প্রবন্ধের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ আলোচনা কর।


প্রবন্ধ ; নন্দনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
খোলা পাতা ব্লগের সকল বিষয় দেখতে ক্লিক করুন এখানে
ভূমিকা
‘প্রবন্ধ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো— ‘প্রকৃষ্ট রূপে বন্ধন’। অর্থাৎ, কোনো সুশৃঙ্খল এবং যুক্তিযুক্ত চিন্তার শৈল্পিক না নান্দনিক উপস্থাপন। এটি নিছক তথ্য প্রদান নয়, বরং তথ্যের সাথে লেখকের সৃজনশীল মনের প্রজ্ঞা ও চিন্তার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। গদ্য সাহিত্যের আধুনিকতম এই শাখাটি পাঠকদের যেমন জ্ঞান দেয়, তেমনি চিন্তার খোরাক জোগায়।
প্রবন্ধ কাকে বলে?
সাধারণভাবে, কোনো বিশেষ বিষয়কে কেন্দ্র করে যুক্তি, তথ্য ও আলোচনার মাধ্যমে রচিত Essay।
( ব্লগের সুবিধার জন্য প্রবন্ধ বা Essay একই অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। )
সাহিত্যিক ভাষায়, নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে লেখকের পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও রুচিশীল চিন্তার সুবিন্যস্ত রূপই হলো সাহিত্যের এই শাখা। ইংরেজি সাহিত্যে একে Essay বলা হয়। ফরাসি শব্দ ‘Essais’ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ হলো— ‘প্রচেষ্টা’ বা ‘পরীক্ষা’। অর্থাৎ, কোনো বিষয় নিয়ে লেখকের ব্যক্তিগত বিচার-বুদ্ধির পরীক্ষা বা প্রচেষ্টা থেকে এ শাখা।
বাংলা সাহিত্যে মননশীল সৃজনশীলতার অন্যতম প্রধান শাখা হলো আলোচিত শাখা। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করে লেখক যখন তার পাণ্ডিত্য, যুক্তি এবং শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটান, তখনই তা Essay হিসেবে গণ্য হয়। আজকের ব্লগে আমরা বিষয়টির গভীরতর দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করব। আধুনিক যুগের আধুনিক গদ্যের ফসল হলো Essay। আধুনিক সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো Essay সাহিত্যও পাশ্চাত্য প্রভাবে জন্ম। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকেই প্রবন্ধের উপর পাশ্চাত্যের প্রভাব সঞ্চারিত হয়।
সংজ্ঞা ঃ সাধারণত কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে আশ্রয় করে লেখক কোনো বিষয়বস্তু সম্বন্ধে যে আত্মসচেতন নাতিদীর্ঘ সাহিত্য-রূপ সৃষ্টি করেন, তাকেই Essay বলা যায়। অর্থাৎ, কোনো বিষয়বস্তু অবলম্বনে রচিত লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিমূলক গদ্যরীতির সাহিত্য-সৃষ্টিকে Essay বলে। ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে প্রকৃষ্ট বন্ধনযুক্ত রচনাকেই Essay বলা যেতে পারে। বিষয়-বস্তুু সুষ্ঠু বন্ধনযুক্ত ধারাবাহিক পারুúর্য সহযোগে আলোচনাকে Essay নামে চিহ্নিত করা যায়। নানা বিষয় নিয়ে তত্ত্বকেন্দ্রিক ও বস্তুগত চিন্তামূলক গদ্য নিবন্ধই Essayসাহিত্য বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।
স্বরূপ ঃ প্রবন্ধকে অনেকে রচনা মনে করে থাকে। প্রবন্ধ অবশ্যই এক শ্রেণীর রচনা , কিন্তু যে-কোনো রচনাকেই Essay বলা যায় না। Essay হলো এক ধরণের গদ্য রচনা, যার মধ্যে আলোচনার মধ্যে দিয়ে কোনো বিশেষ বক্তব্য, কোনো দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা বিষয়ের অন্তর্গত বক্তব্যকে লেখক উপস্থাপন করেন। উপস্থাপিত বিষয়ের চিন্তা ও মনন, যুক্তির পরম্পর মিলনে পাঠককে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সহায়তা করে। Essay একটা নির্দিষ্ট বিষয় অবলম্বনে রচিত হলেও এর মধ্যে লেখকের মনোভঙ্গি প্রকাশ পায়।
নিবন্ধ, সন্দর্ভ, রচনা প্রভৃতি প্রতিশব্দ প্রবন্ধ অর্থে সাধারণত প্রয়োগ করা হয়। এ শব্দগুলো সংস্কৃত সাহিত্যে মধ্যযুগে ও আধুনিক যুগের প্রথমার্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। অবশ্য আধুনিক যুগে বিতর্কমূলক এবং ব্যাখ্যামূলক রচনাকে প্রস্তাব বলা হতো। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকেই গভীর চিন্তা, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণমূলক গদ্য রচনাকে প্রবন্ধ হিসেবে নামকরণ হতে থাকে। এক সময় অনেকে এমন ধারণাও করতেন যে, কোনো মৌলিক সৃষ্টিকর্মকে যুক্তি ও মননশীলতা দিয়ে মানুষের বোধগম্য করাই প্রবন্ধের মূখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু বর্তমানে Essay সম্পর্কে এমন ধ্যান-ধারণার অবসান ঘটেছে।
Essay সাহিত্যের মধ্যে যুক্তির সাহায্যে কোনো বক্তব্য প্রকাশ করে লেখক তার মধ্যে সাহিত্য রসের সঞ্চার করেন। তাই তাকে লেখকের ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশি প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। প্রত্যেক Essay-এ কোনো কিছু প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে। যথার্থ তথ্য-প্রমাণের সমাবেশে, ভাবে, ভাষায়, চিন্তার প্রয়োগে সেই প্রতিপাদ্য বিষয়কে রূপদান করাই এর লক্ষ্য।
এর বিষয়বস্তুতে রয়েছে নানান বৈচিত্র্য। জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজ সাহিত্য রাজনীতি, সংস্কৃতি, নন্দনতত্ত্ব, শিক্ষাসহ মানব জীবনের বহু প্রসঙ্গ প্রবন্ধের আঙিনায় হাজির হতে পারে। এর সীমানায় গুরুগম্ভীর দার্শনিক তত্ত্বালোচনা, দুর্দান্ত ঐতিহাসিক গবেষণা, রাজনৈতিক মসিযুদ্ধ আর সমাজনৈতিক জটিলতা, সাহিত্যিক বিতর্ক এবং সমালোচনা আর গদ্য ছন্দে লেখকের আত্মপ্রকাশ এ-সবই অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাকে। বস্তুতপক্ষে জগৎ ও জীবনের বিচিত্র বিষয় এর উপজীব্য।
Essay আকৃতির দিক থেকে সংক্ষিপ্ত হয়। তবে বিষয়বস্তুর ব্যাপকতার পরিপ্রেক্ষিতে এর আয়তন দীর্ঘ হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, বঙ্কিম চন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র বা কমলাকান্তের দপ্তর এবং শরৎচন্দ্রের নারীর মূল্য বড় হলেও অশোভন নয়। এর আকার-আকৃতি যেমন হোক, বড় কথা হলো প্রবন্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চিন্তাধারার মধ্যে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণতা থাকা প্রয়োজন।
তথ্য ও বিষয় Essayতে প্রাধান্য পায়। এর মধ্যে দিয়ে লেখক আত্মপ্রকাশ করে। এখানে কল্পনার অবকাশ নেই। এর মধ্যে বিষয-বস্তুকে যথাযথরূপে প্রকাশের জন্য ভাষারীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে লেখকের সচেতন থাকতে হয়। প্রায় প্রতিটি Essayই চিন্তাসমৃদ্ধ ও দৃঢ়কায় হয়ে থাকে। প্রবন্ধকার প্রতিটি বিষয়কে অনিবার্য ভাষারূপের মাধ্যমে পাঠকের কাছে প্রকাশ করেন। তবে এক্ষেত্রে প্রাবন্ধিকের ব্যক্তিত্বের ছাপ পড়ে যায়। বিভিন্ন লেখকের ব্যক্তিত্বের ভিন্নতার কারণেই ভাষার পার্থক্য ধরা পড়ে। বিদ্যাসাগরের প্রবন্ধের ভাষা, বঙ্কিমের প্রবন্ধের ভাষা, রবীন্দ্রনাথের Essayর ভাষা এ জন্যই ভিন্ন হয়েছে।
Essay সাহিত্যের একটি শাখা। অন্যান্য সাহিত্যের মতো ্এতেও পাঠকের দুটি উদ্দেশ্য পূরণ করে, এক – জ্ঞানের সীমানা বাড়িয়ে দেয় এবং দুই – মনোলোক ও ভাবলোককে সমৃদ্ধ করে। এ ছাড়া সৌন্দর্য সৃষ্টি, আনন্দ দান তো আছেই ।
Essayর রূপ-গন্ধ বড় বিচিত্র। সমালোচনা সাহিত্য, রম্য-রচনা, জীবনচরিত, আত্মচরিত, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণ বৃত্তান্ত ইত্যাদি প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্তর্ভূক্ত। স্মৃতিকথামূলক রচনা (যেমন Ñ রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি) আত্মচরিতজাতীয় রচনা, চিঠিপত্র (যথা- রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র, চিঠিপত্র) বা ব্যঙ্গরসাত্মক রচনা (যথা – বিদ্যাসাগরের ব্রজবিলাস ) প্রভৃতিও ছদ্মবেশী প্রবন্ধ মাত্র।
প্রকারভেদ ঃ বিষয়বস্তু ও প্রকাশভঙ্গির বিচারে Essay দু’প্রকার। যথা
১. তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ Essay; ও ২. মন্ময় বা ব্যক্তিনিষ্ঠ Essay।
তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ Essay ঃ বিষয়বস্তুর প্রাধান্য স্বীকার করে যে সকল বস্তুনিষ্ঠ Essay লিখিত হয়, তাকে তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ Essay বলা হয়। সুনির্দিষ্ট সুচিন্তিত কোনো বিষয়ের মধ্যে আদি, মধ্য ও অন্ত সমন্বিত চিন্তাপ্রধান সৃষ্টিই হলো তন্ময় Essay। এই শ্রেণির প্রবন্ধকার অতিমাত্রায় সংযত ও নিষ্ঠাবান হয়ে থাকেন। এতে লেখকের পা-িত্যবুদ্ধি বা জ্ঞানের পরিচয়ই মুখ্য হয়ে ওঠে।
বস্তুনিষ্ঠ Essayতে লেখকের ব্যক্তি চিত্তের সাথে পাঠকের বুদ্ধির যোগ হতে পারে, কিন্তু তার হৃদয়ের সাথে কোনো সংযোগ সাধিত হয় না। বস্তুনিষ্ঠ Essay পাঠকের বুদ্ধিকে তীক্ষèতর, দৃষ্টিকে সুমজ্জ্বল ও জ্ঞানের পরিধিকে প্রশস্ত করে তোলে। এ ধরনের Essayতে লেখক অধিকাংশ সময় তার জ্ঞানের পরিধি, তার চিন্তাশীলতা বা বুদ্ধির প্রখরতায় পাঠককে বিস্মিত করেন। লেখক ও পাঠক একাসনে অবস্থান করেন না। এখানে লেখককে মনে হয় তিনি যেন বেদীর উপর বসে গুরুদেবের মতো পাঠককে অবুঝ শিশু মনে করে জ্ঞানের আলো বিতরণ করছেন।
এতে গুরুগম্ভীর প্রশ্ন বা জীবন-সমস্যা অবলম্বনে সূক্ষ্ম আলোচনা করে লেখক তার চিন্তাশীলতা ও বিচারবুদ্ধির সাহায্যে মীমাংসার সন্ধান দেবার চেষ্টা করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের বিবিধ প্রবন্ধ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রবন্ধ মঞ্জরী ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের সামাজিক প্রবন্ধ, কাজী মোতাহের হোসেনের সংস্কৃতি কথা, মুনীর চৌধুরীর বাংলা গদ্যরীতি বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের দৃষ্টান্ত। আলোচনা শেষে এ ধরনের প্রবন্ধে যে-সব বৈশিষ্ট্যাবলি পাওয়া যায়Ñ
১. বস্তুনিষ্ঠ Essayতে লেখকের পাত্যি, বুদ্ধি বা জ্ঞানের পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে।
২. লেখকের ব্যক্তিচিত্তের সাথে পাঠকের যোগ হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের সংযোগ সাধিত হয় না।
৩. লেখকের জ্ঞানের পরিধি ও তার বুদ্ধির প্রখরতা আমাদের বিস্মিত করে।
৪. বস্তুনিষ্ঠ Essay বস্তুনিষ্ঠ ও চিন্তাপ্রধান। ব্যক্তিনিষ্ঠ কিংবা ভাবপ্রধান নয়।
৫. এই Essay সুনির্দিষ্ট, সুচিন্তিত চৌহদ্দি বা সীমারেখার মধ্যে আদি-মধ্য-অন্ত্য-সমন্বিত চিন্তাপ্রধান সৃষ্টি।
৬. বস্তুনিষ্ঠ Essay আমাদের বুদ্ধি, চিন্তা বা জ্ঞানের পিপাসা মিটায়।
৭. এ Essay গুরুগম্ভীর প্রশ্ন বা জীবনসমস্যা অবলম্বনে সূক্ষ্ম আলোচনা করে তা মীমাংসা করতে পারে।
৮. এখানে লেখকের বিচারবুদ্ধি ও চিন্তাশীলতা প্রাধান্য পায়।
৯. এখানে লেখক আত্মপ্রচার করেন, আত্মনিবেদন নয়।
মন্ময় বা ব্যক্তিনিষ্ঠ Essay ঃ যে প্রবন্ধে বিষয়বস্তু বা ব্যক্তিচিন্তার চেয়ে ব্যক্তি-হৃদয়ই প্রধান এবং লেখকের ব্যক্তিসত্তার প্রকাশ ঘটে, তাকে মন্ময় বা ব্যক্তিগত Essay বলে। হৃদয় প্রধান বলে একে ভাবনিষ্ঠ প্রবন্ধও বলা হয়। এ ধরণের Essayতে বিষয়বস্তুর চেয়ে পাঠককেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। লেখক এখানে নিজের অনুভূতিকে পাঠকের অনুভূতি ও সংবেদনশীলতার সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। চিন্তার চেয়ে ভাবই এখানে বেশি ।
ব্যক্তিগত Essayতে জ্ঞানের বিষয়কে হাস্যরসম-িত পুষ্পপেলবতা দান করে পাঠককে বিমুগ্ধ করে। লেখক বিষয়বস্তুর গাম্ভীর্যকে আত্মগত ভাবরসে স্নিগ্ধ করে পাঠকের চারদিকে সুন্দর শান্ত ও কান্ত একটি ভাবম-ল সৃষ্টি করেন। লেখক এখানে পাঠকের সাথে মিশে গিয়ে একান্ত আপনার জনের মত আপনার কথাটি বলে যান। এ প্রবন্ধের মৃদু আলোক রেখায় আমরা বিশেষকে চিনতে পারি এবং সেই সাথে নিজেকে চিনি।
মন্ময় বা ব্যক্তিনিষ্ঠ Essayতে লেখক আত্মনিষ্ঠ কল্পনার দ্বারা রঞ্চিত করে যে-কোনো বিষয়কে প্রকাশ করেন। এখানে বলার ভঙ্গিই তার কাছে প্রধান। তিনি একান্তভাবে আত্মনিষ্ঠ, অকপট ও খেয়ালি। সুনির্দিষ্ট সীমার বন্ধন তার কাছে পীড়াদায়ক, এজন্য তিনি বিষয় হতে বিষয়ান্তরে অবলীলাক্রমে ভ্রমণ করেন। বঙ্কিম চন্দ্রের কমলাকান্তের দপ্তর, লোক রহস্য রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র প্রবন্ধ এ জাতীয় প্রবন্ধের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এ ছাড়া প্রমথ চৌধুরী, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখ ব্যক্তিগত প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে আশ্চর্য দক্ষতা দেখিয়েছেন। মন্ময় প্রবন্ধের আলোচনা শেষে যে-সব বৈশিষ্ট্যাবলি পাওয়া যায় Ñ
১. মন্ময় Essay জ্ঞানের বিষয়কে হাস্যরসম-িত পুষ্প পেলবতা দান করে পাঠককে মুগ্ধ করে।
২. এ জাতীয় Essay ব্যক্তিনিষ্ঠ এবং ভাব প্রধান, বস্তুনিষ্ঠ বা চিন্তাপ্রধান নয়।
৩. এখানে লেখকের অনুভূতি স্নিগ্ধ , সরস, হাস্যমধুর আত্মস্পর্শই প্রধান।
৪. লেখক পাঠকের সাথে অভিন্ন হয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেন।
৫. এ জাতীয় Essay লেখক আত্মপ্রচার নয় , আত্মনিবেদন করেন।
৬. এ Essayর মাধ্যমে আমরা যেমন লেখককে চিনি, তেমনি নিজেদেরকে চিনতে পারি।
৭. এর বিষয়বস্তু আকাশের তারকা হতে মাটির প্রদীপ পর্যন্ত বিস্তৃত।
৮. অতিপুরাতন, পরিচিত বিষয়কে লেখক আত্মনিষ্ঠ কল্পনা দ্বারা রজ্ঞিত করে এ জাতীয় প্রবন্ধে প্রকাশ করেন।
৯. এ জাতীয় প্রাবন্ধিক পাঠকের ভালবাসা অর্জন করেন।
Essayর রূপ ও রীতি বিচিত্র। জন্মলগ্ন থেকে বিভিন্ন লেখকের সম্মিলিত প্রচেষ্টা , অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, চিন্তার বহুমুখিতা Essayর ক্ষেত্রকে করেছে বৈচিত্র্যময় ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বর্তমানে Essay অধিকমাত্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। অমীয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশ, আবু সয়ীদ আইয়ুব উভয় শ্রেণির Essay সমান পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। এরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিক থেকে Essay-সাহিত্যকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছেন।
Essay সাহিত্যের স্বরূপ বিচার শেষে বলা যায় যে,Essay একেবারে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন গোত্রভূক্ত একটি সাহিত্যাঙ্গিক। সাহিত্যিকের গভীর জীবন-উপলব্ধি ও বিদগ্ধ সমাজ-ভাবনাই Essayতে বিশেষভাবে প্রাধ্যান্য পেয়ে থাকে। আবার অপরাপর সাহিত্য শাখার বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক মূল্যায়ন ও গুরুত্ব নির্ধারণের মাধ্যম হিসেবেও প্রবন্ধের ভূমিকা অপরিহার্য। সাহিত্যাঙ্গিকের একটি উৎকৃষ্ট ও অভিজাত শ্রেণীর সাহিত্য-রূপ হলো – প্রবন্ধ সাহিত্য।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এআই এর সহায়তায় দেওয়া হলো।
প্রবন্ধের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য
একটি সার্থক Essayর কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা স্বরূপ থাকে যা একে গল্প বা উপন্যাসের চেয়ে আলাদা করে:
সুসংবদ্ধ কাঠামো: একটি Essayতে বিষয়ের একটি যৌক্তিক বিন্যাস থাকে।
যুক্তিনির্ভরতা: Essay মানেই তথ্যের সমাহার। লেখক এখানে যা বলেন, তা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন।
ভাষার গাম্ভীর্য: Essayর ভাষা সাধারণত পরিশীলিত ও মার্জিত হয়, যা বিষয়ের গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলে।
সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য: প্রতিটি Essayর একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা মূল বার্তা থাকে।
Essay কত প্রকার ও কী কী? (Classification of Essay)
বিষয়বস্তু, শৈলী এবং লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে Essayকে প্রধানত দুইটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: ১. তন্ময় Essay (Objective Essay) ২. মন্ময় Essay (Subjective Essay)
তন্ময় Essayর স্বরূপ ব্যাখ্যা (Nature of Objective Essay)
তন্ময় Essay বা বস্তুনিষ্ঠ Essayতে বিষয়বস্তুর প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি থাকে। এখানে লেখক নিজের ব্যক্তিগত আবেগ বা অনুভূতিকে দূরে রেখে কেবল বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করেন।
তন্ময় Essayর প্রধান বৈশিষ্ট্য:
নিরপেক্ষতা: লেখক এখানে বিচারকের মতো নিরপেক্ষ থাকেন।
তথ্যাশ্রয়ী: বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন বা সমাজতত্ত্বের মতো বিষয়গুলো এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
যৌক্তিক বিশ্লেষণ: লেখক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি পাঠকের সামনে তুলে ধরেন।
উদাহরণ: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘সাম্য’ বা ‘বিজ্ঞান রহস্য’ হলো শ্রেষ্ঠ তন্ময় Essay।
মন্ময় Essayর স্বরূপ ব্যাখ্যা (Nature of Subjective Essay)
মন্ময় বা ব্যক্তিনিষ্ঠ Essayতে লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতি, রুচি এবং খেয়ালখুশি প্রধান হয়ে ওঠে। একে ‘ললিত Essay‘ বা ইংরেজিতে ‘Personal Essay’ বলা হয়।
মন্ময় Essayর প্রধান বৈশিষ্ট্য:
আত্মমুখী ভাব: এখানে বিষয়ের চেয়ে লেখকের ‘আমি’ সত্তা বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বড় হয়ে দেখা দেয়।
মননশীলতা ও শিল্প: লেখক এখানে তর্কের চেয়ে শিল্পের দিকে বেশি নজর দেন। ভাষা হয় অনেকটা কাব্যিক ও ঘরোয়া।
সহজ সাবলীলতা: এই Essay পড়তে অনেকটা গল্পের মতো লাগে।
উদাহরণ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’ বা সৈয়দ মুজতবা আলীর রম্যরচনাগুলো মন্ময় Essayর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তন্ময় ও মন্ময় Essayর তুলনামূলক পার্থক্য
| পার্থক্যের বিষয় | তন্ময় Essay (Objective) | মন্ময় Essay (Subjective) |
| প্রধান বিষয় | বিষয়বস্তু বা তথ্য। | লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতি। |
| লেখকের ভূমিকা | নিরপেক্ষ ও আড়ালে থাকেন। | প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত থাকেন। |
| লক্ষ্য | জ্ঞান দান ও সত্য প্রতিষ্ঠা। | আনন্দ দান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়। |
| শৈলী | যুক্তি ও বুদ্ধিনির্ভর। | আবেগ ও শিল্পনির্ভর। |
তন্ময় ও মন্ময় Essay এবং প্রাবন্ধিকদের তালিকা
এই তালিকায় বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কিছু Essay এবং তাদের স্রষ্টাদের নাম তুলে ধরা হলো:
১. তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ Essay (Objective Essays)
এই ধারার প্রবন্ধগুলো মূলত তথ্য, যুক্তি, বিজ্ঞান, ইতিহাস বা সমাজতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে লেখা।
| প্রাবন্ধিকের নাম | বিখ্যাত তন্ময় প্রবন্ধ / প্রবন্ধগ্রন্থ | বিষয়বস্তু |
| বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | সাম্য, বিজ্ঞান রহস্য | সমাজতন্ত্র ও বিজ্ঞান |
| রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী | জিজ্ঞাসা, কর্মকথা | বিজ্ঞান ও দর্শন |
| অক্ষয়কুমার দত্ত | বাহ্যবস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ | সমাজ ও বিজ্ঞান |
| ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ | বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত | ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব |
| বিনয় সরকার | ইতিবৃত্ত | ইতিহাস ও রাষ্ট্রনীতি |
| প্রমথ চৌধুরী | বীরবলের হালখাতা (প্রবন্ধ অংশ) | ভাষা ও সাহিত্য সমালোচনা |
২. মন্ময় বা ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধ (Subjective/Personal Essays)
এই ধারার প্রবন্ধে লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতি, রসিকতা এবং খেয়ালখুশি প্রাধান্য পায়। একে ‘ললিত প্রবন্ধ’ বা ‘পার্সোনাল এসে’ (Personal Essay) বলা হয়।
| প্রাবন্ধিকের নাম | বিখ্যাত মন্ময় প্রবন্ধ / প্রবন্ধগ্রন্থ | বিশেষত্ব |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | বিচিত্র প্রবন্ধ, পঞ্চভূত | আধ্যাত্মিকতা ও রসানুভূতি |
| সৈয়দ মুজতবা আলী | পঞ্চতন্ত্র, ময়ূরকণ্ঠী | রম্য ও বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা |
| প্রমথ চৌধুরী | নীললোহিতের চিঠিপত্র | মননশীলতা ও চাতুর্য |
| বুদ্ধদেব বসু | হঠাৎ আলোর ঝলকানি | জীবন দর্শন ও কাব্যিকতা |
| অন্নদাশঙ্কর রায় | তারুণ্য, বিনোদ | লঘু মেজাজের জীবনবোধ |
| আবুল মনসুর আহমদ | আয়না, ফুড কনফারেন্স | ব্যঙ্গ ও সমাজ বিদ্রূপ |
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা তন্ময় প্রবন্ধের জনক বলা হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মন্ময় প্রবন্ধকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
প্রমথ চৌধুরী এমন একজন প্রাবন্ধিক যার লেখায় তন্ময় ও মন্ময়—উভয় গুণের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়।
