অন্নদামঙ্গল কাব্য : মানসিংহ ভবানন্দ উপাখ্যান অবলম্বনে ভারতচন্দ্রের সমাজভাবনা, ব্যঙ্গরস নৈপুণ্য ও ঐতিহাসিকতার পরিচয় দাও।


অন্নদামঙ্গল কাব্য – মানসিংহ ভবানন্দ উপাখ্যান
খোলা পাতা ব্লগ – প্রকাশিত বিষয়ের তালিকা ক্লিক করুন
অন্নদামঙ্গল কাব্য- কবির সমসাময়িক সমাজ চিত্র:
অন্নদামঙ্গল কাব্য- মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যান অবলম্বনে সমসাময়িক সমাজবাস্তবতার চিত্র।
অথবা,অন্নদামঙ্গল কাব্য- মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যানে বিবৃত তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির পরিচয়
অথবা, ‘ভারতচন্দ্রের রস, রুচি ও জীবনবোধ আঠার শতকের সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র প্রকটিত হয়েছে।’
মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যগুলো মূলত দেবনির্ভর ও সগোত্রীয় দেবতাদের পুজোর প্রচলনকল্পে লেখা হলেও কাব্যগুলোর মধ্যে তৎকালীন বাংলাদেশের মানুষের পারিবারিক, সামাজিক ও দৈনন্দিন জীবনের এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় জীবনেরও ছবি ফুটে উঠেছে। মঙ্গলকাব্যের সর্বশেষ কবি ভারতচন্দ্রের শ্রেষ্ঠত্বের নানাবিধ কারণের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো সমসাময়িক যুগ মানসকে তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে তাঁর কাব্যে তুলে ধরেছেন। সমসাময়িক জীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে কবি তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্য-এ শিল্পমণ্ডিত রূপ দিয়েছেন।
গ্রাম বাংলায় সে সময় তখনও কৃষিনির্ভর জীবনের ধারা অব্যাহত ছিল, সে জীবনে সীমিত কৃষি সমৃদ্ধি জাত শান্তি, তৃপ্তি ও আনন্দ তখন বহমান। এছাড়াও সে সমাজ ছিল প্রথাবদ্ধ, সংস্কারে আচ্ছন্ন, উচ্চ শ্রেণি দ্বারা শোষিত। মধ্যযুগের দৃঢ় ধর্মের বাঁধনও শিথিল হয়ে গেছে: কিন্তু ধর্মীয় উৎসব ও আচার অনুষ্ঠানের বাইরের ঠাট তখনও সক্রিয়। প্রচলিত জীবনধারার মধ্যে একটা বিপর্যয়ের আভাস লক্ষ করা যায়। ফলে সমাজ জীবনে নানা অনাচার ও ফাঁক-ফাঁকি ঢুকে পড়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতেই ভারতচন্দ্রের জীবন ও কর্মকৃতি।
নগরকেন্দ্রিক সমাজ ও জীবনের কথা, তাদের রস ও রুচির প্রতিফলন কবির অন্নদামঙ্গল কাব্য-এ রয়েছে। তাঁর কাব্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – ‘অন্নদামঙ্গল গান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তাহার উজ্জ্বলতা যেমন তাহার কারুকার্য’। তবে তিনি শুধু রাজসভার বর্ণনা করেননি। সাধারণ বাঙালি জীবনের অন্তর প্রদেশের কামনার ছবিও এঁকেছেন। ঈম্বরী পাটুনীর সেই অবিস্মরণীয় উক্তি- ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’ – উক্তিটির মধ্যে গোটা বাংলার শাশ্বত মানব আর্তিই প্রকাশিত।
সমসাময়িক জীবনের তাগিদ মেটাতে গিয়ে কবি অন্নদামঙ্গল কাব্য রচনার ক্ষেত্রে মঙ্গলকাব্যের গতানুগতিক প্রথাটুকু ছাড়া আর সবকিছু পরিবর্তন করে নিয়েছেন। কাল্পনিক নায়ক-নায়িকার পরিবর্তে ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত চরিত্র গ্রহণ করেছেন। কাহিনির মধ্যে দিয়ে সমকালীন সমাজের অন্তঃসারশূন্যতাকে অন্নদামঙ্গল কাব্য-এ টেনে এনেছেন।
অষ্টাদশ শতকের গোড়া থেকেই যে নব্য উঠতি ধনিক শ্রেণি মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল যাদের কাছে পরবর্তীকালে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাভূত হয়েছিলেন, সে সমাজের চিত্রও কবির দৃষ্টি এড়ায়নি। জেগে ওঠা নবীন ধনশালী এ সমাজ ছিল সংস্কৃতিশূন্য অথচ ভোগ-বাসনার প্রতি ছিল তাদের প্রচুর আগ্রহ। ধর্মীয়বোধ ও আদর্শ তখন জীবন থেকে ক্রমশ বিলীয়মান। এ প্রসঙ্গে ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের মন্তব্য
পারত্রিক জীবনের কোন কল্যাণ নহে, বরং তাহার পরিবর্তে পার্থিব ভোগ বাসনার চরিতার্থতাই জীবনের একমাত্র কাম্য। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের ইহাই মুখ্য প্রেরণা।
কৃষিনির্ভর জীবন থেকে শান্তি দূর হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীসহ বণিকরা বড় হচ্ছে। হরিহোড়ের সংসার থেকে ভবানন্দ মজুমদারের বাড়িতে অন্নদার যাত্রার মধ্যে তারই ইঙ্গিত মেলে।
কবির সামাজিক অভিজ্ঞতা ছিল ব্যাপক। কাব্যের বিভিন্ন অধ্যায়ে তার প্রমাণ (দেওয়া যায়) পাওয়া যায়। মানসিংহের সৈন্যে ঝড়বৃষ্টি অংশে ঘেসেড়ানির উক্তির মধ্যে আদিরসসহ হাস্যরস থাকলেও তার মধ্যে কবির বাস্তব অভিজ্ঞতা উঁকি মারে।
বৎসর পনর ষোল বয়স আমার
ক্রমে ক্রমে বদলিনু এগার ভাতার॥
অবলা নারীর খেদোক্তির মধ্যে দিয়ে এখানে তৎকালীন সমাজে তার মূল্য ও মর্যাদা সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
বহুবিবাহ পীড়িত সমাজের কথা, বিবাহের যৌতুক প্রথা ভাগ্য-অন্বেষণে সাধারণ মানুষের সংগ্রামের কথা- এসব জীবন্ত হয়ে আছে এ কাব্যে। ‘দাসু-বাসুর খেদ’ অংশে তৎকালীন জীবনবোধের পরিচয় মেলে-
কুড়ি টাকা পণ দিয়া নতুন করিনু বিয়া
এক দিনো শুতে না পাইনু॥
কবি ব্যক্তিগত জীবনে স্বস্তি পাননি। ফলে গার্হস্থ্য জীবনের প্রতি কবির তীব্র আকাঙ্ক্ষা অন্নদামঙ্গল কাব্যের মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যানের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। ভোগ-সর্বস্বতার কথাও সে প্রসঙ্গে এসেছে। কবির গার্হস্থ্য জীবন বোধের প্রকাশ –
দুই নারী বিনা নাহি পতির আদর।
অথবা,
দিবসে মজুরী করে রজনীতে গিয়া ঘরে
নারী লয়ে সে থাকে সুখী ॥
এসবের মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনাকাক্সক্ষার প্রকাশ ঘটেছে। আনোয়ার পাশার ভাষায় বলা যায় ‘দাসু যেন এখানে সংসার বিচ্যুত কবি-মনের প্রতীক।’
‘বড় রানীর নিকট সাধীর বাক্য’ এবং ‘ছোট রানীর নিকট মাধীর বাক্য’ – এ দুটি পরিচ্ছেদে পারিবারিক গার্হস্থ্য জীবনের ছবি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। দুই সতীনের কোন্দল, সাধী-মাধীর তৎপরতা বর্ণনায় কবির সামাজিক অভিজ্ঞতা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। মনে হয় কবির বাস্তব অভিজ্ঞতা বাণীরূপ পেয়েছে। সপতœী কোন্দল বাংলার চিরাচরিত ঘটনা। স্বামীকে বশ করার জন্য দু’সতীনের কৌশলগুলো বাস্তব। সেজেগুজে নিজেকে আকর্ষণীয় করা, ছেলেকে পথে বসিয়ে রাখা, তেল-পানি-পান পড়া ব্যবহার করা ইত্যাদির মধ্যে তার প্রমাণ মেলে।
ভবানন্দ বাড়ি ফিরে এসেছে। যে ঘরে আগে যাবে সেই পাটরানী হবে। তার দাসীরও দাম বাড়বে। তাই সাধী-মাধীও জোর তৎপর নিজ নিজ রানীর কাছে ভবানন্দকে নিয়ে যেতে। এখানে তৎকালীন সমাজের সাধারণ মানুষের আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের চিত্র পাওয়া যায়।
ইতিহাসের পাতা থেকে যেসব চরিত্র ও ঘটনা এ কাব্যে গতানুগতিক প্রথার মধ্যে ভিড়ে গেছে, তাতে ঐতিহাসিকতা ক্ষুণœ হলেও সমসাময়িক সমাজ-বাস্তবতার কোনো ঘাটতি নেই। মানসিংহ ও প্রতাপাদিত্যের যুদ্ধের মধ্যে রাজায় রাজায় ক্ষমতার প্রাধান্য বজায় রাখার চেষ্টা প্রকাশ পেয়েছে। সে সময়ে ভেট প্রদানের প্রমাণ মেলে মানসিংহের কাছে ভবানন্দের উপহার প্রদানের মধ্যে। জাহাঙ্গীর ও ভবানন্দের কথার মধ্যে দিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসম্পন্ন মুসলমান ও উচ্চবিত্ত হিন্দুর পারস্পরিক ধর্মীয় বিদ্বেষের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
জাহাঙ্গীর : আপনার নূর দিলা দাড়ি গোঁফ দিয়া।
হেন দাড়ি বামন মুড়ায় কি বিচারে।
ভবানন্দ : ঈশ্বরের নূর বলি দাড়ির যতন।
টিকি কাটি নেড়া মাথা এ যুক্তি কেমন ॥
মধ্যযুগীয় যুদ্ধের রীতি প্রকাশ পেয়েছে প্রতাপাদিত্যের কাছে মানসিংহের বেড়ি ও তরবারি পাঠানোর মধ্যে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিপক্ষের কাছে বেড়ি ও তলোয়ার পাঠানো হতো। যদি বেড়ি গ্রহণ করে তবে বুঝে নিত সে বশ্যতা স্বীকার করেছে। আর তলোয়ার গ্রহণ করা অর্থ যুদ্ধকে স্বীকার করা।
সাংসারিক রীতিনীতিও প্রকাশ পেয়েছে কাব্যে। সে সময়ে নারীরা-স্বামীদের নাম মুখে নিত না। তার প্রমাণ-
বিশেষণে সবিশেষ কহিবারে পারি
জানহ স্বামীর নাম নাহি ধরে নারী।
দিল্লিতে ভূত-প্রেতের উপদ্রব প্রসঙ্গে সে সমাজে ডাকিনী-যোগিনী, ভূত-প্রেতে বিশ্বাস, ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবজ ইত্যাদি সামাজিক কুসংস্কারের বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে পারা যায়।
নলকুবেরের শাপ অধ্যায়ে তৎকালীন সমাজের উচ্চবিত্তের মানুষের ভোগ-বিলাসের চিত্র ফুটে উঠেছে।
এ সুখ যামিনী এ নব কামিনী
এ আমি নব যুবক।
এ রস ছাড়িয়া পূজায় বসিয়া
ধ্যানে রব যেন বক ॥
অন্নদার পুজো প্রসঙ্গে এয়োতে উপস্থিত যেসব নারীর নাম কবি বলেছেন তাতে বাংলার উঁচু-নীচু দুই শ্রেণির হিন্দু মেয়েদের নাম জানা যায়। রন্ধন অংশে বাংলার দৈনন্দিন জীবনে বাঙালি সমাজের খাবারের পরিচয় পাওয়া যায়। সে খাদ্য তালিকায় পাওয়া যায়- বাংলার শাক, মাছ, মাংস, ভাজি, টক, ঝোল, চড়চড়ি ইত্যাদিসহ প্রায় ২৫০ রকমের ব্যঞ্জনের কথা। কবির অতিরিক্ত অলংকার প্রিয়তার মধ্যেও তৎকালীন সমাজের রুচি ও পরিবেশ খুঁজে পাওয়া যায়।
অন্নদামঙ্গল কাব্যের মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যানের ব্যঙ্গরস
মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের শেষ কবি ভারতচন্দ্রের কাব্যে ব্যঙ্গ ও রঙ্গরস প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে আছে। আর এজন্য ব্যঙ্গ ও রঙ্গরস ভারতচন্ত্রের মৌলিক কবি প্রতিভার অšতর্গত কিনা অথবা তিনি মূলত ব্যঙ্গ ও রঙ্গরসের কবি কিনা, তিনি হাস্যরসের কবি না ব্যঙ্গ রসের কবি এ বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে এবং বিভিন্ন সমালোচক ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে পন্ডিতেরা মতৈক্যে পৌছুতে পারেননি। তবে আলোচনার বিতর্কে প্রবেশ না করে ডঃ আহমদ শরীফের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে আমরাও একথা বলতে পারি যে অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের মানসিংহ- ভবানন্দ’ উপাখ্যান শীর্ষক অংশটুকু আগাগোড়াই আবিল-অনাবিল, হাস্য-পরিহাসের ভান্ডার।
হাস্য-পরিহাসের রঙ্গ-ব্যঙ্গের অসংখ্য উপাদান অন্নদামঙ্গল কাব্য-এর এ উপাখ্যানের সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে। ভারতচন্দ্র প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার সভাকবি হয়ে রাজার পূর্বপুরুষের গুণকীর্তন করলেও নিজ বুদ্ধি ও ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দেননি। এছাড়াও তৎকালীন সমাজ ও পরিবেশ কবির চিত্তে প্রভাব ফেলেছে। তাই তাঁর কাব্যে ব্যঙ্গ-রস থাকলেও এ সবের পিছনে একটা উদ্দেশ্য সব সময় কাজ করছে।
মধ্যযুগের কবিদের কাজই ছিল সভা মনোরঞ্জন, ভারতচন্দ্রকেও তা করতে হয়েছে। জীবিকার প্রয়োজনে শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি ও দরবারি সমাজের রুচি, অহংকার, বিলাস, লালসার ক্ষুধা তাঁকে মেটাতে হয়েছে। কবি স্থূল রসিকতা রঙ্গ-ব্যঙ্গ বা হাস্যরস পরিবেশনের আড়ালে সমসাময়িক সমাজ ও ধর্মের অšতসারশূন্যতা এবং অনাচার অনিয়ম ধ্যান-ধারণা মত ও বিশ্বাসের প্রতি সুতীক্ষ্ম শ্লেষ ও বিদ্রূপবাণ নিক্ষেপ করেছেন। সমসাময়িক রুচি ও পরিবেশের প্রতি কবি ব্যঙ্গের আড়ালে প্রতিবাদ করেছেন অন্নদামঙ্গল কাব্য এ । তিনি হয়তো এসবের অবসান চেয়েছিলেন। বোধ হয় নতুন জীবন সৃষ্টির প্রয়োজনও অনুভব করেছিলেন।
কবি দরবারি জীবন ও রুচির পরিচয় দিলেও কাব্যের মধ্যে জীবনবোধের ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। ঈশ্বরী পাটনীর প্রার্থনা, দাসু বাসুর খেদ, সাধী- মাধীর তৎপরতার মধ্যে তার প্রমাণ মেলে। ভারতচন্ত্রের কাব্যে যে ব্যঙ্গ ও রঙ্গরস আছে, একথা সত্য। প্রশ্ন উঠেছে কবি নিজে ব্যঙ্গরসের কবি কি না ? ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন – “ভারতচন্দ্র ব্যঙ্গ রসেরই কবি ছিলেন”। তবে তিনি হাস্য রসের কবি বলে স্বীকার করেন নি। এ প্রসঙ্গে তার যুক্তি হলো হাস্যরসে জ্বালা থাকে না, থাকে নির্মল আনন্দ। অন্যদিকে ব্যঙ্গরসে থাকে জ্বালা, সমাজ- দৃষ্টি এবং সে সম্পর্কিত গভীর চিন্তা, আর তার অন্তরালে থাকে সহানুভূতি, ভারতচন্দ্রের ব্যঙ্গে বিদ্রূপের বাণ আছে।
অন্নদামঙ্গল কাব্য-এর মানসিংহ ভবানন্দ উপাখ্যান সম্পাদনা করতে গিয়ে আনোয়ার পাশা ভিন্নমতের কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন যে, কবি মূলতই ব্যঙ্গ ও রঙ্গরসের কবি নন। রাজ দরবারের মনোরঞ্জনের প্রয়োজনে কবিকে তা করতে হয়েছে। তাই স্বাভাবিক ভাবে দরবারী রুচি অনুযাযী কিছূ ব্যঙ্গরস আমদানি করতে হয়েছে।
একথা আগেও উল্লেখিত হয়েছে। তবে একথা স্বীকার করতে হচ্ছে যে, কবির ব্যঙ্গ রসের বা হাস্যরসের স্পষ্ট উদ্দেশ্যের কথা সকলেই স্বীকার করেছেন। কবি নিজে প্রকৃত পক্ষে ব্যঙ্গ রসের বা হাস্যরসের কবি নন।
কবির কাব্যে রঙ্গরসাত্মক অংশ অনেক আছে। তবে সেগুলো যদি একটু সতর্কভাবে লক্ষ করা যায়, তাহলে দেখা যাবে, সে সব অংশের অনেকখানিই কাব্যের অপরিহার্য অঙ্গ নয়। যেন বাইরের তাগিদে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। মানসিংহের সৈন্যে ঝড়বৃষ্টি অংশের মূল বিষয় হলো- ঝড়বৃষ্টির কবলে পড়ে রাজা মানসিংহের সেনা দলের দুর্গতি এবং ভবানন্দের সহায়তায় তাদের নিস্তার লাভের বিবরণ। এর মধ্যে ঘেসেড়ানীর মুখে দুটি উক্তি-
বৎসর পনর ষোল বয়স আমার।
ক্রমে ক্রমে বদলিনু এগার ভাতার॥
এ চরণ দুটি যেন উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। মূল অংশের সাথে খাপ খায় না। “এই চরণ দুটি কেবলই রাজদরবারের রুচি পরিতৃপ্তির জন্য।”
জাহাঙ্গীর ও ভবানন্দের কথাবার্তা ব্যঙ্গাত্মক। হিন্দু ও মুসলমান দুটি সমাজ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গ-কটাক্ষ করেছে। মূল কাহিনির সাথে এই ব্যঙ্গরসের হয়তো একটু যোগসূত্র আছে, কিন্তু আনোয়ার পাশার মতে এ ব্যঙ্গবাণের অন্তরালে লুকিয়ে আছে ভক্তিবাদ। তবে এসবের মধ্যে ব্যঙ্গটা বাহ্যিকভাবে খুব স্পষ্ট । যেমন- জাহাঙ্গীর বলেছে-
(১) আর দেখ নারীর খসম মরি যায়
নিকা নাহি দিয়া রাঁড় করি রাখে তায়।
(২) আমার বাসনা হয় যত হিন্দু পাই।
সুন্নত দেওয়াই আর কলমা পড়াই॥
ভবানন্দ বলেছে-
(১) খসম ছাড়িয়া যেবা নিকা করে রাঁড়
একে ছাড়ি গাই যেন ধরে আর ষাঁড়।
এসব যুক্তিতর্ক কৌতুকবহ এটা সত্য।
ভারত চন্দ্র তাঁর কাব্যে কিছু অপ্রধান চরিত্র কাহিনীর সাথে যুক্ত করেছেন। লক্ষ করলে দেখা যাবে কৌতুক রস বা ব্যঙ্গরস সৃষ্টির জন্যই এগুলো আমদানি করা হয়েছে। চরিত্রগুলোকে জীবšত করে তোলার দিকে কবির তেমন চেষ্টা নেই। তবে এদের বর্ণনা থেকে পাঠক-শ্রোতা যে নির্মল আনন্দ লাভ করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ভবানন্দ মজুমদার দেশে ফেরার পর চন্দ্রমুখী-পদ্মমুখীর ঝগড়ার কথা ধরা যাক। দুই সতীনের ঝগড়া বাঙালি সমাজের উপভোগ্য ও চিত্তরোচক বিষয়। সভা মনোরঞ্জন করতে গিয়ে কবি স্বাভাবিক ভাবেই এ অংশ যুক্ত না করে পারেননি। কবির ধারালো কলমের আঁচড়ে সেই বিবরণ অনাবিল আনন্দের উৎস হয়ে উঠেছে।
সাধী-মাধীর অতি উৎসাহী তৎপরতার মধ্যে কৌতুকরস উপছে পড়ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সপত্নী কোন্দলের প্রতি ব্যঙ্গও প্রকাশ পেয়েছে এখানে, সাধী-মাধীর তৎপরতার মধ্যে হাসি থাকলেও রয়েছে আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের চিত্র। দাসী জানে যে রাণী সম্পদশালী হওয়া মানেই তারও স্বচ্ছলতা। আসলে কবি ছিলেন গভীর দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। রাজসভার মনোরঞ্জন করেছেন ঠিকই, কিন্তু সুযোগ পেলেই জীবনবোধের কথা বলতে ছাড়েন নি।
স্বামীকে বশে আনার জন্য স্ত্রীদের প্রতিযোগিতার মধ্যে কৌতুকরস প্রকাশ পেয়েছে। সাধী মাধী তাদের রাণীদের স্বামীকে পাইয়ে দেবার জন্য যে কৌশল অবলম্বন করেছে তাতে হাসির ফোয়ারা ছোটে।
যেমন- সাধী বলেছে –
টেনে টুনে বাঁধ ছাঁদ খোঁপাখানি গো।
শাড়ী পর চিকন শ্রীরামখানি গো॥
মাধী বলেছে- পড়া তৈল মুখে মাখি পড়া ফুল চুলে রাখি
নানা মন্ত্রে সিঁদুর পরিলা।
নিছক কৌতুকরস পরিবেশন করতে গিয়ে কবি কোথাও সুরুচির সীমাকে অতিক্রম করেছেন-
কুড়ি টাকা পণ দিয়া নতুন করিনু বিয়া
একদিনো শুতে না পাইনু।
দাসু-বাসুর কথার মধ্যে কৌতুকরস থাকলেও এর মধ্যে অবশ্য সংসার বিচ্যুত কবি-চিত্তের ছবি পাওয়া যায়।
‘দিল্লীতে ভূতের উৎপত্তি’ অংশে যে কৌতুকরস সৃষ্টি করা হয়েছে তার অšতরালে কবির উদ্দেশ্য ছিল রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের গৃহদেবতার কাছে জাহাঙ্গীরের বশ্যতা স্বীকার করানো। তবে এতে কৌতুক রসের অভাব নেই-
আর বিবি বান্দিরে ধরিছে আর ভূতে।
ওঝারে কিলায় কেহ কেহ মুখে মুতে।
ভবানন্দের দুই স্ত্রী সম্ভোগ অংশ ও আর আগের প্র¯তুতি অংশে ভবানন্দের মনোভাব ব্যক্ত করার মধ্যেও কবি কৌতুক রসের সৃষ্টি করেছেন-
এক চক্ষু কাতরায়ে ছোট ঘরে যায়।
আর চক্ষু রাঙ্গা হয়ে বড় জনে চায়।
অলংকৃত বাক্যের মধ্যেও কবি বৈদগ্ধ্যদীপ্ত হাস্যরস পরিবেশন করেছেন। অলংকৃত বাক্যের ভিতরের হাস্যরস অবশ্য রসঞ্জ ব্যক্তিই কেবল বুঝতে পারে। অন্নদার সঙ্গে ঈশ্বরী পাটুনীর কথোপকথন অংশটুকু এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখানো যায়-
“অতি বড় বৃদ্ধপতি সিদ্ধিতে নিপুন
কোন গুন নাহি তার কপালে আগুন॥”
ভারতচন্দ্র ‘ব্যঙ্গরসের কবি’ আর সামাজিক কুপ্রথার প্রতি বক্রোক্তিই তাঁর হাস্যরসের মূল॥” – এ কথা যারা
বলেছেন -সমস্ত আলোচনা শেষে তাদের কথা পুরোপুরি মেনে নেওয়া যায় না। যদিও তাদের যুক্তি রয়েছে। তবুও ব্যঙ্গরসের সেই জ্বালাময় সমাজদৃষ্টি এবং সে বিষয়ের গভীর চিন্তা মানসিংহ ভবানন্দ উপাখ্যানের বেশির ভাগ হাস্যরসাত্মক বর্ণনাতে খুঁজে পাওয়া যায় না। সম্পাদক আনোয়ার পাশার মতের সাথে মত মিলিয়ে বলা যায় সেসব বর্ণনায় রয়েছে নির্মল আনন্দ আর দীপ্ত বুদ্ধি ও বাক চাতুর্যের খেলা। Wit-এর লক্ষণের সাথে যার মিল রয়েছে। শেষ কথা হলো বিতর্কের জালে না জড়িয়ে সাধারণভাবে স্বীকার করতেই হয় যে ভারতচন্দ্রের কাব্যে হাস্যরস বা কৌতুকরস প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে রয়েছে। তা সে যে উদ্দেশ্যেই হোক পাঠক-শ্রোতা আনন্দ পাবেই।
অন্নদামঙ্গল কাব্য – মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যানের ঐতিহাসিকতা বিচার
অন্নদামঙ্গল কাব্য – এর ‘মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যান’-এর ঐতিহাসিকতা বিচার কর।
অথবা,অন্নদামঙ্গল কাব্য এর “ ‘মানসিংহ-ভবানন্দ’ উপাখ্যানে ঐতিহাসিক চরিত্র আছে, কিন্তু ইতিহাস নেই” – উক্তিটির সত্যাসত্য বিচার কর।
অথবা, “ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যানের ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো ভিত্তিহীন হয়ে পড়েছে।” – আলোচনা কর।
অথবা, অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যানে দেবীর মাহাত্ম্য প্রচার করতে গিয়ে কবি ইতিহাসকে ক্ষুন্ন করেছেন – আলোচনা কর।
কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি, মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যধারার সর্বশেষ কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর মঙ্গলকাব্যের গতানুগতিক ধারায় পরিবর্তন এনে তাঁর কাব্যকে রাজকণ্ঠের মণিমালা করে তোলেন। গ্রামীণ লোকজ-দেবীর পরিবর্তে সর্বভারতীয় দেবীর বর্ণনা, স্বর্গের গোবেচারি কারো পরিবর্তে প্রভাবশালী নলকুবেরকে মর্ত্যে প্রেরণ, কাল্পনিক চরিত্রের পরিবর্তে ঐতিহাসিক চরিত্রকে কাব্যের নায়ক করা, নাগরিক রুচির পরিচয় প্রদান, ভাষার কারুকার্য ও রস সৃষ্টির দক্ষতা ইত্যাদি কারণে ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের নির্দেশমত তাঁর পূর্বপুরুষ ভবানন্দ মজুমদারকে বড় করা ছিল ভারতচন্দ্রের মূল উদ্দেশ্য। তাই, তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে ভবানন্দ মজুমদারকে দিয়ে অন্নদার মাহাত্ম্য প্রচার করতে গিয়ে কবি ইতিহাসকেও অতিক্রম করে গিয়েছেন ।
কাহিনিসূত্র: অন্নদামঙ্গল কাব্য এর ‘মানসিংহ-ভবানন্দ’ উপাখ্যান অবলম্বনে –
বঙ্গজ কায়স্থ কুলে জন্ম প্রতাপ আদিত্য নামে যশোরে এক রাজা ছিলেন। প্রবল প্রতাপান্বিত এই রাজার সাথে কেউ কুলিয়ে উঠতে পারত না বলে সবাই ভয়ে ভয়ে থাকত। এমনকি তিনি পাতশা জাহাঙ্গীরকেও মান্য করতেন না। তাঁর ছিল বায়ান্ন হাজার ঢালী, ষোলশ হলকা হাতি, অযুত তুরঙ্গ সাথী। তিনি খুল্লতাতো বসন্ত রায়কে সবংশে হত্যা করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। বসন্তরায়ের এক পুত্র কচু রায় প্রতাপের রানীর কৃপায় কোনো রকমে বেঁচে গিয়ে দিল্লির বাদশা জাহাঙ্গীরকে প্রতাপ বৃত্তান্ত খুলে বলেন। জাহাঙ্গীর রেগে গিয়ে সেনাপতি মানসিংহকে প্রতাপ দমনে প্রেরণ করেন। মানসিংহ কচুরায়ের সাথে বর্ধমানে এসে পৌঁছান। মানসিংহের আগমন বার্তা শুনে ভবানন্দ নানা দ্রব্য উপঢৌকন নিয়ে তার সাথে দেখা করেন এবং বাংলার সমস্ত বৃত্তান্ত মানসিংহকে অবহিত করেন।
মানসিংহ তাঁর সৈন্যসামন্ত নিয়ে নবদ্বীপ হয়ে বাগোয়ানে ভবানন্দ মজুমদারের বাড়িতে আসেন। একটানা সাতদিন ঝড়-বৃষ্টিতে মানসিংহ সৈন্যসামন্ত নিয়ে বিপদে পড়লে ভবানন্দ মজুমদার খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, এবং প্রয়োজনীয় রসদ দিয়ে মানসিংহকে সাহায্য করেন। কৃতজ্ঞ মানসিংহ ভবানন্দকে নিয়েই প্রতাপ দমনে যশোর যাত্রা করেন।
যশোরে এসে মানসিংহ প্রতাপের নিকট বেড়ী ও তলোয়ার পাঠান। প্রতাপ বশ্যতা স্বীকারের প্রতীক বেড়ীকে প্রত্যাখান করে তরবারি গ্রহণ করেন এবং দূতের সামনে মানসিংহকে তিরস্কার করেন। ফলে যুদ্ধ হয় এবং প্রতাপ হেরে যান। কচুরায়কে যশোরের রাজা করে বন্দি প্রতাপকে পিঞ্জরাবদ্ধ করে মানসিংহ দিল্লির দিকে যাত্রা করেন। পথে অনিদ্রায়, অনাহারে প্রতাপের মৃত্যু হলে মৃত প্রতাপকে ঘিয়ে ভেজে মানসিংহ জাহাঙ্গীরকে উপহার দেন।
প্রতাপ দমনে ভবানন্দ মানসিংহকে নানাভাবে সাহায্য করলে মানসিংহ ভবানন্দকে জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে কিছু জমি জায়গিরস্বরূপ দিতে মানসিংহ জাহাঙ্গীরের কাছে সুপারিশ করে। কিন্তু জায়গির দেওয়া তো দূরের কথা বরং জাহাঙ্গীর বিধর্মী ভবানন্দের ধর্ম ও দেবদেবীর নিন্দা করেন। মজুমদারও তার যথাযথ উত্তর দেন। ফলে জাহাঙ্গীর ভবানন্দকে কারারুদ্ধ করেন। কারাগারে মজুমদার দেবীর স্তব করেন। দেবী সন্তুষ্ট হয়ে দিল্লিতে ভূত-প্রেত নামিয়ে উপদ্রব শুরু করে। জাহাঙ্গীর দেবীর কাছে নত হয় এবং মজুমদারের নির্দেশে অন্নদার পুজো করেন। মজুমদার জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে জায়গির ও উপঢৌকনসহ স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
ভারতচন্দ্রের ‘মানসিংহ-ভবানন্দ’ উপাখ্যানে উপর্যুক্ত বর্ণিত অংশে ঐতিহাসিক সত্যতা কতটুকু তা বিচার্য।
সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর ও খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে বঙ্গজ কায়স্থ প্রতাপের পরিচয় পাওয়া যায় এভাবেÑ আদি শূরের সময় আগত পঞ্চ কায়স্থের মধ্যে বিরাট গুহ একজন। তাঁর অধস্তন আশুগুহ বঙ্গজ কায়স্থগণের মধ্যে এক বীর পুরুষ ছিলেন।
আশুগুহের এক পৌত্রের নাম রামচন্দ্র, রামচন্দ্রের তিন পুত্র Ñ ভবানন্দ, গুণানন্দ ও শিবানন্দ। ভবানন্দের পুত্র শ্রীহরি সম্ভবত গৌড়েশ্বর বাহাদুর শাহের সময় বিক্রমাদিত্য উপাধি লাভ করেন। এ সময় তাদের পরিবারবর্গ গৌড়ে আনীত হয়। আনুমানিক ১৫৬০ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীহরির এক পুত্র হয়। এই পুত্রই ইতিহাস বিখ্যাত প্রতাপ আদিত্য নামে খ্যাত। প্রতাপ যে বঙ্গজ কায়স্থ কুলোদ্ভব সেই ঐতিহাসিক সত্যটুকু ভারতচন্দ্র অক্ষুণœ রেখেছেন।
ভারতচন্দ্র ভবানন্দ মজুমদারের পরিচয় দিয়েছেন এভাবেÑ কুবেরের পুত্র নলকুবের। দেবী অন্নপূর্ণার শাপে স্বর্গভ্রষ্ট হয়ে বাগোয়ান পরগণার অন্তর্গত আন্দুলিয়া গ্রাম নিবাসী শ্রোত্রীয় কেশোরী গুঁই রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ রাম সমাদ্দরের পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন। ইতিহাসে ভবানন্দ মজুমদারের পরিচয় –
শাণ্ডিল্য গোত্রীয় ভট্টনারায়ণের অষ্টাদশ পুরুষ কাশীনাথ নদীয়ার অন্তর্গত কাকদী পরগণার জমিদার ছিলেন। বাগোয়ানের অন্তর্গত আন্দুলবাড়িয়ায় তাঁহার নিবাস ছিল। কাশীনাথের পুত্র রামচন্দ্র দৈবক্রমে অপুত্রক হরেকৃষ্ণ সমাদ্দার নামক এক ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হন। সমাদ্দারের উত্তরাধিকারী বলিয়া লোকে তাঁহাকে রাম সমাদ্দার বলিয়া ডাকিত। রাম সমাদ্দারের পুত্র দূর্গাদাস পরে ভবানন্দ নামে অভিহিত হন এবং হুগলীর কানুনগো দপ্তরের মুহুরিপদ হইতে ১৬১৩ খ্রিষ্টাব্দে কানুনগো পদে উন্নীত হন। তখন তাঁহার উপাধি হয় মজুমদার। এই ভবানন্দ মজুমদারই কৃষ্ণনগর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা।
মঙ্গলকাব্যের গতানুগতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য শাপগ্রস্ত নলকুবেরের ভবানন্দ মজুমদার নামধারণের যে কাল্পনিক পরিচয় কবি দিয়েছেন, সেটুকু বাদ দিলে ভবানন্দ মজুমদারের জন্মবৃত্তান্তের পরবর্তী অংশে ঐতিহাসিক সত্য অক্ষুন্ন আছে।
বাংলার বারভূঁইয়াদের অন্যতম প্রতাপ সম্পর্কে নানাবিধ গ্রন্থে অনেক অতিরঞ্জিত ঘটনা ও গল্প সৃষ্টি হয়েছে। এ রকম কিছু গ্রন্থ হলো – রামরাম বসুর প্রতাপাদিত্য চরিত্র, ঐতিহাসিক নিখিলনাথ রায়ের প্রতাপাদিত্য নামক জ্ঞাতব্যতথ্যে এবং সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর ও খুলনার ইতিহাস নামক গ্রন্থ। সেই রকম ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যেও দেখা যায়।
মোঘল সা¤্রাজ্যের যুদ্ধকাহিনির বিস্তৃত বিবরণ আকবরনামা, ইকবালনামা-ই জাহাঙ্গিরী, মির্জনাথনের বাহার-ই-স্তান ও মাখজান-ই-আফগান ইত্যাদি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এর মধ্যে আকবরনামা-ই হলো বিশ্বাসযোগ্য গ্রন্থ। এখানে মোঘলদের সাথে অনেক ছোটখাট যুদ্ধের বিবরণ থাকলেও মোঘলদের সাথে প্রতাপাদিত্য বা তাঁর পিতা শ্রীহরির কোনো সংঘর্ষের উল্লেখ নেই।
সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর সম্রাট হলে প্রধান সেনাপতি মানসিংহকে পুনরায় বাংলার সুবেদার করে পাঠান। ১৬০৫-১৬০৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মাত্র আট মাস তিনি বাংলাদেশে ছিলেন। অনেকে মনে করেন এ সময়ে হয়তো প্রতাপের সাথে তাঁর যুদ্ধ হয়। কিন্তু জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় ইকবালনামা-ই-জাহাঙ্গীরী ও তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী গ্রন্থের মধ্যে। ইকবালনামা-ই-জাহাঙ্গীরী, তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী ও আকবরনামাসহ প্রভৃতি গ্রন্থে মোঘলদের সাথে প্রতিটি চুনোপুটির যুদ্ধের উল্লেখ আছে, অথচ প্রতাপের সাথে যুদ্ধের কোনো উল্লেখ নেই।
প্রতাপ ও মানসিংহ সংক্রান্ত এ রকম একটা ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় সতীশ মিত্রের যশোহর ও খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে, নবাব আব্দুল লতিফের ভ্রমণ কাহিনিতে এবং মির্জানাথনের বাহার-ই-স্তান-এ । এসব কাহিনিতে দেখা যায় যে, ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে সুবেদার ইসলাম খানের সেনাপতির হাতে প্রতাপ যুদ্ধে পরাজিত হয় এবং সন্ধি স্থাপনের জন্য সেনাপতি তাকে ঢাকায় ইসলাম খানের কাছে নিয়ে আসে। এ সময় ইসলাম খান প্রতাপকে হাতে পেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দিল্লিতে জাহাঙ্গীরের কাছে পাঠিয়ে দেন। পথিমধ্যে প্রতাপের মৃত্যু হয়।
কৃষ্ণনগরের রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার বাল্যকাল থেকেই যশোর রাজপরিবারে সুপরিচিত ছিলেন। সম্ভবত বসন্ত রায়ের হত্যা সম্পর্কিত ব্যাপারে প্রতাপের সাথে মজুমদারের মনোমালিন্য হতে পারে। কিন্তু মানসিংহের সাথে যেহেতু প্রতাপের কোনো যুদ্ধ হয়নি, সেহেতু প্রতাপ আদিত্যের সাথে মানসিংহের যুদ্ধের সময় ভবানন্দ কর্তৃক নানা রকম সহায়তা প্রদান, দিল্লিতে দিয়ে জাহাঙ্গীরের সাথে বাকযুদ্ধে লিপ্ত হওয়া, দিল্লিতে ভূত-প্রেতের উপদ্রব, বাদশাহকে দিয়ে অন্নদার দেবীর পুজো করিয়ে নেওয়া সবই ভারতচন্দ্রের কাল্পনিক সৃষ্টি।
ভারতচন্দ্র ঐতিহাসিক নন, তিনি কবি। তাই ঐতিহাসিক সত্য তাঁর কাব্যের উপজীব্য নাও হতে পারে। কেননা, সাহিত্যিকের লোভ ইতিহাসের রসের ওপর, ঐতিহাসিক সত্যতার ওপর নয়। তাই, বলে রামচন্দ্রকে পামর এবং রাবণকে সাধুরূপে চিহ্নিত করলে অপরাধ আছে। সর্বজনবিদিত সত্যকে একেবারে উল্টো করে দাঁড় করালে রসভঙ্গ হয়, পাঠকের মাথায় আঘাত পড়ে। ইতিহাসবিদিত ইসলাম খাঁর হাতে প্রতাপের পরাজয় ও মৃত্যুকে মানসিংহের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে কবি শুধু অনৈতিহাসিক ঘটনার জন্ম দেননি, বরং পণ্ডিত ও পাঠকসমাজের কাছে তাঁর কাব্যের রসভঙ্গ করেছেন বলে মনে হয়।
