পরিভাষার নান্দনিক বিশ্লেষণ
পরিভাষা বলতে কী বুঝি:
পরি+ভাষা=পরিভাষা। এর আক্ষরিক অর্থ-বিশেষ ভাষা। অর্থাৎ পারিভাষিক শব্দের অর্থ হলো কোনো ভাষার মধ্যে বিশেষ অর্থে ব্যবহারযোগ্য শব্দ। পরিভাষা বা পারিভাষিক শব্দ সম্পর্কে পন্ডিতেরা বিভিন্নভাবে মতামত ব্যক্ত করেছেন। মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বাংলা ভাষার ব্যবকরণ গ্রন্থে বলেছেন-
“বাংলা ভাষায় প্রচলিত বিদেশি শব্দের ভাবানুবাদমূলক প্রতিশব্দকে পারিভাষিক শব্দ বলে।”
রাজশেখর বসু ‘চলন্তিকা’ অভিধানে বলেছেন-“অভিধানে ‘ এর অর্থ সংক্ষেপার্থ শব্দ। অর্থাৎ যে শব্দের দ্বারা সংক্ষেপে কোনোও বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্ত করা যায় তা পরিভাষা।”
মাতৃভাষার সমৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন শাস্ত্রীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে নতুন নতুন শব্দের প্রয়োজন হয়। এটা নিজ ভাষার কোনো শব্দ বা বিদেশি মূল শব্দ, বা বিদেশি শব্দের অনুবাদ বা সামান্য পরিবর্তিত রূপ হতে পারে। জ্ঞান বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যেসব শব্দ সুনির্দিষ্ট বা বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয় সেগুলোই পরিভাষা বা পারিভাষিক শব্দ।
পারিভাষিক শব্দের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা যায়Ñ এটি সুদৃঢ় সুনির্দিষ্ট শব্দ, এর অর্থের সঙ্কোচ নেই, প্রসার নেই। এর অর্থ পন্ডিত ব্যক্তিদের দ্বারা নির্ধারিত এবং এগুলো শিক্ষা, শিল্প, দর্শণ, বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে অর্থবোধে সংশয় ঘটে না।
প্রয়োজনীয়তা ঃ
পৃথিবীর সব ভাষায় সমৃদ্ধির জন্য অন্যভাষা থেকে ভাব ও শব্দ সংগ্রহ করে। অন্যভাষা থেকে ভাব সংগ্রহ করতে গিয়ে সব ভাব নিজ ভাষার শব্দ ভান্ডারে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। এ জন্য তা ভাষা থেকে প্রয়োজনীয় শব্দ সরাসরি বা অনুবাদের মাধ্যমে বা কিছু পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গ্রহণ করা হয়। এসব ক্ষেত্রে আক্ষরিক অনুবাদ না করে মাতৃভাষার প্রয়োজন ও অর্থগত সামঞ্জস্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পারিভাষিক শব্দ তৈরি করে নেয়া হয়।
ব্যবহারিক জীবনে কথাবার্তায় পারিভাষিক শব্দের প্রয়োজন না হলেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বা বিভিন্ন শাস্ত্রীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে কোন মূল প্রত্যয় বা সংজ্ঞার প্রকাশে পারিভাষিক শব্দের কোনো বিকল্প নেই। পারিভাষিক শব্দের প্রয়োজনীয়তার কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলোÑ
১। যে কোনো বিষয়ের সামগ্রিক ব্যাপ্তি বোঝানোর জন্য প্রয়োজনীয় শব্দ কোন ভাষাতেই থাকে না। ফলে জ্ঞান বিজ্ঞানের
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর যথাযথ অনুবাদ করতে হলে অবশ্যই পরিভাষা ব্যবহার করতে হয়।
২। এর ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাপর ভাষাসমূহের শব্দভান্ডারের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা জন্মে।
৩। মাতৃভাষার শব্দ ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়।
৪। ভাষার প্রকাশ ক্ষমতার উৎকর্ষ সাধিত হয়।
৫। অনুবাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যথাযথ শব্দের দু®প্রাপ্যতা। সুতরাং এই সমস্যা সমাধানে পরিভাষাই
হচ্ছে একমাত্র সহায়ক উপাদান।
৬। ভাষার গতিশীলতা বৃদ্ধি করে। ফলে ভাষার সৌন্দর্য অনেক গুণ বেড়ে যায়।
পরিভাষা ও বিদেশি শব্দের পার্থক্য
স্বাভাবিকভাবে পরিভাষা ও বিদেশি শব্দ এক মনে হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে এদের মধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পারিভাষিক শব্দ হলো দেশি বা বিদেশি কোনো ভাষার মূল শব্দ কিংবা তার অনুবাদ বা সামান্য পরিবর্তিত রূপ যা কোনো ভাষাগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার প্রয়োজনে (পন্ডিতজনের মাধ্যমে স্বীকৃত) ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সুদৃঢ়ভাবে সুনির্দিষ্ট।
অন্যদিকে বিদেশি শব্দ হলো কোনো বিদেশি ভাষার মূল শব্দ। সেসব বিদেশি শব্দ মাতৃভাষায় স্থান করে নিয়েছে, সে গুলোর আর পরিভাষা করার প্রয়োজন হয় না। কারণ তা মাতৃভাষার নিজস্ব সম্পদ রূপে পরিগণিত হয়। কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানে কোর্ট কাছারিতে প্রশাসনের নানা ক্ষেত্রে এমন কতগুলো বিষয় আছে যা ঠিকমতো বুঝতে সে শব্দগুলোর অনুবাদ বা রূপান্তর করে তাকে সুনির্দিষ্ট ব্যবহারোপযোগী করে নিতে হয়। এ ধরণের শব্দগুলোই পরিভাষা।
একটি বিদেশি শব্দের নানা অর্থ থাকে। ব্যবহারের গুণের আরও নানা অর্থ প্রকাশ পেতে পারে, কিন্তু এর ব্যবহারিক অর্থ সুনির্দিষ্ট, এর অর্থের সংকোচ নেই, প্রসার নেই।
শব্দ ও পরিভাষা ঃ
পারিভাষিক শব্দ কোনো জ্ঞান-ক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্য-জ্ঞাপক ধারণার নাম বা সংজ্ঞা, আর শব্দ হচ্ছে ভাষায় ব্যবহৃত যে- কোনো অর্থবোধক ধ্বনি বা ধ্বনি সমষ্টি। এক কথায়, সকল পরিভাষাই মূলত শব্দ, কিন্তু সকল শব্দই পরিভাষা নয়।
পরিভাষা করার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় বা পারিভাষিক শব্দের প্রয়োগ-বৈশিষ্ট বা পারিভাষিক শব্দ প্রণয়নের নীতিমালা ঃ
জ্ঞান-বিজ্ঞান বা বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের প্রয়োজনে পরিভাষা অপরিহার্য। ভাষা আপন গতিতে চলে। সেখানে কোনো শব্দ জোর করে চাপিয়ে দিলেই চলে না। সুনির্দিষ্ট অর্থবহ ও শ্রুতিমধুর হলেই পরিভাষা সর্বজনগ্রাহ্য ও ব্যবহার্য হয়ে ওঠে। ফলে, এ ভাষা তৈরির জন্য শুধু প্রতিবাদ বের করলেই চলবে না। এক্ষেত্রে দেখতে হয় প্রয়োগের সুবিধা, ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের সংরক্ষণ, সংক্ষিপ্ততা ও উচ্চারণের সহজসাধ্য রূপ।
নিজস্ব ভাষার ভিত্তিতে অর্থাৎ ভাষায় প্রচলিত শব্দ বা শব্দাংশ জুড়ে বা প্রচলিত শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটিয়ে এবং বিদেশি ভাষার সহায়তা তথা কখনো বিদেশি পরিভাষা হুবহু গ্রহণ করে কিংবা নতুন শব্দ দিয়ে গড়ে উঠেছে আমাদের পারিভাষিক শব্দ। পারিভাষিক শব্দ প্রয়োগের কতগুলো নীতিমালা বা নিয়ম উলেখ করা হলোÑ
১। যেসব বিদেশি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ আছে, জটিল ও দীর্ঘ না হলে সেগুলো পরিভাষা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।
২। ইংরেজি বা আন্তর্জাতিক নামে সুপরিচিত বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ও যন্ত্রাংশের নামের অনুবাদের চেষ্টা না করে উচ্চারণানুগ বানানে সেগুলোর নাম গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন-মিটার, ক্যালরি, কম্পিউটার, ট্রান্সফরমার ইত্যাদি।
৩। যে-সব ইংরেজি শব্দ বা নাম আমাদের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, গবেষক ও সাধারণ পাঠক, শ্রোতা, বক্তার কাছে খুবই
পরিচিত সেগুলোর অনুবাদ না করে সরাসরি গ্রহণ করা যেতে পারে।
৪। অনুবাদের সময় জটিল, কঠিন ও দুর্বোধ্য সংস্কৃতানুসারী শব্দ পরিহার করে সহজ সরল বাংলা শব্দের ব্যবহার করতে হবে। যেমন-হিমাঙ্ক (ঋৎববুরহম ঢ়ড়রহঃ). আর্দ্র (গড়রংঃ) করোটি (ঝশঁষঃ) ইত্যাদি। এ ধরণের পরিভাষা বাংলা ভাষায় গৃহীত ও সুপ্রচিলত, কিন্তু থার্মোমিটারের পরিভাষা হিসেবে ঘর্মমান-যন্ত্র প্রচলিত হয় নি।
৫। ক্ষেত্রবিশেষে লৌকিক অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত বা ব্যবহৃত ভাষা পরিভাষা হিসেবে আহরণ করা যেতে পারে।
৬। পারিভাষিক শব্দ যদি মূল শব্দের অর্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়, তবে তার প্রয়োগ সার্থক হয়। যেমন- ইংরেজি
চৎরসধৎু শব্দটি এসেছে লাতিন ‘প্রিমুস’ (চৎরসঁং) শব্দ থেকে। ‘প্রিমুস’ শব্দের অর্থ প্রথম। সেদিক থেকে ইংরেজি চৎরসধৎু শব্দটির বাংলা পরিভাষা করা হয়েছে প্রাথমিক।
৭। আরবি, ফারসি বা যে-কোনো ভাষা থেকে প্রয়োজনীয় ও গ্রহণযোগ্য শব্দ গ্রহণ করা যেতে পারে।
৮। মাতৃভাষায় কোনো প্রাদেশিক শব্দ নতুনভাবে তৈরি হলে, কিংবা শব্দটি বিশেষভাবে পরিচিত না হলে অথবা শব্দটি কোনো শব্দের পারিভাষিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, সে বিষয়ে বিভ্রান্তির আশঙ্কা থাকলে পারিভাষিক শব্দের পাশে বন্ধনীর মধ্যে বিদেশি শব্দটি জুড়ে দিতে হবে। যেমন- পরম দূরত্ব (অনংড়ষঁঃব ংঢ়ধপব) বা পরম কাল
(অনংড়ষঁঃব ঃরসব) বলতে যা বোঝায় তার অর্থ স্পষ্ট নয়।
৯। প্রণয়ন বা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজস্ব ভাষার মৌলিকত্ব ও স্বাভাবিকত্ব বজায় রাখার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
১০। অবশ্যই বাক্যে ব্যবহৃত অপরাপর শব্দের সঙ্গে যেন খাপ খেয়ে চলতে পারে, সে বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি ও গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।
১১। বাংলায় পারিভাষিক শব্দ তৈরি হয়নি, এমন ক্ষেত্রে বিদেশি শব্দটি বাংলা কিংবা ইংরেজি অক্ষরে লেখাই উত্তম। যেমনÑ
ক) শ্বসনের ফলে প্রচুর পরিমাণ অফবহড়ংরহব ঃৎর ঢ়যড়ংঢ়যধঃব (অঞউ) উৎপন্ন হয়।
খ) বৃক্কের যে অংশ থেকে ইউরেটার উৎপত্তি হয় সে অঞ্চলকে পেলভিস বলে।
(সুভাষ ভট্টাচার্য; বাংলা ভাষা চর্চা)
এ :ধরনের শব্দ যে কোনো ভাষার জন্যে নিত্য প্রয়োজনীয় ভাষা। বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রণীত পরিভাষাসমূহ আপাতত পরিভাষা সমাধানে সহায়ক। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অচিরেই এ সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
পরিভাষা নির্মাণ বা প্রচারে পরিভাষার পুরোপুরি সার্থকতা নেই, তার সার্থকতা প্রয়োগযোগ্যতায়। নির্মিত পরিভাষা যদি প্রয়োগকারী গ্রহণ না করে তবে নির্মাণ ও প্রচার অর্থহীন হয়ে পড়ে। সে কারণে নির্মাণকারী, প্রচারকারী ও প্রয়োগকারীর মধ্যে সংযোগসূত্র থাকতে হবে।
প্রয়োজনীয়তা ঃ
কোনো ভাষার প্রয়োজনে নানা বিষয়ের উন্নয়নের দরকার। কিন্তু মাতৃভাষায় সবসময় শব্দ পাওয়া যায় না। কিংবা এমন শব্দ পাওয়া যায় সেগুলো ব্যবহারযোগ্য বা পরিশীলিত বা শ্র“তিমধুর বা পুরোপুরি অর্থবহ নয়। সে ক্ষেত্রে বিদেশি ভাষার শব্দ অনুবাদ করে কিংবা সরাসরি শব্দ গ্রহণ করে এক ভাষায় পারিভাষিক শব্দ গঠিত হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে আক্ষরিক অনুবাদ শ্র“তিমধুর ও যথার্থ অর্থবহ না হলে এক ভাষার অর্থগত সামঞ্চস্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পারিভাষিক শব্দ গঠন করা হয়ে থাকে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে ঃ
১। এক ভাষায় অলভ্য বা যথাযোগ্যভাব প্রকাশের অনুপযোগী শব্দসমূহের প্রয়োজনীয় বিকল্প শব্দের জন্য পারিভাষিক শব্দ অপরিহার্য উপাদান।
২। যে কোনো ভাষার শব্দসম্পদ বৃদ্ধি, ভাষার সৌন্দর্যসৃষ্টি ও গতিশীলতা প্রদানের সহায়ক।
৩। অন্য ভাষার বিশেষত পৃথিবীর উন্নত ভাষার শব্দ সম্পদ ও প্রায়োগিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়-যা মাতৃভাষার উন্নতিসাধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
৪। অনুবাদের ক্ষেত্রে যথাযথ শব্দের দু®প্রাপ্যতা নিরসনে মাতৃভাষার ক্ষেত্রে একটি সর্বজনীন সহায়ক উপাদান।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর