ফুল্লরার বারমাস্যা: লোকজ নারীমনের বেদনা, ঋতুচক্র ও প্রেমের অন্তর্লীন ইতিহাস / বারমাস্যা কাব্যে গ্রামীণ জীবন, নারী-অনুভূতি ও সামাজিক বাস্তবতার বিশ্লেষণ /লোকসাহিত্যের আলোকে বিরহ-বেদনা ও সাংস্কৃতিক প্রতিচ্ছবি /ঋতুচক্রের অনুপুঙ্খ বর্ণনায় নারীর অন্তর্জগৎ ও সমাজবাস্তবতা / প্রেম, প্রতীক্ষা ও লোকজ জীবনের অন্তর্গত সুরের ব্যাখ্যা
ফুল্লরার বারমাস্যা ও প্রেক্ষিত:
- ফুল্লরার বারমাস্যা – বিরহের বারো মাসের বয়ান
- ফুল্লরার বারমাস্যা –অপেক্ষা, বিরহওজীবনেরগাথা
- ফুল্লরার বারমাস্যা –বিরহিণীফুল্লরাওবারমাস্যারভাষ্য
- ফুল্লরার বারমাস্যা –বারো ঋতুর কান্না: ফুল্লরার বারমাস্যা
বারমাস্যা মঙ্গলকাব্যগুলোর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ। বারমাস্যা বা ছয় ঋতুব্যাপী নায়িকার মনে কষ্ট ভরা বারমাস্যা অংশে নায়িকার মানসিক অবস্থার যথার্থ পরিচয় মেলে। মুকুন্দরাম বিরচিত চন্ডীমঙ্গল কাব্যের কালকেতু উপাখ্যান অংশে বর্ণিত ফুল্লরার বারমাস্যা একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। জীবনাভিজ্ঞতায় ভরা তৎকালীন দরিদ্র-জীবনের নিখুঁত ছবি ও নায়িকা ফুল্লরার বিশেষ এক মানসিক অবস্থার মনোরম চিত্র এ অংশে সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে। ফুল্লবার বারমাস্যার দুঃখ-কাহিনি বর্ণনার পশ্চাতে আছে কবি মুকুন্দরামের দুঃখপ্রবণতা ও দারিদ্র্যের প্রতি সহানুভূতি।
খোলা পাতার সকল কন্টেন্ট দেখতে এখানে ক্লিক করুন
মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যসহ বিভিন্ন আখ্যান কাব্যে নায়ক-নায়িকা বিশেষ করে নায়িকা বারমাস বা ছয় ঋতুর পটভূমিকায় নিজের জীবনের সুখ-দুঃখের পর্যালোচনা করে থাকে। একে বারমাস্যা বলা হয়ে থাকে। বারমাসী মূলত বিরহের গান। নায়িকার অন্তরের দুঃখ বা ক্ষোভ প্রকাশ পায় বারমাসীতে। কখনো শ্রোতা থাকে, আবার কখনো থাকে না। তবে শ্রোতা থাকলে তা হবে নিতান্ত আপনজন ও বিশ্বস্ত। বারমাসীতে পতিনিন্দা থাকে। মিলনের চেয়ে বিরহ, সুখের চেয়ে দুঃখের, আনন্দের চেয়ে বিষাদের বর্ণনা বেশি থাকে। বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ‘বারমাসী’ মধ্যযুগে দেখা যায়। তার মধ্যে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ বিরহমূলক বারমাসী বেশি। ফুল্লরার বারমাস্যা – ফুল্লবার ব্যক্তিগত।
ফুল্লরা দরিদ্র ব্যাধের ঘরণী। দুঃখ তার সংসারের নিত্যসঙ্গী। তাই স্বাভাবিকভাবেই মধ্যযুগের দরিদ্র ও অন্তজ্য শ্রেণীর জীবনের চালচিত্র এর মধ্যে ধরা পড়েছে। ফুল্লবার বারমাসী এসেছে বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে, বিশেষ প্রয়োজনে। তাই, মধ্যযুগের আর পাঁচটা কাব্যের গতানুগতিক ‘বারমাসীর’ চেয়ে ফুল্লবার ‘বারমাসী’ ব্যতিক্রম।
ফুল্লরা দরিদ্র ব্যাধ কালকেতুর ঘরণী। শাশুড়ী ননদ নেই। কালকেতু পশু শিকার করে আর ফুল্লরা হাঁটেহাঁটে পশরা সাজায়। দু‘জনের প্রচেষ্টায় অভাবকে নিত্য সঙ্গী করে তারা সুখে ছিল। অর্থ-সম্পদ না থাকলেও সুখ-সম্পদের অভাব ছিল না। শত টানাটানির মধ্যে তাদের জীর্ণ কুটিরে স্বর্গের শান্তি বিরাজ করতো। কিন্তু দেবী চন্ডীর সামান্য কৌতুকে স্বামী অনুরক্ত ফুল্লরার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
চন্ডী স্বর্ণগোধিকারূপে কালকেতুর কাছে ধরা দেয়। কালকেতু তাকে ঘরে বেঁধে রেখে বাইরে গেল দেবী রূপসী নারীর রূপ ধরে ফুল্লরাকে দেখা দিল। দেবী ফুল্লরাকে উপহাস করে বলে যে, কালকেতু তাঁকে এনেছে, সে এখানেই থাকবে। তাঁর ঘরে সাত সতীন। তাদের দাপট সহ্য করতে না পেরে ঘর ছেড়েছে।
পতিপ্রাণা নারী ফুল্লরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দুঃখের ফিরিস্তি দিয়ে ষোড়শী রমণীকে তাড়ানোর উদ্দেশ্যে নিজের জীবনের দুঃখের তালিকা তৈরি করে। নারীর সংসারে সতীনের মত বিড়ম্বনা আর নেই। সতীন সুখের ভাগ নেয়, দুঃখের ভাগ নেয় না। সেজন্য ফুল্লরা ভাবলো, দুঃখের ছবি যদি দেখানো যায় তাহলে সুন্দরী রমণী নিশ্চয় সংসার ছেড়ে চলে যাবে।
ফুল্লরার বারমাস্যা – ফুল্লরার বারমাসের দুঃখের ঝাঁপি ফুললেই দেখা যায় প্রথমে বৈশাখ মাস। ভেরেন্ডার খামের উপর পাতার ছাউনি দেওয়া ঘর। কালবৈশাখীর ঝড়ে তা ভেঙ্গে পড়ে। বৈশাখের তাপে হাঁটে পশরা বিক্রি করতে পারে না। তাই অভাব সরে না।
পাশেতে বসিয়া রামা কহে দুঃখবাণী।
ভাঙ্গা কুড়্যা ঘরখানি পত্রে ছাওনী
ভেরেন্ডার খাম তার আছে মধ্য ঘরে।
প্রথম বৈশাখ মাসে নিত্য ভাঙ্গে ঝড়ে ॥
জ্যৈষ্ঠমাস ফুল্লবার কাছে ‘পাপিষ্ঠ মাস’। কেননা রোদ্রের তাপে দেহ পুড়ে ছাঁই হয়। তবুও পসরা রেখে জলপান করতে পারে না। এ সময়ে তাই নিত্য অভাব।
পাপিষ্ট জ্যৈষ্ঠমাসে পচ- তপন।
খরতর পোড়ে অঙ্গ রবির কিরণ ॥
পসরা এড়িয়া জল খাত্যে যাত্যে নারি।
দেখিতে দেখিতে চিলে লয় আধা সারি ॥
আষাঢ় মাস চারদিকে পানিতে থৈ থৈ। গৃহস্থদের কোনো কাজ থাকে না। বসে বসে খেয়ে সম্বল ফুরিয়ে যায়। ফলে কেউ মাংস কিনতে চায় না।
আষাঢ়ে পুরিল মহী নবমেঘে জল।
বড় বড় গৃহস্থের টুটয়ে সম্বল ॥
মাংসের পসরা লয়্যা বুলি ঘরে ঘরে।
কিছু খুদ-কুড়া মিলে উদর না পুরে ॥
আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবষে অভাব আরও বেড়ে যায়। কবির ভাষায়Ñ
আচ্ছাদন নাহি অঙ্গে পড়ে মাংস জল।
কত মাছি খায় অঙ্গে করমের ফল ॥
অভাগ্য মনে গুণি অভাগ্য মনে গুণি।
কত শত খায় জোঁক নাহি খায় ফণী ॥
সাপের কামড়ে মৃত্যু হলে হয়তো ফুল্লরা এ ভবযন্ত্রণা থেকে বেঁচে যেতো।
ভাদ্র মাসে চারদিকে পানিতে ভেসে যায়। মুখে দেবার মতো একমুঠো খাবার জোগাড় করা যায় না। ব্যাধপাড়া থেকে আনন্দ উধাও হয়ে যায়। পাড়ার লোকেরা গরিব কিরাত ফলে সাহায্য পাবার মতো কেউ থাকে না।
কিরাত পাড়াতে বসি না মেলে উধার।
হেন বন্ধুজন নাহি যেবা সহে ভার ॥
আশ্বিনের দুঃখ মর্মযাতনায় ভরা। পুজোর উৎসব চারদিকে। পুজোয় পশু বলিদান হয়। বিনা পয়সায় মাংস পেয়ে ফুল্লবার মাংস কেউ খোঁজ করে না। সবার ঘরে আনন্দের উৎসব, কিন্তু ফুল্লবার জীবনে তা নেই, আছেÑ
উত্তম বসনে বেশ করয়ে বনিতা।
অভাগী ফুল্লরা করে উদরের চিন্তা।
কার্তিক মাসে শীতের প্রথম পরশ নেমে আসে। সবাই শীতের কাপড় জোগাড়ে ব্যস্ত হয়। কিন্তু ফুল্লরার জীবনে কোনো বিলাস নেই, তাই তার জন্য নির্ধারিত রয়েছে হরিণের চামড়া।
নিযুক্ত করিলা বিধি সভার কাপড়।
অভাগী ফুল্লরা পরে হরিণের ছড় ॥
অগ্রহায়ণ মাসে ঘরে ঘরে ফসল ওঠে। সর্বত্র সোনালি ধানের ছড়াছড়ি। এ সময় পেটের ক্ষুধার চিন্তা থাকে না বটে, কিন্তু তীব্র শীতের অত্যাচার থেকে মুক্তির উপায় নেই।
উদর পুরিয়া অন্ন দৈবে দিলা যদি।
ঘম-শম শীত তখি নিরমিলা বিধি ॥
পৌষের প্রবল শীতেও ফুল্লবার শীত নিবারণের কোনো উপায় নেই। মাঘ মাসে দুর্ভোগ আরো বেড়ে যায়। চার পাশে কুয়াশায় ভরে যায়। কিছুই দেখা যায় না। কালকেতুর শিকার মেলে না, তাই দারিদ্র্য ফের নেমে আসে।
ফাল্গুন মাস। কোকিল ডাকে, এ মধুমাসে মনে প্রেম জেগে ওঠে। দক্ষিণা বাতাসে মন উতলা হয়। বিরহিণীর মনও দোলে। নারী-পুরুষ একে অপরকে তীব্রভাবে কামনা করে। কিন্তু, ফুল্লবার সে অবকাশটুকুও নেই। কেননাÑ
বণিতা-পুরুষ অঙ্গ পীড়য়ে মদনে।
ফুল্লরার অঙ্গ পুড়ে উদর-দহনে ॥
বিভীষিকার মতো আসে চৈত্রমাস। ঘরের জিনিস বন্ধক রেখে চাল আনতে হয় ঘরের সব জিনিস বন্ধকে চলে যায়। তাও চলে না। ভাত খাওয়ার মাটির পাত্র ছাড়া আর কিছু থাকে না।
অতি দুঃখ মধু মাসে অতি দুঃখ মধু মাসে।
একত্রে শয়নে স্বামী যেন ষোল ক্রোশে ॥
চারপাশ আগুনের হলকা ছোটে, খরা আর খরা।
অনল সমান পোড়ে চইতের খরা।
চালু সেরে বান্ধা দিনু মাটিয়া খাথরা ॥
ফুল্লরার কত আছে করমের ফল।
মাটিয়া পাথরা বিনে অন্য নাহি স্থল ॥
ফুল্লরার এরকমভাবে দুঃখ বর্ণনার উদ্দেশ্য হল সুন্দরী রমণীর কাছে তার সংসারের দুঃখ তুলে ধরা, যাতে রমণী এ সংসারের আশা ত্যাগ করে।
ফুল্লরার ‘বারমাস্যা’ একাধিক কারণে ব্যতিক্রমতার দাবী করতে পারে। ‘বারমাস্যায়’ পতিনিন্দা থাকে। এখানে তা নেই। প্রকৃত দুঃখে পড়লেই নায়িকা তার জীবনের প্রকৃত দুঃখ বর্ণনা করে। কিন্তু এখানে ‘বারমাস্যা’ বর্ণনার পেছনে ফুল্লরার একটা উদ্দেশ্য রয়েছে। সুন্দরী রমণী না আসলে হয়তো আমরা এরকম বর্ণনা পেতাম না। দরিদ্র হলেও অভাব সম্পর্কে ফুল্লরার কোনো অভিযোগ এর আগে পাওয়া যায় না।
ফুল্লরা সতীনের সাথে ঘর করতে রাজী না, অথচ সে নিজেই দেবীকে উপদেশ দিয়েছে সতীনের কাছ থেকে অধিকার আদায় করে নিতে। এই স্ববিরোধিতার কারণেই ফুল্লরা জীবন্ত ও বাস্তব। ফুল্লরার এরকম দুঃখের বর্ণনা দেখে অনেকে কবি মুকুন্দরামকে দুঃখবাদী কবি বলেছেন। কিন্তু দুঃখের বর্ণনা করা, আর দুঃখের কাছে আত্মসর্ম্পণ করা এক নয়। কবি দরিদ্র ছিলেন, নিজে কষ্ট পেয়েছেন। তাই নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে ফুল্লরার বারমাস্যার মধ্যে দিয়ে দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।
কবি কঙ্কন বাস্তববাদী জীবন-রসিক কবি। সুখ-দুঃখের ছবি আঁকতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। বিশেষ করে দুঃখের বর্ণনায় কবির অসম্ভব দক্ষতার পরিচয় মেলে। মঙ্গলকাব্যের ধারায় গতানুগতিক বারমাসী দুঃখ বর্ণনায় কবির অনবদ্য রচনা-শৈলির পরিচয় পাওয়া যায়। দুঃখের বর্ণনার পেছনে ফুল্লরার উদ্দেশ্য ছিল, তাই মনে হয় কবি আড়ালে দাঁড়িয়ে ফুল্লরা ও দেবীর দ্বন্দ্বের ছবি দেখেছেন আর মিট মিট করে হেসেছেন। তবে উদ্দেশ্যটুকু বাদ দিলে শিল্পীর বর্ণনার চমৎকারিত্বে দৈন্য-দুঃখ বাস্তবসম্মত ও বেদনার্ত হয়ে উঠেছে।


