মধ্যযুগের কবিতা – কালকেতু উপাখ্যানের সংলাপ – বাংলা সম্মান শ্রেণি

সাজেশন-২৪-কালকেতু উপাখ্যানের উক্তি বা সংলাপভিত্তিক তথ্যকণিকা:

১. সরকার হৈল কাল খীল ভূমি লেখে লাল
বিনি উপকারে খায় ধূতি।
পোতদার হৈল যম টাকা আড়াই আনা কম
পাই লভ্য খায় দিন প্রতি।

কালকেতু উপাখ্যানের গ্রন্থ-উৎপত্তির কারণ অংশ থেকে নেওয়া। কবির অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত হয়েছে। সমকালীন জমিদারদের অত্যাচারের কথা বলা হয়েছে। জনজীবনের বাস্তব চিত্র প্রকাশিত। সরকারই প্রজার সমস্ত দুঃখের কারণ। অনাবাদি জমি খাজনার তালিকায় লিখে নেয়। উপকার ছাড়াই সরকারি কর্মচারী ঘুষ খায়। পোতদার টাকা দাদন দেওয়ার সময় টাকায় আড়াই আনা কম দেয়। অর্থাৎ এক টাকা ধার নিলে আড়াই আনা কেটে রেখে ষোল আনা থেকে আড়াই আনা বাদ দিয়ে সাড়ে চৌদ্দ আনা দেয়। আবার প্রতিদিন এক টাকার উপর এক পয়সা করে লাভ দিতে হবে। এ যেন মগের মুল্লুক।

কালকেতু উপাখ্যান- অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্রোত্তর

২. যদি পাই মিঠা ঘোল পাকা চালিতার ঝোল
প্রাণ পাই পাইলে আমসী।
আমার সাধের সিমা হেলঞ্চ গিমা
বোয়ালী কুটিয়া কর পাক।

কালকেতু উপাখ্যানের নিদয়ার ‘সাধ ভক্ষণ’ অংশ থেকে নেওয়া। গর্ভবতী নারীর ইচ্ছার কথা ব্যক্ত হয়েছে। সাধ ভক্ষণের খাবারের তালিকা দেখে সমকালীন নি¤œ শ্রেণির সমাজজীবনের দৈনন্দিন খাবারের একটা বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। বিভিন্ন খাবারের কথা এখানে বলা হয়েছে।

৩. দুই তিন মাস গেলে শিশুগণে মেলে
ভল্লুক শরভ ধরি কালকেতু খেলে।

কালকেতু উপাখ্যানের কালকেতুর জন্ম অংশ। বাল্যকালে কালকেতুর খেলার উপকরণ ও ধরন সম্পর্কে বলা হয়েছে।

৪. শুন্ডে ধরি মাতঙ্গরে আছড়িয়া মারে
দন্ড উপাড়িয়া বীর আনে ভারে ভারে।

কালকেতু উপাখ্যানের কালকেতুর মৃগয়া। পশু শিকার, বীরত্ব ও উপার্জনের ধরন। ব্যাধজীবনের একটা চিত্র পাওয়া যায়।

৫. নারীগণ সঙ্গে থাক লীলা রঙ্গে
না কর-দোষ বিচার।
বীর কালকেতু পশু বধহেতু
নিত্য পাড়ে মহামার ॥

কালকেতু উপাখ্যানের বাঘিনীর নিবেদন অংশ। পশুরাজ সিংহকে মুদু ভর্ৎসনা। পশু শিকার করতে গিয়ে কালকেতু পশু সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। রাজা হয়েও সিংহ পশু সমাজকে রক্ষা করতে পারে না। বাঘিনী তাই সিংহকে ভর্ৎসনা করে। পশুপাখির অভিযোগের মধ্যে সমকালীন সমাজে ডিহিদার মামুদ কর্তৃক অত্যাচারের চিত্র প্রতীকী অর্থে ফুটে উঠেছে।

৬. কেন হেন জন্ম বিধি কৈল পাপবংশে।
হরিণ ভুবনে বৈরী আপনার মাংসে ॥

কালকেতু উপাখ্যানের পশুগণের ক্রন্দন অংশ। হরিণের বিলাপ। ক্ষমতাধারী ও অত্যাচারীর কাছে যখন অত্যাচরিত হয়, কোনো প্রতিকার করতে পারে না, উপায়ও নেই , তখন বিলাপ করা ছাড়া কোনো গতি থাকে না। আর নিজেই যখন নিজের ক্ষতির কারণ হয়ে পড়ে, তখন নিজেকে আরও অসহায় মনে হয়। হরিণের মাংস যদি মানুষের প্রিয় না হতো হয়তো হরিণের আজ এত বড় বিপদ হতো না।

৭. চারি পুত্র মৈল মোর মৈল চারি ঝি
মাগু মৈলবুড়া কালে জীয়া কাজ কি।

কালকেতু উপাখ্যানের পশুগণের ক্রন্দন অংশ। সজারুর বিলাপ।

৮. সুবর্ণ-গোধিকা দেখি চিন্তে বীর হৈয়া দুঃখি
অযাত্রিক পাপ দরশনে।

কালকেতু উপাখ্যানের কালকেতুর বনযাত্রা। মৃগয়ায় যাওয়ার পথে স্বর্ণ গোধিকা দেখে কালকেতুর দুঃখ। যাত্রানাস্তি প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে। ব্যাধজীবনের বিশ^াস শিকারে যাওয়ার সময় স্বর্ণগোধিকা দেখলে শিকার মেলে না। স্বর্ণগোধিকা তারা শিকার করে না, তাকে অশুভ মনে করে।

৯. ক্ষুদ্র কিছু ধার নিবে সইয়ের ভবনে
কাঁচড়া ক্ষুদের জাউ রান্ধিবে যতনে।

কালকেতু উপাখ্যানের ফুল্লরা ও কালকেতুর কথোপকথন। পশু না পেয়ে শূন্য হাতে বাড়ি আসলে কালকেতু ফুল্লরাকে সইয়ের কাছ থেকে কিছু খুদ ধার প্রসঙ্গে বলে। নিত্য অভাবের সংসারে কিছু না থাকলে বাঁচার তাগিদে প্রতিবেশী বা আপনজনের কাছে ধার চাওয়া সমাজের একটা নিত্য প্রথা।

১০. বিধাতা করিল মোরে দরিদ্রের কান্তা
চারি প্রহর করি সই উদরের চিন্তা।

কালকেতু উপাখ্যানের ফুল্লরা ও কালকেতুর কথোপকথন। ফুল্লরার সই এর কথার প্রসঙ্গে ফুল্লরা এ কথা বলে। সইয়ের বাড়িতে খুদ ধার করতে গেলে সই ফুল্লরার ভালো-মন্দ জানতে চাইলে ফুল্লরা নিজের জীবনের দুরবস্থার কথা বলে। ফুল্লবার কথার মধ্যে নি¤œশ্রেণির মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিত্য অভাবের কথা প্রকাশ পেয়েছে। দিন আনি দিন খায়, নুন আনতে পান্তা ফুরায় Ñ এমন অবস্থা যাদের তাদের খাবারের চিন্তা ছাড়া আর কোনো চিন্তা মাথায় আসে না। নিজ ভাগ্যের বিড়ম্বনা বিধাতার ঘাড়ে চাপিয়ে সান্ত¡না খোঁজা ছাড়া আর উপায় কি।

১১. শয়ন কুৎসিত বীরের ভোজন বিটকাল।
গ্রাসগুলি তোলে যেন তেআটিয়া তাল।

কালকেতু উপাখ্যানের কালকেতুর চেহারা ও খাবারের নমূনা প্রসঙ্গে কবি বলেছেন। তিন আটি তালের মতো করে লোকমা তুলে গালে দেয়। অতিরিক্ত খেয়ে পেট ঢাউস করে কুৎসিতভাবে ঘুমায়।

১২. হেন বাক্য হইল যদি অভয়ার তুন্ডে।
আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়ে ফুল্লরার মুন্ডে ॥

কালকেতু উপাখ্যানের চণ্ডীর সহিত ফুল্লরার সাক্ষাৎ। চণ্ডীদেবী সতীন হয়ে ফুল্লরার বাড়িতে থাকতে চাইলে ফুল্লরার যে অবস্থা হয়, সে বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বাঙালি নারী আর যা-ই হোক স্বামীর ভাগ কারও দিতে চায় না। চ-ীদেবীকে বুঝিয়ে , যুক্তি দিয়ে সতীনের ঘরে পাঠানোর ক্ষেত্রে ফুল্লরা অনেক তৎপর, কিন্তু যখনই ফুল্লরার সতীন হয়ে থাকতে চাইল, অমনি ফুল্লরা চোখে সরষের ফুল দেখল।

১৩. আছিলাম একাকিনী বসিয়া কাননে।
আনিয়াছে তোর স্বামী বান্দি নিজগুণে ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ফুল্লরার সহিত চণ্ডীর কথোপকথন। ফল্লরা চন্ডীকে তাড়ানোর চেষ্টা করলে চণ্ডী এ কথা বলে।

১৪. তুমি খুড়া হৈলে বন্দী অনুক্ষণ আমি কান্দি
বহু তব নাহি খায় ভাত।


কালকেতু উপাখ্যানের একটা অংশে কালকেতু ভাড়ুদত্তের চাতুরিতে কলিঙ্গ রাজার হাতে বন্দি হয়। বন্দি অবস্থা থেকে কালকেতু ছাড়া পাওয়ার পর বাড়ি ফিরে এলে ভাড়–দত্ত কালকেতুকে এ কথা বলে। কপট ব্যক্তিদের বাস্তব আচরণের নিঁখুত চিত্র এটা।

১৫. বিচার করিয়া রায় মোরে কর রোষ।
পরিণামে জানিবে কালুর নাহি দোষ ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ‘কলিঙ্গ নৃপতির সহিত কালকেতুর কথোপকথন’ অংশে কালকেতু কলিঙ্গ রাজকে লক্ষ্য করে এ কথা বলে। ভাড়ুদত্তের বিশ্বাসঘাতকতায় কালকেতু বন্দি হয়। হাটে ভাড়–দত্তের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে হাটুরেরা কালকেতুর কাছে নালিশ করে। কালকেতু ভাড়–দত্তের ম-লগিরি কেড়ে নেয় এবং অপমান করে। ভাড়–দত্ত প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য পাশের কলিঙ্গরাজের কাছে কালকেতুর নামে মিখ্যা রটনা করে।

কলিঙ্গরাজ কালকেতুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কালকেতু প্রথমে জয়ী হলেও পরে পরাজিত হয়ে আত্মগোপন করে, কিন্তু ভাড়–দত্তের সহযোগিতায় ধরা পড়ে বন্দি হয়। কলিঙ্গরাজ কালকেতুর পরিচয় জানতে চাইলে ব্যাধজীবন থেকে শুরু করে রাজা হওয়া পর্যন্ত সবই বর্ণনা করে। কালকেতু নিজেকে নির্দোষ দাবী করে , কেননা সে যা করেছে দেবীর আজ্ঞায় করেছে।

১৬. কুলের বহুরি আমি কুলের নন্দিনী।
আপনার ভালমন্দ আপনি সে জানি।

কালকেতু উপাখ্যানের দেবীরূপী সুন্দরীকে ঘর থেকে তাড়াবার জন্য ফুল্লরা অনেক উপদেশ ও নীতিকথা শুনালে দেবী চ-ী এ কথা বলে। ফুল্লরা তার সংসারে সম্ভাব্য সতীনের আগমন আটকাতে দেবীকে কুলবধূর মর্যাদা, বংশগৌরব, স্বামীর প্রতি কর্তব্য ইত্যাদি উপদেশ দিয়ে দেবীকে নিজের বাড়ি ফিরে যেতে বলে। রাগ করে সতীনের ঘর ছাড়লে সতীনেরই লাভ, দেখে উঁচু বংশের মনে হলেও কেন আচরণ নীচু জাতের মেয়ের মতো ইত্যাদি উপদেশ ও নীতিবাক্য শুনে ছদ্মবেশী চ-ী বলে যে, সে নি¤œজাতের নয়, সম্ভ্রান্ত বংশের কুলবধূ। সে নিজের ভালোমন্দ বোঝে।

১৭. পিপীড়ার পাখা উঠে মরিবার তরে।
কাহার ঘোড়শী কন্যা আনিয়াছ ঘরে ॥

কালকেতু উপাখ্যানের কালকেতুর প্রতি ফুল্লরা অংশ থেকে । সুন্দরী নারীকে ঘরে এনে তোলার কারণে ফুল্লরা তার স্বামীকে বলে। সম্ভাব্য সতীনকে তাড়ানোর শত চেষ্টা বিফলে গেলে সমস্ত রাগ দিয়ে পড়ে স্বামীর উপর। কেননা, স্বামীই তাকে এনেছে। যন্ত্রণায় জর্জরিত ফুল্লরা হাটে গিয়ে স্বামীকে ক্ষোভের সাথে বলে যে, পিঁপড়ার যেমন পাখা উঠে আগুনে পুড়ে মরার জন্য, সুন্দরি নারীকে ঘরে এনে তোলার জন্য কালকেতুরও তেমন অবস্থা হবে। কারণ, এ সুন্দরি যাদের ঘরের তারা কালকেতুকে ছেড়ে কথা বলবে না।

১৮. পাপিষ্ঠ জ্যৈষ্ঠ মাস পাপিষ্ট জ্যৈষ্ঠ মাস।
বেঙচের ফল খ্যায়া করি উপবাস ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ‘ফুল্লরার বার মাসের দুঃখ’ অংশে সুন্দরীকে তাড়াতে জৈষ্ঠ মাসের দুঃখ বর্ণনা করতে গিয়ে ফুল্লরা এ কথা বলে। কোনো নারীই চায় না তার স্বামীর উপর অন্য কেউ ভাগ না বসাক।

১৯. অতি দুঃখ মধুমাসে অতি দুঃখ মধুমাসে।
একত্রে শয়নে স্বামী যেন ষোল ক্রোশে ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ‘ফুল্লরার বার মাসের দুঃখ’ অংশে সুন্দরীকে তাড়াতে বসন্তকালের/মধুমাসের দুঃখ বর্ণনা করতে গিয়ে ফুল্লরা চ-ীদেবীকে বলে। সংসারের অভাব মধুমাসের স্বামী-স্ত্রীর সুখও সইতে দেয় না। এ দুঃখ বর্ণনার পশ্চাতে রয়েছে সম্ভাব্য সতীনকে তাড়ানো। কোনো নারীই চায় না তার স্বামীর উপর অন্য কেউ ভাগ না বসাক।

২০. শাশুরী ননদী নাহি নাহি তোর সতা।
কার সঙ্গে দ্বন্দ্ব করি চক্ষু কৈলি রাতা ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ‘কালকেতুর প্রতি ফুল্লরা’ অংশে ফুল্লরা কাঁদতে কাঁদতে হাটে গিয়ে কালকেতুর সামনে গেলে কালকেতু ফুল্লরাকে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলে। এখানে বাঙালি বধূজীবনের একটা শাশ^ত রূপ ফুটে উঠেছে। শাশুড়ি, ননদ ও সতীনই বধূজীবনের বিড়ম্বনার উৎসমূল। ফুল্লরার এসব নেই, তবুও কেন তার চোখ লাল। কালকেতু তাই জানতে চায়। ছদ্মবেশী দেবীর সতীনরূপে ফুল্লরার সংসারে অবস্থানের সম্ভাব্য আশ্কংায় ফুল্লরার চোখে জল। সতীনের ভয়েই কাঁদতে কাঁদতে তার চোখ লাল।

২১. হাসেন জগৎ-মাতা বুঝি তার মন।
না পলাইব লয়্যা তোর বাপ-কালি ধন ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ‘কালকেতুর ধন প্রাপ্তি’ অংশে দেবী প্রদত্ত ধন আবার দেবীই যদি চুরি করে কালকেতুর এমন ভাবনার জবাবে দেবী হেসে নিয়ে এ কথা বলেছে। দেবীর বরে প্রাপ্ত সম্পদের কলস কালকেতু নিজে সব নিতে না পেরে দেবীকে একটা কলস নিতে বলে। কলস নিয়ে কালকেতু আগে দেবী পিছে। কালকেতুর মনে সন্দেহ, দেবী যদি কলস নিয়ে পালায়। তাই কালকেতু পেছন ফিরে বারে বারে তাকায়। দেবী কালকেতুর মনোভাব বুঝতে পেরে এ কথা বলে।

২২. বামন হইয়া হাত বাড়াইলে শশী।
আখেটির ঘরে শোভা পাইবে উর্ব্বশী ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ‘কালকেতুর প্রতি ফুল্লরা” অংশে দেবীরূপী সুন্দরীকে ঘরে আনায় ফুল্লরা রেগে গিয়ে কালকেতুকে বলে। সম্ভাব্য সতীনকে তাড়ানোর শত চেষ্টা বিফলে গেলে সমস্ত রাগ দিয়ে পড়ে স্বামীর উপর। কেননা, স্বামীই তাকে এনেছে। যন্ত্রণায় জর্জরিত ফুল্লরা হাটে গিয়ে স্বামীকে ক্ষোভের সাথে বলে যে, বামন হয়ে চাঁদ ধরতে গেলে শোচনীয় দুর্দশায় পড়তে হয়। যেমন, পাখা উঠা পিঁপড়ার পরিণতি হয়।

২৩. মনে মনে কালকেতু করেন যুকতি।
ধন ঘড়া নিয়া পাচ্ছে পালায় পার্ব্বতী ॥

‘কালকেতুর ধন প্রাপ্তি’। ধন নিয়ে যাওয়ার সময় দেবীর কাছে একটা ঘড়া দেয়। দেবী পিছন পিছন যাচ্ছিল। চ-ী যদি ধন নিয়ে পালায় তাই কালকেতু মনে মনে এ কথা বলে। দেবীর বরে প্রাপ্ত সম্পদের কলস কালকেতু নিজে সব নিতে না পেরে দেবীকে একটা কলস নিতে বলে। কলস নিয়ে কালকেতু আগে দেবী পিছে। কালকেতুর মনে সন্দেহ, দেবী যদি কলস নিয়ে পালায়। তাই কালকেতু পেছন ফিরে বারে বারে তাকায়।

২৪. সত্য মিথ্যা বাক্যে ধর্ম্ম আপনে প্রমাণ।
তিন দিবসের চাঁদ দেখি বিদ্যামান ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ‘কালকেতুর প্রতি ফুল্লরা’ । কালকেতু সুন্দরী নারী ঘরে আনার কথা অস্বীকার করলে ফুল্লরা এ কথা বলে। প্রত্যক্ষ প্রমাণ অস্বীকার করা যায় না। কালকেতু তো জানে সে কোনো সুন্দরি নারী আনেনি। সকল নারীকে সে মায়ের মতো দেখে। ফুল্লরা তখন উক্ত উপমা দিয়ে বলে যে, তিন দিনের চাঁদ মানুষ ঘরে বসেই দেখতে পায়। বাড়ি গেলেই কালকেতু বুঝতে পারবে।

২৫. নিজমূর্ত্তী ধরিলে প্রবোধ পাই মনে।
যেইরূপে লোক তোমা পূজায় আশ্বিনে ॥

‘দেবীর পরিচয় প্রদান’ অংশে ছদ্মবেশী দেবী কালকেতুকে বর দিতে চাইলে কালকেতু তা বিশ্বাস করে না। তাই, কালকেতু দেবীকে নিজমূর্তি ধারণ করতে বলে, যেরূপে আশ্বিনে লোকে পুজো করে, সেরূপে যেন দেখা দেয়।

২৬. অতি নীচকূলে জন্ম জাতি গো চোয়াড়।
কেহ না পরশে জল লোকে বলে রাড় ॥

ব্যাধ কালকেতুকে সাত ঘড়া ধন দিয়ে মন্দির তৈরি করে দেবীর পুজো করার কথা বললে কালকেতু নিজের বংশ, সমাজের প্রসঙ্গে এ কথা বলে।

২৭. সোনা-রূপা নহে বাপা এ বেঙ্গা পিতল।
ঘষিয়া মাজিয়া বাপু করেছ উজ্জল।

কালকেতু উপাখ্যানের বণিক ও কালকেতুর কথোপকথন। দেবী প্রদত্ত মূল্যবান আংটি মুরারিশীলের বাড়িতে বিক্রি করতে গেলে ঠক অর্থলোভী মুরারিশীল কালকেতুকে আংটি সম্পর্কে বলে।

২৮. ধর্ম্মকেতু ভায়া মনে কৈলু লেনা দেনাএ
তাহা হৈতে হৈলা বাপা বড়ই শেয়ানা ॥

বণিক ও কালকেতুর কথোপকথন। দেবী প্রদত্ত মূল্যবান আংটি মুরারিশীলের বাড়িতে বিক্রি করতে গেলে ঠক অর্থলোভী মুরারিশীল কালকেতুর চতুরতা বিষয়ে এ কথা বলেছে।

২৯. ফজর সময়ে উঠি বিছায়ে লোহিত পাটি
পাঁচ বেরী করয়ে নামাজ।
ছোলেমানী মালা করে জপে পীর পেগম্বরে
পীরের মোকামে দেয় সাঁজ ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ‘মুসলমানগণের আগমন’ অংশে মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কবি এ কথা বলেছেন। কালকেতুর গুজরাট নগরে মুসলমানদের অবস্থান পশ্চিম পাশে। সমকালীন সমাজ অরাজকতার প্রেক্ষিতে বাস্তুহারা কবি মুকুন্দরামের কালকেতু কর্তৃক সুন্দর সমাজ ব্যবস্থার অবতারণা করেছেন। মুসলমানেরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, সলেমানি তসবি জপে, পির-পয়গম্বরের কবরে ধূপ-বাতি দেয়।

৩০. রোজা নামাজ না করিয়া কেহ হৈল গোলা।
তাসন করিয়া নাম ধরাইল জোলা ॥

মুসলমানদিগের শ্রেণীবিভাগ। গুজরাট নগরে আগত মুসলমানদের শ্রেণীবিভাগ সম্পর্কে কবি এ কথা বলেছেন। কালকেতুর গুজরাট নগরে মুসলমানদের অবস্থান পশ্চিম পাশে। সমকালীন সমাজ অরাজকতার প্রেক্ষিতে বাস্তুহারা কবি মুকুন্দরামের কালকেতু কর্তৃক সুন্দর সমাজ ব্যবস্থার অবতারণা করেছেন। মুসলমানদের মধ্যে নানা পেশার উল্লেখ করে পেশাভিত্তিক সমাজব্যবস্থার বিবরণ দিয়েছেন। পেশাভিত্তিক এ মুসলমান সমাজ সে সময়ে নামেমাত্র্র মুসলমান ছিল, নামাজ-রোজাসহ ধর্মীয় বিধানের চেয়ে পেশাকেই বড় করে দেখতো। যেমন, কাপড় বোনা জোলা বা কারিগর শ্রেণি।

৩১. মণ্ডল বলাতে তোর মুখে নাহি লাজ।
খর্ব্ব হয়্যা ধরিবারে চাহ দ্বিজরাজ ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ‘কালকেতু সমীপে ভাড়ুদত্ত’ অংশে কালকেতু কর্তৃক ভাড়ুদত্তের তিরস্কার প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে। ভাড়ুদত্তের অত্যাচারে হাটুরেরা কালকেতুর কাছে ভাড়ুদত্তের নামে নালিশ করে। হাটুরেদের অত্যাচারের কারণ জিজ্ঞাসা করায় ভাড়ুদত্ত জানায় যে, তারা বংশ পরম্পরা মণ্ডল, হাটে তোলা নেওয়া তার জন্মগত অধিকার। নিজেকে নিজে মণ্ডল বলায় কালকেতু তাকে নির্লজ্জ হিসেবে আখ্যায়িত করতে এ কথা বলে।

৩২. খুড়ী খুড়ী বলি ভাঁড়ু করিলা জোহার।
অঞ্জলি করিয়া কহে কপট প্রকার ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ‘ভাঁড়ুদত্তের চাতুরী’ অংশে ভাড়–দত্তের কপট বিনয় প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে। কালকেতু ভাড়–দত্তকে অপমান করে তাড়িয়ে দিলে কলিঙ্গরাজের কাছে গিয়ে কালকেতুর নামে মিথ্যা রটনা রটায়। কলিঙ্গরাজ কালকেতুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। প্রথমে কালকেতু জয়লাভ করলেও হঠাৎ করে গুজরাট আক্রমণ করে। কালকেতু গোলাঘরে লুকিয়ে থাকে। চতুর ভাড়–দত্ত কালকেতুর গোপন অবস্থান জানার জন্য ফুল্লরার সাথে কপট বিনয়ের অভিনয় করে এবং কালকেতুর গোপন অবস্থান জেনে ধরিয়ে দেয়।

৩৩. হরিদত্তের বেটা হই জয়দত্তের নাতি।
হাটে লয়্যা বেচাইব বীরের ঘোড়া হাতী ॥

‘কালকেতু সমীপে ভাঁড়ুদত্ত’ অংশে কালকেতু ভাঁড়ুদত্তকে তিরস্কার করলে ভাড়–দত্ত বাপ-দাদার নাম নিয়ে কালকেতুর ক্ষতি করার প্রতিজ্ঞা করে।

গুজরাট নগরে ভাঁড়ুদত্ত নিজেই মণ্ডল সেজে হাটে খাজনা আদায়ের নামে হাটুরেদের অত্যাচার শুরু করে। অতিষ্ট হাটুরেরা কালকেতুর কাছে ছ ভাড়–দত্তের নামে নালিশ করে। কালকেতু ভাঁড়ুদত্তকে তিরস্কার করে এবং মণ্ডলী কেড়ে নেয়। অপমানিত ভাঁড়ুদত্ত কালকেতুর ব্যাধজীবনের কথা তুলে কালকেতুকে খোটা দেয়, ছোট করতে চায়। কালকেতুর আগের ইতিহাস তুলে অপমান করতে চায়। বাপ-দাদার নাম নিয়ে শপথ নেয় যে, দরিদ্র কালকেতু ভাগ্যগুণে আজ রাজা হয়েছে, খুব শিঘ্রই ভাড়ুদত্ত এমন অবস্থা করবে যাতে কালকেতুকে আবার ব্যাধজীবনে ফিরে গিয়ে আবার হাতি-ঘোড়া বেচতে যেতে হয়, ফুল্লারাকেও হাটে হাটে পুনরায় মাংস বেচতে যেতে হয়।

৩৪. সেখানে আমার খুড়া খুচালে মন্ডলী।
দেখিয়াছি খুড়া হে তোমার ঠাকুরালী।
তিন গোটা শর ছিল এক গোটা বাঁশ।
হাটে হাটে ফুল্লরা পসরা দিত মাস ॥

কালকেতু উপাখ্যানের ‘কালকেতু সমীপে ভাড়ুদত্ত’ অংশে কালকেতু ভাড়ুদত্তকে তিরস্কার করলে ভাড়ুদত্ত অপমানিত হয়ে কালকেতুর দারিদ্র্যময় জীবনের কথা তুলে অপমান করতে চায়।


গুজরাট নগরে ভাড়ুদত্ত নিজেই মণ্ডল সেজে হাটে খাজনা আদায়ের নামে হাটুরেদের অত্যাচার শুরু করে। অতিষ্ট হাটুরেরা কালকেতুর কাছে ছ ভাড়–দত্তের নামে নালিশ করে। কালকেতু ভাড়ুদত্তকে তিরস্কার করে এবং মণ্ডলীপদ কেড়ে নেয়। অপমানিত ভাড়ুদত্ত কালকেতুর ব্যাধজীবনের কথা তুলে কালকেতুকে খোটা দেয়, ছোট করতে চায়। কালকেতুর আগের ইতিহাস তুলে অপমান করতে চায়। বাপ-দাদার নাম নিয়ে শপথ নেয় যে, দরিদ্র কালকেতু ভাগ্যগুণে আজ রাজা হয়েছে, খুব শিঘ্রই ভাড়–দত্ত এমন অবস্থা করবে যাতে কালকেতুকে আবার ব্যাধজীবনে ফিরে গিয়ে আবার হাতি-ঘোড়া বেচতে যেতে হয়, ফুল্লারাকেও হাটে হাটে পুনরায় মাংস বেচতে যেতে হয়।

৩৫. পেয়াদা সবার কাছে প্রজারা পালায় পাছে
দুয়ার চাপিয়া দেয় থানা।
প্রজা করে বিয়াকুল বেচে ফাল কোদালি
টাকার দ্রব্য বেচে দশ আনা।

কালকেতু উপাখ্যানের গ্রন্থ-উৎপত্তির কারণ অংশ থেকে নেওয়া। কবির অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত হয়েছে। সমকালীন জমিদারদের অত্যাচারের কথা বলা হয়েছে। জনজীবনের বাস্তব চিত্র প্রকাশিত। জমিদারের অত্যাচারে যাতে প্রজারা পালিয়ে না যেতে পারে সেজন্য প্রতি ঘরে ঘরে পেয়াদা পাহারা দেয়। প্রজারা উপায় না পেয়ে যার যা আছে বিক্রি করে দেয়। কিন্তু প্রকৃত মূল্য পায় না। যোল আনা অর্থাৎ এক টাকার দ্রব্য দশ আনায় বেচতে বাধ্য হয়।

৩৬. দেখিয়া গর্ভের ভর মনে বড় লাগে ওর
ক্ষুধাতৃষা নাজি দিন দশ।
আপনার মত পাই তবে গ্রাস কত খাই
পোড়া মাঝে জামিরের রস।

কালকেতু উপাখ্যানের নিদয়ার ‘সাধ ভক্ষণ’ অংশ থেকে নেওয়া। গর্ভবতী নারীর ইচ্ছার কথা ব্যক্ত হয়েছে। সাধ ভক্ষণের খাবারের তালিকা দেখে সমকালীন নি¤œ শ্রেণির সমাজজীবনের দৈনন্দিন খাবারের একটা বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। বিভিন্ন খাবারের কথা এখানে বলা হয়েছে। নিদয়ার প্রথম গর্ভ, পাশে কেউ নেই, তাই মনে বড় ভয়। এত ভয় যে, দশদিন নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলে যায়। কিন্তু আপন কেউ নেই যে, তার কাছে মনের কথা বলে একটু সাহস পায়। কত কী খেতে ইচ্ছে করে।

জামিরের রস দিয়ে মাছ, খই দিয়ে মহিষের দই, কুল , করমচা, চালিতার ঝোল, আমসি, সিমা, হেলেঞ্চা, গিমা শাক, বোয়াল মাছ,পলতার শাক, কাঁঠালের বিচি, চিংড়ি মাছ, হাঁসের ডিম, সজারুর শিকপোড়া, কই মাছ, পাকা তাল, মুলাতে বেগুন শিম, উড়ম্বর ফল ইত্যাদি । বিশেষ করে টক জাতীয় খাবার বেশি করে খেতে চায়। ধর্মকেতু সকলের কাছে হাত পেতে পেতে সবই যোগাড় করে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। অন্তঃসত্ত্বা বাঙালি নারীর খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করতে গিয়ে নিখুঁত বাস্তবতার পরিচয় দিয়েছেন।

৩৭. নিধানী করিয়া খই তথি মহিষের দই
কুল করঞ্জা প্রাণসম বাসি
যদি পাই মিঠা ঘোল পাকা চালিতার ঝোল
প্রাণপাই পাইলে আমসী ॥

কালকেতু উপাখ্যানের নিদয়ার ‘সাধ ভক্ষণ’ অংশ থেকে নেওয়া। গর্ভবতী নারীর ইচ্ছার কথা ব্যক্ত হয়েছে। সাধ ভক্ষণের খাবারের তালিকা দেখে সমকালীন নি¤œ শ্রেণির সমাজজীবনের দৈনন্দিন খাবারের একটা বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। বিভিন্ন খাবারের কথা এখানে বলা হয়েছে। নিদয়ার প্রথম গর্ভ, পাশে কেউ নেই, তাই মনে বড় ভয়। এত ভয় যে, দশদিন নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলে যায়। কিন্তু আপন কেউ নেই যে, তার কাছে মনের কথা বলে একটু সাহস পায়। কত কী খেতে ইচ্ছে করে।

জামিরের রস দিয়ে মাছ, খই দিয়ে মহিষের দই, কুল , করমচা, চালিতার ঝোল, আমসি, সিমা, হেলেঞ্চা, গিমা শাক, বোয়াল মাছ,পলতার শাক, কাঁঠালের বিচি, চিংড়ি মাছ, হাঁসের ডিম, সজারুর শিকপোড়া, কই মাছ, পাকা তাল, মুলাতে বেগুন শিম, উড়ম্বর ফল ইত্যাদি । বিশেষ করে টক জাতীয় খাবার বেশি করে খেতে চায়। ধর্মকেতু সকলের কাছে হাত পেতে পেতে সবই যোগাড় করে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। অন্তঃসত্ত্বা বাঙালি নারীর খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করতে গিয়ে নিখুঁত বাস্তবতার পরিচয় দিয়েছেন।

৩৮. গন্ডার কহয়ে আমি বড় দুঃখ পাই/ খড়েগর কারণে মোর দুই ভাই।

বনের পশুগণ কালকেতুর অত্যাচাওে জর্জরিত হয়ে দেবী চ-ীর কাছে আসে নালিশ জানাতে। সেখানে বিভিন্ন পশু তাদের নির্যাতনের কথা বলে। গ-ার কালকেতু কর্তৃক কীরূপ হেনস্তার শিকার হয় তার বর্ণনা প্রসঙ্গে উক্ত উক্তি করে।

৩৯. দেখিয়া চন্ডীর রূপ ব্যাধের নন্দন/

ভয়ে কম্পমান তনু মুদ্রিত নয়ন।


চণ্ডীদেবী কালকেতুর বাড়িতে স্বর্ণ গোধিকার রূপ ধরে আসে। ফুল্লরা-কালকেতুর সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। দেবীর কৌতূহলে তারা নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত দেবী নিজমূর্তি ধারণ করে নিজের পরিচয় দেয়। দেবীর স্বরূপ দেখে কালকেতু ভয়ে কেঁপে ওঠে এবং চোখ বন্ধ করে ফেলে।

৪০. ধনের পাইয়া আশ / আসিতে বীরের পাশ/

যায় বান্যা খিড়কীর পথে।

দেবী প্রদত্ত আংটি বেচতে কালকেতু মুরারিশীলের বাড়িতে যায়। কালকেতুর গলা শুনে মুরারি মনে করেছিল কালকেতু বুঝি পাওনা টাকা চাইতে এসেছে। তাই মুরারি নিজের স্ত্রীকে – খুড়া বাড়ি নেই – কালকেতুকে এ কথা বলতে বলে খিড়কির পথে গিয়ে লুকায়। কিন্তু যখন জানতে পারে কালকেতু পাওনা টাকা চাইতে নয়, আংটি বিক্রি করতে এসেছে, তখন অর্থলোভী চতুর মুরারি লুকানো অবস্থা থেকে বের হয়ে খিড়কির পথ দিয়ে বের হয়ে বাড়ির সামনে দিয়ে প্রবেশ করে কালকেতুর পাশে আসার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

৪১. বীর বলে অঙ্গুরীর মূল্য নাহি পাই/

যেজন দিয়াছে ইহা তার ঠাঁই যাই।


মুরারিশীল জানে কালকেতুর কাছে দেবী প্রদত্ত আংটির প্রকৃত মূল্য। তবুও স্বভাবজাত চতুর লোকঠকানো মুরারি কৌশলে আংটির মূল্য কম দেওয়ার চেষ্টা করে। বলে যে এটি সোনা বা রূপা কোনোটায় নয়, ঘষে-মেজে পিতল সোনা করে নিয়ে এসেছে কালকেতু। কালকেতুও বুঝে ফেলে যে, মুরারি ঠকানোর চেষ্টা করছে। তাই প্রকৃত মূল্য পাওয়ার জন্য আংটি প্রদত্ত মালিকের কাছে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। মুরারি বুঝে যায় যে, কালকেতুকে হয়তো ঠকানো যাবে না।

৪২. করিকর সমান বরিষে জলধারা।
জল মহী একাকার পথ হইল হারা।


কালকেতু উপাখ্যানের ‘কলিঙ্গদেশে ঝড়বৃষ্টি আরম্ভ’ অংশে কলিঙ্গদেশে মহাদুর্যোগময় প্রাকৃতিক ভয়াবহতার কথা এখানে বলা হয়েছে। কলিঙ্গরাজ কালকেতুকে বন্দি করলে দেবী চ-ী অসন্তুষ্টু হয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি করে। মেঘে মেঘে আকাশ ছেয়ে যায়। অবিরাম জলধারা ঝরতে থাকে। ঘন মেঘে আচ্ছন্ন হওয়ার কারণে চারদিকে অন্ধকার, কেউ কারও দেখতে পারে না। মেঘের গর্জনে কেউ কারও কথা শুনতেও পায় না। দুর্যোগে জমির ফসল এমন উলটপালট হয়ে যায় যে, প্রজারা ভয় পেয়ে যায়। অবিরাম বৃষ্টির কারণে পথ-ঘাট জলে-কাদায় একাকার হয়ে যায়। প্রজারা ভয়ে রাজ্য ছেড়ে পালায়।

৪৩. তৈল বিনা কৈঁলু স্নান করিলুঁ উদক পান/ শিশু কাঁদে ওদনের তরে।

কালকেতু উপাখ্যানের গ্রন্থ-উৎপত্তির কারণ অংশে সমকালীন জমিদার কর্তৃক প্রজা অত্যাচারের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। জীবন রসিক বাস্তববাদী কবি মুকুন্দরামের হাতে জীবন্ত সমাজবাস্তবতার চিত্র এটি।

৪৪. লইয়া পাবড়া ঢেলা যার সঙ্গে করে খেলা/ তার হয় জীবন সংশয়।

কালকেতু উপাখ্যানের কালকেতুর বাল্যকালের খেলাধুলোর চিত্র আঁকতে গিয়ে কবি এ উক্তি করেছেন। কালকেতু বীর শক্তিশালী। অল্প বয়সেই তার সাথে কেউ পেরে ওঠে না। বাচ্চারা মাটির ঢেলা নিয়ে খেলা করে, কালকেতুও করে, তবে সেই ঢেলা যার গায়ে লাগে সেই বোঝে তার জ্বালা কী।

৪৫. যে জনে আঁকড়ে ধরে/ তুলিয়া আছাড়ে তারে/ ভয়ে কেহ নিকটে না রয়।
কালকেতুর বাল্যকালের কথা বলা হয়েছে। বাল্যকালের ক্রীড়া করার সময় ভয়ে কেউ তার কাছে যেত না।

৪৬. ভোজন করিতে গলা করে ঘড়ঘড়/ বসন খসায় যেন মড়াইব খড়।

বীর কালকেতুর ভোজনের বর্ণনা দিতে গিয়ে এ উক্তি করা হয়েছে। খাওয়ার পরিমাণ এত বেশি যে, আর খাওয়ার আগ্রহও এত বেশি যে, খাওয়ার সময় তার গলায় শব্দ হয় প্রচ-।

৪৭. উইচারা খাই আমি নামেতে ভালুক

নেউগী চৌধুরী নই না করি ভালুক।

বনের পশুগণ কালকেতুর অত্যাচাওে জর্জরিত হয়ে দেবী চ-ীর কাছে আসে নালিশ জানাতে। সেখানে বিভিন্ন পশু তাদের নির্যাতনের কথা বলে। ভালুক কালকেতু কর্তৃক কীরূপ হেনস্তার শিকার হয় তার বর্ণনা প্রসঙ্গে উক্ত উক্তি করে। ভালুকের কথায় সে সময়ের সমাজবাস্তবতা অত্যন্ত নিঁখুতভাবে উঠে এসেছে। অর্থাৎ সে সময়ের সাধারণ মানুষও জমিদারদের অত্যাচারের শিকার হতো।

৪৮. বড় নাম বড় গ্রাম বড় কলেবর লুকাইতে ঠাঁই নাই অরন্য ভিতর

কালকেতু উপাখ্যানের বনের পশুগণ কালকেতুর অত্যাচাওে জর্জরিত হয়ে দেবী চ-ীর কাছে আসে নালিশ জানাতে। সেখানে বিভিন্ন পশু তাদের নির্যাতনের কথা বলে। হাতি কালকেতু কর্তৃক কীরূপ হেনস্তার শিকার হয় তার বর্ণনা প্রসঙ্গে উক্ত উক্তি করে। অন্য পশুরা যেখানে সহজে লুকাতে পারে হাতি তা পারে না। তার বড় দেহ, লুকানোর জায়গা পায় না। কালকেতু ধরে জীবন্ত অবস্থায় হাতির দাঁত উপড়ে নেয়।

৪৯. কি করিব কোথা যাব কোথা গেলে তরি

আপনার দন্ত হৈল আপনার বৈরী।

বনের পশুগণ কালকেতুর অত্যাচাওে জর্জরিত হয়ে দেবী চ-ীর কাছে আসে নালিশ জানাতে। সেখানে বিভিন্ন পশু তাদের নির্যাতনের কথা বলে। হাতি কালকেতু কর্তৃক কীরূপ হেনস্তার শিকার হয় তার বর্ণনা প্রসঙ্গে উক্ত উক্তি করে। অন্য পশুরা যেখানে সহজে লুকাতে পারে হাতি তা পারে না। তার বড় দেহ, লুকানোর জায়গা পায় না। কালকেতু ধরে জীবন্ত অবস্থায় হাতির দাঁত উপড়ে নেয়। হাতি আফসোস করে যে তার নিজের দাঁতই তার বড় শত্রু।

৫০. নিজ ভয়হেতু কৈনু গগনে নিবাস/ জালের বন্ধনে বড় পাইনু তরাস

বনের পশুগণ কালকেতুর অত্যাচাওে জর্জরিত হয়ে দেবী চ-ীর কাছে আসে নালিশ জানাতে। সেখানে বিভিন্ন পশু তাদের নির্যাতনের কথা বলে। পাখি জাতীয় পশু কালকেতু কর্তৃক কীরূপ হেনস্তার শিকার হয় তার বর্ণনা প্রসঙ্গে উক্ত উক্তি করে। ভয়ে তারা আকাশে উড়ে বেড়ায়, কিন্তু কালকেতু জাল দিয়ে তাদের ধরে।

৫১. ইলাবৃত দেশে ঘর জাতি গো ব্রাক্ষনী শিশুকাল হৈতে আমি ভ্রমি একাকিনী
বন্দ্যবংশে স্বামী বাপেরা ঘোষাল সত সতা গ্রহে মোর বিষ জঞ্জাল।
অথবা,
বিষকন্ঠ মোর স্বামী সহিতে না পারি আমি
পঞ্চমুখে মোরে দেয় গালি
একে সতীনের জ্বালা কত সহে অবলা
পরিতাপে হয়্যা গেনু কালী ॥

কালকেতু উপাখ্যানের দেবী চণ্ডী গোধিকারূপে কালকেতুর বাড়িতে আসার পর সুন্দর নারীতে রূপান্তরি হয়। গোলাঘরে তাকে দেখে ফুল্লরা বিস্মিত হয়ে তার পরিচয় জানতে চাইলে বলে যে, সে ফুল্লবার সতিন হয়ে থাকবে এবং কালকেতু নিজে তাকে নিয়ে এসেছে। ফুল্লরা দেবীর পরিচয় জানতে চাইলে হেঁয়ালি করে দেবী আসল পরিচয় দিলেও ফুল্লরার পক্ষে তা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ফুল্লরা মনে করলো যে, সতীনের জ্বালা, নেশাখোর স্বামীর জ্বালা সহ্য করতে না পেরে এ নারী ঘর ছেড়েছে।

৫২. সতিনী কোন্দল করে দ্বিগুণ বলিবে তারে
অভিমানে ঘর ছাড় কেনি
কোপে কৈলে বিষপান আপনি ত্যজিবে প্রাণ
সতীনের কিবা হবে হানি।

দেবী চণ্ডী গোধিকারূপে কালকেতুর বাড়িতে আসার পর সুন্দর নারীতে রূপান্তরি হয়। গোলাঘরে তাকে দেখে ফুল্লরা বিস্মিত হয়ে তার পরিচয় জানতে চাইলে বলে যে, সে ফুল্লবার সতিন হয়ে থাকবে এবং কালকেতু নিজে তাকে নিয়ে এসেছে। ফুল্লরা দেবীর পরিচয় জানতে চাইলে হেঁয়ালি করে দেবী আসল পরিচয় দিলেও ফুল্লরার পক্ষে তা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ফুল্লরা মনে করলো যে, সতীনের জ্বালা, নেশাখোর স্বামীর জ্বালা সহ্য করতে না পেরে এ নারী ঘর ছেড়েছে। ফুল্লরা দেবীরূপী সুন্দরীকে সংসারে ফিরে যেতে যুক্তি হিসেবে উক্ত কথা বলে। সত্যিই তো সতীন ঝগড়া করলে দ্বিগুণ বেগে ঝগড়া করবে বিষ খেয়ে কী লাভ ? তাতে তো সতীনেরই লাভ হয়। মজার ব্যাপার হলো ফুল্লরা কিন্তু নিজে সতীন নিতে রাজি না, দেবীকে সতীন নিয়ে সংসার করতে বলছে।

৫৩. মাংসের পশরা লইয়া বুলি ঘরে ঘরে/ কিছু খুদ কুড়া মিলে উদর না পুরে
অথবা
কি কহিব দুঃখে মোর কহনে নায়ায়/ কাহারে কহিব বল দূষী বাপ মায়।
অথবা
আচ্ছাদন নাহি অঙ্গে পড়ে মাংসজল/ কত মাছি খায় অঙ্গে করমের ফল


অথবা
বড় অভাগ্য মনে গুণি বড় অভাগ্য মনে গুণি/ কত শত খায় জোঁক নাহি খায় ফণী।
অথবা
বৃথা বণিতাজনম বৃথা বনিতাজনম/ ধূলি ভয়ে নাহি সেলি শয়নে নয়ন ॥
অথবা
দুঃখ কর অবধান দুঃখ কর অবধান/ জানু কৃশাণু শীতে পরিত্রাণ

উপরের সমস্ত উক্তিগুলো ফুল্লরার বারমাস্যা অংশ থেকে নেওয়া। দেবী চ-ী ছদ্মবেশে তার সংসারে সতীনরূপে থেকে যাওয়ার কথা বললে ফুল্লরা তার সংসারের নিত্য দুঃখের ঝাঁপি খুলে বসে।


প্রফেসর মো: আখতার হোসেন
বাংলা বিভাগ
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *