উপন্যাসের মূল বৈশিষ্ট্য, কাঠামোগত রূপ ও বিভিন্ন ধরনের সাহিত্যিক শাখার বিশ্লেষণ
আধুনিক যুগের অন্যতম জনপ্রিয় শাখা উপন্যাস। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Novel| Novel শব্দটি Novella (ইটালিয়ান শব্দ) থেকে এসেছে। এর মূল Novas– এর অর্থ ‘নতুন’। শব্দটির ব্যুৎপত্তি উপ-নি-অস=অ(ঘঞ)- যার অর্থ অস্বাভাবিক কল্পিত কাহিনী। তবে আধুনিককালে কল্পিত কাহিনী মাত্রই উপন্যাস নয়। এখন Novel হলো বিশেষ রীতি ও নিয়মের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিকাঠামোয় যে কল্পিত কাহিনী বিস্তৃত হয়ে পাঠকের মনোরঞ্জনার্থে উপস্থাপিত হয়, তা-ই উপন্যাস।
এ শিল্প নিয়ে নানা মুনি নানা মত প্রকাশ করেছেন।
রিডারস ডাইজেস্ট এনসাইক্লোপেডিয়াতে Novel এর সংজ্ঞা এরকম-
Novel is a fictitious prose narrative or tale presenting a picture of a real life of the men and women portrayed.”
ইংরেজ ঔপন্যাসিক E.M.Foster বলেছেনÑ
Novel is prose narrative of sufficient length to fill one or two volumes
শ্রীশচন্দ্রদাস বলেন-
লেখকের ব্যক্তিগত জীবনদর্শন ও জীবানুভূতি কোন বাস্তব কাহিনী অবলম্বন করে যে বর্ণনাত্মক শিল্পকার্যে রূপায়িত হয়, তাকে Novel বলে।
ফিল্ডিং এর মতে-
“যেমনটি জীবনে ও সমাজে ঘটে তেমনটি ফুটিয়ে তুলতে হবে, তার চেয়ে বেশিও নয়, কমও নয়।”
দেবীপদ ভট্টাচার্যের মতে-
“একটি বিশ্বাস্য কাহিনী, পরিচিত নর-নারী, সমাজের বাস্তব সমস্যা মানুষের হৃদয় বেদনা যখন একটি সুগঠন লাভ করে তখনই আমরা বলি Novel ।”
তাহলে বলা যায় যে, দৈনন্দিন জীবন চিত্র লেককের শিল্পপ্রতিভাকে আশ্রয় করে বর্ণনাত্মকভাবে উপস্থাপিত হয়ে গল্পে পরিণত হলে, তাকে Novel বলে। বিদগ্ধ পাঠক এর মধ্যে আত্মজিজ্ঞাসা ও জীবন জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পেতে চেষ্টা করে।
গঠন কৌশল ও বৈশিষ্ট্য/স্বরূপ
Novel এর নির্দিষ্ট গঠন কৌশল রয়েছে। রয়েছে একান্ত আবশ্য উপাদান। হাডসন নির্দেশিত ছয়টি উপকরণ-
(১) কাহিনী বা প্লট, (২) চরিত্র (৩) অবস্থান বা পশ্চাৎপট (৪) লেখকের সামগ্রিক জীবনদর্শন (৫) রচনাশৈলি এবং ভাষা ও (৬) আয়তন।
হরপ্রসাদমিত্র Novel এর কলাকৌশলের আলোচনায় প্রধানত তিনটি বিষয়ে দৃষ্টি দিতে বলেনÑ
এক, আখ্যান বা প্লটের কথা
দুই, আখ্যানবস্তুর দেশকালগত অবস্থান এবং পরিবর্তন।
তিন, চরিত্র গঠন ও পরিবর্তন, পরিনতি ও পরিব্যাপ্তির প্রসঙ্গ।
বিস্তারিত আলোচনা:
অন্যদিকে সমালোচকেরা পাঁচটি সূত্রের কথা বলেছেন গঠন কৌশলকে সামনে রেখে। যেমনÑ প্রস্তাবনা, সমস্যার উপস্থাপনা, আখ্যানভাগের মধ্যে জটিলতার প্রবেশ, চরম সংকট মুহূর্ত ও সংকট বিমোচন বা উপসংহার। গঠনরীতির এসব শর্তাবলির আলোকে বলা যায় যে, Novel র আখ্যান বা প্লট, চরিত্র, পরিবেশ বা পটভূমি, সংলাপ, বর্ণনা, রচনাশৈলি, মনস্তত্ত¡ বিশ্লেষণ ইত্যাদির মধ্যে লেখক একটা কার্যকারণ সূত্র আরোপ করে একটি কাহিনী গড়ে তোলেন এবং নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী তার মধ্যে কোনো একা জীবন সত্যকে রূপায়িত করেন।
বিষয়টি কল্পিত হলেও বর্ণনা ও সূ² বিশ্লেষণের গুণে খন্ড খন্ড ঘটনাকে একটি কাহিনীতে মালার মতো গেঁথে তাঁকে এমন জীবন্ত করে তোলেন, তাতে সমগ্র উপন্যাসটিই বাস্তব রূপে ধরা দেয়। আসলে লেখক বাস্তব জীবনের রূপকার, কোনো প্রচারক বা প্রতিবেদক নন।
কাহিনীকে গতিশীল করে রক্তমাংসে গড়া কতকগুলো চরিত্র। আসলে ঘটনা ও চরিত্র পরস্পরের পরিপূরক হয়ে কাহিনীকে হৃদয়গ্রাহী করে তোলে। চরিত্রগুলোর মুখে সহজ সরল ও সাবলীল সংলাপ এবং ঘটনার বর্ণনার জন্য ভাষা, উপন্যাসের স্থান, কাল ও পরিবেশকে ফুটিয়ে তোলে। ভাষা ও রচনাশৈলিই Novel কে চিত্তাকর্ষক করে তোলে।
ঔপন্যাসিক রসাল করে কাহিনী বর্ণনা করেন। পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য লেখককে উপযুক্ত বর্ণনা বা বাণীভঙ্গি বেছে নিতে হয়। বর্ণনায় নাকীয়তা থাকতে পারে, গতিময়তাও থাকতে পারে। বর্ণনার গুণেই Novel পাঠকের হৃদয়ে প্রবেশ করে। নাটকের মঞ্চ বা দৃশ্যাবলি যে কাজ করে ঔপন্যাসিক বর্ণনার সাহায্যে সেই কাজটি করেন, তাই উপন্যাসকে অনেকে ‘পকেট থিয়েটার’ বলে।
কাহিনী ও চরিত্রের সাথে মিল রেখে পরিবেশ কল্পনা করা শ্রেষ্ঠ Novel র বৈশিষ্ট্য। বাস্তবও সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশ হতে হবে। দেশ-কাল-সমাজের রুচি-সংস্কৃতি অনুযায়ী সংলাপ, ভাষা, পরিবেশ ও পটভূমি নির্বাচন করা উচিত।
Novel র মধ্যে লেখকের জীবনদর্শন প্রকাশ পায়। লেখকের ব্যক্তিসত্তা, অনুভূতি, জীবন ও জগত সম্পর্কে ধারণাই জীবন দর্শন। জীবনদর্শনের সাহায্যে লেখক জগৎ ও জীবনের রহস্য উৎঘাটন করতে চান।
যত শর্তই থাকুক না কেন, মূল কথা Novel কে উপভোগ্য হতে হবে। হতে হবে আনন্দ সঞ্চারী ও আনন্দদানকারী। এর জন্য লেক কিছু কৌশল নিয়ে থাকেন। যেমনÑ বিদ্রƒপ, কটাক্ষ, হাস্য-কৌতুক ইত্যাদি। পাঠকের হৃদয়কে মহৎ আনন্দে অভিভূত, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে এক মহৎ উপলদ্ধিতে যে এ শিল্পকে নিয়ে যেতে পারে তা-ই মহৎ শিল্প হবে।
অতএব, সুনির্বাচিত কাহিনী নির্বাচন, বাস্তব চরিত্র সৃষ্টি, উপযুক্ত ভাষা প্রয়োগ, বাস্তব পরিবেশ পরিকল্পনা, ব্যাপকতর আকৃতি, আকর্ষণীয় গল্পরস, মনোমুগ্ধ বর্ণনাভঙ্গি, সাবলীল সংলাপ, জীবনদর্শন, হাস্যকৌতুক ও কটাক্ষের প্রয়োগ সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের যথার্থ মূল্যায়ণ একটি সার্থক Novel র রচনার পূর্বশর্ত। আর এসব পূর্বশর্ত পূরণ করার ক্ষমতাই উপন্যাসের গঠন-কৌশল।

প্রকারভেদ ঃ
Novel র নির্দিষ্ট শ্রেণীবিভাগ করা বড় কঠিন। বিষয়বস্তু ও প্রবণতা অনুসারে উপন্যাসের শ্রেণীবিভাগ উলেখ করা হলোÑ
(১) ঐতিহাসিক Novel ঃ ইতিহাসকে অবলম্বন করে মূল ঘটনা সত্যকে বিবৃত না করে, কবি কল্পনার সাহায্যে তাকে সংকুচিত প্রসারিত করে যে Novel রচিত হয়, তাকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে। যেমন- বঙ্কিমের ‘রাজসিংহ’, রবিন্দ্রনাথের ‘রাজর্ষি’ ইত্যাদি।
(২) সামাজিক ও পারিবারিক ঃ পরিবার ও সমাজ জীবনের নানা বিষয়বস্তু করে যে উপন্যাস রচিত, তাকে সামাজিক ও পারিবারিক Novel বলে। বঙ্কিমের ‘বৃষবৃক্ষ’, কৃষ্ণকান্তের উইল’, রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’ ইত্যাদি।
(৩) কাব্যধর্মী Novel ঃ যে Novel র ভাজে ভাজে কাব্যগুণ প্রকাশ পায় তাকে কাব্যধর্মী উপন্যাস বলে। যেমন- রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’, নজরুলের‘ ব্যথার দান’ ইত্যাদি।
(৪) মনস্তাত্তিক Novel ঃ যে উপন্যাসে চরিত্রের মনোবিশ্লেষণ লেখকের কাছে মূখ্য হয়ে ওঠে, সে ধরনের উপন্যাসকে মনস্তাত্তি¡ক Novel বলে। যেমন- রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’।
(৫) ব্যাঙ্গাত্মক Novel ঃ সমাজের অসঙ্গতিকে ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে যে উপন্যাস উপস্থাপন করা হয়, তাকে ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস বলে। যেমন- পরশুরামের ও সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনা।
(৬) গোয়েন্দা বা ডিটেকটিভ Novel খুন, হত্যা ইত্যাদি বিষয়ের রহস্য উদঘাটনের যে দুঃসাহসিক অভিযান বর্ণিত হয় যে উপন্যাসে, তাকে গোয়েদা বা ডিটেকটিভ উপন্যাস বলে। যেমনÑ বনফুলের ‘পঞ্চপর্ব’।
(৭) আত্মজীবনীমূলকNovel যে উপন্যাসে লেখকের ব্যাক্তিগত জীবনের ঘটনা শিল্পময় হয়ে ওঠে, তাকে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস বলে। যেমন- শরৎচন্দ্রের ‘চারকন্ডে’ লেখা “শ্রীকান্ত” শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত।
(৮) আঞ্চলিক Novel বিশেষ কোনো অঞ্চল ও সে অঞ্চলের নির্দিষ্ট সমাজের মানুষের সামগ্রিক বিষয় যে উপন্যাসে শিল্পময় হয়ে ওঠে, তাকে আঞ্চলিক উপন্যাস বলে। যেমন- মানিকের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অদ্বৈত মল্লবর্মনের ‘ তিতাস একটি নদীর নাম’ ইত্যাদি।
(৯) আত্মজীবনীমূলক ভ্রমনোপন্যাস ঃ লেখকের ভ্রমন পথের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে আত্মজীবনীর আদলে উপন্যাসের মতো সরস ও উপভোগ্য করে তুললে, তাকে আত্মজীবনীমূলক ভ্রমনোপন্যাস বলে। যেমন- সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে-বিদেশে’।
এছাড়াও নানা ধরন Novel রয়েছ
(১) উদ্দেশ্যমূলক Novel ঃ শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ (২) পত্রোপন্যাস ঃ নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব’ (৩) লোমহর্ষক ঃ ভিতিপ্রদ কাহিনী যাতে বর্ণিত হয়। (৪) কাহিনীমূলকNovel ঃ দীনেশ সেনের ‘শ্যামল ও কজ্জল’ (৫) বীরত্বব্যঞ্জক ঃ মনীন্দ্রলাল বসুর ’মনীন্দ্রলাল বসুর ‘ অজয়কুমার’ (৬) পৌরানিক Novel , (৭) রূপক Novel , (৮) রোমাঞ্চকর Novel , (৯) কিশোর , (১০) হাস্যরসাত্মক (১১) পরিপূরক # যেমন- শ্রীকান্তের পরিপূরক প্রমথনাথ বিশীর শ্রীকান্ত পঞ্চম ও ষষ্ঠ পর্ব” (১২) রাজনৈতিক – সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’।
উপন্যাসের উপর ভিডিও ক্লাস– https://www.youtube.com/watch?v=Kl3woeWYEHQ
অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
ভুলে যাওয়া কিছু বিষয় নতুন করে জানলাম!
ধন্যবাদ, স্যার! 🙏
প্রিয় স্যার আপনার এই লেখাটি উপন্যাসের সাহিত্যিক ও দার্শনিক মাত্রাগুলোর একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু উপস্থাপনা। এটি আমাদের সাহিত্যের ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ। পাঠকদের জন্য উপন্যাসের গঠন ও বৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি চমৎকার দিকনির্দেশনা। আপনাকে ধন্যবাদ এমন তথ্যবহুল আর গোছালো লেখা উপহার দেওয়ার জন্য।
উপন্যাসের গঠন ও বৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি চমৎকার দিকনির্দেশনা।
উপন্যাস এর সকল বিষয়ের উপর পরিপূর্ণ একটি কোর্স। ধন্যবাদ স্যার।
তোমাদের জন্যই এ পরিশ্রম