কালিদাসের কবি কৃতিত্ব – নাটকীয়তা ও গীতিময়তা – কোনগুণে মেঘদূত কাব্য কালের সীমানা অতিক্রম করেছে ?
মেঘদূত কাব্য – কালিদাস
মেঘদূত কাব্য কালিদাসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও জনপ্রিয় কাব্য। বহুকাল ধরে কাব্যটি রসিক সমাজে বিশেষভাবে সমাদূত। কাব্যটি কবির কবি-খ্যাতির দ্যোতক। তাই বলা হয় কবি যদি আর কিছু না লিখেও শুধু ‘মেঘদূত’ লিখতেন তবু তাঁর কবি-খ্যাতি অক্ষুণœ থাকতো। কাব্যটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চিত্রশালা। উপমা ব্যবহারেও কবির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। ভারতীয় কাব্য সাহিত্যে ‘মেঘদূত’র প্রভাব সর্বজনস্বীকৃত।
মেঘদূত কাব্য রচনাটি সাহিত্যকর্মের কোন পর্যায়ভুক্ত এ একটি জটিল ও বিতর্কিত প্রশ্ন। সংস্কৃত সাহিত্যে ‘মেঘদূত’ এক অভিনব কাব্য এবং অলংকার শাস্ত্রে প্রচলিত কোনো শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত করাও কষ্টসাধ্য। ‘মেঘদূত’ কাব্যকে মহাকাব্য, গীতিকাব্য, খন্ডকাব্য বা নাটক এরকম বিশেষ কোনো শ্রেণীর পর্যায়ভূক্ত করা যায় না, অথচ এর প্রায় কোনো না কোনো বিশেষত্ব এ কাব্যে আছে।
প্রভুশাপে যক্ষ অলকা থেকে নির্বাসিত জীবন কাটায় রামগিরিতে। নির্বাসিত যক্ষ পত্নী বিরহে নিতান্ত কাতর এবং আষাঢ়ের প্রথম দিবসে আকাশে পুঞ্জীভূত মেঘ দেখে তার মন ভারী চঞ্চল হয়ে ওঠে। সে নিজেকে কিছুতেই সংযত রাখতে পারে না। সে মেঘকে দূত করে পাঠায় প্রেয়সীর কাছে অলকাপুরীতে। এ কাব্যে বিরহ-হৃদয়ের বার্তাই আশ্চার্য কাব্যরূপ লাভ করেছে। বিষয়ের দিকে তাকালে বোঝা যায় ‘মেঘদূত’-এ পূর্বমেঘ পৃথিবীর কামনা বাসনাপূর্ণ বিচিত্র সৌন্দর্যলোক হতে উত্তরমেঘে অলকাপুরীর নিত্য সৌন্দর্যলোকে যাত্রা বলা হয়।
মেঘদূত কাব্য -এর সংহত ও সংযমী গঠনশৈলী দেখে মনে হয় কবি যেন আগে থেকেই পরিকল্পনা করে ছক বা নকশা এঁকে কাব্য রচনায় হাত দিয়েছেন। কেননা, এ কাব্যে সংস্কৃত কাব্যের প্রধান অভিশাপ বাগবাহুল্য থেকে মুক্ত। কাব্যের সারা দেহে মিতাচারের লক্ষণ দেখা যায়। এ কাব্যের গড়ন যেন গর্বিত সক্ষম নৌকার মতো নিটোল ও নিখুঁত। কোথাও এতটুকু বাহুল্য নেই। প্রথম থেকেই গতির বেগ লক্ষ্য করা যায়।
প্রথম শ্লোকে যক্ষের বর্তমান অবস্থা জানিয়ে, একটুও দেরি না করে দ্বিতীয় শ্লোকে মেঘকে সামনে আনা হলো। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্লোকে যক্ষ মেঘ দেখে কী মনে করলো, কী ভাবলো ও কী স্থির করলো তা জানা যায়। যক্ষের মনোভাব পূর্বমেঘের শেষ শ্লোকে গিয়ে শেষ হয়েছে। কোথাও কবির নিজের কোন বাণী নেই। ‘মেঘদূত’ কাব্যের এই আশ্চর্য গতিই পাঠকাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে। মেঘের সাথে সাথে যেন পাঠকও এগিয়ে চলে। মেঘের সাথী হয়ে চলার পথে মাঝে মাঝে আলোচনার সুযোগ রয়েছে, তাই ক্লান্তি বা অন্যমনস্কতা সম্ভব হয় না।
মেঘদূত কাব্য -কে বর্ণনাত্মক কাব্য বলা গেলেও সার্বিকভাব একে বর্ণনাত্মক কাব্য বলা যায় না। কেননা এ কাব্যে বর্ণনার অন্তরালে রয়েছে নাটকীয়তা। বিশ্বসাহিত্যে কালিদাস অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার এবং তাঁর কাব্যসমূহও নাট্যগুণে সমৃদ্ধ এবং ‘মেঘদূত’ও এর ব্যতিক্রম নয়।
মেঘদূত কাব্যে নাটকীয়তার ফলেই চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠেছে। এ কাব্যে মূলত দুটি চরিত্রÑ একজন বক্তা, অপরজন শ্রোতা। বক্তা যক্ষ, শ্রোতা মেঘ, কাব্যের শেষে কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। সেখানে কখনো বক্তা মেঘ, শ্রোতা যক্ষপত্নী। কখনো বক্তা যক্ষ, শ্রোতা যক্ষ পত্মী। কাব্যের শুরু যেমন মেঘের প্রতি যক্ষের সম্ভাষণ দিয়ে, উপসংহার ঘটেছে তেমনি শুরুর মতন।
নাটকে যেমন দৃশ্যপটের পরিবর্তন থাকে, এ কাব্যেও দৃশ্যপটের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। রামগিরি থেকে মেঘ যাত্রা করেছে। পূর্বমেঘে সে এই পৃথিবীর বহু বিচিত্র দৃশ্য অতিক্রম করে উত্তরমেঘে অলকাপুরীতে উপনীত হয়েছে। উপসংহারে পাঠক অবাক হয়ে দেখে যে, মেঘ একই জায়গায় অর্থাৎ রামগিরিতে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। অথচ কবি আশ্চর্য কৌশলে দৃশ্যপটের পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং পাঠকের মনও দৃশ্য পরিবর্তনের সাথে সাথে ঘুরে আসে।
যক্ষপ্রিয়ার উপস্থাপনার মধ্যেও নাটকীয়তা লক্ষ করা যায়। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন- “কবি যখন যক্ষপ্রিয়াকে রঙ্গ মঞ্চে আনলেন সেই মুহূর্তটি ভেবে দেখা যাক। যক্ষপ্রিযাকে উৎসর্গিত শ্লোকের সংখ্যা সতেরো, কিন্তু কবি আমাদের উত্তেজনাকে অক্ষত রেখেছেন। নায়িকাকে নানাভাবে দেখিয়ে ; দিনের কাজ, রাত্রির অনিদ্রা ও নিদ্রায় ঠিক যেন রঙ্গমঞ্চে মূক অভিনয় দেখছি আমরা, মেঘের দিকে সে কেমন করে তাকাবে, কেমন মন দিয়ে শুনবে তার কথা, এই শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত কাব্যের গতির সঙ্গে তার সংযোগ অক্ষুণ্ন । বর্ণনার অন্তরালে এখানে আছে নাটকীয় ক্রিয়া।”
বুদ্ধদেব বসু বলেছেনÑ “মেঘদূত কোনো আধুনিক উপন্যাসের মতো, যাতে প্লট বলে কিছু নেই, কিংবা যেটুকু আছে তার পরিণাম গ্রন্থারম্ভেই বলে দিয়ে লেখক আমাদের ধরে রাখেন শুধু শিল্পতার চাতুরীতে অথবা এটিকে একটি রসান্বিত ভ্রমণ কাহিনি বললেও ভুল হয় না।”
অনেকে মেঘদূত কাব্য -কে গীতিকাব্য বলতে চেয়েছেন। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছেÑ এ কাব্যে কবির আত্মপ্রক্ষেপ ধরা পড়েছে। যক্ষ ও যক্ষপ্রিয়ার কাহিনির মধ্যে মনে হয় কবিরই হৃদয়ের রুদ্ধ বেদনা অজ্ঞাতে বেরিয়ে এসেছে।
মেঘদূত কা্ব্য -এর মধ্যে কবির এই মন্ময়তা লক্ষ করেই পার্বতীচরণ ভট্টাচার্য বলেছেনÑ “বলা চলে মেঘদূত গীতিকাব্য।” কিন্তু মোবাশ্বের আলী বিশ্বসাহিত্য গ্রন্থে বলেছেন যে, যক্ষের বিরহের মধ্যে কবির কোথাও আত্মপ্রক্ষেপ ঘটেনি। কবি যদি কোথাও থেকে থাকেন তবে তিনি অন্তরালে বিরাজ করেছেন।
বস্তুত মেঘদূত কাব্য – এ কবির আত্মগত অনুভূতির রূপায়ণ ঘটেনি। কিন্তু ধ্বনি ও ছন্দের হিল্লোলে কাব্যটি একটি মৃদু-মধুর গীতিসুর লাভ করেছে। তাই, কাব্যটির আবেদন গীতি-কাব্যেরই মতোই।
সংস্কৃত আলংকারিকেরা একে খন্ডকাব্য বলেই অভিহিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু এতে তার আকৃতির পরিচয় পাওয়া গেলেও প্রকৃতির পরিচয় পাওয়া যায় না।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মেঘদূত কাব্য -কে মহাকাব্যের মর্যাদা দিতে চেয়েছেন। নিঃসন্দেহে এ অতিশয়োক্তি, কিন্তু মহাকাব্যের কোনো কোনো লক্ষণ এর মধ্যে আছে। রামগিরি থেকে অলকা, মর্ত থেকে স্বর্গ এই বিশাল পটভূমিই এ কাব্যেকে মহাকাব্যের মর্যাদায় আসীন করেছে। তাছাড়া বিরহী যক্ষের বেদনার দোসর হয়েছে সমগ্র বিশ্বজগৎ ও বিশ্বপ্রকৃতি। এই যে, বিশ্বজনীনতা এর ফলেও মেঘদূত মহাকাব্যোচিত বিশালতা লাভ করেছে।
মেঘদূত বিরহের কাব্য হলেও প্রকৃতির বর্ণনা এতে প্রধান্য পেয়েছে। মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয় এবং প্রকৃতির সাথে সংযোগেই মানুষ পূর্ণতা লাভ করে। কবি কালিদাস প্রকৃত ও মানুষকে অভিন্ন হৃদয় করে তুলেছেন। বিরহে চিত্তের অসীম প্রসার ঘটে। তাই বিরহী যক্ষের সাথে বিশ্বপ্রকৃতির এক গভীর আত্মিক যোগ সাধিত হয়েছে।
কবি প্রসিদ্ধির ব্যাপক অনুসরণ সত্ত্বেও কালিদাসের উপমার চিরকালীন খ্যাতি রয়েছে। উপমার আজস্রতায় কাব্যটিতে চিত্রকল্পের পর চিত্রকল্প অঙ্কিত হয়ে কাব্যটি একটি চিত্রশালা হয়ে উঠেছে। উপমা প্রয়োগ সম্পর্কে বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য বলেছেন-
“কালিদাসের উপমার মধ্যে এমন এক সাবলীলতা, এমন এক লালিত্য, এমন এক ঔচিত্য আছে, যাহা অন্যান্য কবির কাব্যে দুর্লভ।
মেঘদূত বর্ষার কাব্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছেনÑ “মেঘদূত ছাড়া নববর্ষার কোনো সাহিত্য কোথাও নাই। ইহাতে বর্ষার সমস্ত অন্তর্বেদনা নিত্যকালের ভাষায় লিখিত হইয়া গিয়াছে।”
“বর্ষা ও বিরহ এ বিষয় দুটি ভারতীয় কাব্যে আজ পর্যন্ত প্রধান হয়ে আছে তার একটি মূখ্য কারণ সন্দেহ নেই, মেঘদূতের আবহমান প্রতিপত্তি।” মেঘদূত কাব্য বিরহের কাব্য। তাই বিরহ বর্ণনায় কবি সাহিত্যিকরা বর্ষাকে টেনে আনেন। মেঘদূত কাব্য কালের সীমানা অতিক্রম করে চির বিরহী আত্মার আর্তি হয়ে চির উজ্জ্বল হয়ে আছে।
কালিদাসের কল্পনা ভাবাতুর মন সমসাময়িককালের কুশ্রীতা, মালিন্য সবকিছুকে অতিক্রম করে সৃষ্টি করেছেন অলকাপুরী। এ এমনপুরী যেখানে কোনো অপূর্ণতা নেই, যেখানে আছে শুধু প্রেম ও সৌন্দর্য। ‘মেঘদূত’ পাঠককে প্রাত্যহিক জীবনের সকল তুচ্ছতা খন্ডতা, ক্ষুদ্রতা, হীনতা, হেয়তা থেকে এক অসীম সৌন্দর্যালোকে মুক্তি দেয়। তাই ‘মেঘদূত’ পাঠ করে রবীন্দ্রনাথের মতো পাঠকের চিত্তও নববর্ষার ক্ষুদ্র আত্মকোটর হতে বিশ্ব পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়তে চায়।
আঙ্গিকগত দিক থেকে মেঘদূতকে নাটক, গীতিকাব্য, খন্ডকাব্য বা মহাকাব্য কোনো এককভাবে আখ্যায়িত করা যায় না। বরং এগুলোর সবটার লক্ষণ মেঘদূতে রয়েছে। তবে লিরিকের আভাস আর নাটকীয় বিন্যাসই কাব্যটিতে বেশি লক্ষ করা যায়।
পরিশেষে বলা যায় যে, কবির কবিত্ব শক্তির গুণে এ কাব্য কালের সীমা পেরিয়ে গিয়েছে। এ কাব্যের ছন্দ, উপমা, গতিময়তা, নাটকীয়তা, গীতিধর্মীতা, মহাকাব্যিক বিশলতা, বিরহসৃষ্টির অভিনবত্ব, প্রকৃতির চিত্রণ ইত্যাদি গুণ দেখে পাঠক বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়। উপমা-উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প নির্মাণে দেহজ কামনা প্রভাব বিস্তার করলেও কবির কবিত্বগুণে তা সৌন্দর্যমন্তিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন
বাংলা বিভাগ
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।
- বিশ্বসাহিত্য – মোবাশ্বের আলী
- বুদ্ধদেব বসু – কালিদাসের মেঘদূত (বাংলা অনুবাদ ও ভূমিকা)
- বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য (সম্পা.) – Dhvanyāloka of Ānandavardhana with Locana of Abhinavagupta
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী – মেঘদূত সম্পাদনা