বাংলা নাটকের ক্রমবিকাশ: ধারা ও ইতিহাসের পর্যালোচনা
প্রাচীন বাংলা নাটকের ক্রমবিকাশ- জন্মগাঁথা – শাস্ত্রীয় নাট্যরীতি ও আঞ্চলিক প্রভাব
নাট্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘকাল ধরে মানুষের জীবন, সমাজ, মানুষের ইচ্ছা আনন্দ বেদনা অভিনীত হয়েছে। গ্রীক দেশে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। ভারত উপমহাদেশেও প্রায় দুই হাজার বছর আগে মঞ্চে সংস্কৃত নাটক শকুন্তলা, স্বপ্ন বাসবদত্তার অভিনয় দেখে মানুষ আনন্দে মুগ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশেও বহুকাল আগে থেকেই নাটক অভিনয়ের কথা শোনা যায়। হাজার বছরের পুরনো রচনা চর্যাপদে নাটকপেটিকা এবং নাটকের উল্লেখ আছে। রাধাকৃষ্ণের পালা, রামায়ণ, মহাভারতের পাঁচালি, মঙ্গলগীতিকা প্রভৃতি বিষয় গান এবং অভিনয়ের সাহায্যে খোলা মঞ্চে উপস্থিত করা হতো। বাঙালির নাট্যপ্রীতির অনেক ইতিহাস রয়েছে।

বাংলা নাটকের ক্রমবিকাশ – মধ্যযুগের নাট্যধারা – ধর্মীয় কাহিনি ও লোকজ রসের সংমিশ্রণ
প্রাচীন কাল থেকেই নাটক ছিল, মধ্যযুগেও নাটকের চর্চা হয়েছে। তবে তা ধর্মীয় কাহিনি ও লোকজ রসের সংমিশ্রণে। রাধাকৃষ্ণের পালা, মঙ্গলকাব্য, লোকসাহিত্য ইত্যাদি বিষয়গুলো আসরে উপস্থাপিত হতো।
বাংলা নাটকের ক্রমবিকাশ — আধুনিক বাংলা নাটকের বিপ্লব – মঞ্চ, বাস্তবতা ও মনস্তত্ত্বের সংলাপ
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশে নাটকের অস্থিত্ব থাকলেও সেগুলির ক্রমপরিণতি হিসেবে নাটকের সৃষ্টি হয়নি। বাংলা সাহিত্যে নাটক একান্তভাবে আধুনিক কালের সৃষ্টি। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগের আগে কোনো সার্থক বাংলা নাটক রচিত হয়নি। বাংলা কাব্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমরা যেমন প্রাচীনত্ব দাবী করতে পারি, নাটকের ক্ষেত্রে সে রকম দাবী চলে না।
বাংলা নাটককের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের সঙ্গে নাট্যমঞ্চের সম্পর্ক ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। পাশ্চাত্য আদর্শ উপযোগী নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৯৫ খ্রিঃ-এ। এই নাট্যমঞ্চ স্থাপন করেন রুশদেশীয় ব্যক্তি হেরাসিম লেবেডেফ। তিনি লাভ ইজ দি বেস্ট ডক্টর এবং দি ডিজগাইজ এর বাংলা অনুবাদ করে বাঙালিদের দ্বারা নাটক অভিনয়ের ব্যবস্থা করেন।
১৮১৭ খ্রিঃ-এ হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাঙালির মনে পাশ্চাত্যের বাতাস বইতে শুরু করে। শিক্ষিত বাঙালির মনে নতুন নাট্যানুরাগের জন্ম হয়। এই অনুরাগের বশে কলকাতায় ধনী গৃহে শখের নাট্যশালা গড়ে ওঠে। ১৮৩৬ খ্রিঃ-এ প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত হিন্দু থিয়েটারে প্রধানত ইংরেজি নাটকের অভিনয় হত। এতে শিক্ষিত বাঙালির অতুপ্তি থেকেই যায়। যুগের চাহিদা মেটাতে গিয়ে অনুরাগী ব্যক্তিদের দ্বারা পাশ্চাত্য আদর্শে বেশ কিছু সংখ্যক রঙ্গমঞ্চ গড়ে ওঠে। এসব রঙ্গমঞ্চে বাংলা নাটক অভিনীত হত। রঙ্গমঞ্চের মধ্যে বাগবাজার এ্যামেচার থিয়েটার (যা পরবর্তীকালে ন্যাশনাল থিয়েটার নাম ধারণ করে) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এভাবে সাধারণ রঙ্গমঞ্চ প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাশ্চাত্য আদর্শের নাটক রচনার ক্ষেত্রেও একই প্রেরণা ও উদ্যম লক্ষ্য করা যায়।
ইংরেজি নাটক অনুবাদের মধ্য দিয়েই বাংলা নাটকের উদ্ভবের ক্ষেত্র রচিত হয়। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ইংরেজি নাটকের আদর্শে বাংলা নাটক লেখা শুরু হয়। প্রথম দিকে বাংলা নাটকে সংস্কৃত প্রভাবও যথেষ্ট ছিল। নাট্যকারগণ সাধারণত বহুবিবাহ , বিধবা বিবাহ ইত্যাদি সামাজিক বিষয় অবলম্বন করে নাটক রচনা করতেন।
যতদূর জানা যায় জেনারেল এসেম্বলির গণিত শিক্ষক তারাচরণ শিকদার প্রণীত ভদ্রার্জুন (১৮৫২) নাটকই ইংরেজি আদর্শে রচিত প্রথম বাংলা কমেডি নাটক । পাশ্চাত্য আদর্শে রচিত যোগেন্দ্র চন্দ্র গুপ্তের কীর্তিবিলাস (১৮৫২) বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম ট্রাজেডি নাটক।
অনুবাদক নাট্যকারদের মধ্যে হরচন্দ্র ঘোষের কথা বলতে হয়। তিনি শেক্সপিয়রের দি মার্চেন্ট অপ ভেনিস এর অনুবাদ হিসেবে ভানুমতী চিত্তবিলাস (১৮৫২) রচনা করেন। এর ভাষা সরল, তবে নাটকের উপযোগী নয়। চরিত্র সৃষ্টিতেও কোনো দক্ষতার পরিচয় নেই। তিনি কৌরব বিয়োগ, চারুমুখ চিত্তহারা, রজতগিরি নন্দিনী প্রভৃতি নাটকও লেখেন।
বাংলা নাটকের ক্রমবিকা – নবজাগরণের নাটক – সামাজিক সচেতনতা ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ
এরপর রামনারায়ণ তর্করতœ নাট্যকার হিসেবে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর কুলীনকুল সর্বস্ব (১৮৫৪) সম্পূর্ণ মৌলিক সামাজিক নাটক। তার নাটকই প্রথম রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়। এ নাটকে ইংরেজি ও সংস্কৃত দুটি ধারার প্রভাব দেখা যায়। এ আখ্যানভাগ অসংহত ও বৈচিত্র্যহীন, নাটকের চত্রিগুলোতে মানসিক দ্বন্দ্ব তেমন নেই। প্রায় সমগ্র নাটক নাট্যকারের মতামতে ভারাক্রান্ত। এই লেখক বেনীসংহার (১৮৫৬) রত্মাবলী (১৮৫৮) নবনাটক (১৮৬৬) প্রভৃতি নাটক লিখেছেন।
এ পর্যন্ত আলোচিত নাট্যকারদের আমরা বাংলা নাটকের উন্মেষ পর্বের মধ্যে ধরে নিতে পারি। উন্মেষ পর্বের পরে বিকাশ পর্বে এসে মধুসূদন দত্ত ও দীনবন্ধু মিত্রকে আমরা উল্লেখযোগ্য নাট্যকার হিসেবে ধরে নিতে পারি। এরা দুজন বিকাশ পর্বে বাংলা নাটকে যুগান্তর আনায়ন করেন। মধুসূদন প্রাচীন সংস্কৃত নাটকের রীতি পদ্ধতির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে ইংরেজির অনুকরণে নাটক লেখেন। তাঁর শর্মিষ্টা নাটক (১৮৫৮) সে সময়ে রঙ্গমঞ্চে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর পদ্মাবতী নাটকে গ্রীক প্রভাব সুস্পষ্ট। এ নাটকে তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। মধুসূদনের কৃষ্ণকুমারী (১৮৬০) নাটকে ইংরেজি রোমান্টিক নাটকের অনুকরণে বিয়োগবিধুরা নায়িকা, খল চরিত্র, প্রণয় প্রতিদ্বন্দ্বী, নাটকীয় প্রশমন ইত্যাদি খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়া তিনি একেই কি বলে সভ্যতা? ও বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ নামে দুটো বিদ্রুপাত্মক সামাজিক প্রহসনও লেখেন।
বাংলা নাটকের ক্রমবিকাশ– আধুনিকতার পথে
দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ (১৮৬০) শুধু নীলকরদের অত্যাচারের বাস্তব নগ্ন চিত্রই নয়, বরং গণ নাটকের সূতিকাগারও । নবীন তপস্বিনী (১৮৬৩) লীলাবতী, (১৮৬৭) কমলে কামিনী (১৮৭৩) নামে অপর তিনটি নাটকও তিনি রচনা করেন।
জনপ্রিয় নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ (১৮৪৩Ñ১৯১১) একাধারে স্রষ্টা ও অভিনেতা ছিলেন। তাঁর ঐতিহাসিক নাটকÑ কালাপাহাড়, সিরাজউদ্দৌলা; পৌরাণিক নাটক Ñপা-ব কৌরব, বিল্বমঙ্গল, জনা; এবং সামাজিক নাটক Ñবলিদান, প্রফুল্ল ; ও গীতিনাট্যÑ আবু হোসেন উল্লেখযোগ্য।
বাংলা নাটকের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে প্রথম মুসলমান নাট্যকার মীর মশাররফ হোসেনের অবদান অনেকখানি। তাঁর বসন্তকুমারী (১৮৭৩) ও জমিদার দর্পণ নাটক বাংলা নাট্যাঙ্গনকে যথেষ্ট সমৃদ্ধি করে। নাট্যকারের সমাজচেতনা ও আবেগময় ভাষা প্রয়োগ নাটকে গতি সৃষ্টি করে। জমিদার দর্পণ নাটক অনেকখানি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনেও ভুমিকা রাখে।
বাংলা নাটকের ক্রমবিকাশ– সম্ভাবনার দ্বার
বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর শব্দ প্রয়োগ কুশলতা অনন্য ও একক। নাটকীয় দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে তিনি সার্থক। তিনি সমাজিক ও ঐতিহাসিক নাটক রচনার ক্ষেত্রে বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তারাবাঈ, সাজাহান, নূরজাহান প্রভৃতি ঐতিহাসিক নাটক বাংলা নাটকের ইতিহাসে অনন্য সংযোজন।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সমসাময়িকদের মধ্যে অমৃতলাল বসু, ক্ষীরোদ প্রসাদ, বিদ্যাবিনোদ প্রমুখ নাট্যকারগণ উল্লেখযোগ্য।
এরপর নাটকের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে নতুন পথের সন্ধান দেন। রূপক ও সাংকেতিক নাটক রচনা করে তিনি নাটকে নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। এ ছাড়া গীতিনাট্য, ট্রাজেডি, সামাজিক, কৌতুকরসপ্রধান, ঋতুনাট্য, নৃত্যনাট্য ইত্যাদি নাটক রচনা করে বাংলা নাট্য সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক হলোÑ
নীতিনাট্য ঃ বাল্মীকি প্রতিভা ; কাব্যনাটক ঃ চিত্রাঙ্গদা ; রোমান্টিক ট্রাজেডি ঃ রাজা ও রাণী, বিসর্জন ;
সাংকেতিক নাটক ঃ ডাকঘর, রক্তকরবী; সামাজিক নাটক ঃ চ-ালিক; কৌতুকনাট্য ঃ গোড়ায় গলদ;
ঋতুনাট্যঃ বসন্ত ; নৃত্যনাট্য ঃ শ্যামা।
রবীন্দ্রনাথের পরে নাটক আরও গতিশীল হয়েছে। নানা মুনির হাতের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধশালী হয়ে আধুনিক থেকে আধুনিকতর হয়েছে।
দেশবিভাগ ও স্বাধীনতা উত্তর কালে ঢাকা কেন্দ্রিক অনেক নাটক রচিত হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রিক নাট্যকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন
সমসাময়িক বাংলা নাটক – পরীক্ষাধর্মী ধারার সাহসী পদক্ষেপ
ইব্রাহিক খাঁ (কামালপাশা); নূরুল মোমেন (নেমেসিস) ; মুনীর চৌধুরী (কবর , রক্তাক্ত প্রান্তর );
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (বহিপীর); শওকত ওসমান (ক্রীতদাসের হাসি); মমতাজউদ্দিন (স্বাধীনাতা আমার স্বাধীনতা) ; আব্দুল্লা-আল-মামুন (সুবচন নির্বাসনে, এবার ধরা দাও); মামুনুর রশীদ (ওরা কদম আলী) প্রমুখ।
পরিশেষে বলা যায় যে, পাশ্চাত্য আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নাট্যকাররা বাংলা নাটকের যে সূত্রপাত করেছিলেন তা ঢাকা কেন্দ্রিক ও কোলকাতা কেন্দ্রিক নাট্যকারদের হাতে পড়ে দিন দিন সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়েছে। দিনে দিনে এর বিষয় ও আঙ্গিক নব নব মাত্রা পেয়েছে।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
রেফারেন্স তালিকা:
- আহমেদ, এ. (২০০২). বাংলা নাটকের ইতিহাস. ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
- সেন, সুকুমার. (১৯৮১). বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস. কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
- চক্রবর্তী, শঙ্কর. (১৯৯৮). বাংলা নাট্যসাহিত্য: উৎস ও ধারা. কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং।
- দাস, সুশীলকুমার. (১৯৮৭). বাংলা নাটক: সাহিত্য ও সমাজ. কলকাতা: মিত্র ও ঘোষ।
- মজুমদার, অমলেন্দু. (১৯৯৫). আধুনিক বাংলা নাটক. কলকাতা: পত্রভারতী।
- ভট্টাচার্য, হরিদাস. (১৯৭৯). প্রাচীন বাংলা নাট্যকলার বিবর্তন. কলকাতা: প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স।
- সরকার, অমরেন্দ্র. (২০০১). নবজাগরণ ও বাংলা নাটক. ঢাকা: বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনী।
- রায়, শিবপ্রসাদ. (১৯৯৪). বাংলা নাটকের সমাজচেতনা. কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
- চৌধুরী, সমরেন্দ্র. (২০০৫). বাংলা নাটকের ধারা ও দর্শন. ঢাকা: অনুপম প্রকাশনী।
- Banerjee, S. (2003). The Evolution of Bengali Drama. Kolkata: Oxford University Press.