Table of Contents

মেঘনাদবধ কাব্য: ভাষা-শৈলী ও কবিত্ব: গুরুত্বপূর্ণ উক্তি ও সংক্ষিপ্ত আলোচনা । অথবা, আধুনিক কবিভাষা নির্মাণে মাইকেল মধুসূদন দত্ত মেঘনাবাদবধ কাব্যে যে সার্থকতার পরিচয় দিয়েছেন তার স্বরূপ ব্যাখ্যা কর।

প্রফেসর মোঃ আখতার হোসেন , বাংলা বিভাগ ও ডিন, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্খীদের জন্য।

মেঘনাদবধ কাব্য : কবিভাষার বৈশিষ্ট্য

বাংলা সাহিত্য আধুনিকতার প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্তের (১৮২৪-১৮৭৩) বিষ্ময়কর সৃষ্টি মেঘনাদবধ কাব্য। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য। কাহিনি-নির্বাচনে, চিন্তা চেতনায়, ভাব-গৌরবে, নবজাগরণ-চেতনার প্রতিফলনে আ্িঙ্গক ও গঠনশৈলীতে, ভাব-ভাষা-ছন্দ-অলংকার প্রয়োগে . সবদিক থেকেই কবি সার্খকতার পরিচয় দিয়েছেন। কবি এ কাব্যেই প্রথম আধুনিক কবি-ভাষা নির্মাণে সার্থকতা দেখিয়েছেন ।

ভাষা ও কবিভাষার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। কবিভাষা হলো অনিবার্ষ. তা আরোপিত নয়। গতানুগতিক ভাষায় গা ভাসিয়ে কবিতা লিখলে কবিভাষা হয় না। কাব্যের মধ্যে কবি-আত্মার প্রকাশ ঘটলেই কেবল কবিভাষার জন্ম হয়। ভাষাগত সব উপাদান ছন্দ, শব্দ, বাক্য, অলংকার ইত্যাদি মিলিয়ে কবি তার যে বিশিষ্ট বাণীভঙ্গি তৈরি করেন, তাকে বলা হয় কবিভাষা।

একজন কবির ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে, তাঁর শিল্প-চৈতন্যকে সমৃদ্ধ করে। ভাষা যখন কবির কল্পনার প্রকৃতি অনুযায়ী পরিবর্তন হয়ে নতুন সাজে সজ্জিত হয় এবং কবি আত্মাকে ধারণ করে অথবা কবি-প্রকৃতি কাব্যপ্রকৃতির সাথে মিলিত হয়, তখনই সৃষ্টি হয় একটি কবিভাষা ।

কবিভাষার প্রধান উপকরণ ভাব। এই ভাবকে কবি কবিতায় রূপ দেন শব্দের মাধ্যমে। কবি শুধু ভাবের বিবরণ দেন না, তাহলে তিনি হবেন বক্তা। কবি ভাবকে শব্দের সাহায্যে বিভিন্ন কৌশলে পরিচর্যার মাধ্যমে প্রকাশ করেন। মধুসূদনের আগে বা সমকালে যারা কবিতা লিখেছেন, তা গতানুগতিক পথে হেঁটেছেন। তাদের ভাষায় কবি-আত্মার প্রকাশ ঘটেনি মধূসূদনের কবিতায় তার কবি-স্বভাবের প্রকাশ ঘটেছে এবং তাঁর কবিতা ছিল গতানুগতিক বিবর্জিত।

অন্যান্য কবিদের ভাষা শুধু বিবৃতি কিংবা বিবরণমূলক; কিন্তু মধুসূদনের ভাষা শুধু বিবৃতি নয়, যেন কোনো গভীরতর দিকে ধাবিত হয়েছে। ভাবের ব্যঞ্জনা ও শ্রুতিমাধুর্যের জন্য কবি একই সাথে তৎসম ও সাধারণ ব্যবহৃত শব্দ নির্বিচারে প্রয়োগ করেছেন। ভাবকে প্রকাশ করার জন্য কবি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছেন। যেমন- চিত্রধর্মীতা, সৃষ্টিশীলতা, রোমাণ্টিকতা ইত্যাদি।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিভাষার মৌল বৈশিষ্ট্য তিনটি- (১) সঙ্গীতময়তা (২) শব্দ চয়ন এবং শব্দ নির্মাণে নতুনত্ব ও অভিনবত্ব (৩) ক্লাসিকতা বা ক্লাসিক ধর্ম। এছাড়াও আরও অনেক বৈশিষ্ট্য কবির কবিভাষায় লক্ষ্যণীয়। এবার মধুসূদনের কবিভাষার বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হলো-

(১) সঙ্গীতময়তা মধুসূদনের কবিভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি ধ্বনি তরঙ্গের মাধ্যমে ধ্বনি ঝংকার সৃষ্টি করেছেন। আর ধ্বনি ঝংকার সৃষ্টিতে তিনি যুক্তব্যঞ্জন, সমাসবদ্ধ পদ এবং তৎসম শব্দ ব্যবহার করেছেন। আবার অন্তরের মর্মবেদনা বা যন্ত্রণা প্রকাশের সময় ব্যবহার করেছেন সরল ভাষা। ভাব ও পরিবেশ অনুযায়ী ধ্বনি তরঙ্গ সৃষ্টি করে কবি সঙ্গীতময়তার জন্ম দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মোহিতলাল মজুমদার বলেছেনÑ

“মধুসূদনের ভাষায় যে সংগীত আছে তা রস বিগলিত স্বরব্যঞ্জন বর্ণের সংগীত। বিশেষত সংগীতের যাহা শ্রেষ্ঠ উপাদান সেই স্বর অপূর্ব লীলা।”

স্বরধ্বনির লীলাবৈচিত্র্য মেঘনাদবধ কাব্যে সংগীতগুণ সৃষ্টি হয়েছে। যেমনÑ “সশঙ্ক-লঙ্কেশ শুর স্মরিলা শঙ্করে।”

(২) শব্দ-চয়ন এবং শব্দ-নির্মাণে মধুসূদন বাংলা কাব্যে বিপ্লবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি আধুনিক ভাব-চেতনার প্রবর্তক। মধ্যযুগীয় ভাব-চেতনাকে ভাঙতে হয়েছে তাকে। কবি নতুন জীবন চেতনার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন কাব্যে এবং এজন্য কবিকে নতুন শব্দ সৃষ্টি করতে হয়েছিল। তাঁর সৃজনী হাতের শব্দ অনেক সময় দুর্বোধ্য ও অপ্রচলিত মনে হলেও ব্যবহার গুনে তা সার্থক হয়ে উঠেছে।

অনেক অপুষ্টি শব্দ কবির হাতে পড়ে পুষ্টি পেয়ে নবজন্ম লাভ করেছে। নিত্য ব্যবহার্য পুরাতন শব্দ নতুন অর্থে, নতুন ব্যঞ্জনায় ব্যবহৃত হয়েছে। প্রয়োজনের তাগিদে কবিকে নতুন ক্রিয়াপদ সৃষ্টি করতে হয়েছে। আঞ্চলিক শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে এ কাব্যে। তবে সবকিছুই কবি রেনেসাঁসের চেতনার রঙে রাঙিয়ে নিয়েছেন। বাংলা কাব্যে শব্দ ব্যবহারে মধুসূদনই প্রথম সার্থক অবদান রেখেছেন।

দাশরথি পশ্চিম দুয়ারে
হায়রে বিষণœ এবে জানকী বিহনে
কৌমুদী বিহনে যথা কুসুম রঞ্জন
শশাঙ্কে।
এখানে ‘দাশরথি’ ‘শশাঙ্ক’ অপ্রচলিত মনে হলেও এ কাব্যে সার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

(৩) মধুসূদনের কবি-ভাষায় ও কবিত্ব-শক্তিতে রয়েছে অভিজাত সংযম ও পরিমিতিবোধ। সংযম ও আবেগের নিয়ন্ত্রণ তাঁর কবি প্রতিভার মূল ভিত্তি। কবির ভাষা ক্লাসিক গুণে গুণান্বিত। রাবনের পৌরুষ দৃঢ়তার পাশাপাশি রাবণের হৃদয়ান্তর্গত বেদনা, সীতার প্রেম-প্রকৃতি, প্রমীলার নারী স্বাতন্ত্র্যবোধ প্রভৃতির মধ্যে কবির অভিজাত সাহিত্যিক সংযমবোধ প্রকাশ পেয়েছে। আবেগের কাছে কবি কখন পরিমিতিবোধ বিসর্জন দেন নি। যেমনÑ

হাপুত্র, হা বীরবাহু, বীরেন্দ্র কেশরী
কেমনে ধরিব প্রাণ তোমার বিহনে।

(৪) মধুসূদনের কবি-ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উপমার প্রয়োগ-নৈপূণ্য। উপমা নির্মাণে তিনি মহাকাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর ব্যবহৃত উপমা দুই ধরনের। এক সহজ ও সুস্পষ্ট যেমনÑ

আহা মরি, সুবর্ণ দেউটি
তুলসীর মূলে যেন জ্বলিল, উজালি
দশ দিশ।

দুইÑ জটিল ও অপ্রচলিত। যেমনÑ
“তিষাস্পতি শান্তরশ্মি ধাতুর মালা যেন।”

তাঁর উপমায় মধ্যযুগীয় স্থূলতা নেই। আছে গতিশীলতা। ইন্দ্রিয় অনুভূত সৃজনশীল উপমা নির্মাণে কবির দক্ষতা অপরিসীম এবং এসব উপমা কবির ভাষাকে দিয়েছে যুগোত্তীর্ণ আভিজাত্য। বাংলা কবিতায় মধুসূদনই প্রথম উপমা নির্মাণে ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার এবং একই সাথে মানস চক্ষু উন্মোচন করেন। যেমনÑ

বাহিরিলা পদব্রজে রক্ষকূল রাজ
রাবণ বিশদ বস্ত্র; বিশদ উত্তরী
ধুতুরার মালা যেন ধূর্জটির গলে।

(৫) মধুসূদনই বাংলা কাব্যে প্রথম পাশ্চাত্য প্রভাবজাত ভাষা ব্যবহার করেছেন। ইংরেজি ভাষার কাছে কবির ঋণ অনেকে। শব্দ গঠন, রচনা-রীতি, ছন্দ, উপমা ইত্যাদি তিনি ইংরেজি সাহিত্য থেকে গ্রহণ করেছেন। বিদেশি বলে তা আর আর বর্জনীয় নয়, বরং বাংলা কাব্যের ভাষা বলে আমরা স্বীকার করে নিয়েছি।

(৬) মধুসূদন বাংলা কাব্যে নতুন ছন্দের প্রবর্তক। এই নতুন ছন্দ প্রয়োগ কবি অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছেন। কবি প্রচলিত পয়ার ছন্দকে ভেঙে অমিত্রাক্ষর ছন্দ নির্মাণ করেছেন। পয়ারের গতিহীনতা অতিক্রম করে কবি বাংলা কবিতায় সর্বপ্রথম প্রবহমানতা সৃষ্টি করেছেন। যেমনÑ

“সম্মুখ সমরে পড়ি বীর চূড়ামণি
বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে।”

এখাতে ভাব চরণ থেকে চরণান্তরে প্রবাহিত হয়েছে। ভাবের গতিশীলতা, ছন্দের এ প্রবহমানতা মধুসূদনের কবিভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

(৭) অলংকার প্রয়োগেও কবির সাফল্য আকাশছোঁয়া। মধুসূদনের আগের কবিরা কখনো ভাবের সৌন্দর্যের জন্য কখনো বা চরিত্র সৃষ্টির জন্য অলংকার নির্মাণ করেছেন। মধুসূদনের স্বাতন্ত্র্য হলো তিনিই সর্বপ্রথম অলংকার নির্মাণে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার করেছেন। অনুপ্রাস, যমক, শ্লেষ রূপক, নিশ্চয়, সমাসোক্তি, পুনরুক্তবদাভাস প্রভৃতি অলংকার ব্যবহারে তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। যেমন-

ক) অনুপ্রাস: জাগে রথ-রথী গজ অশ্ব পদাতিক।
১। ঝুলিছে ঝলি ঝলবে মুকতা পদ্মরাগ, মরকত হীরা।
২। লস্কার পঙ্কজ রবি গেলা অস্তাচলে।

খ) যমক ঃ তোমার এ বিধি, বিধি কে পারে বুঝিতে?
গ) পুনরুক্তবাদাভাস ঃ ‘কি কারণে’ কহলো সজনি সহসা জলেশ পাশা অস্থির হইলা?

৮) বাংলা ভাষার অপূর্ণতা পূর্ণ করতে গিয়ে কবিকে নামধাতুর ব্যবহার করতে হয়েছে। বিশেষ্য ও বিশেষণ পদকে ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার করে বাংলা কাব্যে তিনি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন। ক্রিয়াপদকেও নামধাতু হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যেমন-

“কৌটা খুলি রক্ষোবধূ দিলা ফোঁটা
সীমন্তে, সিন্দুর বিন্দু শোভিল ললাটে।”

৯) মধুসূদনের কবিভাষা ছিলো স্বতন্ত্র। তাঁর কাব্য প্রকাশের ভাষা অন্য কাব্য হতে ভিন্ন প্রকৃতির। তাঁর স্বাতন্ত্র্য বিলাসী কবিভাষা মূলত কবি- আত্মার প্রতিফলন। যগের কারণে এবং আবেগের কারণে তাঁকে এই নতুন কবিভাষা সৃষ্টি করতে হয়েছিল।

১০) কবি অনেক সময় ব্যাকরণ বিরুদ্ধ শব্দও ব্যবহার করেছেন। এটা তাঁর স্বেচ্ছাচারিতা নয়, প্রয়োজনেই এ দুঃসাহসিক কাজ করেছেন। এটি অনেক ক্ষেত্রে মন্দ না হয়ে ভূষণ হয়ে উঠেছে।

১১) দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহারের দুনামও রয়েছে। তবে এ ধরনের শব্দের ব্যবহার খুবই অল্প। মোহিতলাল মজুমদার যথার্থ বরেছেন “মধুসূদন যে কালের পন্ডিতদের জন্য একটু ভাবনা না করে পারেন নাই।

১২) খাঁটি বাংলা বুলি বা কথ্য ভাষার ব্যবহারও এ কাব্যে রয়েছে। যেমন- পাকশাট মারি কেহ খেদাইছে দূরে—

১৩) ভাব, চিন্তা বা তত্ত্বকে সংক্ষিপ্ত ও শানিত করার জন্য এ কাব্যে অনেক কবিবচন ব্যবহৃত হয়েছে। কালিদাস ও ভারতচন্দ্রের কাব্যে যেমন দেখা যেত। যেমন-

রমে আঁখি, মরে নর তাহার পরশে
অথবা, সবর্বহর কাল তারে পারে না হরিতে।

১৪) গভীর চিন্তা ও ভাবেক সহজবোধ্য ও দৃষ্টিগাহ্য করার জন্য চিত্রকল্পের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে প্রকাব্যে। এ ক্ষেত্রে কবির সাফল্য সীমাহীন।

পরিশেষে বলা যায় যে, যুগের প্রয়োজনে নতুন পথে হাঁটতে গিয়ে কবিকে অনেক সময় স্বেচ্ছাচারী হতে হয়েছে। বিদেশী প্রভাবজাত বাকভঙ্গি ও বাক্য গঠনের ক্ষেত্রেই এরকম কিছু ত্র“টি লক্ষ্যনীয়। তাছাড়া ব্যাকরণ ও প্রচলিত শব্দার্থরীতির সম্পূর্ণ বশ্যতা স্বীকার করা কোনো মৌলিক কবি প্রািতভার পক্ষে সম্ভব নয়। মধুসূদন মৌলিক কবি প্রতিভার অধিকারী। তিনি আনুষ্ঠানিক যুগের উপযুক্ত কাব্যভাষা সুষ্টি করেছেন। মেঘনাদবধ কাব্যে আধুনিক কবিভাষার সবকিছুই খুঁজে পাওয়া যায়।
মেঘনাদবধ কাব্য

বিখ্যাত উক্তির বিশ্লেষণ ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

(১) মেঘনাদবধ কাব্য-এ প্রাচ্য প্রভাব আলোচনা কর।

মূল-কাহিনি, চরিত্রের বেশির ভাগ বাল্মীকি রামায়ণ থেকে নেওয়া। সীতা চরিত্রটি হুবহু বাল্মীকির অনুকরণ। বীরবাহু চরিত্রটি কৃত্তিবাসী রামায়ণ, প্রমীলা চরিত্রটি কাশীরামের কাছ থেকে গৃহীত। মেঘনাদ কবির নিজস্ব সৃষ্টি। চতুর্থ সর্র্গে বাল্মীকির অনুরূপ, ৬ষ্ঠ সর্র্গে বাল্মীকি থেকে নেওয়া হলেও কবির মৌলিক প্রতিভার স্বাক্ষর রয়েছে। ৭ম সর্গে রাবণের শক্তিশেল নিক্ষেপে লক্ষণের পতন ঘটানোর ব্যাপারটি বাল্মীকির রামায়ণ থেকে অবিকৃতভাবে গৃহীত। ৮ম ও ৯ম সর্গে বাল্মীকির কোনো প্রভাব নেই।
শিব-পার্বতী কন্দর্পদেব সম্পর্কিত ঘটনা, প্রকৃতির বর্ণনা, উপমা-অলংকারের প্রয়োগের ক্ষেত্রে কালিদাসের পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে।

(২) মেঘনাদবধ কাব্য-এ পাশ্চাত্য প্রভাব আলোচনা কর।

মূল-উপাদান প্রাচ্যের কবিবৃন্দের মহাকাব্য থেকে গৃহীত। কিন্তু কবির মানস-দর্শন গড়ে উঠেছে পাশ্চাত্যের প্রভাবে। তাই হোমার, ভার্জিল, মিল্টন, দান্তে প্রমুখ পাশ্চাত্য কবিদের মানবিকতা, আদর্শ ও নির্মাণ-কৌশল নিঃসন্দেহে প্রভাব ফেলেছে। হোমারের ইলিয়াড ও ওডেসী কাব্যের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

২য় সর্গে মেঘনাদের বিরুদ্ধে দেবতাদের ষড়যন্ত্র, পার্বতীর মোহিনী বেশ ধারণ করে শিবের নিকট গমন, সপ্তম স্বর্গে রাম রাবণের যুদ্ধ, ৯ম সর্র্গে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বর্ণনায় হোমারের প্রভাব সুস্পষ্ট।
ভারতীয় দেবদেবীর শান্ত, ন্যায়পরায়ণ চরিত্র ধর্মের পরিবর্তে গ্রিক দেব-দেবীর উগ্র স্বভাব হোমারের প্রভাবজাত, মেঘনাদের পরিণাম হেকটরের মতো। গ্রিক নিয়তিবাদ রয়েছে এ কাব্যে।
কল্পনা দেবীর বন্দনা, উপমা, অলংকার প্রয়োগে কবি বহু বিদেশি কবির কাব্য থেকে উপাদান সংগ্রহ করেছেন।

(৩) মেঘনাদবধ কাব্য কোন অর্থে আধুনিক?

উনিশ শতকের নবজাগরণের আলোয় আলোকিত ছিলেন মধুসূদন। পাশ্চাত্য প্রভাবে কবির মনন ও চিন্তাধারা ছিল আধুনিক। সঙ্গত কারণেই তার কাব্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে।
মানবিকতা এ কাব্যের বড় গুণ, ভারতীয় কাব্যের মতো দেব-দেবীর প্রাধান্য এখানে নেই। এখানে রাক্ষস রাবণ মেঘনাদ মানবীয় গুণাবলি সম্পন্ন।

রাম-রাবণের যুদ্ধে দেবতারা উগ্রভাবে রামের পক্ষে ষড়যন্ত্র করে, এতে সমস্ত দেবতাকুল হেয় হয়েছে।
কাহিনিকে নবতর ভাবধারায় সিক্ত, ছন্দ ও ভাষার ক্ষেত্রে মৌলিকতা রয়েছে, রাবণ-মেঘনাদ দেশপ্রেমে উজ্জ্বল,
রাবণ-প্রমীলা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর। তাছাড়া বিভিন্ন চরিত্রে রোমণ্টিকতা আরোপ করা হয়েছে। এসব আধুনিক যুগের লক্ষণ ধারন করে আছে বলেই এটি আধুনিক কাব্য।

(৪) মেঘনাদবধ কাব্য মহাকাব্য কিনা- আলোচনা কর।

বিশ্বনাথ কবিরাজ, দন্ডী প্রমুখ আলংকারিকগণ মহাকাব্যের স্বরূপ ও লক্ষণ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তার আলোকে বিচার করলে মেঘনাদবধ কাব্যকে মহাকাব্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না, তবে পাশ্চাত্য অলংকার শাস্ত্র অনুযায়ী এর মধ্যে মহাকাব্যের লক্ষণ আছে। ঊঢ়রপ এর প্রতিশব্দ মহাকাব্য। ঊঢ়রপ এর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এ কাব্যের অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ গঠনে মহাকাব্যের লক্ষণ আছে। চরিত্রগুলোর মধ্যে নাটকীয় গুণ রয়েছে, কাহিনির বস্তুধর্মীতা, অমিত্রাক্ষর ছন্দের ধ্বনিপ্রবাহ, কল্পনার বিশালতা, অলংকার প্রয়োগ, ভাব পরিকল্পনা, স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল প্রসারী কাহিনি, বিশাল দুই প্রতিপক্ষÑ এ কাব্যকে মহাকাব্য করে তুলেছে।

(৫) মেঘনাদবধ কাব্য এর প্রমীলা চরিত্র অংকন কর।

নারী চরিত্রের মধ্যে প্রমীলার প্রাধান্য বেশি। কবির নিজস্ব সৃষ্টি। বাল্মীকি কাব্যে নেই, কাশীরাম দাসের মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বে বীরাঙ্গনা নারী প্রমীলার সাক্ষাত পাওয়া যায়। কবি সম্ভবত তাকেই গ্রহণ করেছেন।

কবি-কল্পনার বৈচিত্র্যের সমন্বয় চরিত্রটি ঐশ্বর্যময় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় উপাদানের মিশ্রণ ঘটেছে চরিত্রে। ভারতীয় সাহিত্যের পদ্মিনী, লক্ষ্মীবাঈদের তেজস্বিতা এবং পাশ্চাত্য সাহিত্যের ক্লরিন্ডা, ক্যামিলা এবং হোমারের এথিনীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের যুগপৎ মিলন ঘটিয়ে কবি প্রমীলা চরিত্রটি গড়েছেন।

প্রমীলা শুধু বীরাঙ্গনা নয়, তিনি একনিষ্ঠ পতিব্রতা, কল্যাণী, প্রেমিকা, গৃহবধূ। পতিপ্রেম তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় সত্য, সেই পতিপ্রেমের জন্যই তিনি হাসিমুখে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন।

(৭) ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র বারুণীয় পরিচয় দাও।
কবির নিজস্ব সৃষ্টি। সে জলের দেবী। তবে কবি তাকে মানবী করে এঁকেছেন, কেননা সে পৃথিবীর মানুষের মতো রূপযৌনের অধিকারী, রাজমহিষীর মতই প্রসাধনরতা, সখী পরিবেষ্টিত হয়ে আনন্দ করে। মিল্টনের স্যাব্রিনা চরিত্রের আলোকে কল্পিত রারুণী চরিত্রটি। কাব্যের কাহিনিকে পাতাললোকে নিয়ে যাওয়ার জন্য চরিত্রটির প্রয়োজন ছিল।

(৮) ফুলদল দিয়া
কাটিলা কি বিধাতা শাল্মলী তরুবরে
?
বীরবাহুর মৃত্যুতে শোকাহত রাবণ একথা বলেছে। যে বীরবহুর তীর-ধনুকের ভয়ে দেবতারা পর্যন্ত ভীত, সেই বীরবাহুকে কি না প্রাণ দিতে হল ভিখারি রাঘবের হাতে। রাবণ এটা বিশ্বাস করতে পারে না। এ যেন কণ্টকাকীর্ণ শিমুল বৃক্ষকে ফুলদল দিয়ে কেটে ফেলার মত অবিশ্বাস্য। অথচ বিধির অমোঘ বিধানকে রাবণের মেনে নিতে হয়েছে। কবি দক্ষতার সাথে উপমা প্রয়োগ করে রাবণের বেদনাকে তুলে ধরেছেন।

(৯) জন্মভূমি রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে?
যে ডরে, ভীরু সে মূঢ়, শতধিক থারেÑ ব্যাখ্যা কর।

রাবণের স্বদেশ প্রেমমূলক উক্তি। যুদ্ধক্ষেত্রে বীরবাহুর দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত দেখে রাবণ গর্বভরে একথা বলে। দেশমাতা বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত, সেই দেশ রক্ষার জন্য বীরবাহু জীবন দিয়েছে এর চেয়ে গৌরবের বিষয় আর কী হতে পারে। দেশ রক্ষায় যে ভয় পায়, সে সকলের কাছে ধিকৃত। এই দেশপ্রেমবোধ কবি পাশ্চাত্য সাহিত্য থেকে গ্রহণ করে রাবণে চরিত্রে আরোপ করেছেন। এটি আধুনিক যুগের লক্ষণ।

(১০) নিজ কর্ম ফলে,
মজালে রাক্ষসকুলে, মজিলা আপনি।- ব্যাখ্যা কর।

চিত্রাঙ্গদার উক্তি। চিত্রাঙ্গদা স্বামীর কাছে নিজপুত্র বীরবাহুর মৃত্যুর জন্য কৈফিয়ত চায়। রাবণ এজন্য নিজ ভাগ্যকে দোষারোপ করে। চিত্রাঙ্গদা মেনে নিতে পারে না, স্পষ্ট করে বলে, রাম কেন এসেছে, সীতাকে অপহরণ করা হয়েছে বলেই লঙ্কার এ অবস্থা। রাবণের কর্মের জন্যই রাক্ষসকুল বিধ্বস্ত, লঙ্কাও ধ্বংসের পথে।

(১১) দানবনন্দিনী আমি, রক্ষকুলবধূ,
রাবণ শ্বশুর মম, মেধনাদ স্বামী,
আমি কি ডরাই সখি, ভিখারী রাঘবে?Ñ ব্যাখ্যা কর।

প্রমীলার উক্তি। সখি বাসন্তী যখন প্রমীলাকে লঙ্কার বাইরে বেষ্টিত শত্রুর কথা বলে, তখন প্রমীলা এ কথা বলে। প্রমীর আত্মপরিচয় তাকে শক্তিমান করেছে, যে কেন ভিখারি রাঘবকে ভয় করবে। প্রমীলা শেকড়সন্ধানী। সে নিজ পরিচয় তুলে ধরতে গৌরববোধ করেছে। দানবের মেয়ে বলে সে গৌরববোধ করেছে। স্বামী, শ^শুরকুলের গৌরব, স্বামীর বীরত্ব তার অলংকার।

(১২) মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য কী?

আটের অধিক সর্গ, স্বর্গ-মত্য-মাতাল বিস্তৃত বন-সমুদ্র বেষ্টিত কাহিন ওজস্বী ও তেজস্বী প্রসাদগুণ সম্পন্ন ভাষা ইত্যাদি মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য।

(১৩) এয়ো তুমি, তোমার কি সাজে এ বেশ? ব্যাখ্যা কর।

মেঘনাদের সেনাপতি পদে অভিষেকের আনন্দে সবাই মশগুল হলে বিভীষণের স্ত্রী সরমা গোপনে সীতার সাথে অশোক বনে দেখা করতে চায়। সাথে নেয় সিঁদুরের কৌটা। সীতা বিবাহিতা হিন্দু রমণী, অথচ ললাটে সিঁদুর থাকবে না এটা হয় না। রাবণ বন্দি করে রাখার কারণে মাথায় অনেকদিন সিঁদুর দেওয়া হয়নি। সরমা সীতার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে। সে সিঁদুর পরিয়ে ধন্যা হবে। আসলে এ উক্তির মধ্যে দিয়ে মধুসূদন বাঙালি সংস্কৃতি ও সীতার প্রতি অপরিসীম দরদ দেখিয়েছেন। উক্তিটি সরমার।

[রাবণ ক্ষধার্ত ঘোগীর বেশে সীতার কাছে খাবার চায়]

(১৪) চন্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়েÑ ব্যাখ্যা কর।

মেঘনাদ তার চাচা বিভীষণকে এ কথা বলেছে। বিভীষণ রামের পক্ষ অবলম্বন করে। লক্ষণকে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। মেঘনাদ তার চাচা বিভীষণকে অনেক তিক্ত কথা শুনিয়ে তিরস্কার করে। বিভীষণের ভাই রাবণ রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, মেঘনাদের মত বীর ভাইপো স্বর্গজয়ী, উচ্চ বংশের সন্তান, সে কি না চোরের সাথে বন্ধুত্ব করে? হীন নীচ চাঁড়ালকে কেউ কি কখনও রাজবাড়ির সুখশয্যায় বসতে দেয়? রাজহংস কি কখনও কাদা বা পঙ্কজ কাননে খেলা করে? বিভীষণের উচিত হয়নি এ কাজ করা তাই মেঘনাদ উক্ত কথা বলেছে।

(১৫) সঁপি রাজ্যভার পুত্র, তোমায় করিব সহাযাত্রাÑ ব্যাখ্যা কর।

মেঘনাদের চিতার সামনে দাঁড়িয়ে বেদনায় ভারাক্রান্ত রাবণ এ উক্তি করেছে। পিতা তার অসমাপ্ত কাজ পুত্রের কাছে রেখে যায এটাই জগতের স্বাভাবিক নিয়ম, কিন্তু দুর্ভাগ্য রাবণের। রাবণের ইচ্ছা ছিল পুত্রের হাতে রাজ্যভার সঁপে দিয়ে শান্তিতে চোখ বুজবে, কিন্তু বিধাতা সে সুখ কেড়ে নিলেন। পিতার কাঁধে পুত্রের শব- এর চেয়ে বেদনার বিষয় আর নেই। রাবণ এর জন্য তাঁর পূর্বজন্মের কোনো পাপকে দায়ী করেছে।

(১৬) কি সুন্দর মালা আজি পরিয়াছ গলে
প্রচেতঃÑ ব্যাখ্যা কর।

রাবণ ক্ষোভের সাথে সমুদ্রের প্রতি এ উক্তি করেছে। সমুদ্র অজেয় রাবণের আজ সে ভুল ভেঙে গেছে। তাই রাবণ সমুদ্রকে ভৎসনা করেছে। সমুদ্রগর্ভে অমূল্য সব মণি মাণিক্য ভরা, অথচ সামান্য পাথরের মালার লোভ সে সামলাতে পারেনি। রাবণ শ্লেষ মিশ্রিত ভাষায় পাথরের সেতুকে মালার সাথে তুলনা করে সমুদ্রকে ধিক্কার দিয়েছে।

(১৭) মেঘনাদবধ কাব্যের ৯টি সর্গের নাম-
প্রথম সর্গÑ অভিষেক, ২য় সর্গÑ অস্ত্রলাভ, ৩য় সর্গÑ সমাগম, ৪র্থ সর্গÑ অশোকরণ, ৫ম সর্গÑ উদ্যোগ, ৬ষ্ঠ সর্গÑ বধ, ৭ম সর্গÑ শক্তিনির্ভেদ, ৮ম সর্গÑ প্রেতপুরী, ৯ম সর্গÑ সংক্রিয়া।

(১৮) মেঘনাদবধ কাব্য-এ বীরবাহুর বীরত্বঃ (ভগ্নদূত মকরাক্ষ বীরত্বের বর্ণনা কর

প্রথম সর্গে বীরবাহুর বীরত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। সম্মুখ যুদ্ধে সে মারা যায়। বীরবাহুর তীর ধনুকের ভয়ে দেবতারা পর্যন্ত ভীত। রাবণ দূতের মুখে বীরবাহুর মৃত্যুর খবর শুনে শোকে জ্ঞান হারালেও প্রাসাদ শিখরে উঠে যুদ্ধক্ষেত্রে পুত্রের বীরত্বের চিহ্ন দেখে গৌরববোধ কের। দূতের মুখে পুত্রের বীরত্বের কথা শুনে উৎসাহিত হয়। জন্মভূমি রক্ষার জন্য সংগ্রামে লড়াই করে যে শয্যায় শুয়েছে, সে শয্যার জন্য প্রতিটি বীর অপেক্ষা করে। অসংখ্য শত্র“কে ধ্বংস করেছে। মৃত্যুর মুহূর্তেও দেহের নীচে ফেলে অসংখ্য সৈন্য মারা গেছে।

(৩) মেঘনাদবধ কাব্য-এ লঙ্কার সৌন্দর্যের বর্ণনা দাও।

অপরূপ সৌন্দর্যময়। সারি সারি অট্রালিকা, স্বর্ণচূড়া বিশিষ্ট। চিরবসন্ত বিরাজ করে। শীতল বাতাস বয় উদ্যান মাঝে নানা পাখির ডাক। নদীগুলো সমরূপ। সমুদ্রের বুকে টিপ সদৃশ এ লঙ্কার সৌন্দর্য স্বর্গকেও হার মানায়।

(৪) মেঘনাদবধ কাব্য-এ চিত্রাঙ্গদা ও রাবণের পারস্পরিক দোষারোপের বর্ণনা দাও।

চিত্রাঙ্গদা রাবণের স্ত্রী বীরবাহুর মা। বীরবাহু যুদ্ধে নিহত হলে চিত্রাঙ্গদা শোকে বিহবল হয়ে রাজদরবারে এসে রাবণের কাছে এসে পুত্রের মৃত্যুর কৈফিয়ৎ তোলে। রাবণ চিত্রাঙ্গদাকে সান্ত¡না দেয় এবং বলে এক পুত্রশোকে আকুল হয়েছে, আর রাবণ যে শত পুত্র শোক সইছে। চিত্রাঙ্গদা পুত্রের মৃত্যুর কেফিয়ৎ চাইলে রাবণ বলে যে তাকে শুধু শুধু দোষ দিয়ে লাভ নেই। এটা ভাগ্যের লিখন। তা না হলে শক্তিধর রাবণ কোন ভিখারি রাঘবের কাছে ধ্বংস হবে? এ যেন সজারু পানবরজে ঢুকে রাবণ নষ্ট করছে। চিত্রাঙ্গদা বলেÑ
নিজ কর্ম-ফলে
মজালে রাক্ষসকূলে, মজিলা আপনি।
রাম লক্ষণ লঙ্কা দখল করতে আসে নি। এসেছে সীতা উদ্ধারে আর রাবণকে শিক্ষা দিতে।

(৫) মেঘনাদবধ কাব্য-এ সমুদ্রকে রাবণ কীভাবে ধিক্কার দেয়?

কি সুন্দর মালা আর্জি পরিয়াছ গলে
প্রচেতঃ
রাবণ সমুদ্রকে ব্যঙ্গ করে বিদ্রƒপ করে। রাম লঙ্কায় প্রবেশের জন্য সমুদ্রের উপর পাথরের সেতু তৈরি করে। রাবণ ভেবে পায় না এটা কীভাবে সম্ভব। দেশপ্রেমিক রাবণের বিশ্বাস সমুদ্র অজেয়। কিন্তু সমুদ্রের এহেন আচরণ দেখে রাবণ ক্ষোভে দুঃখে সমুদ্রকে ভর্ৎসনা করে। রাবণের বিশ্বাস নষ্ট নয়। সমুদ্র গর্ভে কত না মনিমুক্তা লুকানো, সমুদ্র হচ্ছে রতœাকর, অথচ সামান্য পাথরের মালার লোভ নামলাতে পারল না। পাথরের সেত্যুক রাবণ শ্রেষের সাথে বলেছে যে, চমৎকার অপূর্বমালা গলে পরায় সমুদ্রকে খুব সুন্দর লাগছে। বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে রাবণের প্রচন্ড ক্ষোপ উপচে পড়েছে।

(৭) মেঘনাদবধ কাব্য-এ প্রমীলার লঙ্কা প্রবেশের কাহিনি লেখ।

বীরবাহুর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মেঘনাদ প্রমোদকানন ত্যাগ করে লস্কার চলে যায়। স্বামী বিহনে প্রমীলা বিরহ অনলে দগ্ধ হয়। সখী বাসন্তীকে বলে যে, সে লস্কায় যাবে। বাসন্তী প্রমীলাকে জানায় যে, লস্কার চারপাশে রাম বাহিনী প্রমীলা কী ভাবে লস্কার যাবে? প্রমীলা তখন বলে যে, পর্বত ছেড়ে আসা নদীকে যেমন আটকানো যায় না। সমুদ্রের সাথে নদী মিলিত হয়ই। তেমনি প্রমীলঅ স্বামীর সাথে মিলিত হতে চায়। পথে কোনো বাধইি প্রমীলাকে রোধ করতে পারবে না। তাই বলে-

কী কহিলি বাসন্তী-
পর্বত গৃহদাড়ি
বহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশ্যে, কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি ?
দানচনন্দিনী আমি,রক্ষ, কুলবধূ
রাবণ শ্বরশুর মম, মেঘনদী স্বামী
আমি কি ওরাই সখি, ভিখারী রাখবে ?
রাম সৈনিক হনুমান পথ আগলালে প্রমীলা বলে ওঠে
শৃগাল সহ সিংহী কি বিবাদে?
দিনু ছাড়ি, প্রাণ লয়ে পালা, বনবাসি।
প্রমীলা রোষে হুঙ্কার দিয়ে হনুমানকে বলে তার মত পবন পুত্র ক্ষুদ্রজীবীর সাথে প্রমীলার লড়াই সাজে না। যেমন শিয়ালের সাথে সিংহীর বিবাদ সাজে না, তেমনি প্রমীলা হুনমানের সাথে যুদ্ধ করতে চায় না। সে হনুমান কে বলে যে, সে যেন রামকে ডেকে আনে, তার সাথেই কেবল প্রমীলার লড়াই সাজে। মশা মেরে প্রমীলা হাত নষ্ট করতে চায় না। হুনমান যেন প্রাণ মরে পড়ে এবং বনে গিয়ে বাস করে।

(৯)মেঘনাদবধ কাব্য-এ রাম প্রেত খুরীতে কেন গিয়েছিল?

লক্ষ্মণ কর্তৃক মেঘনাদ নিহত হলে রাবণ (৭ম সর্গে) লক্ষ্মণকে শক্তিশেল নিক্ষেপ করে। লক্ষ্মণের শোকে রাম দেবতাদের সহযোগিতায় প্রেত্তগুরীতে পিতা দশরথের কাছে যায়। দশরথ রামকে জানায় যে লক্ষ্মণ এর দেহে এখনও প্রাণ আছে। সুগন্ধমাদন গিরির শৃঙ্গভাগ থেকে বিশল্যকরণী হেমলতা সংগ্রহ করে নিতে পারলে লক্ষ্মণ জীবন ফিরে পাবে। স্বয়ং যমরাজ একথা দশরথকে জানিয়েছে দ্রুতগামী হনুমানকে সুগন্ধমাদন গিরিতে পাঠানোর কথা বলে।

উপসংহার:

মাইকেল মধুসূদন দত্ত-এর সৃষ্ট মেঘনাদবধ কাব্য বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য মহাকাব্যিক কীর্তি, যেখানে মেঘনাদবধ কাব্য কেবল একটি পৌরাণিক আখ্যান নয়, বরং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির এক গভীর শিল্পরূপ। মেঘনাদবধ কাব্য-এ কবিভাষার যে মহাকাব্যিক রূপায়ণ দেখা যায়, তা বাংলা কাব্যধারাকে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছে। বিশেষত মেঘনাদবধ কাব্য-এর ভাষা গাম্ভীর্য, অলংকারমণ্ডিত শৈলী এবং বীরত্ববোধে সমৃদ্ধ হয়ে এক মহত্তর নান্দনিক জগৎ নির্মাণ করেছে।

একইসঙ্গে, মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রাসঙ্গিক উক্তিগুলো কেবল কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেনি, বরং চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, নৈতিক দ্বন্দ্ব ও মানবিক ট্র্যাজেডিকে গভীরভাবে উন্মোচিত করেছে। এই দিক থেকে মেঘনাদবধ কাব্য একদিকে যেমন ভাষাশৈলীর অনন্য নিদর্শন, অন্যদিকে তেমনি ভাবগত গভীরতারও এক অসামান্য দলিল। পাঠক যখন মেঘনাদবধ কাব্য-এর উক্তিগুলোর বিশ্লেষণ করেন, তখন তিনি উপলব্ধি করতে পারেন এর অন্তর্নিহিত দর্শন ও কাব্যিক শক্তি।

সবশেষে বলা যায়, মেঘনাদবধ কাব্য বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লবী সংযোজন, যেখানে মেঘনাদবধ কাব্য-এর কবিভাষা, উক্তি এবং মহাকাব্যিক রূপ একত্রে মিলিত হয়ে এক চিরন্তন শিল্পসৃষ্টি গড়ে তুলেছে। তাই মেঘনাদবধ কাব্য শুধু একটি কাব্য নয়, বরং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গৌরবময় ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

মেঘনাদবধ কাব্য কবির অমর সৃষ্টি। মেঘনাদবধ কাব্য বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

মেঘনাদবধ কাব্যের কবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *