স্বরধ্বনি বৈচিত্র্যময়: উচ্চারণে, গঠনে ও ব্যবহারে
ভূমিকা:
স্বরধ্বনির সংজ্ঞা ও বিচার প্রক্রিয়া জানার আগে জানতে হবে– বাকযন্ত্রের সাহায্য উচ্চারিত ধ্বনি দুই প্রকার— স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি। উচ্চারণ-প্রকৃতি ও গঠন বৈচিত্র্যের দিক থেকে স্বর ও ব্যঞ্জনধ্বনির মধ্যে যেমন পার্থক্য রয়েছে তেমনি একটি স্বরধ্বনির সাথে অন্য স্বরধ্বনির পার্থক্য রয়েছে। প্রতিটি ধ্বনির স্বাতন্ত্র্য বিচারের জন্য রয়েছে নানা রকম প্রক্রিয়া। ধ্বনি বিচারের এ প্রক্রিয়াকে ধ্বনিবিজ্ঞানের ভাষায় মাপকাঠি বলে।
স্বরধ্বনির সংজ্ঞা:
প্রাক-ভাষাতাত্ত্বিক যুগে ভারতীয় চিন্তাধারায় স্বরধ্বনিকে বলা হয়েছে যে, এ ধ্বনি স্বতন্ত্রভাবে উচ্চারিত হইতে পারে (ঈশ্বরচন্দ্র)। গ্রিক ও ল্যাতিন ঐতিহ্যে স্বরধ্বনির এ পরিচয়ের সাথে আর একটি অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য যোগ করে বলা হয়েছে— স্বরধ্বনি শুধু স্বয়ং উচ্চারিত হয় না, এ এমন এক ধ্বনি-একক যা অক্ষর তৈরি করতে পারে। (Mathews)
প্রথাগত ব্যাকরণে— যে ধ্বনি অন্য ধ্বনির সাহায্য ছাড়া নিজে নিজে উচ্চারিত হতে পারে, তাকে স্বরধ্বনি বলে।
স্বরধ্বনির সংজ্ঞা ও বিচার প্রসঙ্গে প্রথাগত সংজ্ঞার্থ সাম্প্রতিককালে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করা হয়নি। বর্তমানে বায়ুপ্রবাহের উপর গুরুত্ব দিয়ে স্বরধ্বনির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
স্বরধ্বনি হচ্ছে সেই ঘোষ ধ্বনি, যে ধ্বনি উচ্চারণে মুখ ও গলনালি দিয়ে নির্বিঘ্নে বায়ু প্রবাহিত হওয়ায় কোনো বাধার বা সংকুচিত অবস্থার সৃষ্টি হয় না এবং কোনো শ্রুতিগ্রাহ্য ঘর্ষণ শোনা যায় না।
এ রকম ধারণা এ কালের সকল ভাষাবিজ্ঞানী পোষণ করেন।
স্বরধ্বনির সংজ্ঞা ও বিচার প্রসঙ্গে বিভিন্ন পণ্ডিতদের মতামত
Vowel:
A speech sound in which the air stream from the lungs is not blocked in any way in the mouth or throat, and which is usually pronounced with the vibration of the VOCAL CORDS.
জীনাত ইমতিয়াজ আলী এর বাংলা রূপান্তর করেছেন এভাবে—
এক ধরনের বাগধ্বনি হচ্ছে স্বর যার উৎপাদনে ফুসফুস-আগত বায়ুপ্রবাহ মুখের মধ্যে বা গলায় কোথাও কোনোভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয় না এবং যা সাধারণত স্বরযন্ত্রের অনুরণনের ফলে উচ্চারিত হয়।
ধ্বনিবিজ্ঞানী আবদুল হাই বলেন—
স্বাভাবিক কথাবার্তায় গলনালী ও মুখবিবর দিয়ে বাতাস বেরিয়ে যাবার সময় কোনো জায়গায় বাধাপ্রাপ্ত না হয়ে বা শ্রুতিগ্রাহ্য চাপা না খেয়ে ঘোষবৎ যে ধ্বনি উদ্গত হয়, তাকে স্বরধ্বনি বলে।
স্বরধ্বনি উচ্চারণকালে স্বরযন্ত্রের ভেতরের স্বরতন্ত্রীতে কাঁপন লাগে, ফলে ধ্বনিগুলো ঘোষবৎ উচ্চারিত হয়। তবে স্বাভাবিকের তুলনায় অনুচ্চস্বরে বা ফিসফিসিয়ে কথাবার্তায় স্বরধ্বনি অঘোষ হতে পারে। স্বরধ্বনিগুলো অন্য ধ্বনির সাহায্য ছাড়াই উচ্চারিত হতে পারে।
বস্তুত, স্বরধ্বনি শনাক্ত করা খুবই সহজ, বাতাসের প্রতিবন্ধকতাহীন প্রবাহ একটু লক্ষ করলেই যা বোঝা যায়। অর্থাৎ, ফুসফুস তাড়িত বাতাস মুখগহ্বর দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় কোথাও বাধা না পেয়ে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকে স্বরধ্বনি বলে।
স্বরধ্বনি বিচারের মাপকাঠি:
স্বরধ্বনির সংজ্ঞা ও বিচার প্রসঙ্গে ১৯৫০ সালের দিকে স্বরধ্বনি বিচারের প্রক্রিয়া হিসেবে ভাষাবিজ্ঞানী ব্লক ও ট্র্যাগার তিনটি মানদণ্ডের কথা বলেছিলেন—
১. উচ্চারক হিসেবে জিভের ক্রিয়াশীল অংশকে চিহ্নিত করা;
২. জিভের উচ্চতার পরিমাপ নির্ধারণ করা এবং
৩. ঠোঁটের অবস্থা বিচার করা।
এদের মতানুসারে ১৯৬৪ সালে মুহম্মদ আবদুল হাই ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব শীর্ষক গ্রন্থে স্বরধ্বনি বিচারের উপায় হিসেবে তিনটি মাপকাঠির কথা বলেছিলেন—
১. জিহ্বার যে অংশ উঁচু করা হয়, তা খুঁজে বের করা;
২. জিহ্বা কতটুকু উঁচু করা হয়, তা জানা এবং
৩. ঠোঁট ও চোয়ালের অবস্থা কেমন থাকে, তা জানা।
সাম্প্রতিককালে স্বরধ্বনি বিচারে কোমলতালুর অবস্থাকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়। সে হিসেবে স্বরধ্বনি বিচারের মাপকাঠি দাঁড়ায়—
১. জিভের অবস্থা
২. জিভের উচ্চতা
৩. ঠোঁটের অবস্থা
৪. কোমলতালুর অবস্থা
৫. চোয়ালের অবস্থা
জিভের অবস্থা বলতে বোঝায় জিভের কোন অংশের সাহায্যে স্বরধ্বনি উচ্চারিত হয়। জিভের কোন অংশ থেকে উচ্চারিত হয়, তার বিচারে বাংলা স্বরধ্বনি তিন রকমের। যথা-
ক) সম্মুখ স্বরধ্বনি: জিভের সামনের অংশ থেকে উচ্চারিত স্বরধ্বনি হলো সম্মুখ স্বরধ্বনি।
যেমন- ই, এ এবং এ্যা ।
খ) মধ্য স্বরধ্বনি: জিভের স্বাভাবিক অবস্থায় অর্থাৎ জিভ সামনে ও পেছনে না সরে উচ্চারিত স্বরধ্বনি হলো মধ্য স্বরধ্বনি। যেমন- আ।
গ) পশ্চাৎ স্বরধ্বনি: জিভের পেছনের অংশ থেকে উচ্চারিত স্বরধ্বনিগুলোকে পশ্চাৎ স্বরধ্বনি বলে।
যেমন- অ, ও এবং উ।
২. জিভের উচ্চতা অনুসারে: ( জিভে কতটুকু উঁচু করা হয়)
জিভের উচ্চতানুসারে বাংলা স্বরধ্বনিগুলো চার ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন-
ক) উচ্চ স্বরধ্বনি ; খ) উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনি; গ) নিম্ন-মধ্য স্বরধ্বনি এবং ঘ) নিম্ন স্বরধ্বনি।
ক) উচ্চ স্বরধ্বনি : যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিভ সবচেয়ে উপরে ওঠে, সে-গুলোই এ ধরনের স্বরধ্বনি।
যেমন- ই এবং উ।
খ) উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনি: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভে উচ্চ স্বরধ্বনির তুলনায় একটু নিচে এবং নিম্ন
স্বরধ্বনির তুলনায় উপরে থাকে, তাকে উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনি বলে। যেমন- এ এবং ও।
গ) নিম্ন-মধ্য স্বরধ্বনি: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভ নিম্ন স্বরধ্বনির তুলনায় একটু উপরে আর উচ্চ-
মধ্য স্বরধ্বনির তুলনায় নিচে থাকে, তাকে নিম্ন-মধ্য স্বরধ্বনি বলে। যেমন- এ্যা এবং অ ।
ঘ) নিম্ন স্বরধ্বনি: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিভে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করে, তাকে নিম্ন স্বরধ্বনি বলে।
যেমন- আ।
জিভের অবস্থানুসারে ও জিভের উচ্চতানুসারে বাংলা স্বরধ্বনি ছকে দেখানো হলো-
| জিভের উচ্চতা | জিভের অবস্থা | ||
| সম্মুখ | মধ্য | পশ্চাৎ | |
| উচ্চ | ই | উ | |
| উচ্চ-মধ্য | এ | ও | |
| নিম্ন-মধ্য | এ্যা | অ | |
| নিম্ন | আ | ||
৩. ঠোঁটের অবস্থা;
ঠোঁটের অবস্থাভেদে স্বরধ্বনিগুলোর দুই রকম বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। এক, ঠোঁট গোলাকার ও অগোলাকার থাকতে পারে। দুই, ঠোঁট খোলা বা উন্মুক্ত থাকতে পারে।
a. ঠোঁটের গোলাকার ও অগোলাকার অবস্থাভেদে স্বরধ্বনিগুলোর বিচার:
ক) গোলাকৃত স্বরধ্বনি: যে-সব স্বরধ্বনি উচ্চারণ-কালে ঠোঁট গোলাকার ধারণ করে, সেগুলোকেই গোলাকৃত স্বরধ্বনি বলে। যেমন- অ, ও, এবং উ।
খ) অগোলাকৃত স্বরধ্বনি: যে-সব স্বরধ্বনি উচ্চারণ-কালে ঠোঁট গোল না হয়ে প্রসৃত অবস্থায় থাকে, সে-সব স্বরধ্বনিগুলোকে অগোলাকৃত বা প্রসৃত স্বরধ্বনি বলে। যেমন- ই, এ, এ্যা।
b. ঠোঁটের উন্মুক্তি বিচারে: ঠোঁটের উন্মুক্তি বিচারে বাংলা স্বরধ্বনি চার প্রকারের। যথা:-
ক) বিবৃত স্বরধ্বনি; যে-সব স্বরধ্বনি উচ্চারণ-কালে ঠোঁট সবচেয়ে বেশি খোলা থাকে, তাদেরকে বিবৃত স্বরধ্বনি বলে। যেমন- আ।
খ) অর্ধ-বিবৃত যে-সব স্বরধ্বনি উচ্চারণ-কালে বিবৃত স্বরধ্বনির তুলনায় ঠোঁট কম খোলা থাকে, তাকে অর্ধ-বিবৃত স্বরধ্বনি বলে। যেমন- এ্যা এবং অ।
গ) অর্ধ-সংবৃত: যে-সব স্বরধ্বনি উচ্চারণ-কালে ঠোঁট সংবৃত স্বরধ্বনির তুলনায় বেশি খোলা থাকে, তাকে অর্ধ-সংবৃত স্বরধ্বনি বলে। যেমন- এ এবং ও।
ঘ) সংবৃত: যে-সব স্বরধ্বনি উচ্চারণ-কালে ঠোঁট সবচেয়ে কম খোলা বা উন্মুক্ত থাকে, তাকে সংবৃত স্বরধ্বনি বলে। যেমন- ই এবং উ।
| ঠোঁটের অবস্থা | জিভের অবস্থা | ||
| সম্মুখ | মধ্য | পশ্চাৎ | |
| সংবৃত | ই | উ | |
| অর্ধ-সংবৃত | এ | ও | |
| অর্ধ-বিবৃত | এ্যা | অ | |
| বিবৃত | আ | ||
ঠোঁটের উন্মুক্তি অনুযায়ী বাংলা স্বরধ্বনি
৪. কোমলতালুর অবস্থা:
কোমল তালুর অবস্থা বিচারে স্বরধ্বনিগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
ক) মৌখিক ও খ) অনুনাসিক
ক) মৌখিক: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণ-কালে ফুসফুস তাড়িত বাতাস কেবল মুখ দিয়ে বের হয়, তাকে মৌখিক স্বরধ্বনি বলে।
খ) অনুনাসিক: যে সব স্বরধ্বনি উচ্চারণ-কালে কোমল তালু নিচে নেমে যায় এবং বাতাস মুখ ও নাক দিয়ে যুগপৎভাবে বেরিয়ে যায়, তাকে অনুনাসিক স্বরধ্বনি বলে।
বাংলা স্বরধ্বনিগুলো মৌখিক ও অনুনাসিক দুই রকমই হতে পারে। তবে স্বাভাবিক অবস্থায় মৌলিক স্বরধ্বনিগুলো মৌখিক স্বরধ্বনি। অনুনাসিক স্বরধ্বনির উদাহরণ-
ই মৌখিক — বিধি- নিয়ম বা বিধাতা এ- মৌখিক —–এরা- সাধারণ অর্থে
ইঁ অনুনাসিক—– বিঁধি- বিদ্ধ করা এঁ- অনুনাসিক—– এঁরা- সম্মানার্থে
এ্যাঁ/ অ্যাঁ – অনুনাসিক—-ট্যাঁক –থলে, আঁ- বাঁকা- বক্র, বাঁক- বক্র/ পথের বা নদীর বাঁক
এ্যা- মৌখিক-ট্যাক-ট্যাক-অনবরত তীক্ষ্ণ সমালোচনা আ- মৌখিক—- বাক- কথা; বাক ফুটেছে।
অঁ- অনুনাসিক—–গঁদ –আঠা, ওঁ- ওঁরা – সম্মানার্থে বা গত হয়েছেন অর্থে
অ- মৌখিক— গদ- অজীর্ণ/ বিষ ও- মৌখিক—ওখানে/ ওরা
উঁ- অনুনাসিক—–কুঁড়ি- –ফুলের কলি,
উ- মৌখিক—–কুড়ি- বিশ।
(চন্দ্রবিন্দুযুক্ত স্বরধ্বনিই অনুনাসিক স্বরধ্বনি)
৫. চোয়ালের অবস্থা:
চোয়ালের অবস্থানুসারে স্বরধ্বনিগুলোকে দৃঢ় ও শিথিল এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
ক) দৃঢ়: এ জাতীয় স্বরধ্বনি উচ্চারণে স্বরতন্ত্রের পেশিগুলোতে স্বাভাবিক স্বরধ্বনির তুলনায় বেশি চাপ পড়ে। দীর্ঘস্বরই এ জাতীয় স্বরধ্বনি। বাংলায় দীর্ঘ স্বর নেই বলে বাংলা স্বরধ্বনি বিচারে এ মাপকাঠি প্রযোজ্য নয়।
খ) শিথিল: দৃঢ় স্বরধ্বনির বিপরীত স্বরধ্বনিগুলোই হচ্ছে শিথিল স্বরধ্বনি।
অনেকে দৃঢ় ও শিথিল মানদণ্ডের আলোকে স্বরধ্বনি বিচারের প্রবণতাকে উচ্চ ও নিম্ন স্বরধ্বনি হিসেবে স্বরধ্বনি বিচার প্রক্রিয়ারই বৈচিত্র্যমাত্র বলে মনে করেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, স্বরধ্বনি বিচার প্রক্রিয়া জটিল হলেও স্বরধ্বনি বিচারের মাপকাঠির আলোকে বাংলা মৌলিক স্বরধ্বনিগুলোর যে-সব বিভাগ উল্লিখিত হলো তা মোটামুটি সর্বজনস্বীকৃত।
স্বরধ্বনি বিচারের মাপকাঠির আলোকে বিচার শেষে বাংলা স্বরধ্বনিগুলোর ধ্বনিতাত্ত্বিক পরিচয় নিম্নোক্তভাবে দেয়া যায়।
স্বরধ্বনির সংজ্ঞা ও বিচার করতে গেলে আমাদের মৌলিক স্বরধ্বনি সম্পর্কে জানা দরকার।
মৌলিক স্বরধ্বনি:
স্বরধ্বনির স্বাতন্ত্র্য বিচারের যে প্রক্রিয়াগুলো রয়েছে অর্থাৎ মাপকাঠির আলোকে স্বরধ্বনিগুলো বিচার করলে দেখা যায় যে, উচ্চারণ পদ্ধতির দিক থেকে স্বরধ্বনিগুলোর মধ্যে পার্থক্য খুবই কম। সামান্য আলস্যে এক ধ্বনি অন্য ধ্বনি হয়ে যেতে পারে। এ কারণে স্বরধ্বনি বিশ্লেষণ খুবই জটিল। এজন্য ভাষাবিজ্ঞানীরা স্বরধ্বনি বিচারে মৌলিক স্বরধ্বনির পরিকল্পনা করেছেন।
সংজ্ঞা: বিভিন্ন স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভের অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য মুখের ভিতরের শূন্যস্থানে ভাষাবিজ্ঞানীরা যে-সব কাল্পনিক মাপকাঠি নির্ণয় করেছেন, তাদের বিভিন্ন পরিমাপ নির্দেশক বিন্দু থেকে উচ্চারিত স্বরধ্বনিগুলোকে মৌলিক স্বরধ্বনি বলে।
মৌলিক স্বরধ্বনি পৃথিবীর কোনো ভাষার স্বরধ্বনি নয়। বিভিন্ন ভাষার স্বরধ্বনি বিশ্লেষণের জন্যই এর উদ্ভব। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এটি দিয়ে পৃথিবীর যে-কোনো ভাষার স্বরধ্বনি উচ্চারণের স্থান সহজে নির্ণয় করা যায়। কেননা, এগুলো যে-কোনো ভাষার স্বরধ্বনির মতো অত কাছাকাছি নয়।
বাংলা মৌলিক স্বরধ্বনির সংখ্যা:
মৌলিক স্বরধ্বনির সাথে বাংলা স্বরধ্বনির তুলনা করে বাংলা স্বরধ্বনির সংখ্যা নির্ণয় করেছেন ধ্বনিবিজ্ঞানীরা। বাংলা মৌলিক স্বরধ্বনির সংখ্যা নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মুহম্মদ আবদুল হাই এর মতে বাংলা মৌলিক স্বরের সংখ্যা ৮টি। যথা:- ই, এ, এ্যা, আ, অ, ও, অভিশ্রুতি-ও এবং উ।
সুকুমার সেনের মতে ৮টি- ই, এ, এ’, আ, আ’, অ, ও এবং উ
আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ মনে করেন ৭টি- ই, এ, এ্যা, আ, অ, ও এবং উ। পরিত্র সরকারও এমনি মনে করেন।
সর্বজনস্বীকৃত- ই, এ, এ্যা, আ, অ, ও এবং উ।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।
অতিবিরক্ত অংশ
মাপকাঠির আলোকে বাংলা স্বরধ্বনিগুলোর বিচার:
বাংলা স্বরবর্ণ ১১টি হলেও বাংলা মৌলিক স্বর ৭টি। যথা— অ, আ, ই, উ, এ, এ্যা, ও।
১. জিভের অবস্থানুসারে:
জিভের অবস্থা বলতে বোঝায় জিভের কোন অংশের সাহায্যে স্বরধ্বনি উচ্চারিত হয়। জিভের কোন অংশ থেকে উচ্চারিত হয়, তার বিচারে বাংলা স্বরধ্বনি তিন রকমের।
| ধরন | স্বরধ্বনি |
|---|---|
| সম্মুখ | ই, এ, এ্যা |
| মধ্য | আ |
| পশ্চাৎ | অ, ও, উ |
ক) সম্মুখ স্বরধ্বনি: ই, এ এবং এ্যা।
খ) মধ্য স্বরধ্বনি: আ।
গ) পশ্চাৎ স্বরধ্বনি: অ, ও এবং উ।
২. জিভের উচ্চতা অনুসারে:
| জিভের উচ্চতা | সম্মুখ | মধ্য | পশ্চাৎ |
|---|---|---|---|
| উচ্চ | ই | উ | |
| উচ্চ-মধ্য | এ | ও | |
| নিম্ন-মধ্য | এ্যা | অ | |
| নিম্ন | আ |
জিভের উচ্চতানুসারে বাংলা স্বরধ্বনিগুলো চার ভাগে ভাগ করা হয়:
ক) উচ্চ স্বরধ্বনি: ই এবং উ।
খ) উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনি: এ এবং ও।
গ) নিম্ন-মধ্য স্বরধ্বনি: এ্যা এবং অ।
ঘ) নিম্ন স্বরধ্বনি: আ।
৩. ঠোঁটের অবস্থা:
ক) গোলাকৃত ও অগোলাকৃত:
| ধরন | স্বরধ্বনি |
|---|---|
| গোলাকৃত | অ, ও, উ |
| অগোলাকৃত | ই, এ, এ্যা |
খ) ঠোঁটের উন্মুক্তি অনুযায়ী:
| ধরন | স্বরধ্বনি |
|---|---|
| সংবৃত | ই, উ |
| অর্ধ-সংবৃত | এ, ও |
| অর্ধ-বিবৃত | এ্যা, অ |
| বিবৃত | আ |
ক) গোলাকৃত স্বরধ্বনি: অ, ও, উ।
খ) অগোলাকৃত স্বরধ্বনি: ই, এ, এ্যা।
ঠোঁটের উন্মুক্তি অনুযায়ী—
ক) বিবৃত: আ।
খ) অর্ধ-বিবৃত: এ্যা এবং অ।
গ) অর্ধ-সংবৃত: এ এবং ও।
ঘ) সংবৃত: ই এবং উ।
বর্ণনা:
- সংবৃত: ঠোঁট সবচেয়ে কম খোলা থাকে (ই, উ)।
- অর্ধ-সংবৃত: ঠোঁট কিছুটা খোলা থাকে (এ, ও)।
- অর্ধ-বিবৃত: ঠোঁট অর্ধেক খোলা থাকে (এ্যা, অ)।
- বিবৃত: ঠোঁট সবচেয়ে বেশি খোলা থাকে (আ)।
৪. কোমলতালুর অবস্থা:
ক) মৌখিক: বাতাস মুখ দিয়ে বের হয়।
খ) অনুনাসিক: কোমল তালু নেমে এসে বাতাস মুখ ও নাক দিয়ে বের হয়।
বর্ণনা:
- মৌখিক স্বরধ্বনি: বাতাস মুখ দিয়ে বের হয় (ই, এ, আ ইত্যাদি)।
- অনুনাসিক স্বরধ্বনি: কোমল তালু নেমে গিয়ে বাতাস মুখ ও নাক দুই দিক দিয়েই বের হয় (ইঁ, এঁ, আঁ ইত্যাদি)।
- অনুনাসিক স্বরধ্বনিগুলো সাধারণত চন্দ্রবিন্দু (ঁ) যুক্ত হয়।
| ধরন | উদাহরণ |
|---|---|
| মৌখিক | ই (বিধি), এ (এরা), আ (বাক), অ (গদ), ও (ওখানে), উ (কুড়ি) |
| অনুনাসিক | ইঁ (বিঁধি), এঁ (এঁরা), আঁ (বাঁকা), অঁ (গঁদ), ওঁ (ওঁরা), উঁ (কুঁড়ি) |
৫. চোয়ালের অবস্থা:
ক) দৃঢ়: স্বরতন্ত্রের পেশিতে চাপ পড়ে (বাংলায় নেই)।
খ) শিথিল: স্বাভাবিক স্বরধ্বনি।
বাংলা স্বরধ্বনির সারাংশ
| স্বরধ্বনি | উচ্চতা | অবস্থান | ঠোঁট | কোমলতালু |
|---|---|---|---|---|
| ই | উচ্চ | সম্মুখ | অগোলাকৃত | মৌখিক |
| এ | উচ্চ-মধ্য | সম্মুখ | অগোলাকৃত | মৌখিক |
| এ্যা | নিম্ন-মধ্য | সম্মুখ | অগোলাকৃত | মৌখিক |
| আ | নিম্ন | মধ্য | অগোলাকৃত | মৌখিক |
| অ | নিম্ন-মধ্য | পশ্চাৎ | গোলাকৃত | মৌখিক |
| ও | উচ্চ-মধ্য | পশ্চাৎ | গোলাকৃত | মৌখিক |
| উ | উচ্চ | পশ্চাৎ | গোলাকৃত | মৌখিক |
বাংলা স্বরধ্বনির ধ্বনিতাত্ত্বিক পরিচয়:
| স্বরধ্বনি | উচ্চ | উচ্চ-মধ্য | নিম্ন-মধ্য | নিম্ন | সম্মুখ | পশ্চাৎ | মধ্য | সংবৃত | অর্ধ-সংবৃত | অর্ধ-বিবৃত | বিবৃত | গোলাকার | অগোলাকার | মৌখিক |
|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|
| ই | + | – | – | – | + | – | – | + | – | – | – | – | + | + |
| এ | – | + | – | – | + | – | – | – | + | – | – | – | + | + |
| এ্যা | – | – | + | – | + | – | – | – | – | + | – | – | + | + |
| আ | – | – | – | + | – | – | + | – | – | – | + | – | – | + |
| অ | – | – | + | – | – | + | – | – | – | + | – | + | – | + |
| ও | – | + | – | – | – | + | – | – | + | – | – | + | – | + |
| উ | + | – | – | – | – | + |
ই- উচ্চ সম্মুখ অগোলাকৃত সংবৃত মৌখিক স্বরধ্বনি।
এ- উচ্চ-মধ্য সম্মুখ অগোলাকৃত অর্ধ-সংবৃত মৌখিক স্বরধ্বনি।
এ্যা- নিম্ন-মধ্য সম্মুখ অর্ধ-বিবৃত অগোলাকৃত মৌখিক স্বরধ্বনি।
আ- নিম্ন মধ্য বিবৃত মৌখিক স্বরধ্বনি।
অ- নিম্ন-মধ্য পশ্চাৎ গোলাকৃত অর্ধ-বিবৃত মৌখিক স্বরধ্বনি।
ও- উচ্চ-মধ্য পশ্চাৎ গোলাকৃত অর্ধ-সংবৃত মৌখিক স্বরধ্বনি।
উ- উচ্চ পশ্চাৎ গোলাকৃত সংবৃত মৌখিক স্বরধ্বনি।
মৌলিক স্বরধ্বনি:
স্বরধ্বনির স্বাতন্ত্র্য বিচারের যে প্রক্রিয়াগুলো রয়েছে অর্থাৎ মাপকাঠির আলোকে স্বরধ্বনিগুলো বিচার করলে দেখা যায় যে, উচ্চারণ পদ্ধতির দিক থেকে স্বরধ্বনিগুলোর মধ্যে পার্থক্য খুবই কম। সামান্য আলস্যে এক ধ্বনি অন্য ধ্বনি হয়ে যেতে পারে। এ কারণে স্বরধ্বনি বিশ্লেষণ খুবই জটিল। এজন্য ভাষাবিজ্ঞানীরা স্বরধ্বনি বিচারে মৌলিক স্বরধ্বনির পরিকল্পনা করেছেন।
সংজ্ঞা: বিভিন্ন স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভের অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য মুখের ভিতরের শূন্যস্থানে ভাষাবিজ্ঞানীরা যে-সব কাল্পনিক মাপকাঠি নির্ণয় করেছেন, তাদের বিভিন্ন পরিমাপ নির্দেশক বিন্দু থেকে উচ্চারিত স্বরধ্বনিগুলোকে মৌলিক স্বরধ্বনি বলে।
মৌলিক স্বরধ্বনি পৃথিবীর কোনো ভাষার স্বরধ্বনি নয়। বিভিন্ন ভাষার স্বরধ্বনি বিশ্লেষণের জন্যই এর উদ্ভব। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এটি দিয়ে পৃথিবীর যে-কোনো ভাষার স্বরধ্বনি উচ্চারণের স্থান সহজে নির্ণয় করা যায়। কেননা, এগুলো যে-কোনো ভাষার স্বরধ্বনির মতো অত কাছাকাছি নয়।
বাংলা মৌলিক স্বরধ্বনির সংখ্যা:
মৌলিক স্বরধ্বনির সাথে বাংলা স্বরধ্বনির তুলনা করে বাংলা স্বরধ্বনির সংখ্যা নির্ণয় করেছেন ধ্বনিবিজ্ঞানীরা। বাংলা মৌলিক স্বরধ্বনির সংখ্যা নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মুহম্মদ আবদুল হাই এর মতে বাংলা মৌলিক স্বরের সংখ্যা ৮টি। যথা:- ই, এ, এ্যা, আ, অ, ও, অভিশ্রুতি-ও এবং উ।
সুকুমার সেনের মতে ৮টি- ই, এ, এ’, আ, আ’, অ, ও এবং উ
আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ মনে করেন ৭টি- ই, এ, এ্যা, আ, অ, ও এবং উ। পরিত্র সরকারও এমনি মনে করেন।
সর্বজনস্বীকৃত- ই, এ, এ্যা, আ, অ, ও এবং উ।
বাংলা ভিভাগ,
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।
লেখা গুলো অনেক সুন্দর ও সাবলীল হয়েছে। অনেকটা সহজ ভাষা। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় বুঝতে অসুবিধা হয়েছে