ভারতীয় কাব্যে বর্ষা ও বিরহের প্রাধান্যের কারণ মেঘদূত কাব্য – আলোচনা কর।

মেঘদূত কাব্য অবলম্বনে বর্ষা ও বিরহ বর্ণনায় কবির কৃতিত্ব আলোচনা কর।

মেঘদূত কাব্য কালিদাসের সর্বাপেক্ষা সংক্ষিপ্ত ও জনপ্রিয় কাব্য। কাব্যটি বহুকাল ধরে রসিক-সমাজে বিশেষভাবে সমাদূত হয়ে আছে। মেঘদূত কাব্য কবির কবি-খ্যাতির দ্যোতক। এ কাব্যের মূল বিষয় বিরহ। বর্ষার সাথে বিরহের এক নিবিড় ও আন্তরিক সম্পর্ক বিরাজমান এবং বিশ্ব সাহিত্যের কবি কালিদাস তা সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন।

মেঘদূত কাব্য বিরহের ছবির কাব্য। বিরহের নিপুণ প্রয়োগের কারণে যুগ যুগ ধরে বর্ষা ও বিরহÑ এ বিষয় দুটি ভারতীয় কাব্যে প্রধান হয়ে আছে। বিরহের সাথে বিশেষভাবে বর্ষাঋতুকে সংশ্লিষ্ট করেন কালিদাস প্রথম। কালিদাসকে অনুকরণ করে পরবর্তী শ্রেষ্ঠ কবিরা বর্ষা-বিরহ সমন্বয় করে তাদের সৃষ্টি কল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। জয়দেব তাঁর ‘গীতগোবিন্দ’র প্রথমেই বর্ষার আষাঢ়ের মেঘকে সম্বোধন করেছে। বৈষ্ণব কবিদের রাধিকা, উজ্জয়িনীর মেয়েদের মতোই বর্ষার রাত্রে অভিসারে বাইরে যান ; আকাশে মেঘ উঠলে নায়ক-নায়িকার সঙ্গ-লিপ্সা বর্ধিত হয় ; চন্ডীদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত, বর্ষার সঙ্গে প্রেম ও বিরহের একটি অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ স্থাপিত হয়ে গেছে। ‘মেঘদূত’ কাব্যের প্রভাবেই একটি অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ স্থাপিত হয়ে গেছে। মেঘদূত কাব্য -এর প্রভাবেই এমনটি হয়েছে, তা স্বীকার করতেই হয়।

মেঘদূত কাব্য বিরহের কাব্য। কিন্তু এ প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু একটি ভিন্নমত পোষণ করে বলেছেন যে এই কাব্যে সত্যিকার বিরহের স্বাদ নেই, বর্ষার আবেগও এতে সঞ্চরিত হয়নি। বৈষ্ণব কবি বা রবীন্দ্রনাথ একটি মাত্র মুহূর্তে যা পেরেছে, শতোত্তর মন্দাক্রান্তা শ্লোক তাতে সফল হতে পারেনি। বৈষ্ণব কবিরা বলেছেন-

“এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূণ্য মন্দির মোর।”
অথবা,
“এমন দিনে থারে বলা যায়
এমন ঘন ঘোর বরিষায়।”

প্রেম, বিরহ ও বর্ষায় এই ক্ষুদ্র অংশগুলি যেমন ভরপুর, এদের অন্তর্নিহিত আবেগ যেমন পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে, মেঘদূত কাব্য -এ তেমন পাওয়া যায় না। বিরহ, প্রেম ও বর্ষাÑ তিনটি বিষয় একত্রে মিলে হৃদয়কে আপ্লুত করে নাÑ এমন কথাও বুদ্ধদেব বসু বলেছেন। বিরহ প্রসঙ্গেও পাঠকের নিরাশার কথা বলেছেন।

মেঘদূত কাব্য সম্পর্কে এরকম ভিন্নমত পোষণ করার যুক্তি অবশ্য আছে। কেননা উত্তরমেঘের শেষে যক্ষ যা বলেছে তাতে তাকে ভোগবঞ্চিত বিলাসী নাগর বলেই মনে হয়। যক্ষ মেঘকে তার প্রিয়ার কাছে পাঠাচ্ছে কিন্তু দূতকে তাড়া না দিয়ে ঘুরে ঘুরে বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে যেতে বলেছে। তাছাড়াও নদীতে পাহাড়ে সুখ ভোগ করতে এবং উজ্জয়িনীতে রাত কাটিয়ে, কৈলাসে নানা প্রমোদে মেতে উঠতে বলেছে। বর্ণনা পড়ে মনে হয় সম্ভোগ ছাড়া অলকাবাসীর আর কোন কাজ নেই। মেঘের যাত্রাপথের বর্ণনা দিতে গিয়ে মেঘের ভোগ্যবস্তু হিসেবে যেসব উপমা ও চিত্রকলা নির্মিত হয়েছে তা নারী শরীরের যৌনাঙ্গ ও ইন্দ্রিয়জ ভোগ সম্পর্কিত।

অন্যদিকে যক্ষ চিরদিনের জন্য নির্বাসিত নয়। এমন নয় যে যক্ষ তার প্রেয়সীকে আর দেখতে পাবে না, তার স্ত্রী পরস্ত্রীও হয়ে যায় নি। মাত্র এক বছরের বিচ্ছেদ, আট মাস পার হয়ে গেছে, আর চারমাস পর মিলন নিশ্চিত। তাছাড়া যক্ষ যে রামগিরি পর্বতে থাকে, সে রামগিরি মনোরম। যক্ষের অভাব শুধু সঙ্গিনীর। তাই মনে হয় যক্ষ যদি ইন্দ্রিয়ভোগের ব্যবস্থা করতে পারতো তাহলে তার কোনো বেদনা থাকতো না।

যক্ষের নিজের কথার চেয়ে কবির বর্ণনায় যক্ষের কাতরতা বেশি প্রকাশ পেয়েছে। যক্ষের আকুলতা তার স্ত্রীর জন্য। তার নিজের কষ্ট বড় কথা নয়, কষ্ট সহ্য করতে না পেরে পাছে স্ত্রী প্রাণত্যাগ করেÑ এই ভয় যক্ষের মনে। স্ত্রীর কাছে খবর পাঠাচ্ছে এই যক্ষ বেঁচে আছে, ভাল আছে, মেঘকে স্ত্রীর খবর এনে দেবার কথা উত্তর মেঘের শেষ অংশে একবারমাত্র বলেছে। উপর্যুক্ত যুক্তির তালিকা দেখলে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ জাগতে পারে ‘মেঘদূত’ কি তাহলে বিরহের কাব্য নয়?

বর্ষা ও বিরহের সম্পর্ক বাংলা কাব্যে কালিদাসই আবিষ্কার করেছেন। পরবর্তীকালে বাংলা কাব্যে বর্ষা ও বিরহের প্রভাব লক্ষ করা যায়। কালিদাস কাব্যের প্রথমেই বলেছেন যে, মেঘ দেখলে সুখী লোকের চিত্তও বিমনা হয়ে যায়। আর যে বিরহী তার তো কথাই নেই। তাই আষাঢ়ের প্রথম দিবসে রামগিরি পর্বত থেকে আকাশে পুঞ্জীভূত মেঘ দেখে প্রভূর অভিশাপে নির্বাসিত যক্ষের চিত্ত উদ্বেলিত হয়ে ওঠেÑদূর অলকাপুরীতে প্রিয়ার কথা স্মরণ করে।

বিরহে নিতান্ত কাতর বলেই যক্ষ মেঘকে দূত হবার অনুরোধ করেছে। বিরহে এত কাতর যে মেঘ দূত হবার উপযোগী কিনা এ জ্ঞান ও তার নেই। এ প্রসঙ্গে কবি বলেছেন যে, কার্মাতগণ চেতন ও অবচেতনের মধ্যে পার্থক্য হারিয়ে ফেলে। প্রেমাতুর যক্ষের মধ্যেও সকল ভেদবুদ্ধি লোপ পেয়েছে এবং সে অবচেতন মেঘকেই দূত করেছে।

বিরহ বেদনায় যক্ষ কাতর হয়েছে বলেই প্রিয়ার কথা মনে পড়েছে। আর মনে হয়েছে প্রিয়ার কাছে খবর না পাঠালে সে হয়তো আর বাঁচবে না। প্রেম ও বিরহ মানুষকে আশংকাতুর করে তোলে। যক্ষ দেবযোনী হলেও প্রভূর অভিশাপে মর্তে এসে বসবাস করেছে এবং দেবতার মহিমা হতে বিচ্যুত হয়েছে। কবি তাকে মানুষের মতো করে গড়ে তুলেছে। এজন্য সে মানুষের মতো আশংকাতুর।

অলকাপুরী চির আনন্দের জায়গা, সেখানে যক্ষপতœী একাকিনী, গভীর উৎকন্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সে অলকাপুরীতে কোনো বিচ্ছেদ কাতরতা নেই, সেখানে যক্ষপ্রিয়ার বিরহ বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে।

কবি যক্ষের বেদনাকে বিশ্বপ্রসারী করে তুলেছে। রামগিরি থেকে অলকা পর্যন্ত সমগ্র বিশ্ব প্রকৃতি ও বিশ্বজগৎ বিরহাতুর যক্ষের সমব্যথী। যক্ষের বিরহ আমাদেরই বিরহ। নববর্ষার বিরহের যে অব্যক্ত বেদনা যুগ যুগ ধরে প্রেমিক হৃদয়কে ব্যাকুল করে তোলে, তাই এ কাব্যে বিরহ চিরন্তন রূপ লাভ করেছে।

যক্ষের বিরহ-বেদনা ব্যক্তিকে অতিক্রম করে সার্বজনীন রূপ লাভ করেছে। রবীন্দ্রনাথ তাই যক্ষের বিরহকে ব্যক্তিগত বিরহরূপে না দেখে বিশ্বের সকল প্রেমিক হৃদয়ের বিরহ বেদনার শাশ্বত প্রকাশ বলে উপলব্ধি করেছেনÑ

“কবিবর, কবে কোন বিস্মৃত বরষে
কোন পূণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিকসে
লিখেছিলে মেঘদূত। মেঘমন্ত্র শ্লোক
বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক
রাখিয়াছে আপন আঁধার স্তরে স্তরে
সঘন সংগীত মাঝে পুঞ্জীভূত করে।”

নজরুল ইসলাম নার্গিসকে লেখা একটি পত্রেও উল্লেখ করেছেন “তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নববর্ষার নবঘনসিক্ত প্রভাতে। মেঘমেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল।” মেঘপুঞ্জকে কবি নমস্কার জানিয়েছেন এই বলে যে এই মেঘদূত বিরহী যক্ষের বাণী তার প্রিয়ার কাছে নিয়ে গিয়েছিল। এই মেঘপুুঞ্জের আশীর্বাণী নজরুলের জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চয়। “এই আষাঢ় আমার কল্পনার স্বর্গলোক থেকে টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে।” এমনিভাবে হাজারো দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। এতে বাংলা কাব্যে মেঘদূতের প্রভাব স্বীকার করে নিতেই হয়। মূলত বৈষ্ণব কাব্যে বিরহ ও রবীন্দ্র কাব্যে বর্ষা-বিরহ মেঘদূতের বিরহেরই টীকাভাষ্য বা সহজ রূপ।

সমালোচকরা বলেছে যক্ষের বিরহ ক্ষণিকের, কিন্তু বিচ্ছেদ ক্ষণকালীন হলেও বেদনা নিছক উচ্ছ্বাসে পর্যবসিত হয় না। ইংরেজ কবি ডাইড্রেনের কথা- ÒEvery little adrence is an age বিরহের প্রতিটি মুহূতই অনন্ত বলে প্রতিভাত হয়। যক্ষের ক্ষেত্রেও বিরহের প্রতিটি মুহূর্ত অনন্ত বলে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।

বুদ্ধদেব বসু যক্ষকে ভোগবঞ্চিত বিলাসী নাগররূপে চিত্রিত করতে গিয়ে যে যুক্তি দেখিয়েছেন তা আদৌ মেনে নেওয়া যায় না। কেননা যক্ষকে একজন বিলাসী নাগররূপে নয়, সত্যিকারের বিরহীরূপেই কবি রূপায়িত করেছেন।

যক্ষের বিরহ যথার্থ ও আন্তরিক বলেই শাশ্বত মর্যাদা পেয়েছে। এবং তা না হলে –

“এতদিনে মেঘদূতের ভাববস্তু ‘অস্তুংগমিত মহিমা’ হোত। পক্কবিম্বাধরোষ্ঠীর রক্তিম আভা ফিকে হয়ে আসতো, যক্ষপত্নীর চিবুকের ছায়াখানি বর্তমানের খরতাপে ম্লানচ্ছবি হয়ে যেত।” (পার্বতীচরণ ভট্টাচার্য, মেঘদূত পরিচয়)

পরিশেষে বলা যায় যে, যক্ষের বিরহ-বেদনা সত্যি বলেই কবি কালিদাস যক্ষের বেদনার মাধ্যমে বিশ্বের সকল বিরহীর বেদনাকে রূপদান করতে সমর্থ হয়েছেন। তাই মেঘদূত কাব্য যুগ যুগ ধরে বিশ্বের সকল বিরহীর চিত্তে আবেদন জানায়। মেঘদূত কাব্য তাই বর্ষার কাব্য, বিরহের কাব্য। মেঘদূত নববর্ষার চিরন্তন কাব্য। বর্ষাকে ঘিরে মানব হৃদয়ে জেগে ওঠা বিরহের বেদনাকে নিত্য-কালের ভাষায় রূপদান করেছেন কালিদাস। এ বিরহ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে গেছে। যক্ষের বিরহ যথার্থ ও আন্তরিক বলেই শাশ্বত মর্যাদা লাভ করেছে। যক্ষের বিরহ বেদনার মধ্যে দিয়ে পাঠক যুগ যুগ ধরে চির বিরহী হৃদয়ের বেদনাকে প্রত্যক্ষ করে।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন

বাংলা বিভাগ,

সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *