ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের বাঙালিয়ানা, স্বদেশপ্রেম, রঙ্গব্যঙ্গ ও নৈসর্গিকচেতনার পরিচয় দাও।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, ডিন, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষধ, রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত : কোন অর্থে খাঁটি বাঙালি কবি ? রঙ্গব্যঙ্গের স্বরূপ, নিসর্গচেতনা। 

ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ ক্রান্তিকালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের (১৮১২-১৮৫৯) আবির্ভাব । একশত বছর বাংলা কবিতার জগত যখন কবিওয়ালা ও শায়েরদের অপকৃষ্ট রচনরায় পরিপূর্ণ তখন সাহিত্যের আঙিনায় নবসম্ভাবনার বাণী নিয়ে আসেন ঈশ্বর গুপ্ত। তিনি যুগসন্ধিক্ষণের কবি। তাঁর কাব্যে একাল ও সেকালের একটা মেলবন্ধন রয়েছে। তিনিই প্রথম বাংলা কাব্যজগতকে গতানুগতিক পথ থেকে টেনে এনে নতুন পথে নিয়ে আসেন।

খোলা পাতা ব্লগের সকল কন্টেন্ট পেতে সূচিপত্র দেখতে ক্লিক করুন

আগের যুগের কৃত্রিম কবিকৃতি ছেড়ে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত নেমে আসেন বাঙাািলর চির পরিচিত ভুবনে। বাংলার নদী-নালা, মাঠ-ঘাট, ফুল-ফল, খাদ্য-খাবার, উৎসব-পার্বন, আচার-প্রথা, বাংলার ঋতু বৈচিত্র্য, মানুষ-সংসার, প্রকৃতি প্রভৃতি অপরূপ ঐশ্বর্য নিয়ে তাঁর রচানায় ফুটে উঠে। এ জন্য ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সবযুগের প্রথম বাঙালি কবি, আলোচ্য নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব তিনি কোন কোন অর্থে খাঁটি বাঙালি কবি।

বিষ্ণু দে বলেছেন-

”সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’ গ্রন্থে ঈশ্বরগুপ্ত সম্পর্কে বলেছেন- গত শতাব্দীর কন্টকিত সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ঈশ্বর গুপ্ত এই ঐতিহ্য রক্ষায় এক দিকপাল”।

ভাষা-প্রয়োগে ও প্রকাশ ভঙ্গিতে বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য অনেকখানিই ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত-এর কবিতায় রক্ষিত হয়েছে। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে ফলে বৃটিশপূর্ব বাঙালিত্ব প্রায় লোপ পেতে বসেছিল। মধুসূদনকে মিল্টন, হেমচন্দ্রকে পিন্ডার, নবীনচন্দ্রকে বায়রন, রবীন্দ্রনাথকে শেলী বলা হতো এক সময়। অথচ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সংঘাতময় পরিবেশে চন্ডীদাস-কবিকঙ্কন-ভারতচন্দ্রের বাংলা ঐতিহ্যের পথে লেখনী চালিয়ে ঐতিহ্যের সংরক্ষণের দিকেই এগিয়েছেন। এদিক থেকে ঈশ্বর গুপ্ত বাঙালির কবি।

ঐতিহ্যবোধ থেকেই দেখা যায় মঙ্গল কাব্যের বারমাস্যার প্রভাব ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তে লক্ষ করা যায়। তবে তিনি বারমাসের নাম উল্লেখ করেনি, তার দেবীও স্বর্গলোকের বাসিনী কাল্পনিক দেবী নন, আধুনিক কালের এক নারী যিনি কল্পিত স্বর্গলোকের পরিবর্তে ইংল্যান্ড-বাসিনী। তিনি শুধু দুঃখের বর্ণনা করেননি, প্রতিকারও চেয়েছেন।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মঙ্গলকাব্যের প্রথাটির আধুনিকীকরণ করেছেন। মঙ্গলকাব্যের ক্ষীণধারা ঈশ্বরগুপ্তে এসে মিশেছে। ভারতচন্দ্র যেমন সন্তানের ভাতের নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন, ঈশ্বরগুপ্তও তেমনি এ যুগের দেবী মহারানীর কাছে সন্তানের কাছে সন্তানের উদরপূর্তির জন্য কেবল একটু ভাত-জলের প্রার্থনা করেছিলেন।-


ওমা নষ্ট করি কষ্ট-পাশ,
রক্ষা কর ভাতে জলে। (নীলকরঃ পঞ্চমগীত)

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এর কবিতায় যে অশ্লীলতার অভিযোগ আনা হয়, তাও সে-কালের বাঙালিরই বৈশিষ্ট্য থেকে আগত। পূজা-পার্বণ, উৎসব, যাত্রাপালা, পাঁচালি, হাফ-আখড়াই প্রভৃতি সেকালের বাঙালি সংস্কৃতি ছিল অশ্লীল। এসব বঙ্গ-সংস্কৃতির মধ্যে অতিবাহিত তার ছেলেবেলা। যুগরুƒচির প্রভাব ও যথার্থ শিক্ষার কারণে সেকালের বাঙালি সংস্কৃতির এই লোকরঞ্জক অশ্লীল দিক ঈশ্বরগুপ্তের কবিতায় পুরোপুরি রক্ষিত হতে পেরেছে।

সেকালের বাঙালি জাতির ভোজন-প্রিয়তা , ভোজন-সংক্রান্ত প্রাচীন রীতি বা প্রথার কথা তাঁর কবিতায় প্রকাশিত। তিনি নিজেও পেটুক কবি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। পাঁটা, এন্ডাওয়ালা তপস্যা মাছ, আনারস, ’ পৌষপার্বণ’ প্রভৃতি কবিতায় বাঙালি জাতির ভোজন বিলাসিতার প্রাচীণ ধারাকেই রক্ষা করে গিয়েছেন।

কোন মতে নাহি মেটে, বাসনার ক্ষোভ।
যতপাই তত খাই, তবু বাড়ে লোভ।।

রান্না করে পেট ভরে খাওয়া শুধু নয়-

অপরূপ হেরে রূপ, পুত্রশোক হরে।
মুখে দেওয়া দূরে থাক, গন্ধে পেট ভরে।

আহারের পর অতিথির হাতে পান-দানের যে প্রাচীন প্রথা বাঙালি সমাজে বিদ্যমান রয়েছে তাও ঈশ্বরগুপ্তের কবিতায় পাওয়া যায়। ভেতো বাঙালির ভোজন রসিকতার পরিচয় আরও বেশি ফুটে উঠেছে কবিতার মধ্যে প্রকাশিত বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের তালিকায়। যেমন- অড়হর, খেঁসারি, ছোলা, ইত্যাদি ডাল, সরিষা, তিসি, তিল, ইত্যাদি তৈলবীজের নাম, খেঁজুর, ইক্ষুরস, ইত্যাদি রস জাতীয় পানীয়ের নাম, কৎবেল, কুল, কাঁঠাল ইত্যাদি ফলের নাম, আলু, মুলো, বেগুন ইত্যাদি শাকসবজির কথা, তপসে, রূই, পঁটি,কই মাগুর ইত্যাদি মাছ, ছাগ, মেষ, পাখি,কচ্ছপ, পাঁটা ইত্যাদির মাংসের কথা তাঁর রচনায় ছড়িয়ে রয়েছে।

বাঙালির ভোজন বিলাসিতার পাশাপাশি সমকালীন বাঙালি সমাজের অন্তর্লোকের খবরও পাওয়া যায়। এমন নিখুঁত বাঙালির ঘরের ছবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এঁকেছেন যা মুকুন্দরাম বা ভারতচন্দ্রকে ম্লান করে দেয়। গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমে ভোজন রসিক বাঙালির কাছে খাবার বিস্বাদ লাগে, মাংসের প্রতিও লোভ থাকে না। কেবল টক জাতীয় খাদ্যের প্রতি বাঙালির আসক্তি বেড়ে ওঠে। গরমে পান্তা-ভাত প্রিয় বাঙালির কথাও আছে।

বলে বাসি, ভালবাসি, নেবু রস গন্ধ বাসি,
পান্তা খান আমানী মাখিয়া।।
(বর্ষার অধিকারে গ্রীষ্মের প্রাদুর্ভাব)।

ঘাম-ঘামাচি এবং জল পিপাসায় কাতর বাঙালির দুরবস্থার কথা, বর্ষাকালে বন্যার কথা, বন্যার সময় পেটুক বাঙালির প্রথমেই রান্নাঘরের খোঁজ নেবার কথা, গাছের ডালে আশ্রয় নেবার কথা, ইত্যাদি বিষয় বাংলাদেশের জীবন্ত ছবিই ফুটিয়ে তোলে।

দুঃখ-কষ্টে থাকলেও বাংলার মানুষ যে রঙ্গ রসের কদর করতে জানে, তার পরিচয়ও ঈশ্বরগুপ্ত দিয়েছেন। বর্ষার সকল দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে হাজির হয় বৃষপুর্ণিমার মাহেশের স্নানযাত্রার মেলা। মেলা মানেই বাঙালির উৎসব। হিন্দু-মুসলমান কোনো ভেদাভেদ থাকেনা। এ রকম বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়

হাঁড়ি মুচি যুগি জোলা কত বা সেকের পোলা,
জাঁকে জাঁকে ঝাঁকে ঝাঁকে চলে।
ঠেলা ঠেলি চুলোচুলি, ফাঁকে ফাঁকে ঝুলোঝুলি,
লোকারণ্য জলে আর স্থলে।।

প্রবাসী বাঙালিদের আশ্বিনের পুজোর ছুটিতে বাড়ি ফেরা, কৌশলে মনিবের কাছ থেকে ছুটি নেওয়া, ছুটি পেয়ে বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা, শুধু পুজোর আনন্দ নয়, বৃটিশ-শোষণে (১২৫৫ সালে) পুজোর সময় বাঙালির অর্থাভাবের কথাও প্রকাশ পেয়েছে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতায়।

একান্নবর্তী পরিবার বাঙালির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শাশুড়ি ননদের গঞ্জনায় অতিষ্ট একান্নবর্তী পরিবারের বাঙালি বধূর অসহায়তার নিখুঁত ছবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর কবিতায় অত্যন্তদক্ষতার সাথে ফুটে উঠেছে।

বধূর মধুর খনি,মুখ শতদল,
সলিলে ভাসিয়া যায় , চক্ষু ছল ছল॥ (পৌষ পার্বণ)

একান্নবর্তী পরিবারের বধুরা রাত্রে শোবার ঘরে ছাড়া স্বামীকে একান্তে পেত না। পৌষ-পার্বণের রাতে নির্জন অবকাশে স্বামীকে পিঠেপুলি খেতে দিয়ে কীভাবে মনের গোপন কথা ও অভিযোগ জানাতো, তাও সাংবাদিক কবির সতর্ক দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে-


প্রাণে আর নাহি সয়, ননদের জ্বালা,
বিষমাখা বাক্যবানে, কান হলো কালা।্

গোপনে তিন হাঁিড় পিঠা শাশুড়ি কন্যার বাড়িতে পাঠিয়েছে, ঠাকুরঝির ছেলেগুলো ঠেসে ঠেসে খেয়েছে, নিজের ছেলে যেন ভেসে এসেছে, না পেয়ে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছে-এরকম নানা অভিযোগ । এ যেন বাঙালির জীবন্ত-আলেখ্য।

গ্রাম বাংলার কবি হিসেবেও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর সুনাম। জলে জঙ্গলে ভরা সেকালের গ্রাম বাংলার ফুল-ফল, সাপ-খোপ, কীট-পতঙ্গ,পশু-পাখি, নদ-নদী, ধানক্ষেত, ঋতু ও প্রাকৃতিক শোভা, নর-নারী,গরমে কাঁঠালের এঁচোড়ে পেকে ওঠা, বর্ষার নধর ধানের চারার নাচানাচি, বর্ষায় ভয়ঙ্কর নদীর ছবি, এমনকি মেলা থেকে গ্রাম্য বিধবাদের বাড়ি ফেরা পর্যন্তরঙ্গ রসিক কবির বর্ননায় অপরূপ হয়ে ধরা পড়েছে। কবির ভাষায়-

”এসে বাড়ি যত রাঁড়ী,ফাঁকে করি ফেলে হাঁড়ি,
হাতে পাখা কাঁটাল মাথায়।
কথা কয় ইলিবিলি, মুখেতে পানের খিলি
গলা বেয়ে পিক পড়ে যায়।

কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত খাঁটি বাঙালি কবি, বাংলা সমাজের কবি, তিনি কোলকাতা শহরের কবি। তিনি বাংলার গ্রাম দেশের কবি। তাই সাধারণ মানুষ পৌষ-পার্বণে পিঠার স্বাদ গ্রহণ করে আর কবি তার মধ্যে কাব্যরসের সন্ধান করেন; বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় চালের দাম চড়া দেখে একটু রস করেন।

রঙ্গ ব্যঙ্গ বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ। কাব্য নিয়ে যে ইয়ার্কি তিনি করেছেন, তাও বাঙালির স্বভাব সিদ্ধ। সব কিছুকে নিয়েই ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত রঙ্গ ব্যঙ্গে মেতে উঠেছেন।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর ভাষাও ছিলো খাঁটি বাংলা কথার ছাঁচে গড়া। সব জিনিসে আনন্দ খোঁজা, সাময়িক বিষয় নিয়ে আগ্রহে মেতে ওঠা – সবই বাঙালি সহজ জীবন প্রীতির লক্ষণ।

কবির কাব্যরীতিও কবিওয়ালাদের মত। খাঁটি বাংলা প্রয়োগে তাঁর কৃতিত্ব। বঙ্কিমের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছেন খাঁিট বাংলার কবি বলে । সেকালের বাঙালিদের মতো স্বভাবসিদ্ধ ভাবে অশ্লীল শব্দের ব্যবহার করেছেন।

অনুপ্রাস-যমকের খেলায়ও তিনি বাঙালিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। শব্দের ব্যবহারে তিনি অদ্বিতীয়। মাতৃভাষার প্রতি তাঁর যে অকৃত্রিম ভালোবাসা, তা তাঁকে বাঙালির কবি করে তুলেছে। অথচ, সে সময় বাঙ্গালা বুঝিতে পারি ” এ কথা স্বীকার করতে অনেকের লজ্জা হতো।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর মতো খাঁটি বাংলা ভাষায়, বাঙালির এমন প্রাণের ভাষায গদ্য কি পদ্য কেউ লেখেন নি। তিনি দেশি ভাব প্রকাশ করেছেন। সমকালে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও ইংরেজি ভাষার প্রভাবে অন্যদের কাছে বাংলা ভাষা ছিলো তাচ্ছিল্য ও ব্যঙ্গের ভাষা। মাতৃভাষার অনাদর তিনি সহ্য করতে পারেনি।

তিনিই প্রথম মাতৃভাষার প্রতি, দেশের প্রতি, দেশের সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি বিশেষ মমত্ববোধ প্রকাশ করেছেন। সংস্কৃতিকে রক্ষার মানসেই তিনি রামপ্রসাদ, ভারত, ভারতচন্দ্রসহ বিভিন্ন কবিওয়ালদের( লালু, নন্দলাল প্রমুখ) জীবনী ও রচনা সংগ্রহ করেছেন। বাংলার কৃষ্টি কালচার লোপ পাচ্ছে জেনেই হয়ত স্ত্রী শিক্ষার প্রসারের প্রতি ব্যঙ্গ করেছেন। ভারতভূমিকে তিনি মাতৃসম ভালোবেসেছেন-এখানেই তিনি বিশেষভাবে বাঙালি কবি।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সমাজসচেতন কবি। সমাজের অভাব-দৈন্য, সংঘাত, অসঙ্গতি, আশা-আক্াঙ্খা, পারিবারিক জীবন, গার্হস্থ্য অন্তর্জীবন, তুচ্ছ-বিষয়, খাদ্যদ্রব্য, উৎসব-পার্বন, ইতিহাস, আচার প্রথা, কোন্দল, বধূর গঞ্জনা ও আশা, সবই উঠে এসেছে। যে সময় পাশ্চাত্যের আদর্শে গা ভাসিয়ে চলেছে শিক্ষিত সমাজ, তখন ঈশ্বর গুপ্ত বাংলার নিখুঁত ছবি তাঁর কবিতায় তুলে এনেছেন। গস্খাম-বাংলার মধুর ও বাস্তব রুপটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে। এখানে তিনি খাঁটি বাংলার কবি, খাঁটি বাঙালি কবি।

উপযুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ঈ্শ্বরচন্দ্র গুপ্ত, ভাবে-ভাষায় সংস্কৃতিতে যে ভাবে বাংলার ঐতিহ্য অবগাহন করেছেন,তাতে তাঁকে বাঙালি কবিই বলতে হয়। তবে তিনি যা, তা আর কেউ নন। তিনি তাঁর রাজ্যে অদ্বিতীয়। সমাজচেতনায়, ঐতিহ্য বোধে, সংস্কৃতি চর্চায়, ভাষার ব্যবহারে , সমাজ-জীবন অঙ্কনে, স্বদেশকে ভালোবাসায়, ঋতু বর্ণনায় , রঙ্গ-ব্যঙ্গে, গার্হস্থ্য জীবনের বর্ণনায়, বাঙালির কৃষ্টি-কালচারের বর্ণনা ও স্বরনে-ঈশ্বরগুপ্ত বাঙালির স্বভাবসিদ্ধ পথেই হেঁটেছেন।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর রঙ্গ-ব্যঙ্গের স্বরূপ

অথবা এত বড় প্রতিভা শুধু ইয়ার্কিতেই শেষ হলো বঙ্কিমের এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা কর।

ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর উনিশ শতকের এক বিশেষ ক্রান্তিলগ্নে বাংলা কাব্য জগতে ঈ্শ্বরগুপ্তের(১৮১২-৫৯) আবির্ভাব। বাংলা কাব্য-জগত যখন কবিওয়ালা ও শায়েরদের অপকৃষ্ট রচনায় পরিপূর্ণ, তখন সাহিত্যেক্ষেত্রে নব সম্ভাবনার বাণী নিয়ে আবির্ভূত হন গুপ্ত কবি। মধ্যযুগের ও সমসময়ের গতানুগতিক পথ পরিহার করে খন্ড খন্ড কবিতার অবয়বে নতুন বিষয় বক্তব্য নিয়ে বাংলা কবিতার জগতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন ঈ্শ্বর চন্দ্র গুপ্ত। বিচিত্র বিষয় নিয়ে ঈশ্বরগুপ্ত মৌলিক কবি প্রতিভার পরিচয় দিলেন ও বিভিন্ন বিষয় অবলম্বনে রঙ্গ-ব্যঙ্গ সৃষ্টিতে তিনি চরম দক্ষতা দেখিয়েছেন এবং এ ক্ষেত্রে তিনি বাংলা সাহিত্যে অদ্বিতীয় , আলোচ্য নিবন্ধে আমরা আলোকপাত করবো।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বিচিত্র বিষয় নিয়ে কবিতা লিখেছেন । তবে রঙ্গ-ব্যঙ্গ বিষয়ক কবিতা রচনায় তিনি পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সমালোচক তারাপদ মুখোপাধ্যায় বলেন-

’’ সামাজিক ও ব্যঙ্গ পর্যায়ের কবিতাগুলির মধ্যে ঈ্শ্বরচন্দ্রের কবিত্ব-শক্তির সম্যক প্রকাশ ঘটিয়াছে, তাহার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য দুটি- রঙ্গপ্রিয়তা ও লঘু চপলভঙ্গি, রসের মধুরালাপনের মধ্যে যেখানেই সামাজিক অনাচার – ব্যভিচার, যেখানেই চারিত্র্য-দৈন্য ও আদর্শ হীনতার প্রকাশ পাইয়াছে, সেখানেই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের হুল ফুটাইয়া তিনি বাঙালিকে সজাগ করিয়া তুলিতে চাহিয়াছেন।”

কবিতায় রঙ্গ -ব্যঙ্গের জন্য বাংলা সাহিত্যে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনিই বাংলা সাহিত্যের প্রথম হাস্যরসের কবি। রঙ্গে ব্যাঙ্গে, হাস্য-পরিহাসে তাঁর কবিতা প্রাণবন্ত-সজীবতায় উজ্জ্বল। গুপ্ত কবির রঙ্গ ব্যঙ্গের একটা বিরাট অংশ আবির্তত হয়েছে হয়েছে সমকালীন বাঙালীর গার্হস্থ্য জীবনচর্চাকে আশ্রয় করে। শ্বশুর-শাশুড়ি আর ননদ-দেবরসহ স্বামীকে নিয়েই বাঙালী নারীর সংসার –জীবন রাতদিন হাড় ভাঙা খাটুনি আর শ্বশুর-কুলের জ্বালা যন্ত্রনাই তা প্রতিদিনের সঙ্গী। কষ্টে প্রান বের হবার উপক্রম হলেও নারীর কোনো অবসর মেলে না। রান্নাঘরে হাঁড়ি তাকেই চড়াতে হয় সংসারের দাবীতে। গুপ্ত কবির কবিতায় এর ব্যঙ্গাত্মক চিত্র পাওয়া যায়। কবির ভাষায় –
” মাগীদের নাহি আর তিন রাত্রি ঘুম।

গড়াগড়ি ছড়াছড়ি রন্ধনের ধূম।

কত থাকে তার কাঁচা কত যায় পুড়ে।
সাধে রাধে পরমান্ন নলেনের গুড়ে।॥”(পৌষ পার্বন)

ঈশ্বরগুপ্তের কবিতায় সমকালীন নানা ঘটনা-বিষয় উঠে এসেছে। বিধবা-বিবাহ আন্দোলন, কৌলিন্য প্রথার অপকারিতা, খ্রিষ্ট ধর্মের ব্যাপক প্রসার, ইংরেজদের অনুকরণপ্রিয়তা, সাহেবীয়ানা বজায় রাখা, দেশীয় আচার-প্রথার অবজ্ঞা, ¯ত্রী শিক্ষা প্রসারে সনাতন স্ত্রীধর্ম লোপ পাবার আশাঙ্কা, খাদ্যভাব ও দুর্ভিক্ষ, ইয়ংবেঙ্গলদের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া, নীলকরদের অত্যাচার প্রভৃতি সে সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তিনি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে এসবের বিরোধিতা করেছেন।

উচ্চশিক্ষার অভাব ও সংস্কারের মোহে ঈশ্বরগুপ্ত বিধবা বিবাহকে সমর্থন করতে পারেননি। অন্যদিকে কৌলিন্য প্রথাকে নিয়েও জায়াগায়ই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বা ইয়ার্কি ঠাট্টা করেছেন। তাই দেখা যায় বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পুরৃষ বিদ্যাসাগরের (১৮২০-৯১) বিধবা বিবাহ প্রচলনের চেষ্টাকে তিনি তীব্র বিদ্রূপ করেছেন-

কোলে কাঁকে ছেলে ঝোলে, যে সকর রাঁিড়
তাহারা সধবা হবে, পরে শাঁকা সাড়ি॥
………………….
শাস্ত্র নয়,যুক্তি নয়, হবে কি প্রকারে?
দেশাচারে ব্যবহারে বাধো বাধো করে॥

তিনি স্ত্রী-শিক্ষাকে সমর্থন করেছেন। তবে এ সমর্থনের মধ্যেও তাঁর ব্যঙ্গ-কৌতুক রয়েছে। কবির ভাষায়-

”লক্ষী মেয়ে যারা ছিল,
তারাই এখন চড়বে ঘোড়া,
চড়বে ঘোড়া,
ঠাঠ ঠমকে চালাক চতুর
সভ্য হবে থোড়া থোড়া।”(বাঙালি মেয়ে)

সাধারণ বাঙালি ঘরের মেয়েদের নিয়েও ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখেছেন-

”সাড়ীপরা এলোচুল, আমাদের মেম।
বেলাক নেটিব লেডি শেম শেম শেম।
সিন্দুরের বিন্দুসহ কপালেতে উল্কি।
নসী, যশী, ক্ষেমী, বামী,রামী,শামী, শুল্কি॥ (ইংরেজি নববর্ষ)

(শতেক বিধোবা হয় একের মরনে কৌলিন্য প্রথার বিরোধিতা)

পরবর্তীতে ঈশ্বরগুপ্ত শিক্ষিতা নবীনাদের আচরন দেখে নারী-শিক্ষার বিরোধিতা করেছেন, কেননা নারীশিক্ষার ফলেই চিরচেনা বাঙালী ললনাদের ভোল পাল্টে গেল। তাই কবি এর বিরোধিতা করে ব্যঙ্গ করলেন এভাবে-

” আগে মেয়েগুলো ছিল ভাল
ব্রত ধর্ম্ম কোর্ত্তো সবে।
এক বেথনি এসে শেষ করেছে
আর কি তাদের তেমন পাবে”।

নারী নিয়ে রঙ্গ তামাসা করলেও তিনি নারী বিদ্বেষী ছিলেন না। গদ্য রচনায় নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতিশীল মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে । আসলে কবির কাছে কাব্য রচনা ও রঙ্গ ছিল সমর্থক। কবি নিজেই বলেছেন-

”পরিহাস ছলে ইসে কাব্য আছে যত,
সে কেবল ব্যঙ্গমাত্র , নহে মনোগত।”

নিছক সৃষ্টির প্রয়োজনে কবিকে ব্যঙ্গ করতে হয়েছে। বহুবিবাহ বাল্যবিবাহ ও কৌলিণ্য প্রথার বিরোধিতা তিনি করেছেন ও ব্যঙ্গ করেছেন। বঙ্কিম বলেছেন-” স্ত্রীলোক তাঁহার কাছে কেবল ব্যঙ্গের পাত্র।”

কেবল স্ত্রীলোক কেন, সমগ্র বস্তুপুঞ্জের প্রতিই কবির রঙ্গ-ব্যঙ্গের কৌতুকদৃষ্টি ছিল। স্থুল কথা, ”ঈশ্বরগুপ্ত জবধষরংঃ এবং ঝধঃরৎরংঃ. ইহা তাঁহার সাম্রাজ্য এবং ইহাতে তিনি বাঙ্গালা” সাহিত্যে অদ্বিতীয়। বিদ্বেষ নয়, গ্লানি নয়, আপন মনের আনন্দটুকুই তাঁর কবিতায় রঙ্গ-ব্যঙ্গের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে।

সমগ্র বস্তুপুঞ্জ ও সর্বস্তরের বাঙালির প্রতিই ঈ্শ্বরগুপ্তের ব্যঙ্গ বর্ষিত হয়েছে। পূজারী ব্রাহ্মণ, মেকি ব্রাহ্মণ পন্ডিত থেকে শুরূ করে সাধারণ মেহনতি মানুষ মুটে, মজুর কেউই তাঁর ব্যঙ্গ থেকে রেহাই পায়নি। পূজারী ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় নিয়ে কবির কৌতুককর বর্ণনা-

” প্রভাতে উঠিয়া মরে, মিছে ফুল তুলে।
পূজার আসনে বসে, মন্ত্র যায় ভুলে।
শিবেরে ঠেকায়ে কলা, কলা আগে চায়।
খপ করে তুলে নিয়ে, গপ করে খায়।”

কবি ছিলেন সমাজ-সচেতন। তাই, সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। সমাজের নব্য শিক্ষিত বিশেষ করে ইয়ংবেঙ্গলদের আধুনিকতার নামে অসভ্যতাকে তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। তিনি সব সময় এদের বিরোধিতা করেছেন। কবি ব্যঙ্গ করে লিখেছেন-

” সোনার বাঙাল করে কাঙাল ইয়ং বাঙাল যতজনা
…………………………………………..
এরা না হিন্দু , না মোসলমান ধর্ম ধর্মের ধার ধারেনা।”

কোলকাতার বাবু-সম্প্রাদাদয়ৈর নির্বুদ্ধিতা, মোহ,আচার আচরন নিয়ে কৌতুক, চড়া সুদে ঋন করেও বাবুয়ানা রক্ষা করার প্রতি ব্যঙ্গ, সখের বাবুদের নকল বাবু হবার চিত্র, তাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো পারিষদ বর্গ, নবীন ও প্রবীনদের মধ্যে বিপরীত আচরণ প্রভৃতি নিয়ে কবি রঙ্গ-ব্যঙ্গে মেতে উঠেছেন।

হাল ফ্যাশানকে লক্ষ করেও কবি কাব্যে ব্যঙ্গরস সৃষ্টি করেছেন। ইংরেজি শিক্ষিত নব্য সম্প্রদায়ের বেদ-বেদান্ত সম্পর্কে যে বক্তব্য তা নিয়েও ব্যঙ্গ প্রকাশ পেয়েছে। রাজনারায়ণ বসু সম্বন্ধে-

” বেকন পড়িয়া করে বেদের সিদ্ধান্ত।”

শিষ্য অক্ষয় কুমার দত্ত, বিদেশী সাহেব-মেম, ছোটলাট,বড় লাট, মার্শম্যান, নীলকর কেউই রঙ্গের হাত থেকে রেহাই পাননি।

কবি নিজেকে নিয়েও ব্যঙ্গরসে মেতেছেন। নীলকরদের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে এদেশের মানুষকে পোষা গরূর সাথে তুলনা করেছেন এবং ব্রিটিশ রানী ভিক্টোরিয়ার কাছে কবি মন্তব্য পেশ করেছেন এভাবে-

তুমি মা কল্পতরূ, আমরা সব পোষাগরূ,
শিখিনি শিং বাঁকানো,
আমরা ভুসি পেলেই খুশী হব,
ঘুসি খেলে বাঁচব না।”(নীলকর)

খাদ্যসামগ্রী নিয়ে কবিতার মধ্যে কবি যে রসের অবতারনা করেছেন তা নিছক রঙ্গ(ঋঁহ)। সেকানে তামাশার হাসি দমকা বাতাসে যেন উপছে পড়েছে। অতি সাধারণ তুচ্ছ বিষয় নিয়েও তিনি রসিকতায় মেতেছেন। ’তমসে মাছ’ কবিতায় তমষে মাছ নিয়ে রঙ্গ-কৌতুক করতে গিয়ে তিনি তপস্বীর সাথে তুলনা করেছেন।-

কষিত কনককান্তিকমনীয কায়।
গালভরা গোঁপ দাঁড়ি, তপস্বীর প্রায়”।

’পাঁটা’ কবিতায় পাঁটা সম্বন্ধে কবির নির্মল আনন্দ রসের পরিচয় প্রকাশিত। কবিতাটিতে, কবির ভোজনের অপরিসীম তৃপ্তি স্বতঃস্ফূর্ত মজার বাণ ডেকেছেন-

”রসভরা রসময় রসের ছাগল।
তোমার কারণে আমি হয়েছি পাগল॥
…………………….
এমন পাঁটার নাম যে রেখেছে বোকা।
নিজে সেই বোকা নয় ঝাড়বংশে বোকা॥”(পাঁটা)

উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর কবিতায় রঙ্গ (ঋঁহ) ব্যঙ্গ (রিঃ)-ই প্রধান। আনন্দ প্রকাশই এই ব্যঙ্গের মৌল উদ্দেশ্য। পাঠক মনোরঞ্জণের বিষয়টিও রয়েছে।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর কবিতায় নিসর্গপ্রীতি বা প্রকৃতি চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।

উনিশ শতকের এক ক্রান্তিকালে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের (১৮১২-১৮৬৯) আবির্ভাব। তাঁর সমকালে সমাজ ছিল বিধ্বস্ত, জীবনযাত্রা ছিলো এলোমেলো, ছিলো প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের দ্বন্দ্ব, নানাবিধ অত্যাচারে বাঙালি শান্তির নীড়ের অন্বেষায় ব্যস্ত। এরকম অনুধর প্রাঙ্গনে ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত নতুনের বার্তা নিয়ে আসেন। তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বৈশিষ্ট ধারন করে থাকলেও আধুনিকতার অনেক লক্ষণ তাঁর রচনায় পাওয়া যায়। সাহিত্যক্ষেত্রে প্রকৃতির ব্যবহার তার আগে কেউ করতে পারেনি।

মধ্যযুগের দেবতানির্ভর অলৌকিক জগৎ থেকে তিনি নেমে আসেন চেনা-জানা মাটিতে। তাঁর কবি- প্রকৃতিতে যে অনন্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যনীয় তা হলো অতি তুচ্ছ, নগন্য, উপেক্ষিত অথচ সুপরিচিত বস্তুসমূহে অপরূপ মহিমাও কাব্য গৌরব আরোপ এবং প্রকৃতিকে প্রধান করে কবিতা রচনা। এসব বিষয় নিযে যে কাব্য রচনা করা যায় তা এর আগে কোনো বাঙালি কবির ধারনা ছিলনা। বলা যায় নিসর্গপ্রীতি বা প্রকৃতি চেতনা ঈশ্বর গুপ্তের মধ্যেই প্রথম লক্ষ করা যায়।

প্রকৃতিপ্রেম আধুনিক কবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট। প্রকৃতিবিষয়ক কবিতায় কবি আধুনিক মনের পরিচয় দিয়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তই প্রথমবারের মতো বাংলা সাহিত্যে নিসর্গকে প্রধান উপজীব্য করে তোলেন। মঘধ্যযুগের কবিরা তাদের কাব্যে প্রকৃতিকে ব্যবহার করেছেন নায়ক-নায়িকার ভাবের আলম্বন বিভাব হিসেবে। বর্ষ, কোকিলের ডাক, ময়ূরের নাচ, কদম ফুল, ডাহুকের ডাক, ব্যাঙের ডাক প্রভৃতি নায়ক-নায়িকার মনে ভাবের উদ্দীুুপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রকৃতিকে বর্ণনা করার জন্য তারা কবিতা লেখেন নি।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর হাত ধরেই প্রকৃতি কাব্যের রাজদরবারে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। মধ্য যুগে বর্ষা নায়ক-নায়িকার বিরহকে তীব্র করেছে, বসন্ততাদের মিলনকে ত্বরান্বিত করেছে। অর্থ্যাৎ প্রাকৃতি সেখানে স্থায়ীভাব বা সঞ্চারী ভাব জাগরনে সহায়তা করেছে। প্রকৃতি সেখানে গৌন। ঈশ্বরগুপ্ত দেখালেন যে, নিসর্গ শুধু মানবমনকে পুলকিত ও অশ্রুসজল করে না, নিসর্গের নিজস্ব একটা অপরূপ রূপও রয়েছে। ষড়ঋতুতে প্রকৃতি যে বিচিত্র রূপ মাধুরী নিয়ে আবির্ভূত হয়, বাংলা সাহিত্যে ঈশ্বর গুপ্তই তা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর প্রকৃতি বিষয়ক কবিতার সংখ্যাও অনেক। এর মধ্যে ঋতু, গ্রীষ্ম, বর্ষার আবির্ভাব, বর্ষার অভিষেক, বর্ষণ বর্ণন, বর্ষার ঝড়, বৃষ্টি, শরদ্বর্ণন, শারতদীয় প্রভাত, বসন্তবর্ণন, ফুল, ঝড়, বর্ষার নদী, প্রভাত, মধ্যাহ্ন, সন্ধ্যা, রজনী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। রূপময় বাংলার বিচিত্র রূপ আর নিসর্গ কবির কল্পনায় বিচিত্র বিন্যাসে ধরা পড়েছে প্রকৃতির সাদামাটা বর্ণানাই নয়, নিসর্গের সাথে মানব মনের সম্পর্ক, প্রকৃতিকেন্দ্রিক বাঙালির পূজা-পার্বনে আনন্দানুষ্ঠান, প্রকৃতিকেন্দ্রিক বাঙালির ভোজন রসিকতা, প্রকৃতিকেন্দ্রিক বাঙালির দৈনন্দিন জীবনধারা প্রভৃতি অপারূপভাবে চিত্রিত হয়েছে। ঋতু আর নিসর্গ তাঁর কবিতায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

এবার কিছু দৃষ্টান্তদেওয়া যেতে পারে। একটা কথা বলা দরকার যে কবি নিসর্গের বর্ণনায় কবিয়ালসুলভ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ভাষার দিকে খেয়াল না করে চরনের পর চরন সাজিয়ে শুধু ছন্দ নির্মান করেছেন।
গ্রীষ্ম কবিতায় –
গ্রীষ্ম করে বিশ্বনাশ, দৃশ্য ভয়ঙ্কর।
সৃষ্টি আর নাহি হয়, দৃষ্টির গোচর।

গ্রীষ্মের তাপে মানুষ ঘেমে ওঠে, মাঠ শুকিয়ে কাঠ হয়, চাষী আশা হারায়, এ ঋতু তাই ..
শস্যচোর গ্রীষ্ম ব্যাটা দস্যূ অতিশয়, তাপে গাছের পাতা শুকিয়ে যায়, যোগীর যোগ ভেঙে যায়, পাখি আহার ছেড়ে দেয়। এর পর হঠাৎ একদিন শোনা যায়- মুষলধারে বৃষ্টির শব্দ।

বর্ষার আগমনে শুষ্ক ধরণী শীতল হয়ে। গাছে নতুন পাতা শোভা পায়। কদম ফোটে, নদী ছাপিয়ে ওঠে, পাঠশালা বন্ধ হয়ে যায় দুর্ভোগ বাড়ে অবলা গৃহিনীদের….
রান্নাঘরে কান্নাহাটী ভিজে কাট ভিজে মাটি,
কোন মতে নাহি জ্বলে চুলো
নাকে চোকে জল সরে সেই দন্ডে ইচ্ছে করে
চুলোশুদ্ধ চোলে যায় চূলো।

বর্ষায় পৃথিবীর মানুষের দুঃখ -বিড়ম্বনা, হাসি-কান্না, কষ্ট, অবসর উৎসব, খাওয়া সবই তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে।

বর্ষার পরে আসে শরৎ। নীল আকাশে তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলা বঙ্গমাতাকে অপরূপ সাজে সাজিয়ে তোলে। শিশির সিক্ত ঘাস, কাশফুলের শোভা, শাপলা – পদ্মের নয়নাভিরাম দুশ্য, নির্মল জলে রাজহংসের বিহার-এসব যেন নিসর্গকে নবরাগে রাঙিয়ে দেয়। শরতেই বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গোসব । বাঙালির হৃদয় মেতে ওঠে। প্রতিটি গৃহকোন আনন্দে ভাসে। ভাসে কারণ—
দুর্গা দরশন অর্থে শরদে আসেন মর্ত্যে
সুরগন সহ শতক্রাতু।

হেমন্তের ফসলকাটার উৎসব, সতুন পিঠা-পায়েসের লোভ ও উৎসব তাঁর কবিতায় থাকলেও হেমন্তের বিরহীরূপ তাঁর কবিতায় ঠাঁই পায় নি। কুহেলি ঘেরা শীত প্রকৃতির অপরূপ বর্ননা –

ঋষির ভাঙিল ধান, শিশির প্রতাপে॥
কুয়াশার ধ্বজা উড়ে, সন্ধ্যা আর প্রাতে।

শীতের পরে আসে বসন্ত। বসন্তের অপরূপ র্ণানাও ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায় পাওয়া যায়। ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায় ষড়ঋতু ও ঋতুকেন্দ্রিক বাঙালির জীবন প্রণালী যে ভাবে ওঠে এসেছে, তাতে করে তাঁেক খাঁটি বাঙালি হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে।সেকালের গ্রাম বাংলার ফুল-ফল, সাপ-খোপ, কীট-পতঙ্গ, পশু –পাখি ,নদ-নদী, ধানক্ষেত, বন্যা খরা, নবান্ন, শস্যপরিপূর্ন হেমন্ত, গোলাপ , গাঁদা,গন্ধরাজ,কুন্দ, মল্লিক,জুই, চাঁপা প্রভৃতি ফুলের সাথে ভাঁটি, বাসক,বেল নাগকেশর ফুলের বর্ণনা প্রভৃতি প্রকৃতি তাঁর রচনায় অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়ে আছে।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর কবিতায় প্রকৃতি ব্যবহার ও কবির নিসর্গ চেতনার সরূপ প্রসঙ্গে তারাপদ মুখোপাধ্যায় বলেছেন-

            ”ঈশ্বরচন্দ্রের কবিতায় সর্ব্বপ্রথম কাব্যের রাজদরারে নিসর্গের স্বতন্ত্র আসন নির্দিষ্ট হইল।”

মোটকথা গ্রীষ্মের প্রচন্ডতা, বষর্’ার জলেডোবা প্রমত্ত নদী, বর্ষার শ্যামল নধর ধান, হেমন্তেশিশির ভেজা বাংলা,বসন্তেনানা রঙের ফুলের মেলা, হাজারও পাখির কূজন, জৈষ্ঠ্যের খরতপ্ততা শেষে কাল বৈশাখীর তান্ডব-সবই তাঁর কবিতায় সুন্দর ভাবে ফুঠে উঠেছে।

প্রকৃতি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর কবিতায় প্রধান উপজীব্য হলেও পাঠকের মনোজগতে কোনো ভাব ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করেনা। প্রকৃতি বিষয়ক প্রধান বৈশিষ্ট্য আত্মলীনতা। অর্থাৎ প্রকৃতির অনির্বচনীয় সৌন্দর্যকে নিজে উপলব্ধি করা এবং অন্যদের চিত্তে ভাব ব্যঞ্জনারূপে আলোড়ন সৃষ্টি করা। কিন্তু গুপ্ত কবির কবিতায় প্রকৃতির বস্তুগত দিক ফুটে উঠেছে বেশি। তাঁর কবিতা বস্তুজগতের সীমালঙ্ঘন করে মানবমনে ভাবের উদ্রেক করেনা। এজন্য অনেকে বলে থাকেন যে, তাঁর নিসর্গপ্রীতি মানুষের অন্তরের সাথে গভীর সংযোগ সাধনে ব্যর্থ হয়েছে। তাই বলা যায় ঈশ্বর গুপ্তের প্রকৃতি ভাবপ্রধান নয়, বর্ণনা প্রধান। তাঁর প্রকৃতি বস্তুধর্মী, ব্যঞ্জনাধর্মী নয়।

আলোচনা শেষে বলা যায় যে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর প্রকৃতি বিষয়ক কবিতা পাঠকের মনে পরিপূর্ণ বঞ্জনা আনতে না পারলেও বাংলা কাব্য জগতে প্রকৃতিকে প্রধান করে তোলার জন্য তাঁর কবিতা অভনবত্ব ও নতুনত্বের দাবীদার। তিনিই প্রথম প্রকৃতিকে কবিতার প্রধান উপজীব্য করেছেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতি বিষয়ক কবিতার ভিত রচিত হয়েছে। ইতহাসের প্রেক্ষাপটে তার নিসর্গপ্রীতি তাই একটু ভিন্নমাত্রার মূল্যায়ন দাবী করে।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *