Table of Contents

ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর: ভাষাশিল্পের প্রাজ্ঞ কারিগর, নাগরিক চেতনার কবি ও আধুনিকতার অগ্রদূত

ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর : মধ্যযুগের কবি হয়েও আধুনিকতার রূপকার।

প্রফেসর মোঃ আখতার হোসেন , বাংলা বিভাগ ও ডিন, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

ভাষাশিল্পী ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ভাষা-ছন্দ ও অলংকারের শৈল্পিক ব্যবহারের পরিচয়
অথবা, “ভারতচন্দ্র বাগবৈদগ্ধের কবি”
অথবা, “অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল।”- এ উক্তির আলোকে ভারতচন্দ্রের কবি-ভাষার স্বরূপ বিচার ।
অথবা, ‘ভারতচন্দ্র শব্দকুশলী কবি।’ – ‘মানসিংহ-ভবানন্দ’ উপাখ্যান অবলম্বনে উক্তিটির বিচার ।

মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যধারার শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়। তিনি প্রচলিত কাব্য-কাঠামো অনুসরণে কাব্য রচনা করলেও তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ স্বতন্ত্র মর্যাদার দাবিদার। তাঁর প্রখর কবিত্ব-শক্তি, বুদ্ধিদীপ্ত ভঙ্গি তাঁর কাব্যে ফুটে উঠেছে। ভারতচন্দ্র রায় যে সময়ে কাব্য রচনা করেছেন, সে সময়ে সমাজ-জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। নাগরিক জীবনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে গিয়েছে। কবি নিজে ছিলেন রাজসভার কবি। দেবীমাহাত্ম্য কাব্যে ভক্তদের ভক্তির ধারা পাল্টাতে ও শুরু করেছে। ফলে সমাজ-বাস্তবতার কথা মেনে নিয়ে কবি দেবী মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যটুকুই শুধু ঠিক রেখেছেন। তাই, কাব্য-কাঠামোতে সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য শিল্পরীতির দিকে বেশি মনোযোগী হয়েছিলেন।

ভারতচন্দ্র রায় শক্তিমান ও শিল্পকুশলী কবি। তাঁর মতো শব্দকুশলী ভাষাশিল্পী শুধু মধ্যযুগে কেন, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দুর্লভ। সেকালের রুচি ও পরিবেশ তাঁর কাব্যে যেমন অবলীলায় মূর্ত হয়ে উঠেছে, তেমনি খাঁটি বাংলা ভাষার সাবলীল শ্রী ও মাধুর্যগুণ তাঁরই হাতে প্রথমবারের মতো সার্থকভাবে ধরা পড়েছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-

রাজসভাকবি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল গান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তাহার উজ্জ্বলতা তেমনি তাহার কারুকার্য।
শিল্পনৈপূণ্যের দিক থেকে ভারতচন্দ্রের কৃতিত্ব অনন্য, ছন্দবৈচিত্র্যৈ ও শব্দ-ঐশ্বর্যে ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ গান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো, এবং রত্নমালার মতো উজ্জ্বল।

কবির এ কৃতিত্ব কাব্যের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে আছে। সংস্কৃত ও ফারসি শব্দের প্রাণধর্ম ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও কবির শব্দ নির্বাচন ও তার সুষ্ঠ প্রয়োগ কুশলতায় উক্ত ভিন্ন ভাষা একান্ত শ্রুতিমধুর হয়ে উঠেছে। বিষয়বস্তু অনুযায়ী পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কবি সংস্কৃত, বাংলা, হিন্দি ও ফারসি শব্দ অবলীলাক্রমে ব্যবহার করেছেন। এ প্রসঙ্গে কবি নিজেই বলেছেন-

মানসিংহ পাতশায় হৈল যে বাণী।
উচিত যে আরবি-পারসী হিন্দুস্থানী ॥
পড়িয়াছি যেই মত বর্ণিবারে পারি।
কিন্তু সে সকল লোকে বুঝিবারে ভারি ॥
না রবে প্রসাদ গুণ না হবে রসাল।
অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল ॥

এসব ক্ষেত্রে কবির পাণ্ডিত্য ঝিলিক দিয়ে উঠেছে। বর্ণিত বিষয়ের প্রকৃতি বুঝে বিষয়টিকে প্রাণবন্ত করার জন্য কবি অনায়াসেই সে অনুযায়ী শব্দ ব্যবহার করেছেন। মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্যের বর্ণনায় কবি লিখেছেন –

মহারুদ্ররূপে মহাদেব সাজে,
ভভম্ভব ভভম্ভব শিঙ্গা ঘোর বাজে।

পৌরাণিক অংশে পরিবেশ অনুযায়ী কবি সংস্কৃত ও বিশুদ্ধ তৎসম শব্দ ব্যবহার করে বিষয়ের গুরুত্ব ও গাম্ভীর্য বজায় রেখেছেন। অন্যদিকে রাজদরবার, হাটবাজার শহরের আবহাওয়া ইত্যাদি বর্ণনায় সাধারণ মানুষের উপযোগী সহজ সরল শব্দ প্রয়োগ করেছেন-

কল কোকিল অলিকুল বকুল ফুলে
বসিল অন্নপূর্ণা মনি দেওলে।

পারিবারিক জীবন বর্ণনায় কবির ভাষা মাটির কাছাকাছি মানুষের নিত্যদিনের ভাষা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কবির ভাষা গীতিকবিতার কাছাকাছি; সেসব ক্ষেত্রে ভাষা প্রসাদগুণ বিশিষ্ট হয়েছে। শুধু শব্দ নির্বাচনের মধ্যেই কবির পাণ্ডিত্য সীমাবদ্ধ নয়, শব্দগুলো সুবিন্যস্তভাবে বাক্যে স্থাপন করে সংক্ষিপ্ত অথচ সরস ও গভীর ভাবদ্যোতক করে তুলেছেন। কবির প্রবচনের দিকে লক্ষ করলে এর প্রমাণ মেলে-

১) মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতন। ২. নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়।

কাব্য যে দৈবানুগ্রহে রচিত হয় না, তার জন্য চাই সাধনা ও অধ্যবসায়- ভারতচন্দ্র তা প্রমাণ করেছেন। মধ্যযুগের অন্য দুইজন রূপসচেতন শিল্পী জয়দেব ও বিদ্যাপতির সাথে ভারতচন্দ্রের তুলনা করা যায়। ভারতচন্দ্র মধ্যযুগের বাংলা ভাষার গ্রাম্য সরলতার ওপর শহুরে জৌলুস আরোপ করেছেন এবং তা অত্যন্ত সার্থক ভাবে। রসাল ও মধুর শব্দ বিন্যাসে কবি অনেক সময় দৃশ্যকে চিত্রধর্মী করে তুলেছেন-

পাটুনী বলিছে মাগো শুন নিবেদন।
সেঁউতি উপরে রাখ ও রাঙ্গা চরণ ॥

ভারতচন্দ্র রায়ই সর্বপ্রথম সচেতনভাবে শিল্পরীতির অনুসরণ করেছেন । এর আগে বাংলা কাব্যের ছন্দ অলংকারের ক্ষেত্রে সংস্কৃতের অন্ধ অনুকরণ করা হতো। সচেতনভাবে কাব্যের দেহ শিল্প-সুষমামণ্ডিত করার ক্ষেত্রে কবিরও একটা ভূমিকা আছে- তা ভারতচন্দ্রই গভীরভাবে অনুভব করেন। তিনি জানতেন– যে হোক সে হোক ভাষা কাব্যে রস লয়ে– তাই রস সৃষ্টির জন্য উর্দু, আরবি, পারসি ইত্যাদি যাবনী মিশাল ভাষার ব্যবহার করেছেন। শব্দ নির্বাচনের মতো ছন্দ নির্বাচনেও কবির পাণ্ডিত্য-প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। যে ছন্দ যে জাতীয় বর্ণনার পক্ষে একান্ত উপযোগী, কবি বেছে বেছে সবক্ষেত্রেই সে রকম ছন্দ ব্যবহার করেছেন-

উদ্ধ বাহু যেন রাহু চন্দ্র সূর্য্য পড়িছে ।
লম্ফ ঝম্ফ ভূমিকম্প নাগ কূম্ম লাড়িছে।

কবির এই তূণক ছন্দ দক্ষযজ্ঞ নাশের রুদ্র তাণ্ডবের যোগ্য ছন্দই বটে। বৈচিত্র্যহীন বাংলা ছন্দরীতিতে কবি নতুনের চমক দেখিয়েছেন সার্থকতার সাথে। অগাধ পাণ্ডিত্য ও রূপদক্ষ শিল্পীমনের মাধুরী মিশিয়ে গতানুগতিক পয়ার ও ত্রিপদীকে কবি নতুন রূপ দান করেছেন, নতুনভাবে লঘুত্রিপদী-

ঘোড়ায় ঘোরায় যুঝে পায় পায়
গজে গজে শুণ্ডে শুণ্ডে।
সোয়ারে সোয়ারে খর তরবারে
মালে মালে মুণ্ডে মুণ্ডে ।।

একাবলী ছন্দ:
চল চল সব ব্রজ কুমারী।
তরুতলে গিয়া ভেটি মুরারী

মালঝাঁপ ছন্দ:

কোতোয়াল যেন কাল খাঁড়া ঢাল ঝাকে।
ধরি বাণ খরশান হানাহান হাঁকে।

সংস্কৃত ছন্দও কবি সুষ্ঠুভাবেই বাংলায় রূপ দেন, কবির বিখ্যাত ভুজঙ্গ-প্রয়াত ছন্দের কথা বলা যায়-

মহারুদ্রবেশে মহাদেব সাজে।
ভভম্ভম ভভম্ভম মিঙ্গা যোর বাজে।

বাংলা শব্দে যেখানে লঘু গুরু উচ্চারণ-ভেদ নেই, সেখানে সংস্কৃতের লঘুগুরু ছন্দকে অনুকরণ করা দুঃসাধ্য। কবি নিখুঁতভাবে সে-সব ছন্দকে বাংলায় আমদানি করেছেন। কবির কাব্যে ছন্দের মিলের যে মহিমা চোখে পড়ে, তাতে মনে হয় ছন্দের মিলের পাকা ভিত্তি তিনিই সৃষ্টি করে গেছেন। তাঁর ছন্দে মিলের দিক থেকে কোনো ত্রুটি বা দৈন্য নেই, বরং মিলের আতিশয্য আমাদেরকে অবাক ও বিস্মিত করে।

অন্তমিলের ক্ষেত্রে হসন্তবর্ণের সাথে আকারান্ত শব্দের মিল তাঁর কাব্যে নেই। তিনি কেবল শেষ অক্ষরের মিল দিয়ে খুশি থাকেননি। শেষ অক্ষরের আগের স্বরের মিলও তিনি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বজায় রেখেছেন। একটা দিক থেকে কবি বর্তমান যুগকেও ছাড়িয়ে গেছেন। এখনকার দিনে ত্রিপদীর দুই পর্বে বা তিন পর্বে মিল দেবার ব্যবস্থা নেই; তাঁর কাব্যে তিন পর্বেও মিল আছে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন কবিদের মধ্যে ব্রজবুলির কবিদের কথা ছেড়ে দিলে ভারতচন্দ্রের মতো এমন ছন্দের সৌষ্ঠব, বৈচিত্র্য ও পারিপাট্য দ্বিতীয় কোনো কবি দেখাতে পারেননি।

ছন্দের মতো অলংকার ব্যবহারেও ভারতচন্দ্র সুকুশলী শিল্পী। তাঁর কাব্যে অর্থালংকারের চেয়ে শব্দালংকার বেশি। অলংকার সৃষ্টির আশ্চর্য ক্ষমতা ভারতচন্দ্রের কাব্যকে বোঝা করে তোলেনি, বরং সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। অতিরিক্ত শব্দালংকার প্রয়োগ প্রসঙ্গে অনেকে বলেছেন যে, সে যুগের সৌখিন ও অলংকার বিলাসী নগর-জীবনের রুচি ও সংস্কৃতির মতো এটাও আন্তরিকতাশূন্য, ব্যঞ্জনাহীন ও গতানুগতিক। এ কথা সর্বাংশে মেনে নেওয়া যায় না। কাব্যের মধ্যে যমক শ্লেষ, অনুপ্রাস, উপমা, অতিশয়োক্তি ইত্যাদি শব্দালংকার ও অর্থালংকারের যে মালা কবি গেঁথেছেন, এর কলাচাতুর্য কবির উৎকৃষ্ট কবিত্বের নিদর্শন বহন করে।


অনুপ্রাস:
টল টল ঢল ঢল চল চল ছল ছল
কল কল তরল তরঙ্গে ॥

যমক : ১. ভারত ভারত খ্যাত আপনার গুণে ।
২. ঈশ্বরীরে জিজ্ঞাসিল ঈশ্বরী পাটুনী।

শ্লেষ : অতি বড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপুণ।
কোন গুণ নাহি তাঁর কপালে আগুন।”

বিরোধাভাস: অচক্ষু সর্বত্র চান অকর্ণ শুনিতে পান
অপদ সর্বত্র গতাগতি।
উৎপ্রেক্ষা: একচক্ষু কাতরায়ে ছোট ঘরে যায়।
আর চক্ষু রাঙা হয়ে বড় জনে চায় ॥

সবশেষে বলা যায়, শব্দচয়নে ছন্দের লীলাখেলায় ও অলংকার প্রয়োগে ভারতচন্দ্র রায় আশ্চর্যরকম সফলতা লাভ করেছেন। তিনি একাধারে রূপদক্ষ এবং রূপ-শিল্পী। মধ্যযুগের গতানুগতিকতায় তিনি অন্ধভাবে গা ভাসিয়ে চলেননি, চরিত্র-চিত্রণে বা কাহিনিগত দিক দিয়ে কবির সীমাবদ্ধতা থাকলেও কাব্যের বহিরঙ্গ নির্মাণে তিনি সফল এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই, ভাষা, শব্দ, ছন্দ ও শিল্পবোধে কবির ‘অন্নদামঙ্গল’ অন্যান্য মঙ্গলকাব্যের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসন লাভ করে আছে।

ছন্দের পারিপাট্যে ও কাব্যিক বিন্যাসের চাতুর্যে ভারতচন্দ্রের কাব্য সে কালের কাব্যের উজ্জ্বল নিদর্শন।

‘মানসিংহ-ভবানন্দ’ উপাখ্যানের ঘটনা ও চরিত্রগুলো দুর্বল কিন্তু শিল্পগুণ ও কাব্যরস অপূর্ব। তাই অনেকে বলে থাকনে কবি জীবন শিল্পী হিসেবে দুর্বল কিন্তু ভাষালংকার ও ছন্দ শিল্পী হিসেবে অনন্য সমকালীন যুগচেতনার বিচিত্র ও বহুমুখী প্রকাশ কবির কাব্যে লক্ষ করা যায়। পুরাতন কালের ঐতিহ্যের মধ্যে থেকে তিনি নতুনত্বের আমদানি করেছেন। তিনি সমকালীন সমাজ পরিবর্তনে যে নব জীবনের উল্লাস লক্ষ করেছেন তা তার কাব্যরীতি ও ছন্দে, কাহিণি ও চরিত্র সৃষ্টিতে গতানুগতিকতা পরিহারের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেছেন।

অষ্টাদশ শতকের শুরুতেই নয়, সমগ্র মধ্যযুগেই সামন্তপ্রভুদের দৌরাত্ম্যের দাপটে মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে অতিষ্ঠ। মুকুন্দরামের জীবনেও ঘটেছে। ভারতচন্দ্রের জীবনেও ঘটেছে। কিন্তু কবি সে তিক্ত অভিজ্ঞতা কখনো ভুলতে পারেননি। ফলে কাব্যে এসেছে অশ্লীলতা, রঙ্গ-ব্যঙ্গের বাড়াবাড়ি, বিদ্রুপের শানিত চাবুক।
ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের মন্তব্যÑ পারিত্রিক জীবনের কোনো কল্যাণ নহে বরং তাহার পরিবর্তে পার্থিব ভোগ বাসনার চরিতার্থতাই জীবনের একমাত্র কাম্যÑ ভারত চন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের ইহাই মুখ্য প্রেরণা।

ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের নাগরিক-রুচি:

সম্ভাব্য প্রশ্ন:
প্রশ্ন: ‘ভারতচন্দ্র ছিলেন মূলত নাগরিক কবি।’- এ উক্তির যথার্থতা বিচার কর।
অথবা, ভারতচন্দ্র ছিলেন মূলত নাগরিক বৈদগ্ধ্যের কবি। উক্তিটি বিচার কর।
অথবা, মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যান অবলম্বনে ভারতচন্দ্রের নাগরিক রুচির পরিচয় দাও।

উত্তর: মঙ্গলকাব্যে ধারার শেষ কবি, কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভাকবি ভারতচন্দ্র মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি। বিদেশি সাহিত্যের প্রভাবমুক্ত বাংলা সাহিত্যের সর্বশেষ কবি ভারতচন্দ্রের হাতেই বাংলা ভাষা আশ্চর্য পরিণতি লাভ করে, কেননা তিনি ছিলেন শব্দকুশলী ভাষাশিল্পী। কবি অবলীলাক্রমে সে কালের রস-রুচিকে তার কাব্যে প্রকাশ করেছেন। কবির অন্নদামঙ্গলকাব্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মন্তব্য Ñ রাজসভাকবি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল গান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তাহার উজ্জ্বলতা, তেমনি তাহার কারুকার্য।

রাজসভাকবি হওয়া ও তার কাব্যে নাগরিক জীবনের কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাওয়ার কারণে কবিকে অনেকে নাগরিক কবি বলতে চেয়েছেন। আবার অনেকে নাগরিক কবি হিসেবে স্বীকার করেননি।

কেউ বলেছেন – ভারতচন্দ্র নাগরিক কবি। আবার কেউ বলেছেনÑ ভারতচন্দ্র বিদগ্ধ নাগরিক রুচির পরিতৃপ্তি সাধান করেছেন, কাল বিধৃত জীবনকে সৃষ্টি করেননি। এ রকমও বলেছেন অনেকে Ñ তাঁর কাব্য তৎকালীন বাংলাদেশের লৌকিক জীবনধারার নাগরিক রূপ।

রাজসভা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সে হিসেবে রাজসভার কবির কাব্যে গভীরতর জীবনবোধের পরিচয় না থাকলেও তৎকালীন নগর ও দরবারি জীবন সেখানে প্রতিফলিত হবে এটাই স্বাভাবিক। কবির কাব্যে গ্রামীণ স্থূলতার চেয়ে নাগরিক সূক্ষ্মতার পরিচয় বেশি। কোনো অংশ রুচির কাছে কিছুটা আপত্তিকর হলেও কবি অসাধারণ শব্দমন্ত্রে, তীর্যক বাগভঙ্গিমায়, সরস হাস্য-পরিহাসে এবং অম্লান ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে বিচিত্র নাগরিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

ভারতচন্দ্রের কাব্যে প্রতিফলিত রুচি, রূপ-রস, ভাষা-ছন্দÑঅলংকার সব মিলে যে অভিনব বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে, তা সমসাময়িক নগর জীবনরেই প্রতিরূপ। সে জীবনের উদ্দেশ্য হলো জীবনদৃষ্টির চেয়ে আর্ট সৃষ্টি। সমকালীন জীবনের অন্তঃসারশূন্যতাকে কবি সূক্ষ্ম বিদ্রুপের মধ্যে দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করেছেন।

ভাষা-ছন্দ-অলংকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কবির নাগরিক-জনোচিত বাক-সংযম ও বাগবৈদগ্ধ্য রচনা-ভঙ্গিতে একটি স্বাভাবিক দক্ষতার সূচনা করেছিল, ফলে নিতান্ত গ্রাম্য ভাব-ভাষায় বর্ণিত অংশও শিল্পময় হয়েছে।
ভারতচন্দ্রের দেবী মঙ্গলকাব্যের গতানুগতিক দেবীর মতো নয়, এ দেবী সর্বভারতীয় হতে চায়। এ দেবীর ভক্ত রাজসিক ব্যক্তি। এ দেবী লৌকিক নয়, ঐশ্বর্যবান মানুষের প্রচ- প্রতিপত্তিশালী দেবী। এ দেবী পুজোও চেয়েছে ধনী শ্রেণির দ্বারা। স্বর্গের গোবেচারা ধরনের কাউকে মর্ত্যে পাঠিয়ে পুজো চেয়ে তৃপ্ত নয় সে। দেবী পুজো চায় সেই প্রাণ-পরিপূর্ণ জীবনরসিক মানবের, যে স্বচ্ছন্দে বলতে পারে =

এ সুখ যামিনী এ নব কামিনী
এ আমি নব যুবক।
এ রস ছাড়িয়া পূজায় বসিয়া
ধ্যানে রব যেন বক ॥

এ নলকুবের যেন ভোগবিলাসে মত্ত নগরকেন্দ্রিক রাজদরকারের মানুষের প্রতিনিধি।
দেবী-বন্দনার মধ্যেও আত্মনিবেদন ও আত্মসমর্পণ নেই, আছে শ্রদ্ধা। দেবদেবীরা যেন রাজসভার রুচির তৃপ্তির জন্য স্বর্গীয় স্বভাব ভুলে পার্থিব রূপ লাভ করেছে।

দৈবভয়ে বিপর্যস্ত মানুষের চিত্র অঙ্কন মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য হলেও ভারতচন্দ্রের কাব্যে তা নেই বললেই চলে। ব্যাসকৃত গঙ্গা তিরস্কার, ব্যাসের তপস্যায় অন্নদার চাঞ্চল্য ইত্যাদি অংশে পুরুষের পৌরুষত্ব, মানুষের মনুষ্যত্ব মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। যেমন –
সে হোক সে হোক আরো করিব যতন।
মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন ॥

২৫০ রকমের রান্নার তালিকায় গ্রাম্য খাদ্য যেমন আছে, তেমনি লুচি, মোন্ডা, খেচরান্ন, পরমান্ন, ও নানা মেঠাই দ্রব্যের উল্লেখে রাজদরবারের চিত্র ফুটে উঠেছে।

ভারতচন্দ্র রায় এর অন্নদামঙ্গল কাব্যের বিশেষ করে ‘মানসিংহ-ভবানন্দ’ উপাখ্যানে চিত্রিত সমাজ মূলত বর্ধমান-কৃষ্ণনগর-চন্দননগর-মুর্শিদাবাদ ও কোলকাতার নগর-সমাজ, বিশেষ করে ক্ষয়িষ্ণু নবাবি শাসনের শেষ পর্যায়ের সমাজ। তাই, কবির অলংকার সৃষ্টির মধ্যেও দরবারি সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে। অনেকের ধারণা কবি দরবারি জীবনের রুচির খোরাক মেটাতে গিয়েছেন বলেই কাব্যটি অনুপ্রাসের ভারে ব্যঞ্জনাহীন হয়েছে।

কবির বুদ্ধি ও বাক বৈদগ্ধ্য দেখে মনে হয় কবি দরবারকেন্দ্রিক রুচির খোরাক জুগিয়েছেন। তাই, তাঁর কাব্যের ভাব, ভাষা, শব্দ ও অলংকার ব্যবহারে তারই প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে কবির প্রবাদ-প্রবচনগুলো বাক-বৈদগ্ধ্যের অপূর্ব নিদর্শন –
নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়।
এ ছাড়াও তাঁর অনেক উক্তির মধ্যে স্বতন্ত্রতা লক্ষণীয়Ñ
ক) ঈশ্বরীরে পরিচয় কহেন ঈশ্বরী।
খ) এ ত মেয়ে মেয়ে নয়, দেবতা নিশ্চয়।
গ) বিশেষণে সবিশেষ কহিবারে পারি।

ভারতচন্দ্র রায়ের কাব্যে সমকালীন আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, মোগল-পাঠান, দিল্লি-কাশী-পুরীসহ ঐতিহাসিক স্থান, ব্যক্তিত্ব ও ঘটনা, দেবী ও কাব্যে বর্ণিত মানুষের আধুনিক জীবনবোধ, আদিরসের প্রাধান্য, জীবনমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, বাক-বৈদগ্ধ্য ইত্যাদি লক্ষ করেই কবি ভারতচন্দ্র রায়কে অনেকেই নাগরিক কবি বলে অভিহিত করেছেন। বিশেষ করে অনুপ্রাস, যমকাদি শব্দালংকার ও নানা অর্থালংকারের ছড়াছড়িতে সমসাময়িক নাগরিক জীবনের তথাকথিত বিদগ্ধ সমাজ, কুলীন-সমাজ ও অন্যান্য ভদ্র সমাজের গলদ ও গ্লানির এক ঐশ্বর্যময় বর্ণনা কবির কাব্যে রয়েছে। এ রকম বর্ণনার মধ্যে দিয়ে মঙ্গলকাব্যের গ্রামীণ রূপের ওপরে নাগরিক বেশ পরানো হয়েছে।

ভারতচন্দ্র রায় নাগরিক কবি কি না এ প্রসঙ্গে দ্বৈত মতও রয়েছে। মুহম্মদ আবদুল হাই ও আনোয়ার পাশা সম্পাদিত মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যান-এর কবি ভারতচন্দ্র ও তাঁর কাব্য-প্রসঙ্গে আলোচনায় বলা হয়েছে –

যাঁরা মনের করেন, ভারতচন্দ্র নাগরিক কবি এবং নাগরিক জীবনের অন্তঃসারশূন্যতা তাঁর কাব্যকে প্রাণহীন শব্দাড়ম্বরে পর্যবসিত করেছে, এঁদের ধারণার সঙ্গে সর্বাংশে একমত হওয়া কঠিন। ভারতচন্দ্রের জীবন কাহিনি পর্যালোচনা করেই প্রমাণ পাওয়া যায়, ভারতচন্দ্র নাগরিক ছিলেন না, ছিলেন পুরোপুরি গ্রামীণ।

এখানে পুরোপুরি নাগরিক না বলার অর্থ আংশিক নাগরিক, তা এখানে মেনে নেওয়া হয়েছে।
ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থে ভারতচন্দ্র রায়কে নাগরিক কবি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রীভূদেব চৌধুরীও ভারতচন্দ্রের কাব্যের নাগরিক বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ দিয়েছেন। কবির পুরো জীবন নগরকেন্দ্রিক না হলেও ‘মানসিংহ-ভবানন্দ’ উপাখ্যান অনুযায়ী তিনি নাগরিক কবিই। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের নির্দেশে রচিত কাব্যে নগরজীবনের অনেক বিষয় অঙ্কিত। মহারাজের মনোরঞ্জনও কবিকে করতে হয়েছে। মহারাজের সাথে কবিকে যোগাযোগ রাখতেও হয়েছে। তাই, কবির আবাসস্থল গ্রামে না শহরে তা বিবেচ্য নয়।

কাব্যে নাগরিক সভাতার পরিচয় রয়েছে এটাই বড় কথা। কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষের মাহাত্ম্য বর্ণনায় যা কিছু ঘটেছে বা বর্ণিত হয়েছে, তার সাথে নগর সভ্যতাই ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। স¤্রাট জাহাঙ্গীরের দরবার পর্যন্ত ভবানন্দের উপস্থিতি। মানসিংহের সাথে ভবানন্দের সাক্ষাৎও হয়েছে রাজ্যের রাজধানী নগরেই। ভারতচন্দ্র অধিকাংশ সময় গ্রামে বাস করলেও ধনী পরিবারের সন্তান হিসেবে নগর জীবনের সাথে তাঁর যোগাযোগ থাকাটা অসম্ভব নয়। সেই হিসেবে কবিকে নাগরিক কবি বলা যেতে পারে।

মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যান

ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের ‘মানসিংহ-ভবানন্দ’ উপাখ্যান কাব্যে আধুনিকতার ছাপ:

সম্ভাব্য প্রশ্ন:
প্রশ্ন : ‘ ভারতচন্দ্র রায় আঙ্গিকে মধ্যযুগীয়, কিন্তু অন্তর্নিহিত ভাবধারায় অনেকাংশে আধুনিক’ – আলোচনা কর।
অথবা, ভারতচন্দ্রের হাতে মঙ্গলকাব্য চরমোৎকর্ষ লাভ করে – আলোচনা কর।
অথবা, “ভারতচন্দ্রের কাব্যে মঙ্গলকাব্যের কাঠামো বজায় থাকলেও মঙ্গলকাব্যের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়নি।” – উক্তিটির মূল্যায়ন কর।

উত্তর: ভারতচন্দ্র রায় বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের শেষ কবি ও শ্রেষ্ঠ কবি। শ্রীচৈতন্য জীবনীকাব্য বাদ দিলে তাঁর সমকক্ষ কবি মধ্যযুগে নেই বললেই চলে। দেবীমাহাত্ম্য প্রচারে বা কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষের কীর্তিকথা লিখতে বসেও কবি মানুষের কথাও অত্যন্ত হৃদয়তার সাথে তাঁর কাব্যে চিত্রিত করেছেন। ফলে আধুনিকতার কিছু ছাপ তাঁর কাব্যে ফুটে উঠেছে।
ভারতচন্দ্র রায় মঙ্গলকাব্য রচনা করলেও মঙ্গলকাব্য রচনার যে মূল ভিত্তি দেবভক্তি তা তাঁর মধ্যে ছিল না। তিনি কাব্য রচনা করছেন রাজসভাকবি হয়ে কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে। এখানে দেবভক্তি মূল প্রেরণা নয়, মূল প্রেরণা তার অন্নদাতার আদেশ বা পূর্বপুরুষের মাহাত্ম্য প্রচার। তাছাড়া সমকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে মঙ্গলকাব্য রচনার মূলধারা শুকিয়ে গেছে, দেবভক্তি বা দৈবনির্ভরতা কমে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভারতচন্দ্র রায় মহাকবির সমপর্যায়, রাজা কর্তৃক রায়গুণাকর উপাধিপ্রাপ্ত। বিস্ময়কর কবি প্রতিভার স্ফুরণ কাব্যের সর্বাঙ্গজুড়ে। তিনি হাস্যরসিক, রস ও শ্লেষ সৃষ্টিতে অদ্বিতীয়, অপরূপ নৈপুণ্য ছন্দের ক্ষেত্রে। তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্য রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা শিরে ধারণ করেছে-

অন্নদামঙ্গল গান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তাহার উজ্জ্বলতা, তেমনি তাহার কারুকার্য। এই উজ্জ্বলতা এবং কারুকার্য ভারতচন্দ্রের কাব্যের মূল ঐশ্বর্য।

ভারতচন্দ্র রায় মধ্যযুগের ভাবধারায় আবির্ভূত হলেও তিনি ছিলেন সমাজ ও যুগসচেতন, তাঁর অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, রুচি ও নাগরিক অভিজ্ঞতায় আধুনিকতার প্রভাব বিস্তারিত, তাই দেবতার মহিমাকীর্তন তাঁর কাব্যের প্রধান বিষয় হতে পারেনি। যুগের চাহিদা যুগসচেতন কবি উপেক্ষা করতে পারে না। তাই, কাব্যের শুরুতেই কবি ঘোষণা করেছেন –

নতুন মঙ্গল আসে ভারত সরস ভাসে
রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের আজ্ঞায় ॥
অথবা,
সেই আজ্ঞামত কবি রায়গুণাকর।
অন্নদামঙ্গল কহে নবরসতর ॥

ভারতচন্দ্র রায়ের কাব্যগুণ সর্বতোভাবে আধুনিক বৈশিষ্ট্যের ছোঁয়ায় ধন্য। মধ্যযুগের অলংকারবহুল কাব্যধারার পথে বিচরণ করেও ভারতচন্দ্র নতুন বাক ও ভঙ্গির সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তিনি জানতেন গতানুগতিক কাব্যধারায় চর্বিতচর্বণে পাঠক তিক্ত, তাই নিজ কাব্যকে উপভোগ্য ও জনপ্রিয় করার জন্য বেশ কিছু নতুনত্বের সংযোগ সাধান করেছিলেন, যা সে যুগকে অতিক্রম করে নতুন যুগের ইঙ্গিত বহন করে।

ভারতচন্দ্র রায় মধ্যযুগের শেষভাগের কবি। তাঁর সমকাল ছিল ইতিহাসের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়। সামাজিক-রাজনৈতিক বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পূর্বধারার বিশ্বাস-মনন বিপর্যস্ত। রাজনৈতিক বিপর্যয়, বর্গীর হামলা, গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বিপর্যস্ত, যুগবৈশিষ্ট্যের অবসান এরকম পরিস্থিতিতে কাব্য রচনাকালে কবি বুঝতে পেরেছিলেন যে, নতুনের আবাহন ছাড়া – ব্যর্থ হবে গানের পসরা। তাই, পূর্বের কবিদের ন্যায় কাল্পনিক চরিত্রের ওপর নির্ভর না করে ইতিহাস ও পৌরাণিক ভিত্তিক চরিত্রকে কাব্যের নায়ক করেছেন। দেবভক্তির পরিবর্তে মানুষকে বড় করে দেখেছেন। নতুন যুগের ভাবনাকে সামনে টেনে এনেছেন।

ভারতচন্দ্র রায় জানতেন যে, পূর্ববর্তী কাব্যধারার গতি শুকিয়ে গেছে, তিনি জানতেন যে, মরা গাঙে আর বান ডাকে না, তাই মঙ্গলকাব্যের মৃতপ্রায় ধারাকে নতুন খাতে প্রবাহিত করেছিলেন এবং সাফল্য লাভ করেছিলেন। প্রদীপ নিভে যাবার আগে যেমন শেষবারের মতো দপ করে জ্বলে ওঠে, ভারতচন্দ্রের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল।
বৈজ্ঞানিক বিচারবুদ্ধির নিরিখে গোপাল হালদার মন্তব্য করেছেন –

ভারতচন্দ্র রায়কে আধুনিক যুগের কবি বলাও অসম্ভব, মধ্যযুগের কবি বলাও দুঃসাধ্য। তাঁর মনের গড়নে আবেগ-বাহুল্য নেই, সেখানে বুদ্ধির প্রাচুর্যই প্রবল, ধর্মবোধে তিনি ভারাক্রান্ত নন, দেব-দেবীরা মানব-মানবীর মতই তাঁর নিকটে রসিকতার উপাদান। ঐহিকতা তাঁর চিন্তায় ও কাব্যের স্বাভাবিক গুণ।

এই বুদ্ধির ঔজ্জ্বল্য, এই ঐহিকতাবাদ ও প্রণয় রচনায় বাস্তবতাবাদ আধুনিককালের অন্যতম ধর্ম। গোপাল হালদার এই নিরিখে ভারতচন্দ্রের কাব্যে আধুনিকতার সুস্পষ্ট ছাপ দেখতে পেয়েছেন।

আধুনিকতা বা আধুনিক যুগ শুরু আঠারো শতকের গোড়ায়। সেই বিচারে ভারতচন্দ্র রায়কে আধুনিক কবি বললে যুগ-অতিক্রমের দোষে দুষ্ট হতে হয়। কিন্তু আধুনিকতা কখনো সন-তারিখ নিরিখে নয়, তা মন ও মননে। ভারতচন্দ্র যখন কাব্যজগতে আবির্ভূত তখন মোঘল রাজ্য দুর্বলপ্রায়, চারপাশে বশ্যতা অস্বীকারের প্রবণতা, বিদেশি অনেক জাতি এদেশে প্রবেশ করেছে। দেশীয় সংস্কৃতির সাথে আরবি-ফারসি ভাবধারার সংস্পর্শ তো ছিলই সেই সাথে পাশ্চাত্য ভাবধারার আগমনে নতুন সভ্যতা ও সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটে। যুগের এই উভয়ধারার বৈশিষ্ট্য ভারতচন্দ্র রায়ের কাব্যে প্রতিফলিত হবে এটাই তো স্বাভাবিক, যেহেতু তিনি ছিলেন যুগসচেতন কবি।

ভারতচন্দ্র রায় গতানুগতিক ধারার মঙ্গলকাব্য লিখতে বসলেও তিনি যে কাব্য রচনা করেছেন তাতে মঙ্গলকাব্যের বাইরের আবরণ বা খোলসটুকুই আছে। মঙ্গলকাব্যের আভাস বা ঢং বজায় থাকলেও অন্তর্নিহিত ভাবধারা ভিন্ন। দেব-দেবীর বন্দনা থেকে শুরু করে সৃষ্টি কাহিনি, পুজোর জন্য শাপগ্রস্ত কাউকে মর্ত্যে প্রেরণ, বারমাস্যা বা প্রতিনিন্দা ইত্যাদি মঙ্গলকাব্যের বাহ্যিক কাঠামো বা ঠাট ভারতচন্দ্রের কাব্যে পুরোমাত্রায় উপস্থিত, সেই শুধু মঙ্গলকাব্যের প্রাণ। দরবারি ফরমায়েশ থাকায় অনেকে অন্নদামঙ্গল কাব্যকে নিছক মজলিশি রচনা বা সভাসাহিত্য রূপে দেখতে চেয়েছেন। এ নিরিখে ভারতচন্দ্র রায়ের অন্নদামঙ্গলকে পুরোপুরি মধ্যযুগের কাব্যও বলতে পারছি না। আবার এ কথাও নিশ্চিত যে, ভারতচন্দ্রের কাব্যেই প্রথম স্পষ্টভাবে নাগরিক রস-রুচির কথা প্রকাশ পেয়েছে। ফলে আধুনিকতাকে বিচারের মধ্যেই রাখতে হচ্ছে।

আধুনিকতার বিচারে প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে, মননধর্মিতা, আধ্যাত্মিকতার পরিবর্তে ঐহিকতা, একান্তভাবে আবেগময়তা, ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কিংবা প্রেম বা বিশুদ্ধ সৌন্দর্যচেতনা ইত্যাদি আদি আধুনিকতার সুস্পষ্ট লক্ষণ ভারতচন্দ্রের কাব্যে কিন্তু সহজলভ্য নয়। তবে দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচার করতে গিয়ে কবি অন্নদামঙ্গল কাব্যকে মানবধর্মী করে তুলেছেন। কাব্যের দেবদেবীর জীবনযাত্রার মধ্যে সাধারণ মানুষেরই দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে খুঁজে পাওয়া যায়। হরগৌরীর জীবনযাত্রা, ব্যাসদেবের ক্রিয়াকলাপে মানুষেরই জয়গান ঘোষিত হয়েছে। দেবী কর্তৃক বর দেওয়ার আশ্বাস পেয়েও ঈশ্বরী পাটুনীর মুখে কোনো পারলৌকিক আর্তি নয়, ধর্মীয় কোনো আবেগ নয়, শাশ্বত মানব আর্তিই তার মুখে ধ্বনিত হয়েছে Ñ আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। এই যে শাশ্বত ঐকান্তিক মানব আর্তি আধুনিকতারই লক্ষণ। তাঁর কাব্যে ধর্র্মীয় আবেগকে নয়, মানবিক আবেদনের ঐকান্তিকতাকে পাওয়া যায়।

ইতিহাসচেতনা আধুনিকতার লক্ষণ। ভারতচন্দ্রের কাব্যে সমকালীন ইতিহাস উঠে এসেছে। যদিও প্রকৃত ইতিহাস নেই, তবুও তিনিই এ পথের আদি পুরুষ। সমকালীন ঘটনা তথা সমাজচেতনা ভারতচন্দ্রের কাব্যেই প্রথম ফুটে উঠেছে। আধুনিক যুগের সূচনারও আগে মানবজীবনকে কেন্দ্র করে সমাজজীবনের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে ভারতচন্দ্রের হাতেই। নাগরিকবোধের বিকাশও তাঁরই হাতে।

গীতিকবিতা একান্তই আধুনিককালের। মধ্যযুগের সাহিত্যের সন্ধানে ব্যস্ত সমালোচকেরা, সেই আলোকে বৈষ্ণব পদাবলিকে মধ্যযুগের গীতিকবিতা বলা হয়েছে। ভারতচন্দ্রের কাব্যে সরাসরি গীতিকবিতার আদল না থাকলেও যে কয়েকটি বিষ্ণুপদ রয়েছে, তাতে গীতিকবিতার ইঙ্গিতধর্মী বলা যায়।

ভারতচন্দ্র রায় এর অন্নদামঙ্গল কাব্যে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের সম্মিলিত রূপ দেখে অনেকে যুগসন্ধিক্ষণের কবি বলতে চেয়েছেন। কিন্তু ভারতচন্দ্রের যুগকে যুগসন্ধির যুগ বলা চলে না, সেই হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তই যুগসন্ধিক্ষণের কবি। ভারতচন্দ্রের হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য নতুন যুগে প্রবেশ করে। গ্রাম্য বা লোকসাহিত্য আর লোকসাহিত্য থাকেনি, শিক্ষিত-সভ্য সমাজের সাহিত্য, বা রাজদরবারে স্থান করে নিয়েছে।

দেবভাষা পরিত্যাগ করে মানুষের মুখের ভাষাকে মেনে নেওয়া, রচনার মধ্যে মানব-প্রাধান্যকে স্থান দেওয়া, দেবদেবীর মাহাত্ম্যপ্রচারের চেয়ে মানবজীবনের সুখ-দুঃখকে চিত্রিত করা, ঐশ্বরিক নয়, ঐহিক আর্তিকে রূপ দেওয়া এই যে নতুনত্ব, এখানেই কবির কৃতিত্ব। এ ছাড়াও –

চ-ীমঙ্গলের কাল্পনিক নায়ক-নায়িকাতে তিনি আর তুষ্ট হচ্ছেন না – দেবী-মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যটুকুই শুধু অক্ষুন্ন রেখে কাহিনিকে আমূল পরিবর্তিত করে নিচ্ছেন তিনি। কাল্পনিক নায়ক-নায়িকা পরিত্যাগ করে ভবানন্দের মতো একজন ইতিহাসে উল্লিখিত ব্যক্তিকে নায়কের স্থানে বসিয়ে, জাহাঙ্গীর মানসিংহ প্রতাপাদিত্য প্রভৃতি ঐতিহাসিক চরিত্র আমদানি করে সামগ্রিকভাবে মধ্যযুগীয় কাব্যধারাতেই একটি তুলনা-রহিত পরিবর্তন নিয়ে এলেন ভারতচন্দ্র রায়।

মুহম্মদ আবদুল হাই ও আনোয়ার পাশার এ মন্তব্যের সাথে একমত পোষণ করতেই হয়, আর ভারতচন্দ্রের অসাধারণত্ব মনে রাখতেই হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *