ভাবের পরিচয় ও ভাবের প্রকারভেদ
ভাবের সংজ্ঞা : প্রকারভেদ ও পরিচয়।
ভাব, বিভাব, অনুভাব, সঞ্চারি ইত্যাদি শব্দগুলো রসতত্ত্বে পারিভাষিক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই রসতত্ত্বে ভাব এর প্রয়োগ সাধারণ থেকে পৃথক। প্রচলিত ধ্যান-ধারণার সাথে ভাব শব্দটি রসতত্ত্বে পৃথক ব্যঞ্জনা নিয়ে ব্যবহৃত হয়।
ব্যুৎপত্তি: ভূ ধাতু অথবা এর প্রেরণার্থক ক্রিয়া ভাবি ধাতুর পরে নানা প্রত্যয় যুক্ত করে ভাব শব্দটির উৎপত্তি। ধাতুটির মূল অর্থ হওয়া , কারো মতো হওয়া।
ভাবের সংজ্ঞা: ভাব কী?
ড. সুধীরকুমার দাস গুপ্ত তার কাব্যালোক গ্রন্থে বলেছেন-
অলংকার শাস্ত্রে ভাব শব্দটি তিনটি অর্থে প্রচলিত। যেমন-
১. রতি, শোক, ইত্যাদি ভাব, যাদের দুটি ভেদ স্বীকৃত- স্থায়ী ও অস্থায়ী।
২. দেবাদিবিষয়া রতি, প্রধান-ভূত সঞ্চারী এবং উদ্বুদ্ধ মাত্র স্থায়ী।
৩. নির্বিকার চিত্তে প্রণয়জনিত প্রথম বিক্রিয়া, নারীগণের ভাবের পূর্বাবস্থা।
রসতত্ত্বে ভাব শব্দটির প্রয়োগ প্রথম অর্থে। অর্থাৎ রতি শোক ইত্যাদি ভাব।
বিচিত্রময় মনের অধিকারী মানুষ। মন-চিত্ত নানারকম বৃত্তিতে সদা লীলাময়। মানুষের চিত্ত যত রকমের বৃত্তি করে, তা চিত্তবৃত্তি। অলংকার শাস্ত্র অনুযায়ী ভাব বলতে বোঝায় মানবমনের চিত্তবৃত্তিগুলোকে। মানুষের মনে অনন্ত ভাবের খেলা। এসব চিত্তবৃত্তিগুলোর কোনোটি মানবমনে চিরস্থায়ী, আবার কোনোটি আবির্ভূত হয়েই হারিয়ে যায়। এ সব চিত্তবৃত্তির পারিভাষিক নাম ভাব।
ড. সুশীল কুমার দে ভাব শব্দটিকে emotion হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অতুল চন্দ্র গুপ্ত চিত্তবৃত্তি ও emotion – বাংলা ও ইংরেজি এ দুইটি শব্দে ভাব-কে বুঝিয়েছেন। তিনি মনে করেন ইমোশন বা ভাব-এর সুখ-দুঃখানুভূতি কতকগুলো ধারণা(idea) বা বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে বিদ্যমান থাকে।
ড. সুধীর কুমার দাশগুপ্ত মনে করেন ভাব শব্দটি সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রে যেভাবে ব্যবহৃত , উপরে আলোচিত কোনো ব্যাখ্যায় তা ধরা পড়েনি। তিনি ভাব শব্দটির অর্থ করেছেন-
স্বাদাত্মক চিত্তবৃত্তি- অর্থাৎ এমন চিত্তবৃত্তি যা নিজে আস্বাদন করে।
অলংকার শাস্ত্রে ভাব শব্দটি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা নেই। ভাবের স্বীকৃত দুইটি রূপ স্থায়ী ও সঞ্চারি (ব্যাভিচারী) ভাব নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা রয়েছে। এসব আলোচনা থেকে ভাবের স্বরূপ জানা যেতে পারে। তবে একটা ধারণা করা যেতে পারে যে, মানুষের মনের ইমোশন বা অনুভূতি বা চিত্তবৃত্তিকে ভাব বলা যেতে পারে।
ভাবের সংজ্ঞা: স্থায়িভাব থেকে সৃষ্ট রসের উপাদান দুইটি-
এক, মানসিক উপাদান;
দুই, বাহ্যিক উপাদান।
- মানুষের মনের ভাব অর্থাৎ চিত্তবৃত্তি বা ইমোশন হলো মানসিক উপাদান;
- কবির প্রতিভাবলে সৃষ্ট অলৌকিক ভাবজগৎ হলো রসের বাহ্যিক উপাদান, যেমন- নাটক, উপন্যাস, কবিতা, ছোটগল্প ইত্যাদি।
আলঙ্কারিকেরা বলেন- রসের বাহ্য উপাদানের ক্রিয়ায় ‘ভাব’ রসে পরিণতি লাভ করে।
তাহলে বলা যায় যে, সহৃদয় সামাজিকের মনে জন্ম দেয়া ভাব বা ইমোশন বা চিত্তবৃত্তির পরিণত রূপ হলো রস।
ভাবের সংজ্ঞা — ভাব ও রসের পার্থক্য:
ভাব লৌকিক, রস অলৌকিক। ভাবের পরিণত রূপ হলো রস। লৌকিক জগতের ভাব কবির প্রতিভাবলে অলৌকিক হয়ে ওঠে। জগতের রতি, শোক ইত্যাদি ভাব কবির প্রতিভাবলে এক মায়াবী মোহনীয় হয়ে ধরা পড়ে কাব্যজগতে। সেই কাব্যজগতে প্রবেশ করে পাঠক অলৌকিক আনন্দ লাভ করে।
পথের ধারে বা বস্তিতে কত আসমানীদের আমরা দেখে থাকি, মনেও থাকে না। মনে দাগ কাটে না। কিন্তু জসীমউদ্দীনের হাতে পড়ে রসুলপুরের ভেন্না পাতার ছাওয়া ঘরের কোনো এক আসমানী অলৌকিক মায়াময় জগতের বাসিন্দা হয়ে গেছে। চিরকাল পাঠকের মনে সে অলৌকিক আনন্দ দিয়ে যাচ্ছে। জগতের লৌকিক ভাব(আসমানী) কাব্যজগতে গিয়ে রসে পরিণত হয়ে গেছে।
স্বজনহারানো কত বৃদ্ধ গ্রামে-গঞ্জে চোখের জল ফেলে, সেই বৃদ্ধ কবর কবিতায় এসে অলৌকিক মায়াবীজগতের বাসিন্দা হয়ে আনন্দসঞ্চারি হয়ে গেছে।
আলঙ্কারিকরা বলেন যে, শোক, রতি ইত্যাদি ভাব লৌকিক হলেও তা থেকে সৃষ্ট করুণ ও শৃঙ্গার রস অলৌকিক। লৌকিক জগতের বিষয়ও কবির প্রতিভাবলে অলৌকিক কাব্যজগতে রূপান্তরিত হয়।

ভাবের সংজ্ঞা—– ভাবের প্রকারভেদ:
আলঙ্কারিকরা মনে করেন মানুষের মনে সৃষ্ট ইমোশন বা অনুভূতির সংখ্যা ৪২টি। এ সব ভাব প্রকৃতি-বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দুই ভাগে বিভক্ত।
এক, স্থায়িভাব ও
দুই, অস্থায়ি বা সঞ্চারি বা ব্যাভিচারী ভাব।
১. স্থায়িভাব: যে ভাব মানবমনে গভীরভাবে অনুভূত হয় তা-ই স্থায়িভাব। যে ভাব মানব মনকে গভীরভাবে আন্দোলিত করে, প্রভাবিত করে, যার প্রভাব মানুষ এড়াতে পারে না, মানুষকে বিমোহিত করে রাখে সেগুলোই স্থায়িভাব। অর্থাৎ মানব মনে স্থায়ি চিত্তবৃত্তিকে স্থায়িভাব বলে। এ সব ভাবের প্রভাব মানুষ এড়াতে পারে না বলেই তা মানব মনে স্থায়িত্ব পায়। পণ্ডিতদের মতে- দীর্ঘস্থায়ী প্রবল ইমোশন বা ভাব বা চিত্তবৃত্তি হলো স্থায়িভাব।
স্থায়িভাব নয়টি। নাট্যশাস্ত্রে আটটি স্থায়িভাবের কথা বলা হয়েছে। অভিনবগুপ্ত হেমচন্দ্র প্রমুখ বলেছেন যে, এই স্থায়িভাবই রসে রূপান্তরিত হয়, তাই রসও নয় প্রকার। স্থায়িভাব এবং তা থেকে উৎপন্ন রস নিম্নরূপ-
| স্থায়িভাব | রস | স্থায়িভাব | রস |
| ১. রতি | শৃঙ্গার বা মধুর রস | ২. শোক | করুণ |
| ৩. হাস | হাস্য | ৪. ক্রোধ | রৌদ্র |
| ৫. উৎসাহ | বীর | ৬. ভয় | ভয়ানক |
| ৭. জুগুপ্সা | বীভৎস | ৮. বিস্ময় | অদ্ভূত |
| ৯. শস | শান্ত |
২. সঞ্চারী বা ব্যাভিচারী ভাব:
সঞ্চারী বা ব্যাভিচারী ভাব ৩৩টি। স্থায়িভাব ছাড়াও মানবমনে উদয় হওয়া ভাবগুলোই সঞ্চারী বা ব্যাভিচারী ভাব। এসব ভাব মানব মনে উদয় হয় ঠিকই কিন্তু স্থায়ী হয় না, উদয় হয় এবং অস্ত যায়, ফোটে আর টুটে, উদ্ভূত হয় আবার মিলিয়ে যায়, অনেকটা বুদবুদের মতো। মানব মনের এই সব অস্থায়ী চিত্তবৃত্তিগুলোকে অলংকার শাস্ত্রে বলা হয় সঞ্চারিভাব বা ব্যাভিচারিভাব।
এদের কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই। এগুলো কোনো না কোনো স্থায়িভাবের অনুষঙ্গে উদয়-বিলয় হয়, স্থায়িভাবকে পরিপুষ্টতা দান করেই মিলিয়ে যায়। স্থায়িভাবের সহচরী হিসেবে উদয় হয় বলেই এরা সঞ্চারিভাব বা ব্যাভিচারিভাব বা সহচারিভাব।
স্থায়িভাব ও সঞ্চারিভারের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে আলঙ্কারিকেরা উপমা দিয়েছেন এভাবে- স্থায়িভাব যেন সমুদ্র, আর তার বক্ষে উঠা বুদবুদ যেন সঞ্চারিভাব। সমুদ্র বক্ষেই তাদের উদয়, সমুদ্র বক্ষেই তাদের বিলয়, ফোটা আর মিলিয়ে যাওয়া। অতি ক্ষণস্থায়ি কিন্তু অস্তিত্ব অস্বীকার করা যাবে না। আন্দোলিত সমুদ্রবক্ষের শীর্ষে বুদবুদ না থাকলে যেন উত্থিত সমুদ্রবক্ষের কোনো পুষ্টতা থাকে না। অলংকার শাস্ত্রে তাই বলা হয়, সঞ্চারিভাব স্থায়িভাবকে পরিপুষ্টতা দিতেই যেন আবির্ভূত হয়। এ জন্যই রসাস্বাদনকালে সঞ্চারিভাব বা ব্যাভিচারিভাবের পৃথক কোনো অস্তিত্ব উপলব্ধি হয় না। তবে স্থায়িভাবের পুষ্টতা বা রসাস্বাদনে স্থায়িভাব ও সঞ্চারিভাবের রসায়ন অনুভূত হয়।
ভাবের সংজ্ঞা— সঞ্চারি ভাবের সংখ্যা
সংস্কৃত আলঙ্কারিকদের মতে ৩৩টি সঞ্চারিভাব বা ব্যাভিচারিভারের নাম –
নির্বেদ, আবেগ, দৈন্য, জড়তা, উগ্রতা,,মোহ, মদ, নিদ্রা, অপসাদ, চপলতা, বিরোধ বিষাদ,শ্রম, ঔৎসুক্য, স্মৃতি, মরণ, আলস্য, স্বপ্ন, চিন্তা, গ্লানি, অসূয়া, উন্মাদ, শঙ্কা, অবহিত্থা, হর্ষ, লজ্জা, মতি, গর্ব, ব্যধি, সন্ত্রাস, অমর্ষ, বিতর্ক
এ ছাড়াও আরো অনেক সঞ্চারিভাব জাগতে পারে। ড. সুধীর কুমার দাশ গুপ্ত আরো ৩৩টি সঞ্চারিভাবের কথা বলেছেন।
স্থায়িভাবও যদি অন্য ভাবের সহচরী বা অনুষঙ্গে আসে, তবে তাকেও সঞ্চারিভাব বলা যেতে পারে। এগুলোকে স্থায়িভাবের আনুষঙ্গিক সঞ্চারী বা ব্যাভিচারিভাব বলা হয়।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।
রসতত্ত্ব বিষয়ক রেফারেন্স বইয়ের তালিকা
প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ
- ভরত মুনি — নাট্যশাস্ত্র
- আনন্দবর্ধন — ধ্বন্যালোক
- আবিনবগুপ্ত — অভিনব ভারতী (ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্রের টীকা)
- ভামহ — কাব্যালঙ্কার
- বিশ্বনাথ কবিরাজ — সাহিত্য দর্পণ
- রাজশেখর — কাব্যমীমাংসা
- কুণ্ডকুন্দরাচার্য — রসিকরণ
বাংলা রচয়িতা ও গবেষক
- ড. সুকুমার সেন — বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রাসঙ্গিক অধ্যায়)
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ — বাংলা সাহিত্যের কথা
- আশুতোষ ভট্টাচার্য — রসতত্ত্ব ও বাংলা সাহিত্য
- অমলেন্দু ভট্টাচার্য — বাংলা কাব্য ও রসতত্ত্ব
- ড. নীহাররঞ্জন রায় — বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস: আদি পর্ব
- অধ্যাপক বিশ্বনাথ ত্রিপাঠী — রসতত্ত্বের পরিচয়
- ড. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত — বাংলা কাব্যের রসতত্ত্ব
- ড. গোবিন্দচন্দ্র দে — কাব্যতত্ত্ব ও সমালোচনা
- সত্যরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় — কাব্যতত্ত্ব: রস ও অলঙ্কার
ইংরেজি রেফারেন্স
- Gerow, Edwin. Indian Poetics. (Oxford University Press)
- Keith, A. Berriedale. The Sanskrit Drama.
- Hiriyanna, M. Art Experience in Indian Philosophy.
- De, S.K. History of Sanskrit Poetics.
- Masson, J.L. Aesthetic Theories of India.
- Pollock, Sheldon. A Rasa Reader: Classical Indian Aesthetics. (Columbia University Press, 2016)
স্যার এটা তো আমাদের ক্লাসে আলোচনা করছিলেন অল্প কিছু।
যাই হোক, নতুন করে আবার পড়লাম নোট রাখলাম।
ধন্যবাদ স্যার আপনাকে