নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা: ক্রমবিকাশ ও প্রাচ্য শাখার অবস্থান

নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা:

আর্যভাষার ভারতীয় অংশের নাম ভারতীয় আর্যভাষা। এ ভাষার বিবর্তনের তিনটি যুগÑ প্রাচীন ভারতীয় আর্য, মধ্য ভারতীয় আর্য এবং নব্য ভারতীয় আর্য। মোটামুটি ৬৫০ খ্রিঃ থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত ভারতীয় আর্য ভাষা থেকে যেসব নবীণ ভাষার জন্ম হয়, তাদেরকে নব্যভারতীয় আর্যভাষার অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা ও তার প্রচা্য শাখার পরিচয়

নব্য ভারতীয় আর্যভাষা ‘র শাখাগুলোর মধ্যে প্রাচ্যশাখা অন্যতম। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের আলোকে বাংলা, আসামী, উড়িয়া, মৈথিলী, মগহী, ভোজপুরিয়াÑ এই ছয়টি ভাষাকে নব্যভারতীয় আর্যভাষার প্রাচ্য শাখার অন্তর্ভূক্ত করেছেন। সুনীতিকুমার এদেরকে মাগধী ভাষা নামে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে প্রাচ্য শাখার ভাষাগুলো হলো-

প্রাচ্য শাখার অন্তর্গত প্রধান ভাষাসমূহ


(১) পূর্ব মাগধী- বাংলা, আসামী উড়িয়া।
(২) মধ্য মাগধী- মৈথিলি, মগহী।
(৩) পশ্চিম মাগধী- ভোজপুরিয়া। এই প্রাচ্য ভাষাগুলোর মধ্যে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। এই গিয়ারসনের মতে-বিহারী (২ ও ৩নং) সাধারণ লক্ষণগুলো এই গোষ্ঠীকে অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে পৃথক করেছে।

অর্থাৎ সহজ করে বললে-—–

নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা : প্রাচ্য শাখার অন্তর্গত ভাষাসমূহ

নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা – প্রাচ্য শাখার ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য: ৫টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

অডিও ভিডিও শুনতে বা দেখতে


(১) ধ্বনিতাত্ত্বিক: অ-কারের উচ্চারণ সংবৃত। শ, স- এর উচ্চারণ শ-এর মতো। ই-এর অপিনিহিতি বজায় ছিল।

(২) রূপতাত্ত্বিক: কর্তৃকারকে বিভক্তি লোপ পেত বা ‘এ’ বিভক্তি হতো, করণ কারকে এ বা এঁ বিভক্তি, সম্বন্ধ পদে ‘ক’ এবং ‘র’, অধিকরণ কারকে ‘এ’ বিভক্তি, অতীতকালে ‘ল’ প্রত্যয়ান্ত ক্রিয়ামূল, ভবিষ্যৎকালে ‘ব’ প্রত্যয়ান্ত ক্রিয়ামূল হতো। প্রাচ্য শাখা ছাড়া অন্য ভাষায় ভবিষ্যৎকালে ‘ব’ এবং অতীতকালে ‘ল’ যুক্ত ক্রিয়ামূল একত্রে নেই।

(৩) পদক্রম: সকর্মক ক্রিয়ার অতীতকালে কর্তৃবাচ্যের প্রয়োগ অর্থাৎ হিন্দি ভাষার মতো কর্মের সাথে ক্রিয়াপদের লিঙ্গ ইত্যাদি বিষয়ের অন্বয় হয় না।

প্রাচীন বাংলায় এ রকম স্থলে কর্মবাচ্য ব্যবহৃত হতো। যেমন- তোহর অন্তরে মই ঘালিলি হাড়েরি মালি।
অতীত ও ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়ামূলের সাথে পুরুষ ও বচনভেদে বিভক্তি যোগ হয়। বিভিন্ন ভাষায় বিভক্তি এক না হলেও বিভক্তি যোগের ব্যবহার ছিল সাধারণ।

(৪) শব্দকোষ: কতকগুলো শব্দ হিন্দি ইত্যাদি থেকে আলাদা হলেও প্রাচ্য গোষ্ঠীর জন্য ছিল সাধারণ। যেমন-
বাংলা- চোখ, মাথা, চুল
হিন্দি- আঁখ, সির/সর, বাল ইত্যাদি।

নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা প্রাচ্য শাখার অন্তর্ভূক্ত ভাষাগুলোর ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং বাংলা ভাষার সাথে অন্যান্য ভাষার তুলনা:

নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা পূর্ব মাগধী ভাষা সমূহের সাধারণ লক্ষণ;
(ক) সম্বন্ধ পদে ‘র’ বিভক্তি
(খ) অতীতকালের ক্রিয়ামুলে ‘ইল’ বিভক্তি,
(গ) ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়ামূলে ‘হব’ বিভক্তি
(ঘ) অধিকরণে ‘তে’ বিভক্তি হয়।

নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা উড়িয়া ভাষা:
(ক) বহুবচনে ‘মানে’ প্রত্যয়। যেমনÑ পুরুষমানে, আম্ভেমানে (আমরা)।
(খ) অপাদানে ‘রু’ বিভক্তি। যেমনÑ ঘররু (ঘর থেকে)
(গ) সম্বন্ধের বহুবচনে ‘ঙ্ক’ ‘ঙ্কর’ বিভক্তি। যেমন- পুরুষঙ্ক, পুরুষঙ্কর ইত্যাদি।
(ঘ) অধিকরণে ‘রে’ বিভক্তি। যথা ঘররে (ঘরে)।
(ঙ) ‘আছ’ ধাতুর অর্থে ‘অট’ ধাতু এবং ‘ছিল’ স্থানে ‘থিল’।

আসামী ভাষার বিশেষ লক্ষণ :
(ক) বহুবচনে ‘বিলাক’ ‘বোর’ হোঁৎ বিভক্তি যোগ।
(খ) অপাদানে ‘পরা’ কারক অব্যয়ের ব্যবহার। যেমনÑ ঘরর পরা (ঘর থেকে)।

নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা – বাংলা ভাষার বিশেষ লক্ষণ :
(ক) বহুবচনে ‘রা’, ‘এরা’, ‘গুলি’, গুলা বিভক্তি।
(খ) কর্মে বহুবচনে দিগকে বিভক্তি।
(গ) সম্বন্ধের বহুবচনে ‘দিগের’ ‘দের’ বিভক্তি।
(ঘ) অপাদান কারকে ‘হতে’ ‘থেকে’ কারক অব্যয় প্রয়োগ।
আধুনিক কালে উড়িয়া, আসামী ও বাংলায় যত পার্থক্য দেখা যায়, প্রাচীনকালে সেরকম ছিল না।

মধ্য মাগধী ভাষার সাধারণ লক্ষণঃ
(ক) কর্তা ও কর্মের সম্মানভেদে ক্রিয়াপদের রূপ পরিবর্তন।
(খ) ক্রিয়াপদে মূল ‘ন্ত’ স্থানে ‘থ’ হয়। যেমন- চলন্তি>চলথি>বাং- চলেন
(গ) ভবিষ্যৎকালে সৎ (শতৃ) প্রত্যয়ের ব্যবহার।
(ঘ) অস্ত্যর্থক ক্রিয়া ‘আছ’, ‘থিক’ কেবল মৈথিলীতে দেখা যায়।
(ঙ) ‘অহ’, ‘হ’ ধাতুর প্রয়োগ মাগহী ভাষায় দৃষ্ট হয়।

পশ্চিম মাগধী ভাষার সাধারণ লক্ষণ :
ভোজপুরিয়া, নাগপুরিয়া ভাষায় ‘অ’ কারের বিবৃত উচ্চারণ ‘উ’ কারের মত হয়। বর্তমানকালের প্রথম পুরুষে ক্রিয়া পদে ‘অস’ বিভক্তির ব্যবহার হয়। যেমনÑ দেখস্ (সে দেখে)। বর্তমানকালে নির্দেশভাবে এবং ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়াপদের সাথে ‘ল’ স্বার্থে প্রত্যয় হয়। যেমনÑ দেখঁলো (আমি দেখি)। ভবিষ্যৎকালের প্রথম পুরুষে ‘ব’ এর পরিবর্তে ‘হ’ প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়। যথাঃ ‘দেখল’ স্থানে ‘দেখহ’।

বিহারী ভাষার সাধারণ লক্ষণ :
মৈথিলী, মাগধী এবং ভোজপুরিয়া ভাষা সাধারণত বিহারী ভাষা নামে পরিচিত।
বর্তমানকালে ‘থ’ ধাতু। যেমনÑ ‘থিক’, ‘থক’ ব্যবহৃত হয়। (আছ অর্থে)
সম্বন্ধে ‘কের’ বিভক্তির প্রয়োগ দেখা যায় রামকের। ইন্টার বিশেষণসূচক সর্বনামে ‘হেন’ প্রত্যয় প্রয়োগ লক্ষণীয়। যেমনÑ যেহেন (যেমন) তেহেন (তেমন)।
অধিকরণে ‘মে’ ব্যবহৃত হয়। যেমনÑ ঘরমে।
অপাদানে ‘সে’ ব্যবহৃত হয়। যেমনÑ ঘরসে।
এ দুটো (মে, সে) হিন্দিতেও অবশ্য দেখা যায়।
শ স্থানে ‘ন’ উচ্চারণ, ল স্থানে ‘র’ উচ্চারণ প্রবণতা দেখা যায়।
অতীতকালের ক্রিয়ামূলে ‘অল’ প্রত্যয়, ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়ামূলে ‘সব’ প্রত্যয় ব্যবহার বিধিও একটি লক্ষণ বিশেষ।

পূর্ব ও মধ্য মাগধীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য :
কর্তৃকারকে ‘এ’ বিভক্তির ব্যবহার, প্রথম পুরুষের ক্রিয়াপদে ‘ক’ প্রত্যয়ের ব্যবহার (স্বার্থে) দেখিলেক (মাগধী), দেখলক (মাগধী), দুই স্বরের মধ্যবর্তী ‘ব’ ধ্বনির ‘ম’ ধ্বনিতে পরিবর্তন, দিমুÑ দিব, দেখিমিÑ দেখিবি (উড়িয়া), বহুবচনে ‘রা’ বিভক্তিÑ আমরা সব (বাং), হমরা সভ (মৈথিলী) এবং সর্বনামের বিশেষণ পদে ‘হেন’ প্রত্যয়ের ব্যবহার যেন>যেহেন (মৈথিলী) দেখা যায়।

প্রাচ্য শাখার ভাষাগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করলেই, এদের মধ্যে মূল সাদৃশ্য বোঝা যায় এবং অন্যান্য শাখার সাথে এদের পার্থক্যগুলোও নির্ণয় করা সহজ হয়।

নব্য ভারতীয় আর্য ভাসা-প্রাচ্য শাখার পরিচয়

উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে সারসংক্ষেপে বলা যায়- (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে)

নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা : সাধারণ বৈশিষ্ট্য

ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

  1. স্বরবর্ণের আধিক্য – বাংলা ও উড়িয়ায় স্বরবর্ণের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি।
  2. বিসর্গ বিলোপ – সংস্কৃতের বিসর্গ চিহ্ন প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। যেমনঃ দুঃখদুখ
  3. ব্যঞ্জনের কোমলতা – প্রাচ্য ভাষায় ধ্বনি উচ্চারণ নরম ও কোমল। যেমনঃ কর্ণকান
  4. দ্বিত্বধ্বনি হ্রাস – একই ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব প্রায়শই বাদ যায়। যেমনঃ সত্ত্বসত্ত্বাসত্তা
  5. নাসাল ধ্বনির প্রাচুর্য – বিশেষত বাংলায় (চান, জান, মন)।

রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

  1. লিঙ্গভেদ প্রায় বিলুপ্ত – বাংলা ও অসমীয়ায় বিশেষ্যে লিঙ্গভেদ নেই।
  2. বহুবচন গঠন – “রা/রাে/গো” প্রভৃতি দ্বারা বহুবচন। যেমনঃ ছেলে → ছেলেরা।
  3. ক্রিয়াপদে সহজীকরণ – জটিল সংস্কৃত ক্রিয়ারূপ সহজ হয়েছে। যেমনঃ গচ্ছামিযাই
  4. পদান্ত হ্রাস – প্রাচীন সংস্কৃতের বিভক্তি পদান্ত প্রায় বিলীন। যেমনঃ গৃহাত্ঘর থেকে
  5. অব্যয় ব্যবহারে স্বতন্ত্রতা – বাংলা ও উড়িয়ায় দেশজ অব্যয়ের প্রাধান্য।

উপসংহার

প্রাচ্য শাখার ভাষাসমূহে সংস্কৃতের মূল বৈশিষ্ট্য থাকলেও, ধ্বনি ও রূপের সহজীকরণ, কোমলতা এবং দেশজ প্রভাবের কারণে এগুলো স্বতন্ত্র মর্যাদা অর্জন করেছে। বিশেষত বাংলা আজ শুধু ভারতীয় নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও সমৃদ্ধ সাহিত্যভাণ্ডারের অধিকারী।

উৎস: নিজের লেখা

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন ,

বাংলা বিভাগ,

সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *