অষ্ট্রিক, দ্রাবিড়, কোল , মুণ্ডা, অষ্ট্রেলীয় – মূলত এরাই বাংলার আদি জনগোষ্ঠী

বাংলায় কোনো আদিগোষ্ঠী ছিল কিনা সে বিষয়ে ইতিহাস নীরব। তবে পশ্চিমের গিরিপথ দিয়ে যেসব
জাতি ভারতবর্ষে প্রবেশ করে তাদের আগমনের আগেও এদেশে জনবসতি ছিল , সভ্যতাও ছিল। সেই অনার্য
জাতির যে অংশ সিন্ধু উপকূলে বাস করতো তারা ছিল দ্রাবিড়ভাষী এবং পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চলে যারা বাস
করতো তারা ছিল অষ্ট্রিকভাষী। কিনতু এ অনার্য জাতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। বাংলাদেশের
জনগোষ্ঠীর আদি জনগোষ্ঠী ছিল তারাই।


আজকের বাংলা প্রাচীন কালে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত ছিল। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে পূর্বভারতের অনেকগুলো ‘দস্যু’
কোমের নাম পাওয়া যায় তার মধ্যে একটি পুণ্ড্রকোম। এ কোমের সাথে পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের নামকরণের
একটা মিল পাওয়া যায়। সে যুগে যে এরকম অনেক কোম সমাজ ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর্যরা
এদেরকে তাদের রচিত বিভিন্ন গ্রন্থে দাস, দস্যু, অসুর, পিশাচ, রাক্ষস অনাচারী বলে অভিহিত করেছে।


নৃতাত্ত্বিকেরা সমগ্র মানবজাতিকে নিগ্রীয়, মঙ্গোলীয় ও কেকেশীয় এই তিনটি বৃহৎ মানবগোষ্ঠীতে বিভক্ত
করেছেন। বাংলাদেশের অধিবাসীরা এই তিনটি গোষ্ঠীর কোনো না কোনো গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।
নৃতাত্ত্বিকদের মতে উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীর প্রথম স্তর ছিল নেগ্রীটো জন। সুন্দরবন, যশোর এবং ময়মনসিংহ
ও নিম্নবঙ্গের কোথাও কোথাও মিল পাওয়া গেছে। যাদের সাথে মিল রয়েছে, তাদের দেহ খর্ব, গায়ের রং
ঘনশ্যাম, কেশ ঊর্ণাবৎ, ঠোঁট পুরু ও উল্টানো এবং নাক অতি চ্যাপ্টা।


বাংলায় যে আদি জনগোষ্ঠীর ভাগ বেশি, তারা ছিল আদি অষ্ট্রেলীয়। এরা অষ্ট্রিকভাষী ছিল। এরাও নিগ্রীয় বৃহৎ
মানবগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত। এক সময় এরা মধ্য ভারত থেকে দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এরা খর্বকায়,
কৃষ্ণবর্ণ, দীর্ঘমুণ্ডু, তাম্রকেশ। পশ্চিম ও উত্তর ভারতের বিপুল জনসাধারণ, মধ্যভারতের কোল, ভীল, করোয়া,
খারওয়ার, মুণ্ডা, মালপাহাড়ী,এবং দক্ষিণ ভারতের চঞ্চু, কুরুব প্রভৃতি লোকেরা আদি অষ্ট্রেলীয়দেরই বংশধারার
অন্তর্গত। বাংলাদেশের সাঁওতাল, বাঁশফোড়, রাজবংশী প্রভৃতি উপজাতির লোকেরা আদি অষ্ট্রেলীয়দের সাথে
সম্পৃক্ত। কেউ কেউ এদের নামকরণ করেছেন কোলিড এবং যে অংশ সিংহলের অধিবাসী তাদের নামকরণ
করেছেন ভেড্ডিড।


বাংলার জনপ্রবাহে দীর্ঘমুণ্ডুবিশিষ্ট দুটি জনের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। একটি জনগোষ্ঠী উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু
করে পশ্চিম ও উত্তর ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। অপর একটি দীর্ঘমুণ্ডুবিশিষ্ট জনগোষ্ঠীর ফসিল মহেন-জো
দারোতে আবিষ্কৃত হয়েছে। সিন্ধু উপত্যকার প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা এই জনেরই সৃষ্টি। এই দীর্ঘমুণ্ডু বিশিষ্ট
দুটো জনই হয়তো ইউরোপ থেকে আর্যপূর্ব কালে এদেশে এসেছে।
অ্যালপাই বা ব্যাকিড নরগোষ্ঠী বলে পরিচিত এক গোলমুণ্ড জনগোষ্ঠীর পরিচয় বাংলার জনপ্রবাহে পাওয়া
যায়। এদের মুণ্ড কংকাল হরপ্পা ও মহেন-জো-দারোতে পাওয়া গেছে। এদের মুণ্ডের আকৃতি গোল ও মধ্যম,
নাসাকৃতি তীক্ষ্ন ও উন্নত বা মধ্যম, দেহ দৈর্ঘ্য মধ্যম।


বাংলায় বৈদিক সভ্যতার জন্মদাতা বলে যে গোষ্ঠী পরিচিত, তার লোক প্রচলিত নাম আর্য জাতি এবং নৃতাত্ত্বিক
নাম আদি নর্ডিক বা ইণ্ডিড। আদিতে এরা ককেশীয় বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিল। এই আদি নর্ডিকদের
আগমনের ফলেই ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বতন সভ্যতা ও সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু
বাংলাদেশের জনপ্রবাহে বা রক্তধারায় আর্য বলে কথিত এই জনের অবদান ধর্তব্যের বাইরে।
নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষায় “ইহাদের আর্যভাষা সভ্যতা ও সংস্কৃতি ঐতিহাসিক কালে বহু শতাব্দী ধরিয়া ধীরে
ধীরে বাংলাদেশে সঞ্চারিত হইয়া পূর্বতন সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে আত্মসাৎ করিয়া নূতন রূপে আত্মপ্রকাশ
করিয়াছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু বাঙালির রক্ত ও দেহগঠনে এই আদি নর্ডিক জনের রক্ত ও দেহগঠন বৈশিষ্ট্যের
দান অত্যন্ত অল্প, সে ধারা শীর্ণ ও ক্ষীণ।


বাঙালি ব্রাহ্মণদের সাথে নৃতাত্ত্বিক আত্মীয়তা দেখা যায় বাঙালি বৈদ্য কায়স্থ ও শুদ্রদের। মধ্যভারতীয়
অব্রাহ্মণদের সাথেই বাঙালি ব্রাহ্মণদের আত্মীয়তার নৃতাত্ত্বিক সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের জনপ্রবাহে কোথাও কোথাও মোঙ্গলীয় রক্তের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। আসাম ও পূর্বভারতের পার্বত্য
অঞ্চলসমূহে এই মোঙ্গল জনের প্রসার দেখা যায়। তারা আসাম, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি এলাকা বেয়ে
রংপুর অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। মিরি, নাগা, বেদো, কোচ, পালিয়া ও গারো প্রভৃতি পার্বত্য জাতির মধ্যে এই
রক্তধারা প্রবহমান এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট জেলায়ও।
আর্যদের আগমনের পরপরই ইরান তুর্কিস্তানের শক জাতি এই উপমহাদেশে অভিযান চালায়। শকেরা ক্রমে
ভারতের পূর্বাঞ্চলে ও বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে।


যে সব জন ও নরগোষ্ঠীর কথা এতক্ষণ আলোচনা করা হলো তাদের মধ্যে আর্যদের ছাড়া অন্য সকলের
বাংলায় বসবাস আরম্ভ হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক কালে। ঐতিহাসিক কালেও বাংলার জনপ্রবাহ নতুন নতুন জন ও
জাতির রক্ত মিশ্রণে সমৃদ্ধতর হয়েছে এবং আজও এ বিকাশের ধারা অব্যাহত।আদি জনগোষ্ঠীর সাথে বিভিন্ন ধারার রক্ত মিশে বাংলার বর্তমান জনগোষ্ঠী গড়ে উছেছে।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন,

অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
সরকারি এম এম কলেজ, যশোর

2 Responses

  1. স্যার আসসালামু আলাইকুম। অসাধারণ, যুগোপযোগী ও শিক্ষক –শিক্ষার্থী বান্ধব উদ্যোগ। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন দিকগুলো এত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন; যার মাধ্যমে সকলে উপকৃত হবে।শিক্ষার্থীদের অন্তরে আজীবন জায়গা করে নেওয়ার বিধিব্যবস্থা করে নিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *