি ব্রহ্মার মানসীও। পূর্ণিমা রাতে আকাশের জোছনার রুপ আসলে আদি স্রষ্টার মানস-সুন্দরীর প্রতিচ্ছবি।
আচম্বিতে অপরুপ
ওূপসীর প্রতিরূপ
হাসি হাসি ভাসি ভাসি উদয় অম্বরে।
সারদাকে এভাবে মায়াশক্তি বা ব্রহ্মার মানস-স্বরসীরুপে অঙ্কনের পরিকল্পনা বিহারীলাল চক্রবর্তীর নিজস্ব। বাংলা সাহিত্যে এর আগে এ রকম / জাতীয় আর কারো মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় না।
উনিশ শতকে ইংরেজি কবিতায় অতি অস্পষ্টভাবে এক শক্তির কথা পাওয়া যায়। শেলী এক ঐক্যের কথা বলতেন এবং সেই ঐক্যের অধিষ্ঠাত্রী এক অদৃশ্য শক্তির আভাস মেলে। শেলী সেই অদৃশ্য শক্তিকে সকল সৌন্দর্যের ও রহস্যের মূলধার বলেছেন। কীটসও অনেক কবিতায় সৌন্দর্য দেবীর কথা বলেছেন। ওয়ার্ডস ওয়ার্থ সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে একটা অশরীরী আত্মার খোঁজ পেয়েছিলেন। এদের সাথে কবি বিহারীলালের পরিচয় থাকলেও তাদের প্রভাব খুবই নগন্য মনে হয়। আসলে কবি মনের উপর প্রাচ্য চিন্তাধারার প্রভাব রয়েছে। আদি শক্তি বা মায়াশক্তির কথা এদেশীয় চিন্তাধারায় প্রাচীনকাল থেকেই রয়েছে।
কবি আদ্রশক্তি রুপে সারদাকে দেখেছেন বলেই সারদা ’যোগশ্বরী’, ’সারদা’ যোগানন্দময়ী তনু যোগেিন্দ্রর ধ্যান ধন, সারদা যেমন কবির ধ্যেয় মূর্তি তেমনি যোগির আরধ্য, সারদা ভোলামহেশ্বর প্রাণ এবং আলুথালু কেশে শ্মশানের প্রান্তদেশে’ বিষণœা।
সারদাকে কবি যেভাবে অনুভূতি ও কাব্য-সাধনার ভিতর দিয়ে রুপায়িত করেছেন, তাতে সারদা কবির ’আরাধ্য’ দেবী হয়ে উঠেছেন। এভাবে সারদার মূর্তি তৈরির জন্য কবি বিহারীলাল রোমান্টিকতার স্তর পেরিয়ে মিস্টিকের অতলতাকে স্পর্শ করেছেন। শেস পর্যন্ত কবি-মন রেমান্টিক হয়েও মিস্টিক হয়ে উঠেছে। এখানেই কবির কাব্য-সাধনা স্বার্থক হয়ে উঠেছে।

আলোচনা
১. ভাব-বিভোরতার প্রবলতা
বিহারীলালের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আবেগের গভীরতা। তাঁর কাব্যে ব্যক্তিমানসের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, প্রেম-বিরহ অত্যন্ত অন্তর্মুখী ভঙ্গিতে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বহির্জগতের বর্ণনার চেয়ে অন্তর্জগতের স্পন্দনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর কবিতায় প্রকৃতি কেবল দৃশ্যমান জগত নয়, বরং মনের প্রতিচ্ছবি। ভোরের আকাশ, শিশিরভেজা পুষ্প, মলিন সন্ধ্যা—সবই যেন কবির হৃদয়ের অনুরণন। এই দিক থেকে তিনি নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রোমান্টিক কবিদের অন্যতম।
২. রোমান্টিক না মিস্টিক?
বিহারীলালের কবিতায় রোমান্টিকতার সঙ্গে মিস্টিক আবহও লক্ষ্য করা যায়। তিনি কেবল প্রেম ও প্রকৃতির কবি নন; তাঁর কবিতায় এক অন্তর্লৌকিক সত্তার সন্ধানও আছে।
রোমান্টিকতার দিক থেকে—
- ব্যক্তিমানসের প্রাধান্য
- প্রকৃতির সঙ্গে আত্মীয়তা
- আবেগের স্বাধীন প্রকাশ
মিস্টিক প্রবণতার দিক থেকে—
- জাগতিক দুঃখের অন্তর্গত অর্থ অনুসন্ধান
- এক অদৃশ্য শক্তির অনুভব
- আত্মসমর্পণের সুর
তবে তাঁর মিস্টিসিজম সুসংহত দর্শনে প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং তা আবেগপ্রবণ ও স্বতঃস্ফূর্ত।
৩. আঙ্গিকের প্রতি অনাগ্রহ
সমালোচকদের প্রধান অভিযোগ—বিহারীলালের কবিতায় আঙ্গিকগত দৃঢ়তা ও কারুকার্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল।
- ছন্দের শৈথিল্য
- অলংকার প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা
- কাব্যগঠনে কাঠামোগত দৃঢ়তার অভাব
তিনি ভাষাকে শিল্পের নিখুঁত যন্ত্র হিসেবে নির্মাণের চেয়ে অনুভূতির বাহন হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফলে তাঁর কবিতা অনেক সময় ভাবাবেগে পরিপূর্ণ হলেও শিল্পসম্মত নিখুঁততা পায় না।
এই প্রসঙ্গে বলা হয়—তিনি যত বড় ভাবুক, তত বড় কারিগর নন। তাঁর কবিতায় হৃদয়ের সুর আছে, কিন্তু সবসময় শিল্পের সংযম নেই।
৪. ‘ভোরের পাখি’ উপমার তাৎপর্য
তাঁকে ‘ভোরের পাখি’ বলা হয় কারণ—
- তিনি বাংলা রোমান্টিকতার সূচনা করেছেন।
- তাঁর কাব্যে এক নতুন সংবেদনশীলতা জন্ম নিয়েছে।
পরবর্তী কবিদের, বিশেষত রবীন্দ্রনাথের কাব্যে তাঁর প্রভাব পরোক্ষে লক্ষ করা যায়।
তিনি যেন পূর্ণ দিবালোক নন, বরং প্রভাতের আভাস—যেখানে সম্ভাবনা আছে, কিন্তু পূর্ণ বিকাশ নয়।
উপসংহার
সব দিক বিচার করলে বলা যায়, বিহারীলাল চক্রবর্তী মূলত একজন ভাবুক কবি। তাঁর কবিতায় আবেগের প্রবলতা মুখ্য, আঙ্গিকের সচেতনতা অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই তাঁর স্বাতন্ত্র্য। তিনি নিখুঁত কারিগর না হলেও অন্তর্জাগতিক অনুভূতির প্রথম শক্তিশালী প্রকাশক।
তাঁর কাব্যে শিল্পের সংযম কম, কিন্তু হৃদয়ের স্পন্দন প্রবল; কারুকার্যের নিখুঁততা নেই, কিন্তু অনুভবের সততা আছে। তাই বলা যায়—তিনি আঙ্গিকের কবি নন, কিন্তু ভাবের কবি; তিনি হয়তো পূর্ণাঙ্গ শিল্পরূপকার নন, কিন্তু বাংলা রোমান্টিকতার ‘ভোরের পাখি’ হিসেবে তাঁর স্থান অম্লান।