বিদ্যাসাগরের সাহিত্যে “ কেবল মনীষা ও মানবতাবোধ নয়, বিদ্যাসাগরের সাহিত্য-প্রতিভার অন্যতম বৈশিষ্ট্য রহস্যপ্রিয়তা ও কৌতুকানুভূতি”- আলোচনা কর।

”কেবল মানবপ্রীতি ও সমাজ হিতৈষণা নয়, আকর্ষণীয় রহস্যপ্রিয়তা ও কৌতুকানুভূতি বিদ্যাসগরের সাহিত্যচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য” – উক্তিটির যথার্থতা নিরূপণ কর।

বিদ্যাসাগর : রহস্যপ্রিয়তা ও কৌতুকপরায়ণতা

সমাজ-সংস্কারক, বাংলা গদ্যের যথার্থ শিল্পী, উনিশ শতকের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর(১৮২০-১৮৯১) মূলত মানবতাবাদী সাহিত্যিক। মানুষের কল্যাণের দিকে লক্ষ্য রেখেই তিনি লেখনী ধারণ করেন এবং বিভিন্ন সংস্কারে হাত দেন। তাঁর বিচিত্র জীবন, অসাধারণ মেধা, তীক্ষè বুদ্ধি সবই মানবকল্যাণে উৎসর্গীকৃত। আধুনিক শিক্ষা সম্প্রসারণ, স্ত্রী-শিক্ষা প্রচার, বিধবা বিবাহ প্রচার, বহু বিবাহ রোধ, জাতিকে মানব প্রেমে উজ্জীবিত করা, সমাজের নানা কুসংস্কার দূর করা ইত্যাদি কাজ বিবেচনায় তিনি যেন গ্রহান্তরের কক্ষপথ থেকে ছিটকে এসে পড়েছিলেন উনিশ শতকের বাংলাদেশে।

খোলা পাতার ব্লগের সকল কন্টেন্ট দেখতে ক্লিক করুন

অশেষ প্রাণ, অগাধ পান্ডিত্য, অসীম সাহস ও মানবপ্রেমিক বিদ্যাসাগরের অপরিসীম দান বাংলা গদ্যের রূপ নির্মাণ। তবে সাহিত্যের আঙিনায় তাঁর বিচরণ মানব কল্যাণের ব্রত নিয়ে। কিন্তু কেবল মানবপ্রীতি ও সমাজ হিতৈষণা নয়, আকর্ষণীয় রহস্যপ্রিয়তা ও কৌতুকানুভূতি বিদ্যাসাগরের মানবপ্রীতি, সমাজ ভাবনা, আকর্ষণীয় রহস্যপ্রিয়তা ও কৌতুকানুভূতি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

ঈশ্বরচন্দ্রের মানবপ্রীতি, সমাজ-ভাবনা, তাঁর বিশাল, বিচিত্র কর্মব্যাকুল জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়, তাঁর বিভিন্ন ধরণের রচনার মধ্যে। অনুবাদমূলক রচনা, শিক্ষামূলক রচনা, সমাজ-সংস্কারমূলক রচনা, মৌলিক রচনা- এ- সব রচনার মূলে মানবপ্রেম নিহিত ছিলো।

অনুবাদমূলক গ্রন্থ রচনার মধ্যে দিয়ে তাঁর সাহিত্যসাধনা শুরু হয়েছিল। বাসুদেব চরিত, বেতাল পঞ্চ বিংশতি(১৮৪৭৭), শকুন্তলা (১৮৪৭), সীতার বনবাস (১৮৬০), ’ভ্রান্তিবিলাস’ (১৮৬৯) -এ সব অনুবাদমূলক রচনা লেখকের নিজস্ব চিন্তাচেতনায়, ভাষার লালিত্যে, স্বাতন্ত্রিক কৌশল আর ব্যতিক্রমী প্রতিভার স্পর্শে সৃজনশীল সাহিত্যকর্মে পরিণত হয়।

লেখকের সমাজহিতৈষণা ও মানবপ্রীতির সমধিক স্ফূর্তি লাভ করেছে তারঁ শিক্ষামূলক রচনায়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সমাজের সার্বিক মঙ্গল সাধনের জন্য সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষা সংস্কারের। দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। শিশু কিশোরদের পাঠ্যবই ’বর্ণপরিচয়’(১৮৫৫) থেকে শুরু করে সব রকম শিক্ষা সমগ্রীর কথা ভেবেছেন। তাঁর বর্ণ পরিচয় (১৮৫৫), শব্দ মঞ্জুরী(১৮৫৪), কথামালা(১৮৫৬), জীবন চরিত, আখ্যান মঞ্জুরী (১৮৬৩), ঋজুপাঠ (১৮৫১), ব্যাকরণ কৌমুদী, সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা (১৮৫১) , বোধোদয়, ইত্যাদি শিক্ষামূলক গ্রন্থগুলো পাঠ করলে বোঝা যাবে, তাঁর সমাজ-ভাবনা, দেশ-ভাবনা, ও মানবপ্রীতি কত গভীর।

সমাজ বিপ্লবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ঈশ্বরচন্দ্র সমাজ-সংস্কার ও সমাজ পুনর্গঠনে হাত দেন। সমকালীন বাংলাদেশের হিন্দু সমাজের নানাবিধ কুসংস্কার, কুমন্ডুকতা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। সতীদাহপ্রথা, কৌলিন্য বা বহুবিবাহ, এবং বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ প্রভৃতি প্রথা ও অনাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।

ঈশ্বরচন্দ্রের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ২৬ জুলাই ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয় এবং সেই সাথে বহুবিবাহ প্রথা বন্ধ হয়। এ প্রেক্ষিতে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ ঈশ্বরচন্দ্রের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগে। তিনি তাদের বক্তব্যের দাঁত ভাঙা জবাব দেবার জন্যই এবং বিধবা বিবাহের সমর্থনে বিবিধ শাস্ত্র ঘেঁটে অকাট্য যুক্তি তুলে ধরেন। বিধবা বিবাহের যুক্তি এবং বাল্য বিবাহের দোষ তুলে ধরতে রচনা করেন বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব(১৮৫৫) ও বহু বিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার (১৮৭১)

ব্রাহ্মণের ছেলে হয়েও তিনি আচার-বিচারের চেয়ে মানুষকে বড় করে দেখেছেন। তাই,ঈশ্বরচন্দ্রের সাহিত্য-সাধনার মূল প্রেরণা ছিল মানবতাবাদ। তাঁর এ-সব মানবমুখী কর্মের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে ফোঁটা কাটা শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিতেরা কুৎসা রটনা করেছিল। সে-সব টিকিকাটা পন্ডিতদের মতামত ও কুৎসার প্রতিবাদে বিদ্যাসাগর ছদ্মনামে অত্যন্ত তরল পরিহাস ও ব্যঙ্গ-বক্রোক্তিপূর্ণ ভাষায় পুস্তিকা প্রকাশ করে প্রতিপক্ষের হাস্যকর জ্ঞানবুদ্ধিকে প্রতি পদে পদে হাস্যস্পদ করেছেন।

কস্যচিত উপযুক্ত ভাইপোস্য নামে বিদ্যাসাগরের রচিত বেনামী বিতর্কমূলক রচনাগুলোর মধ্যে তাঁর সুতীক্ষè বিদ্রুপবাণে প্রতিপক্ষ প্রতি পদে বিদ্ধ ও বিধ্বস্ত হয়েছে। শাস্ত্রবাক্য উদ্ধৃত করে তিনি বিরুদ্ধ দলকে কাবু করেছেন।

বিদ্যাসাগরের ছোট ছোট গল্প ফেঁদে, রঙ্গ-ব্যঙ্গের বাক্যাঘাতে তিনি তারানাথ তর্কবাচস্পতি ও ব্রজনাথ বিদ্যারতœদের ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছেন। ব্যঙ্গ বিদ্রূপের যে চাবুক তিনি ব্যবহার করেছেন, তরবারির মতো তা রক্ত ঘটিয়েছে। কখনো ভাষার ভুল দেখিয়ে, কখনো প্রতিপক্ষের অসচ্চরিত্রের উল্লেখ করে, কখনো শাস্ত্রবাক্যের সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে, কখনো তাদের আচরণের অসঙ্গতি উদ্ধার করে সহজ , প্রকাশময় স্পষ্ট ভাষায় তিনি ক্ষণে ক্ষণে বিধবাবিবাহ-বিরোধী এবং বাল্য ও বহুবিবাহ-সমর্থক পন্ডিতদের নাজেহাল করেছেন।

অতি অল্প হইল, আবার অতি অল্প হইল গ্রন্থ দুটি রঙ্গ কৌতুকের জন্য বাঙালি হৃদয়ে আজও গেঁথে আছে। ব্রজবিলাস গ্রন্থে ’বেহুদা পন্ডিত’ ব্রজনাথ বিদ্যারতেœন নাস্তানাবুাদের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। উক্ত পন্ডিত বিধবা বিবাহ যে শাস্ত্র সম্মত নয়, তা প্রমাণে উদ্যোগী হলে বিদ্যাসাগর এ জাতীয় পন্ডিতদের চরিত্র বোঝানোর জন্য নানা ধরনের গল্প ফেঁদেছেন। বিদ্যাসাগর মন্তব্য করেছেন যে, তৈল বটের লোভে এ জাতীয় বিদ্যাবাগীশ খুড়ো মশায়রা পারেন না এমন কোনো কাজ নেই। সরস মন্তব্যের জন্য বিদ্যাসাগরের ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দের নমুনা- বেহুদা পন্ডিত, বেঢপ বিদ্যাবাগীশ, ফাজিল চালাক, বেকুবের শিরোমনি ইত্যাদি।

ব্রজনাথকে নিয়ে বিদ্যাসাগরের একটি উক্তি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। আপনাকে বামুনরূপে এবং ব্রজনাথকে নদীয়ার চাঁদরূপে তুলনা করে অতঃপর বিদ্যাসাগরের মন্তব্য ,

ইতিপূর্বে শ্রীমতী যশোহর হিন্দুধর্মরক্ষিনী সভা ভূবনমোহন বিদ্যারতœকে নবদ্বীপ চন্দ্র অর্থাৎ নদীয়ার চাঁদ উপাধি দিয়েছেন। কিন্তু এ পর্যন্ত , এক সময়ে দুই চাঁদ দেখা যায় নাই। সুতরাং একজন বই দু’জনের নদীয়ার চাঁদ হইবার সম্ভবনা নাই। কিন্তু উভয়ের মধ্যে একজন একেবারেই বঞ্চিত হইবেন, সেটাও ভালো দেখায় না। এবং ঐ উপলক্ষ্যে ,দুজনে হুড়হুড়ি ও গুঁতগুতি করিয়া মরিবেন, সেটাও ভালো দেখায় না। এজন্য আমার বিবেচনায়, সমাংশ করিয়া, দু’জনকেই এক এক অর্ধচন্দ্র দিয়া, সন্তষ্ট করিয়া বিদায় করা উচিত।

বিদ্যাসাগরের শ্লেষ-বিদ্রূপের তীব্রতা পাঠমাত্রই সহজে বোধগম্য হয়। খুড়োর কলম করার যে প্রস্তাব বিদ্যাসাগর করেছেন, অর্থ ও ভঙ্গি উভয় দিক দিয়েই তা বাংলা সাহিত্যে অভিনব। অট্টহাস্যের সঙ্গে এ রকম সরাসরি প্রবল আঘাতে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করার দৃষ্টান্ত তার বেনামী রচনাতে এত বেশি যে, দু’একটি উদাহরণের দ্বারা বোঝানো সম্ভব নয়।

বিদ্যাসাগর কেবল দু’হাতে নয়, বরং যেনো দশ হাতে নানা রকম অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্দয়ভাবে একই সঙ্গে আক্রমণ করেছেন। প্রমথনাথ বিশীর মতে তাঁর এ আক্রমণের ভাষাও টাট্টু ঘোড়ার মতো হাল্কা চালে ছুটে চলেছে। মূলত বিদ্যাসাগরের এই কৌতুকানুভূতির তুলনা হতে পারে রবীন্দ্রনাথের সাথে।

বাংলা সাহিত্যে হাস্যরসাত্মক সাহিত্যের তীব্র অভাব লক্ষ্য করে বঙ্কিমচন্দ্র রচনা করেছিলেন ’ লোকরহস্যের ও কমলাকান্তের দপ্তর। এর আগে অবশ্য বাংলা সাহিত্যে ভাঁড়ামীর অভাব ছিলোনা । কিন্তু বিমল রসিকতা কি কাব্যে, কি গদ্যে কোথাও তেমন প্রকাশ পায়নি। তাই পন্ডিতেরা এ ব্যাপারে একক কৃতিত্ব বঙ্কিম চন্দ্রকে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু এ কৃতিত্ব প্রকৃত পক্ষে বিদ্যাসাগরের প্রাপ্য। বিদ্যাসাগর উইট, হিউমান ও স্যাটায়ারের যে মান নির্ধারণ করে দিয়েছেন , বঙ্কিমচন্দ্র তার সমকক্ষতা দাবী করতে পারেন কি নাÑ তা বিতর্কের বিষয়।

বঙ্কিমচন্দ্র হাস্যরস সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু বঙ্কিমের রসিকতা বিশেষভাবে হাস্যরসাত্মক সাহিত্যেই সীমাবব্ধ, আর বিদ্যাসাগরের সকল রচনা-ই কৌতুক আলোকে উদ্ভাসিত। উইট এবং হিউমার ব্যতীত স্যাটায়ারের ব্যবহারে বিদ্যাসাগর বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন। স্যাটায়ারের ব্যবহারে তিনি যে নৈপূণ্য ও ক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন, বঙ্কিমের সাথে তার কোনো তুলনা চলতে পারে না। কেননা বঙ্কিম কদাচিৎ এর ব্যবহার করেছেন, আর কোথাও চেষ্টা থাকলেও বিদ্যাসাগরের তুলনায় তা পানসে।

ব্যক্তিনির্ভর শ্লেষ-বিদ্রুপ ও কৌতুক-হাস্যের প্রাচুর্য আধুনিকতার অন্যতম লক্ষণ। বিদ্যাসাগরের রঙ্গ ব্যঙ্গে আধুনিকতার এ বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। হারুন-অর-রশিদের মতো রাজা বিক্রমাদিত্যকে নিয়ে অনেক মজার গল্প প্রচলিত আছে। বেতালপঞ্চবিংশতি এমনি একগুচ্ছ সরেশ গল্পের গ্রন্থ। ধর্মীয় কোনো প্রেরণা নয়, একান্ত মানবিক রস এ গল্পের উপজীব্য। সমসাময়িক পাঠকের সাহিত্য রুচি বিকশিত হয়ে উঠবে, অতীতের জীবন ধারা সম্পর্কে সকল মোহ ও মিথ্যা ধারণা দূর হবে – এ গল্পের এটাই উদ্দেশ্য। এমন কি মুনি ঋষিদের এবং রাজরাজড়ার মানবিক দুর্বলতা, প্রাচীন প্রেমের হাস্যকরতা এবং প্রাচীন সমাজের অত্যন্ত সাধারণ মূল্যবোধ পরিস্ফুট করে মুক্ত-চিন্তার জন্ম দিতে চেয়েছেন এ গ্রন্থে। এই উদ্দেশ্যে তিনি “বেতালপঞ্চবিংশতি’ কাহিনির ফাঁকে ফাঁকে উইট, হিউমার ও স্যাটায়ারের পর্যাপ্ত মিশ্রণ ঘটিয়েছেন।

দৃষ্টান্ত হিসেবে ভোগবতী নগরের রাজা চন্দ্রভানু কর্তৃক তপস্বীর ধ্যান ভাঙানো কাহিনির মধ্যে বিদ্যাসাগরের বর্ণনার অতিশয়োক্তি, তির্যক ব্যঙ্গ অট্টহাস্যের জন্ম দেয় না বটে, কিন্তু স্মিতহাস্যে পাঠকের মন প্রসন্ন হয়ে ওঠে।

দুর্বৃত্ত স্বামী কর্তৃক সুশীলা স্ত্রী কুপের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তার ক্রন্দন শুনে এক পথিক কুপের ভেতর এই সুন্দরী রমনীকে দেখতে পায়। পথিক দর্শনমাত্র, অতিমাত্র ব্যাকুল হইয়া, পরম যত্নে, সেই স্ত্রীরতœকে সুপ হইতে উদ্ধৃত করিল। পথিকের ব্যাকুলতা এবং পরম যত্ন ও স্ত্রীরত্ন শব্দদ্বয়ের অনুপ্রাস নিঃসন্দেহে কৌতুককর ও ইঙ্গিতাবহ।

শকুন্তলাতেও রহস্যপ্রিয়তা ও কৌতুকানুভূতী লক্ষ্য করা যায়। রাজা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার প্রথম দিকের পরিচয় সঙ্গতভাবেই কৌতুকরসাচ্ছন্ন। এমনকি তার আগে সুন্দরী শকুন্তলার যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাও কৌতুকদীপ্ত। কাহিনীর মধ্যে মধুকরের ফুল ত্যাগ করে শকুন্তলার মুখে বসার যে চেষ্টা এবং শকুন্তলার অকারণ বিহবলতা ও উৎকণ্ঠা তা পাঠকদের সহজেই স্মিতহাস্যে উদ্ভাসিত করে।

সমালোচকদের মতে, যে ব্যঙ্গ কৌতুক লেখক নিজেকে লক্ষ্য করে বর্ষণ করেন , তা-ই নাকি শ্রেষ্ঠতম। এই দিক বিচারে বিদ্যাসাগরকে যথার্থ উচ্চ স্থান দিতে হয়। নিজের জন্মকাহিনী বিবৃত করে বিদ্যাসাগর নিজেকে এঁড়ে বাছুরের সাথে যে রকম তুলনা করেছিলেন , সমগ্র বাংলা সাহিত্যে তা উল্লেখযোগ্য রঙ্গ বলে পরিচিত। বেনামী রচনায় নিজের পরিচয় গোপন রাখার জন্যে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে তিনি বিমল কৌতুকে মত্ত হয়েছেন। যেমন- একগন্ডা একমাস অতীত হইল বিদ্যাসাগর বাবুজি অতি বিদকুটে পেটের পীড়ায় বেয়াড়া জড়ীভূত হইয়া পড়িয়া লেজ নাড়িতেছেন, উঠিয়া পথ্য করিবার তাকত নাই।

পরিশেষে একটা কথা পরিষ্কার যে, ব্যঙ্গ বিদ্রুপের মধ্য দিয়ে বিদ্যাসাগর সমাজের নানা অসঙ্গতিকে নাড়া দিতে চেয়েছেন। তাঁর সকল ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, কৌতুকরস ও রহস্যময়তার আড়ালে কাজ করেছে একটি যথার্থ সামাজিক মন। কথার মারপ্যাঁচ, রসসৃষ্টির কৌশল, বাকবৈদগ্ধ্য, মার্জিত যুক্তিতর্ক, নির্মল হাস্যরস ইত্যাদি তাঁর রচনাকে সজীব ও প্রাণবন্ত করেছে, ফলে তা হয়েছে হৃদয়গ্রাহী। অতএব, বলা যায় কেবল মানবপ্রীতি ও সমাজ হিতৈষণা নয়, আকর্ষণীয় রহস্যপ্রিয়তা ও কৌতুকানুভূতি বিদ্যাসাগরে সাহিত্য রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ ও ডিন, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্বাবিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *