রবীন্দ্রনাথের নাটকে মানবতাবাদ ও অন্ধবিশ্বাস ভাঙার অনন্য দৃষ্টান্ত

বিসর্জন নাটক রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কাব্যনাট্য। বিশ্ব-বরেণ্য কবি-সম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকরের অপরিসীম কবি প্রতিভার স্পর্শে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মত বাংলা নাটকেরও সমৃদ্ধি ঘটেছে। আখ্যানবস্তুর সুনিপুণ বিন্যাস কৌশলে, ঘটনার দ্রæত প্রবাহে, নাটকীয় চমৎকারিত্বে, চরিত্রের ভেতর ও বাইরের দ্ব›দ্ব সংঘাতের রূপায়ণে, বেগবান ভাবরূপের প্রকাশে, মঞ্চাভিনয়ের উপযোগিতায় বিসর্জন বাংলা নাট্য-সাহিত্যের ধারায় বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। নাটকটির নামকরণেও রয়েছে কবির বিশিষ্ট অভিপ্রেত। আলোচ্য নিবন্ধে নাটকটির নামকরণের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করার প্রায়াস নেব।

বিসর্জন নাটকের নামকরণে গৃহীত রীতি:

নাম ও নামকরণ কী ? কোনো কিছুর পরিচয় ও সনাক্তকরণের অনুষঙ্গে নাম প্রয়োজন। সেজন্য পৃথিবীতে নামবিহীন কোনো কিছুই পাওয়া যায় না। নাম অপহিার্য বলেই হয়ত বাস্তবজীবনে নামকরণের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব লক্ষণীয়। কারণ, নামে কাজ চলে যাওয়ার ব্যাপারটিকেই মুখ্য করে দেখা হয়। সেজন্য কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন হলেও অসংগত মনে না কেউ।

সাহিত্যে নামকরণ ঃ বাস্তবজীবনের সাথে সাহিত্যের জগৎ কিছুটা ভিন্নতর, একথা মানতেই হবে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে শিল্পচেতনা একটি গুদরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিল্পসাহিত্যের নামকরণ একটি আর্ট। তাই সামঞ্জস্যহীন নাম সাহিত্যের শিল্পসাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সে-দিকটি খেয়াল রেখেই হয়ত মনীষী ক্যাভেন্ডিস বলেছেন Ñপ্রচুর অর্থসম্পদের চেয়েও একটি সুন্দর নাম শ্রেয়। সাহিত্যে নামকরণ একটি সচেতন শিল্পপ্রয়াস একথা মানতেই হয়।

সাহিত্যে নামকরণের রীতি ঃ পাশ্চাত্যের স্বনামধন্য সাহিত্য সমালোচক ই, এম, ফরস্টার সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণের রীতি সম্পর্কে চমৎকার আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে Ñসাহিত্যের নাম হবে গোটা রচনার অবয়ববিম্বিত একটি ক্ষুদ্র দর্পণ। তিনি নামকরণের ক্ষেত্রে নায়ক-নায়িকার নাম, ঘটনা সংঘটিত হবার স্থান, কালগত বৈশিষ্ট্য এবং সর্বোপরি রচনার বক্তব্যসারকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর বিচারে , বিষয়বক্তব্যকে ধারণ করলেই নামকরণ যৌক্তিকতা পায়। আসলে নামের মধ্যেই রিচনার শিল্প-সুষমা ফুটে ওঠে।

বিসর্জন নাটকের নামকরণের সার্থকতা বিচার:

বিসর্জন নাটকের নামকরণের ক্ষেত্রে নাট্যকার তাঁর অভিপ্রেত মূলভাবকে লক্ষ্য করেই নামকরণ করেছেন। এ নামকরণ কতটুকু সার্থক তা বিচার করে দেখা যেতে পারে।



বিসর্জন নাটকটি রবীন্দনাথ ঠাকুরের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস রাজর্ষি’র নাট্যরূপ। সে হিসেবে নাটকের নাম রাজর্ষি হতে পারতো। কিন্তু নাটকের প্রয়োজনে কাহিনীর আাঙ্গিক ও চরিত্র দুটোই পরিবর্তিত হয়েছে। রাজর্ষি উপন্যাসে রাজা গোবিন্দমাণিক্যের চরিত্রে রাজা ও ঋষির আচরণ প্রকাশ পাওয়ায় এ রকম নামকরণ করা হয়েছিল। নাটকে ও উপন্যাসে গোবিন্দমাণিক্যের চরিত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন না ঘটলেও নাটকের মূল দ্ব›দ্ব উপন্যাস থেকে কিছুটা ভিন্ন। রাজর্ষি উপন্যাসে রাজা গোবিন্দমাণিক্য প্রাধান্য পেলেও বিসর্জন নাটকে জয়সিংহের অন্তর্দ্ব›দ্ব ও আত্মবিসর্জন সবচেয়ে উলে­খযোগ্য ঘটনা। জয়সিংহই এ নাটকের নায়ক। তাছাড়া রাজর্ষি নামের মধ্যে কোনো নাটকীয়তার গন্ধ না থাকায় নাট্যকার রাজর্ষি নামকরণ বর্জন করেছেন।

এ নাটকের মূল উপজীব্য প্রেম ও প্রতাপের দ্ব›দ্ব। মিথ্যা ধর্ম-বোধের সঙ্গে উদার মানবতার দ্ব›দ্ব। একদিকে অর্থহীন ধর্মের অন্ধ সংস্কার এবং প্রচলিত যুক্তিহীন প্রথা, অন্যদিকে, চিরসত্য মানবধর্ম, হৃদয়ধর্ম তথা উদার মানবতাবাদ। মানুষ সৃষ্ট আচার বিধির সঙ্গে হৃদয়ের পরম সত্য প্রেমের; হিংসার সঙ্গে অহিংসার দ্ব›দ্ব।

প্রেমের পক্ষে রাজা গোবিন্দমাণিক্য ও অপর্ণা। অন্যদিকে রঘুপতি ও গুণবতী। এই দুই পক্ষের মাঝে পড়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে আত্মবিসর্জন দিয়েছে জয়সিংহ। জয়সিংহের আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে রঘুপতির অন্তরে চেতনার উদ্ভব এবং শেষ পর্যন্ত মানবতা তথা হৃদয়ধর্মের জয় ঘোষিত হয়।

বিসর্জন নাটকের মঞ্চায়ন

বিসর্জনের নামকরণের অপর্ণ:

অপর্ণার ছাগশিশু বলির মধ্য দিয়ে নাটকের দ্ব›েদ্বর বীজ অঙ্কুরিত হয়। রাণী গুণবতী একটি প্রাণের আশায় উদগ্রীব ; অথচ দেবীর পায়ে মানত করে শত শত প্রাণ। এ বিরোধিতা নাটকের দ্ব›দ্ব সংঘাতকে গতিদান করেছে।

 রাজা গোবিন্দমাণিক্য রাজ্যে পশুবলি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে রঘুপতি ক্ষেপে যায়। রাণীর পুজো অসমাপ্ত থাকে বলে রাণী রঘুপতির পক্ষ নিয়ে রাজার বিদরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। রঘুপতি রাজার ছোট ভাই  নক্ষত্র রায়কেও প্রলোভিত করে পক্ষে আনে। ছলনা করে জয়সিংহকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেয় যে, জয়সিংহ গোবিন্দমাণিক্যের রক্ত তথা রাজ রক্ত এনে দেবে শ্রাবণের শেষ রাতে।  দ্বিধা-বিভক্ত ক্ষত-বিক্ষত জয়সিংহ শেষ পর্যন্ত নিজের বুকের রক্ত দিয়ে দেবীর পা ধুয়ে দেয়।

             এদিকে রাণী ও রাজার বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। রাণী দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নেন পুজো ও বলির। প্রস্তুতি নিয়ে ছুটে যান মন্দিরে। রাণী মন্দিরে আসার আগেই জয়সিংহের আত্মবিসর্জনে রঘুপতি বিহŸল, বিচলিত, বিক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী । এতদিনের দম্ভ, প্রথা, সংস্কার, বিশ্বাস সব কিছু আচ্ছন্ন করে ফেলে জয়সিংহের মৃত্যু। রঘুপতির অন্তর বেদনায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। দূরে গোমতীর জলে প্রতিমা ছুঁড়ে ফেলে দেয় রঘুপতি। ঠিক এ সময়ে রাণী আসে মন্দিরে। দেখেন দেবী নেই। রঘুপতিকে জিজ্ঞাসা করলে সে বলে Ñ

নাই ঊর্ধ্বে নাই; নিম্নে নাই, কোথাও সে
নাই। কোথাও সে ছিল না কখনো।

গুণবতীর মোহভঙ্গ হয়। সব কিছু ফেলে রাজাকে খুঁজতে থাকে।
বল শিঘ্র কোন পথে গেছে মহারাজ।
সকল অন্ধত্ব আর বিশ্বাস বিসর্জন দিয়ে রাজার কাছেই ফিরে যেতে চান তিনি। অপর্ণার আহŸানে রঘুপতিও মন্দির ছেড়ে পথে বের হয়।

         নাটকের কাহিনী শেষ পর্যন্ত পরিণতি পেয়েছে সার্থক ট্র্যাজেডিতে। নাটকে বিসর্জিত হয়েছে জয়সিংহের জীবনের; বিসর্জিত হয়েছে রঘুপতির চিরলালিত বিশ্বাসের, বিসর্জিত হয়েছে রাজা গোবিন্দমাণিক্যের সিংহাসনের, বিসর্জিত হয়েছে অপর্ণার ছাগশিশুর। এছাড়াও রাণী গুণবতী বিসর্জন দিয়েছে অন্ধত্ব ও বিশ্বাস, বিসর্জিত হয়েছে নিষ্ঠুর প্রথার দৌরাত্ম্য, বিসর্জিত হয়েছে হিংসার। নক্ষত্র রায়ের রাজ্যলোভের মোহ বিসর্জিত হয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে দ্ব›দ্ব বিসর্জিত হয়েছে। রাণী প্রাণের বিনিময়ে যে মাতৃত্ব চায় সেই স্বার্থপর মাতৃত্ব বিসর্জিত হয়েছে। রঘুপতির অন্তর থেকে আত্মঅহমিকা , গর্ব, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও হিংস্রতা বিসর্জিত হয়েছে।

            রাজ্যের সকল ধর্মপ্রাণ জনগণ যে পাথরের মূর্তিকে দেবী বলে মানত; যার পায়ে বছরের পর বছর বলি দিয়ে এসেছে; সেই দেবী মূর্তি বিসর্জিত হয়েছে। বলি প্রথাও বিসর্জিত হয়েছে। পাথরের মূর্তির স্থানে মানব দেবীর আগমন ঘটেছে।

দেবী আজ এসেছে ফিরে আমার দেবীর মাঝে।

এভাবে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে নাটক বিসর্জন বিসর্জন হয়ে উঠেছে।
বিসর্জন নাটক সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মন্তব্য হল Ñ

নাটকের শেষে রঘুপতি প্রতিমা বিসর্জন দিলেন, এই বাইরের ঘটনা ঘটল। কিন্তু এই নাটকে এর চেয়েও মহত্তর আরেক বিসর্জন হয়েছে। জয়সিংহ তার প্রাণ বিসর্জন দিয়ে রঘুপতির মনে চেতনার সঞ্চার করে দিয়েছিল।

         সুতরাং , প্রতিমা বিসর্জন এই নাটকের শেষ কথা নয়। তার চেয়ে বড় বথা হল জয়সিংহের আত্মত্যাগ। কারণ, তখনই রঘুপতি সুস্পষ্টভাবে এই সত্যকে অনুভব করতে পারলো যে, প্রেম হিংসার পথে চলে না। বিশ্বমাতার পুজো প্রেমের দ্বারাই হয়। এই মৃত্যুতে সে বুঝতে পারলো যে, সে যা হারাল তা কত মূল্যবান। ছাগশিশুর পক্ষে প্রাণ কত সত্য জিনিস, সে-কথা অপর্ণাই বুঝেছিল, কিন্তু  রঘুপতির পক্ষে তা বুঝতে সময় লেগেছিল। সে প্রিয়জনকে হারিয়ে নিদাদরুণভাবে অনুভব করতে পারল যে, প্রাণের মূল্য কত বেশি, তাকে আঘাত করলে তার মধ্যে কত বেদনা।

          পরিশেষে বলা যায় যে, নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ নাটকের মূলভাবকে কেন্দ্র করে তাঁর নাটকের নাম বিসর্জন রেখেছেন। এখানে একাধারে ঘটেছে প্রতিমা বিসর্জন, জয়সিংহের আত্মবিসর্জন, রঘুপতির মন থেকে হিংসার বিসর্জন, রাণী গুণবতীর তথাকথিত মাতৃত্বের বিসর্জন এবং দীর্ঘ দিন থেকে গণমানসে লালিত একটি বিশ্বাসের বিসর্জন। তাই, এসব দিক বিচার করে বলা যায় নাটকের নামকরণ বিসর্জন সার্থক। 

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

2 Responses

  1. আপনার মত শ্রদ্ধেয় স্যার পেয়ে আমার বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়া সার্থক হয়েছে। শিক্ষাগুরু আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *