উচ্চারণস্থল থেকে মহাপ্রাণ-অল্পপ্রাণ—বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনির সহজ শ্রেণিবিন্যাস
ব্যঞ্জনধ্বনির বিচার করার আগে জেনে নিই ব্যঞ্জনধ্বনি শব্দটির উৎপত্তি। ব্যঞ্জনধ্বনি- গ্রিক শব্দ কনসোনান্স বা কনসানানতিস থেকে ইংরেজি কনসোনাষ্ট শব্দের উৎপত্তি। গ্রিসে শব্দ দুটোর অর্থ ছিল একত্রে উচ্চারণযোগ্য। এখানে একত্রে বলতে স্বরকে বোঝানো হয়েছে। প্রাচীন কাল থেকে ইউরোপসহ আমাদের দেশে ব্যঞ্জন সম্পর্কে এ রকম ধারণাই প্রশ্রয় পেয়েছে। মুহম্মাদ শহীদুল্লাহ যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা মূলত গ্রিক ব্যঞ্জন-ধারণার মতই-
যাহা স্বরের সাহায্যে উচ্চারিত হয়, তাহাকে ব্যঞ্জন বলে।
পরবর্তীকালে বিশ শতকের প্রথম দিকে ব্যঞ্জনের ধারণা পাশ্চাত্যের মতো আমাদের দেশেও পরিবর্তিত হয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল হাই পূর্বসূরীদের চেয়ে পৃথক সংজ্ঞা দিয়েছেন-
–ফুসফুস নির্গত বাতাস গলনালী, মুখবিবর কিংবা মুখের বাইরে (ঠোঁটে বাধ্য পাওয়ার কিংবা শ্রুতিগ্রাহ্য চাপ খাওয়ার ফলে যে-সব ধ্বনি উদগত হয় সেগুলোই ব্যঞ্জনধ্বনি।
ব্যঞ্জনধ্বনির বিচার ও সংজ্ঞা:
পরবর্তীতে আরো জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হয়েছে। নিম্নে বিভিন্ন পণ্ডিতদের সংজ্ঞা দেওয়া হলো-
রফিকুল ইসলাম – ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণে মুখবিবরে বা ঠোঁটে জিহবার সাহায্যে বাধার সৃষ্টি হয়।
মনজুর মোরশেদ-
ব্যঞ্জনধ্বনি গঠনের সময় শ্রুতিগ্রাহ্য শব্দ উৎপাদিত হয় এবং সেই সঙ্গে ফুসফুস থেকে বাতাস বেরুনোর সময় বিভিন্ন বাক-প্রত্যঙ্গের সংস্পর্শের জন্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং বাতাস ঘষা খেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
এ সব সংজ্ঞা সাম্প্রতিককালের এ বিষয়ক মূল্যায়নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিচে দুজন উল্লেখযোগ্য ভাষাবিজ্ঞানীর সংজ্ঞার অনুবাদ দেওয়া হলো-
জ্যাক রিচার্ডস-
ব্যঞ্জন হচ্ছে এমন এক ধরনের বাগধ্বনি যার উচ্চারণে বায়ুপ্রবাহ মুখের ভিতরের কোনো-না-কোনো অংশে, হয় সম্পূর্ণরূপে বা আংশিকভাবে বাধা প্রাপ্ত হয়, অথবা বায়ুর নির্গমপথ সংকীর্ণ হওয়ায় শ্রুতিগ্রাহ্য ঘর্ষণের সৃষ্টি করে বাতাস বেরিয়ে যায়। কিছু ব্যঞ্জনের উচ্চারণে বায়ুপ্রবাহ মুখের মধ্যে রুদ্ধ হয়ে নাক দিয়ে নির্গত হয়।
পি. এইচ, ম্যাথুউস-
ব্যঞ্জন হচ্ছে সেই সব বাগধ্বনি যেগুলির উচ্চারণে বায়ুপ্রবাহ মুখের কোনো-না-কোনো অংশে, গলার মধ্যে অথবা স্বরযন্ত্রে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় যথেষ্ট পরিমাণে শ্রুতিগ্রাহ্য ঘর্ষণের সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ কিছুটা প্রতিবন্ধকতা ছাড়া ব্যঞ্জনঞ্চধ্বনি উচ্চারিত হয় না।
সব সংজ্ঞার শেষে বলা যায়- বাক-প্রত্যঙ্গে বাধাই ব্যঞ্জনধ্বনিকে স্বরধ্বনি থেকে পৃথক করেছে। সে হিসেবে বলা যায়, ব্যঞ্জন হচ্ছে মূলত সেই ধ্বনি যে-ধ্বনির সৃষ্টিতে ফুসফুসীয় বায়ু বাগযন্ত্রে বাধা পেয়ে নির্গত হয়।
ব্যঞ্জনধ্বনির বিচার ও শ্রেণিবিন্যাস:

ব্যঞ্জনধ্বনি বিচারের মাপকাঠি:
প্রতিটি বাঞ্জনধ্বনিই একে অন্য থেকে পৃথক। এই স্বাতন্ত্র্য বিচারের জন্য রয়েছে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। প্রচলিত অর্থে একে ব্যঞ্জনধ্বনি বিচারের মাপাকাঠি বলে। ব্যঞ্জনধ্বনি বিচারের মাপিকাঠি পাঁচটি-
১. উচ্চারণ স্থান বিচার
২. উচ্চারণরীতি বিচার (উচ্চারণ প্রক্রিয়া)
৩. কোমল তালুর অবস্থা বিচার
৪. স্বরতন্ত্রের অবস্থা বিচার
৫. বাতাসের চাপের আধিক্য বিচার
উচ্চারণমূলক ধ্বনিবিজ্ঞানে বাগধ্বনির বিচার করতে গিয়ে ধ্বনিবিজ্ঞানীরা সাধারণত নিম্নোক্ত মানদণ্ডগুলিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। যেমন-
ক) বায়ুপ্রবাহ কৌশল,
খ) স্বরতন্ত্রের অনুরণনের অবস্থা
গ) কোমল তালুর অবস্থা
ঘ) ফানির উচ্চারণ স্থান।
ঙ) উচ্চারণরীতি
সেদিক বিচারে বলা যায় প্রচলিত মাপকাঠিগুলোর সাথে উক্ত মানদণ্ডগুলোর সামঞ্জস্য রয়েছে।
এবার মাপকাঠির আলোকে ব্যঞ্জনধ্বনিগুলোর বিচার করে দেখা যেতে পারে।
১. উচ্চারণ স্থান অনুসারে ব্যঞ্জনধ্বনির বিচার:
উচ্চারণস্থান বলতে মূলত ধ্বনির উচ্চারণে সংশ্লিষ্ট প্রত্যঙ্গগুলোর পরস্পর ও আনুভূমিক সম্পর্ককে বোঝায়। এখানে বিচার্য ধ্বনি উৎপাদনে সক্রিয় উচ্চারক প্রতাঙ্গের কোন বিশেষ অংশে বাতাস বাধা পাচ্ছে। উচ্চারণস্থান অনুসারে ধ্বনি বিচারের সময় ধ্বনির নামকরণে সক্রিয় উচ্চারক প্রত্যঙ্গগুলির চেয়ে নিষ্ক্রিয় উচ্চারক প্রতাঙ্গসমূহ প্রাধান্য পায় বেশি। উচ্চারণস্থানগত বিবেচনার বিষয় মুখ্যত দুটি।
- সক্রিয় উচ্চারক প্রত্যঙ্গগুলি সনাক্ত করা।
- নিষ্ক্রিয় উচ্চারক প্রত্যঙ্গ অনুযায়ী ধ্বনিগুলোর নামকরণ করা।
উচ্চারণস্থান অনুসারে ব্যঞ্জনধ্বনিগুলির এগারটি সম্ভাব্য স্থান নির্দেশ করা হয়। নিচে এগুলির উল্লেখ করে বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিগুলির উচ্চারণস্থান ও সে অনুসারে ব্যঞ্জনধ্বনিগুলোর বিচার করা হলো।
উচ্চারণ স্থানগুলো হলো দন্ত-ওষ্ঠ, দ্বি-ওষ্ঠ, দন্তমূল, মূর্ধা, তালু, জিহ্বামূল, আলজিভ, গলনালি ও কণ্ঠনালি।
উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনিগুলোর বিচার করে নিম্নোক্তভাবে সাজানো যায়-
ক) কণ্ঠনালীয়: কণ্ঠনালীর মধ্যে ধ্বনিবাহী বাতাস বাধা পেয়ে উচ্চারিত ধ্বনিগুলোই কণ্ঠনালীয় ধ্বনি। বাংলায় এ জাতীয় ধ্বনি (হ)।
স্বরতন্ত্রীদ্বয় সংকুচিত হয়ে ব্যয়ুপথ সংকীর্ণ করে এবং একেবারে বন্ধ হয় না। এভাবে উচ্চারিত ধ্বনিই কণ্ঠনালীয় বা আন্তঃস্বরতন্ত্রীজাত ধ্বনি।
খ) জিহ্বামূলীয় ধ্বনি (পশ্চাৎ তালুজাত বা কোমল তালুজাত): জিভের পিছনের অংশ উঁচু হয়ে আলজিভের মূলের কাছাকাছি নরমতালু স্পর্শ করে যে-সব ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকে জিহ্বলামূলীয় বলে। বাংলা এ জাতীয় ধ্বনিগুলো হলো- ক, খ, গ, ঘ, ঙ।
গ) প্রশস্ত দন্তমূলীয় বা তালব্য ধ্বনিঃ জিভ প্রসারিত হয়ে শক্ত তালু স্পর্শ করে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, সেগুলোই প্রশস্তদন্তমূলীয় বা তালব্য ধ্বনি বলে। জিতের পাতা ও শক্ত তালুর সংস্পর্শে এ ধ্বনি উচ্চারিত। যেমন- চ, ছ, জ, ঝ ।
ঘ) পশ্চাৎ দন্তমূলীয় ধ্বনি: উপরের পাটি দাঁতের গোড়ার শেষাংশ ও শক্ততাপুর আরম্ভের স্থানে জিভের পাতা উঁচু করে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকে পশ্চাৎ দন্তমূলীয় ধ্বনি বলে। যেমন-শ।
ঙ) তালব্য-দন্তমূলীয় বা দন্তমূলীয় মূর্ধন্য বা দন্তমূলীয় প্রতিবেষ্টিত ধ্বনি: উপর পাটি দাঁতের গোড়ার সঙ্গে জিভের ডগা একটু উল্টো করে যে ধ্বনি পাওয়া যায়। অর্থাৎ জিভের সামনের অংশ উপরে গিয়ে শক্ত তালু স্পর্শ করে তালব্য দন্তমূলীয় ধ্বনি উচ্চারিত হয়। এভাবে উচ্চারিত বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো হলো-ট. ঠ, ড, ঢ।
চ) দন্তমূলীয় ধ্বনি: জিভের অগ্রভাগ ও উপরের পাটি দাঁতের গোড়ার সংস্পর্শে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয় তাকে দন্তমুলীয় ধ্বনি বলে। যেমন র, ল, ন।
ছ) দন্ত্য ধ্বনি: জিভের ডগা উপরের পাটি দাঁতের নিম্নাংশকে স্পর্শ করে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয় তাকে দন্ত্যধ্বনি বলে। যেমন-ত. গ. দ .ধ।
জ) ওষ্ঠ্য-ধ্বনি বা দ্বি-ওষ্ঠ্য: দুই ঠোঁটের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনিই ওষ্ঠা বা দ্বি-ওষ্ঠ্য ধ্বনি। বাংলা ভাষায় প, ফ, ব, ভ, ম ওষ্ঠ্য-ধ্বনি বা দ্বি-ওষ্ঠ্য ধ্বনি।
ঝ) দন্ত-ওষ্ঠ্য ধ্বনি: নিচের ঠোঁট উপরের পাটি দাঁত সম্পূর্ণ স্পর্শ করে বা প্রায় স্পর্শ করে যে সব ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকে দন্ত-ওষ্ঠ্য ধ্বনি বলে। যেমন ইংরেজি ‘এফ’, এবং ‘ভি’।
বাংলা ভাষায় দন্ত-ওষ্ঠ্য ধ্বনি নেই। কিন্তু বাংলা প-বর্গীয় ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো (প, ফ, ব, ভ, ম) অসতর্কতা হেতু দন্ত-ওষ্ঠ্য ধ্বনি হতে পারে।
ঞ) আলজিহ্বা ধ্বনি : জিভের পেছনের অংশ ও আলজিভের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনিগুলোকে আলজিহবা ধধ্বনি নামে চিহ্নিত করা হয়। আফ্রিকায় বহু উপভাষায় এবং আরবি-ফারসি ভাষায় আলজিহবা ধ্বনি রয়েছে। বাংলায় এ ধ্বনি নেই।
ট) গলনালীয় ধ্বনি: এ জাতীয় ধ্বনি উচ্চারণে গলনালির মাংসপেশিতে বাতাস বাধ্য পায়। গলনালীয় ধ্বনিসমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে আরবিই সমধিক পরিচিত।

উচ্চারণস্থান বিচারে আমরা বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিগুলির উচ্চারণস্থান নিম্নোক্তভাবে দেখাতে পারি:
ক) কণ্ঠনালীয়: হ
খ) জিহ্বামূলীয় ধ্বনিঃ ক খ গ ঘ ঙ ।
গ) প্রশস্ত দন্তমূলীয় ধ্বনি বা তালব্য ধ্বনি: চ ছ জ ঝ।
ঘ) পশ্চাৎ দন্তমূলীয় ধ্বনি: শ।
ঙ) মূর্ধন্য ধ্বনি/ তালবা-দন্তমূলীয় বা দন্তমূলীয় মূর্ধন্য বা দন্তমূলীয় প্রতিবেষ্টিত ধ্বনি: ট ঠ ড ঢ
চ) দন্তমূলীয় ধ্বনিঃ র ল ন ।
ছ) দন্ত্য- ধ্বনি: ত থ দ ধ
জ) ওষ্ঠ্য ধ্বনি: প ফ ব ভ ম
বাকি অংশ অন্য কোনো দিন
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।
সুন্দর হয়েছে। বুঝতে পেরেছি
মা শা আল্লাহ,খুব ভাল লাগল।
সুন্দর ভাবে পড়া টা গুছিয়ে দেবার জন্য শ্রদ্ধেয় স্যার কে অসংখ্য ধন্যবাদ।
স্যার আসা করবো চাকরি পরীক্ষার কিছু প্রশ্ন ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে দেওয়ার।
মানে যে বিষয়ের উপর আমাদের পড়ানো হচ্ছে।
তোমদের উপকার হলে আমার পরিশ্রম সার্থক হবে।