দুঃখ ও মানবিক বিপর্যয়ের নান্দনিক রূপ: ট্র্যাজেডির দর্শন ও সাহিত্যিক তাৎপর্য

ট্র্যাজেডির সংজ্ঞা ও প্রকৃতি


ট্র্যাজেডির সংজ্ঞা ও প্রকৃতি:

 রস বিচারে নাটককে যে কয়ভাগে ভাগ করা যায়, ট্র্যাজেডি তার মধ্যে অন্যতম। বাংলায় ট্্র্যাজেডি নাটকের আবির্ভাব পাশ্চাত্য নাটকের অনুকরণে, পাশ্চাত্যে প্রাচীন কাল থেকেই ট্্র্যাজেডির চর্চা হয়ে আসছে। তাই ট্্র্যাজেডি সম্পর্কে পাশ্চাত্যেই বেশি আলোচনা হয়েছে। 

        ট্র্যাজেডি: গ্রিক শব্দ ট্রাগোস থেকে ট্র্যাজেডি শব্দের উৎপত্তি। ট্রাগোস শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো ছাগরূপী কোরাস বা ছাগগীতি। গ্রিসের শস্য ও সুরার দেবতা দিওনুসাসের মন্দিরে ছাগ বলিদানের সময় সমবেত কণ্ঠে দিওনুসাসের করুণ কাহিনীকে গানের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হতো।  অনুমান করা হয় ছাগ বলিদানের সময় সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত গানের সাথে সংলাপ যুক্ত হয়ে বেদনার গান বেদনার নাটক হয়ে উঠেছে।

        ট্র্যাজেডি সম্পর্কে গ্রিক নন্দনতত্ত¡বিদগণ আলোচনা করেছেন এবং এর সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপ নির্ণয় করেছেন। গ্রিক নন্দনতত্ত¡বিদগণের মধ্যে এরিস্টটল ট্র্যাজেডি সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করেছেন। 

       এরিস্টটলের ট্র্যাজেডির সংজ্ঞা ঃ
 
রঙ্গমঞ্চে নায়ক বা নায়িকার গতিমান জীবন কাহিনীর দৃশ্য পরম্পরা উপস্থাপিত করে যে নাটক দর্শকের হৃদয়ে উদ্রিক্ত ভীতি ও করুণা প্রশমনের মাধ্যমে তার মনে  করুণ রসের আনন্দ সৃষ্টি করে তাকেই ট্র্যাজেডি বলে। 

এরিস্টটলের সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করলে ট্র্যাজেডির নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় Ñ
ক্স ট্র্যাজেডি হলো জীবনের কোনো ঘটনার অনুকরণ।
ক্স ট্র্যাজেডিতে জীবনের কোনো গুরুতর ঘটনা থাকবে।
ক্স ট্র্যাজেডির ঘটনা স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে এবং এর একটি পরিণতি থাকবে।
ক্স ট্র্যাজেডিতে ছন্দ ও সংগীত ইত্যাদি আনন্দজনক উপাদান থাকবে।
ক্স ট্র্যাজেডি হবে ঘটনাত্মক, বর্ণনামূলক নয়।
ক্স ট্র্যাজেডি করুণা ও আতঙ্কের জন্ম দেবে এবং শেষ পযন্ত ঐ অনুভূতিগুলো থেকে মানুষের মনকে মুক্ত করে ।
ক্স নাটকের সমস্তঘটনা একটি পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে।
ক্স ভাষা হবে বিপুলভাবে অলঙ্কৃত ।

শ্রীশচন্দ্র দাশ ট্র্যাজেডির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন – আত্মদ্বন্দ্বে পরাভূত মানব জীবনের করুণ কাহিনীকে সাধারণত ট্র্যাজেডি বলা হয়।

প্রিক ট্র্যাজেডির দৃষ্টান্ত সফোক্লিস ও ইডিপাস

ট্র্যাজেডি কয়েকটি মূল ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
১. মানুষের মর্যাদা নষ্ট হলে বা জীবনের অপচয় ঘটলে ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়।
২. মানুষ তার ইচ্ছা ও কর্মের দ্বারা নিজ জীবনের পরিণতিকে ডেকে আনে। জীবনের ত্রুটিই তাকে ট্র্যাজেডির দিকে টেনে নিয়ে যায়।
৩. মানুষ নিয়তির হাতে বন্দী। নিয়তির হাত থেকে মুক্তির জন মানুষ সংগ্রাম করে। কিন্তু নিয়তি নির্ধারিত ভাগ্য থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না। নিয়তির হাত থেকে মুক্তির জন্য মানুষ সংগ্রাম করে, কিন্তু নিয়তি নির্ধারিত ভাগ্য থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না।

        ট্র্যাজেডি করুণ রসের কাব্য। ট্র্যাজেডির পরিণতিতে সব সময় যে মৃত্যু অনিবার্য তা নয়। শেক্সপিয়রের ট্র্যজেডিতে মৃত্যু থাকলেও গ্রিক ট্র্যাজেডিতে মৃত্যু অবধারিত নয়। 

সাধারণ বা সামান্য মানুষের ঘটনা দিয়ে প্রকৃত ট্র্যাজেডি হয় না। শক্তিমান ও প্রবল ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের সংগ্রাম ও তার করুণ পরিণতি প্রকৃত ট্র্যাজেডির বিষয়।

মানুষ চায় স্বাধীন ভাবে বাঁচতে ও ইচ্ছাকে পূরণ করতে। সেই সাথে মর্যাদা অর্জন করতে চায়। কিন্তু মানুষ চাইলেই তা পায় না। প্রতিকূল পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করে। শেষ পযন্ত পরাজয় বরণ করে। দর্শক তার সংগ্রাম দেখে মুগ্ধ হয়, আবার পরিণতি দেখে করুণা ও ভয়ে বিহŸল হয়। তাই, ট্র্যাজেডি দর্শককে আনন্দও দেয় ও বেদনাও দেয়।

ট্র্যাজেডির সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভিডিও বার্তা

ট্র্যজেডির আরও কিছু বৈশিষ্ট্য Ñ

ক্স এটি সব সময় বিয়োগাত্মক বা বিষাদাত্মক ।
ক্স এর নায়ক নিয়তির সাথে দ্বদ্বে পর্যুদস্তহলেও আত্মপ্রতিষ্ঠা করতে চায় কিন্তু তা পারে না।
ক্স এর নায়ক কোনো ঘটনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, সে নিজেই সমস্তঘটনার নিয়স্ত্রক।
ক্স এটি বেশির ভাগ দর্শকের হৃদয় আকর্ষণ করে।
ক্স ট্র্যাজেডি দৃশ্য ও পাঠ্যকাব্যের সমন্বয়।
ক্স ট্র্যাজেডির কাহিনীর গতি বেশি , যেন বিদ্যুৎগতি সম্পন্ন।
ক্স ট্র্যাজেডি জগৎ ও জীবনের অতলস্পর্শ রহস্য উদঘাটন করে আর এটাই তার গৌরব।
ক্স মহাকাব্যের মতো এতে সর্গ বিভাগ নেই, রয়েছে অঙ্ক বিভাজন।
ক্স এর নায়কের দোষগুণ উভয়ই থাকতে পারে। সে একেবারেই ভালো বা একেবারেই খারাপ মানুষ হয় না। তার চরিত্রে থাকে দুর্বলতার বীজ এবং এ দুর্বলতার ছিদ্রপথে তার জীবনে ট্র্যাজেডি নেমে আসে।

        ট্র্যাজেডি মহৎ সাহিত্যের পর্যায়ভূক্ত। এরিস্টটলের মতে এ মহৎ সাহিত্যে ছয়টি উপাদান থাকে। এগুলো হলো Ñ বৃত্ত, চরিত্র, বাচন, মনন, দৃশ্য এবং সঙ্গীত। এ সমস্ত  উপাদানের সুষ্ঠু প্রয়োগ ও পারস্পরিক সমন্বয় ট্র্যাজেডিকে দান করে মহিমান্বিত মর্যাদা ও অমরত্ব। 

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, 
বাংলা বিভাগ,
 সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর। 

2 Responses

  1. প্রিয় স্যার আপনার লেখাটি ট্র্যাজেডির নান্দনিক ও দার্শনিক দিকগুলোর একটি সুষ্ঠু ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ প্রদান করেছে। এটি সাহিত্যের ছাত্র-শিক্ষক এবং সাধারণ পাঠকদের জন্য ট্র্যাজেডির মর্ম ও তাৎপর্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি মূল্যবান দলিল হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছি। আপনাকে ধন্যবাদ এমন গোছালো ও তথ্যবহুল একটি লেখা আমাদেরকে পড়তে দিয়ে আলোকিত করার জন্য।

  2. প্রিয় স্যার আপনার লেখাটি ট্র্যাজেডির নান্দনিক ও দার্শনিক দিকগুলোর একটি সুষ্ঠু ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ প্রদান করেছে। এটি সাহিত্যের ছাত্র-শিক্ষক এবং সাধারণ পাঠকদের জন্য ট্র্যাজেডির মর্ম ও তাৎপর্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি মূল্যবান দলিল হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছি। আপনাকে ধন্যবাদ এমন গোছালো ও তথ্যবহুল একটি লেখা আমাদেরকে পড়তে দিয়ে আলোকিত করার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *