জিহ্বা থেকে স্বরযন্ত্র—কণ্ঠের কারিগরদের চমকপ্রদ ভূমিকা

বাকপ্রত্যঙ্গ: প্রসঙ্গ-কথা

মানুষের দেহের নানা অঙ্গ নানা কাজে নিয়োজিত। মানুষ ঘ্রাণে-শ্রবণে-স্বাদে-অনুভূতিতে-দর্শনে পরিতৃপ্ত হয় নানা অঙ্ঘের সাহায্যে। মনের ভাব প্রকাশের জন্য মানুষ কথা বলে, আওয়াজ করে। মানুষের মনের ভাব প্রকাশের জন্য ধ্বনি উচ্চারণে পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে ব্যবহৃত অঙ্গগুলোই বাক-প্রত্যঙ্গ।

বাকপ্রত্যঙ্গ: সংজ্ঞা

মানুষ কথা বলার জন্য বা নানা প্রকার ধ্বনি উচ্চারণে দেহের যে সব প্রত্যঙ্গ বা যন্ত্রের সাহায্য নিয়ে থাকে, তাকেই বলা হয় বাগযন্ত্র। ফুসফুস থেকে বাতাস বের হয়ে যাওয়ার সময় গলনালী ও মুখবিবরের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন ধরনের ধ্বনি সৃষ্টি হয়। মুখবিবরের এই পৃথক পৃথক অংশকেই বাক-প্রত্যঙ্গ বলে।


বাক-প্রত্যঙ্গের পরিচয়

ফুসফুস

বাগযন্ত্রের অন্যতম অংশ ফুসফুস। মানুষের বাগধ্বনি উচ্চারণের অন্যতম কেন্দ্রস্থল হলো ফুসফুস। শ্বাসবায়ু বের হওয়ার সময়, আবার কখনো কখনো বাতাস ঢোকার পথে ধ্বনি সৃষ্টি হয়। ফুসফুসই ধ্বনি উৎপাদক যন্ত্র – এমন কথাও বলা হয়ে থাকে।

বাক-প্রত্যঙ্গের চিত্র (গুগল)

বাক-প্রত্যঙ্গ: স্বরযন্ত্র

আমাদের গলার বাইরের থেকে যে উঁচু projection-এর মতো প্রত্যঙ্গ দেখা যায়, তাকে কণ্ঠমণি বলা হয়। ইংরেজিতে এটাকে এ্যাডামস এ্যাপল (Adam’s Apple) বলে। এই কণ্ঠমণির ভিতরের দিকের অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রত্যঙ্গাদিসহ পুরো অংশটিকে স্বরযন্ত্র বলা হয়। একে অনেকে ধ্বনি-বাক্সও বলে থাকেন। ফুসফুস থেকে আগত বাতাস এখানেই প্রথম বাধা পায় এবং নানা ধ্বনি সৃষ্টি করে।

বাক-প্রত্যঙ্গ: স্বরতন্ত্রী

স্বরযন্ত্রের ভিতরে দেওয়ালে সারি বেঁধে থাকে কিছু পাতলা ও সূক্ষ্ম পেশী। এগুলো অনেকটা পাতলা ভাঁজ করা পর্দার মতো। জিভের মত পাতলা দুটো নমনীয় পর্দাকে স্বরতন্ত্রী বলে। দেখতে অনেকটা ইংরেজি উলটা V (ভি)-এর মতো। মানুষ স্বরতন্ত্রী দুটোকে দুই পাশে সরিয়ে দিতে পারে, আবার ইচ্ছেমতো পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ করে বিচিত্রভাবে কাঁপাতে পারে। ফলে, সৃষ্টি হয় নানা ধ্বনি।

স্বরপথ বা গ্লটিস

বাক-প্রত্যঙ্গের মধ্যে স্বরপথ অন্যতম। স্বরতন্ত্রী দুই পাশে সরে গিয়ে এদের মাঝখান দিয়ে বাতাসের যাতায়াতের যে পথ করে দেয় তাকে স্বরপথ বলে। বিভিন্ন ধ্বনি উচ্চারণের সময় এই স্বরপথের আকৃতিও বিভিন্ন রকম হয়। ফুসফুস তাড়িত বাতাস মুখ বা নাক দিয়ে বের হওয়ার আগে এই স্বরপথে প্রবেশ করে এবং স্বরতন্ত্রীকে স্পর্শ করে। পর্দা দুইটি কখনো বাতাসের পথকে বন্ধ করে দেয়, আবার কখনো পথকে সংকীর্ণ করে দেয়। এ স্বরতন্ত্রী দুইাট আন্দোলিত হয়ে কম্পনের সৃষ্টি করে।

বাতাস বের হওয়ার সময় পর্দা দুইটি যদি কাঁপতে থাকে এবং এ অবস্থায় যে সব ধ্বনি সৃষ্টি হয়, তাদের ঘোষধ্বনি বলে। আর বাতাস যদি বাধা না পেয়ে শুধু স্বরতন্ত্রী ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়, কোনো কাঁপনের সৃষ্টি না হয়, তবে সে অবস্থায় সৃষ্ট ধ্বনিকে অঘোষ ধ্বনি বলে। এ দিক থেকে কোনো ভাষার সমস্ত ধ্বনিকে ঘোষ ও অঘোষ এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এ জন্যই এই স্বরতন্ত্রী ও স্বরপথ বা গ্লটিস বাগধ্বনি সৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অধিজিহ্বা

শ্বাসনালী ও খাদ্যনালী পাশাপাশি অবস্থিত। শ্বাসনালীর ভেতরে যাতে কোনো খাদ্যকণা যেতে না পারে সেজন্য জিভের নিচেকার মাংসপিণ্ডের সাথে উর্ধ্বাঙ্গ ধরনের একটি মাংসপিণ্ড আছে। এটাকে অধিজিহ্বা বলে। অধিজিহ্বা ধ্বনি সৃষ্টিতে কোনো প্রত্যক্ষ কাজে আসে না। এর কাজ খাবার খাওয়ার সময় শ্বাসনালীর মুখে ঢাকনা হিসেবে কাজ করা।

গলনালী বা কণ্ঠনালী

স্বরতন্ত্রীর উপরে, জিভের গোড়া বা অধিজিহ্বা বরাবর ঘাড়ের দেয়াল ঘেঁষা অংশটুকুকে বলা হয় গলনালী। শ্বাসনালী ও খাদ্যনালীর মোহনাস্থলকে গলনালী বা কণ্ঠনালী বলে। এটাকে গলকক্ষ বা গলমুখও বলা হয়। বাংলা ভাষার ধ্বনিসৃষ্টিতে এর কোনো ভুমিকা নেই, তবে আরবি ভাষায় আছে।

আলজিভ

গলনালীর উপরের দিকে কোমল বা পশ্চাৎ তালু সংলগ্ন জিভের মতো ঝুলানো একটা অংশ থাকে, এটাকে আলজিভ বলে। কোমলতালুর শেষাংশের প্রসারিত নরম ঝুলন্ত অংশই আলজিভ। বাংলা ভাষার ধ্বনি সৃষ্টিতে এর কোনো ভূমিকা নেই। ডাচ, জার্মান ও ফরাসি ভাষায় এর ভূমিকা রয়েছে।

নাসাগর্ভ

আলজিভ থেকে নাক পর্যন্ত অংশকে বলা হয় নাসাগর্ভ বা নাসিক্যপথ। আনুনাসিক বা অনুনাসিক ও নাসিক্যধ্বনি উচ্চারণে নাসিক্যপথ ব্যবহৃত হয়।

মুখবিবর

গলকক্ষ থেকে ঠোঁট পর্যন্ত অংশকে বলা হয় মূখবিবর। মুখবিবরের ভেতরে আছে তালু এবং তার বিভিন্ন অংশ, দাঁত ও ঠোঁট।

তালু

মুখবিবরের সীমানা তালু দ্বারা চিহ্নিত। তালুকে মোটামুটি তিনটি প্রধান অংশে ভাগ করা যায়। কোমলতালু (পশ্চাৎ তালু), শক্ত তালু (অগ্র তালু) এবং দন্তমূলীয় অঞ্চল। ধ্বনি উৎপাদনে এদের কাজ হলো জিভকে সাহায্য করা। তালুকে মুখের ছাদও বলা হয়। সামনের দিকে ঝুঁকে আছে উপর পাটি দাঁত। দাঁতের পাটি থেকেই ভেতরে গেলে যে উঁচু অংশ দেখা যায়, তাকে দন্তমূল / মূর্ধা বলে। দন্তমূল থেকে জিভের সাহায্যে বাংলা র, ল, ন, স প্রভৃতি ধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয়। অগ্রতালু থেকে জিভের ডগা উল্টে ট-বর্গীয় ধ্বনি সৃষ্টি হয়। শক্ততালুর পেছনে নরম অংশকে পশ্চাৎতালু বা স্নিগ্ধ তালু বা কোমল তালু বলা হয়। এটি নরম বলে একে উপরে উঠানো ও নিচে নামানো যায়। নাসিক্যধ্বনি উচ্চারণে এই কোমলতালু নিচের দিকে কিছুটা নেমে আসে। এই অংশ থেকে জিভের সাহায্যে ক-বর্গীয় ধ্বনি সুষ্টি হয়।

ঠোঁট

আমাদের দুইটি ঠোঁট। একটি উপরে, অন্যটি নিচে। এ দুইটি ঠোঁটই ধ্বনি সৃষ্টিতে কাজে লাগে। প-বর্গীয় ধ্বনি বিশুদ্ধ ওষ্ঠ্য ধ্বনি। উপরের পাটি দাঁতের সাথে নিচের ঠোঁট মিলে দন্ত্যোষ্ঠ্য ধ্বনির সৃষ্টি হয়। ধ্বনি সৃষ্টিতে ঠোঁটের কার্যকরী ভূমিকা রয়েছে।

জিভ

বাগযন্ত্রের যেসব প্রত্যঙ্গের কথা এতক্ষণ আলোচিত হলো সেগুলো একা কেউ কোনো ধ্বনি উচ্চারণ করতে পারে না। এর সঙ্গে উচ্চারক হিসেবে জিভ সহযোগিতা করে। সেজন্য ধ্বনি সৃষ্টিতে জিভের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিভকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবে মুখ বন্ধ রাখলে জিভের সে অংশটুকু দন্তমূলের তলায় পড়ে থাকে, তাকে জিভের পাতলা অংশ বলে। এর প্রান্ত অংশকে জিভের ডগা বলে জিভের যে অংশটুকু শক্ততালুর তলায় পড়ে থাকে, তাকে জিভের পাতা বলে বা সম্মুখ জিভ বলে। নরম তালুর তলায় পড়ে থাকা অংশই পশ্চাৎ জিভ। একে জিভের গোড়ালিও বলে। এর প্রান্তে থাকে অধিজিভ।

জিভ ও তালু বাকপ্রত্যঙ্গের মধ্যে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। জিভের বিভিন্ন অংশ এবং তালুর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন প্রকারের স্পর্শ, ঘর্ষণ ও আঘাতের ফলে বিভিন্ন ধ্বনি সৃষ্টি হয়ে থাকে।

একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, বাকপ্রত্যঙ্গের যে-কোনো একটির সাহায্যে কোনো ধ্বনিই উৎপন্ন হয় না। ফুসফুস থেকে বাতাস গলনালী ও মুখবিবর বা নাসাপথে বের হয়ে আসার সময় বাগযন্ত্রগুলোর কোনো জায়গায় আটকে গিয়ে নতুবা বায়ুপথ সংকীর্ণ হওয়ার ফলে চাপা খেয়ে বিচিত্র ধ্বনির সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, যে-কোনো একটি ধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখগহ্বরের উপরের বা নিচের এ রকম দুটো নির্দিষ্ট বা বিশিষ্ট অংশ জড়িত হয়ে যায়। তখন ঐ দুটো নির্দিষ্ট বাকপ্রত্যঙ্গকে উচ্চারক বলে।

ধ্বনিবিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য ।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন,

বাংলা বিভাগ,

সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *